শিরোনাম
You are here: প্রচ্ছদ / আমাদের চট্টগ্রাম / বনদস্যুদের অভয়ারণ্য হয়ে যাচ্ছে চুনতি অভয়ারণ্য
বনদস্যুদের অভয়ারণ্য হয়ে যাচ্ছে চুনতি অভয়ারণ্য

বনদস্যুদের অভয়ারণ্য হয়ে যাচ্ছে চুনতি অভয়ারণ্য

চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ৭০ কিমি দক্ষিণে লোহাগাড়া উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের মধ্যে একটি ইউনিয়নের নাম চুনতি। ইউনিয়নের পূর্ব ও দক্ষিণে পাহাড় এবং উত্তর ও পশ্চিমে এর গা-ঘেঁষে চলে গেছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক। শিক্ষা, সংস্কৃতি ও প্রকৃতির জোন হিসেবে এ স্থানটির নামকরণ বৈশিষ্ট্যমন্ডিত।

ফার্সি শব্দ চুনিদাহ (যার অর্থ নির্বাচিত কথা) থেকে চুনতির উত্পত্তি। অন্য বর্ণনা মতে এখানে এক বৌদ্ধ ভিক্ষুর মঠ ছিল। একদা একজন বহিরাগত লোক এ অঞ্চল দিয়ে যাওয়ার সময় এখানকার নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে অভীভূত হয়ে তিনি ভিক্ষুর কাছে জানতে চান এ সুন্দর অঞ্চলটির নাম কি? ভিক্ষু বললেন চুনিটিয়া। তখন থেকে এ অঞ্চলটি চুনিটিয়া। ক্রমে চুনতি নামে পরিচিতি লাভ করে।

উপমহাদেশীয় জীব-বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ বনাঞ্চল এবং এশিয়ান হাতি প্রজননের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবেও চুনতির পরিচিতি ব্যাপক। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় অঞ্চলটি মুক্তিযোদ্ধাদের গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল। ১৯৮৬ সালে বাঁশখালী, লোহাগাড়া, সাতকানিয়া ও চকরিয়ার ৭ হাজার ৭৬৪ হেক্টর জমি নিয়ে গড়ে ওঠে চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য। এটি বিরল-বিশাল বনাঞ্চল ও প্রচুর সম্পদে ভরা অঞ্চল। কিন্তু বনবিভাগের জনবল সংকট, অভয়ারণ্যের ভিতরে বসতি, ধানি-বন্দোবস্তি ও খাসজমি থাকা এবং এদের ও বনদস্যুদের উত্পাতে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে।

বনবিভাগ সূত্রে জানা যায়, ৭টি সংরক্ষিত বনভূমির এ অভয়ারণ্যে এশিয়ান হাতি, মায়াহরিণ, বানর, বন্যশুকর, মেছোবাঘসহ ১৯ প্রজাতির স্তন্যপ্রাণী, মথুয়া ঘুঘু, বনমোরগ-মুরগিসহ ৫৩ প্রজাতির পাখি, অজগর, দাড়াসসহ ৭ প্রজাতির সরীসৃপ,৭ প্রজাতির উভচর প্রাণী ও বিভিন্ন প্রজাতির মা গর্জনসহ ১০৭ প্রজাতির গাছে ভরপুর ছিল। অভয়ারণ্য সৃষ্টির আগ থেকে অভয়ারণ্যের ভিতরে বহু ধানি-বন্দোবস্তি-খতিয়ানভুক্ত জমি ও ঘরবাড়ি থাকায় ক্রমান্বয়ে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। বর্তমানে অভয়ারণ্যে প্রতিনিয়ত একপালে ১০/১২টি হাতিসহ বিভিন্ন পশুপাখির বিচরণ দেখা যায়। বনপুকুর এলাকায় ৮ শতাধিক মা গর্জনসহ বিভিন্ন প্রজাতির সারি সারি গাছ অভয়ারণ্যের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যকে বৃদ্ধি করেছে। বন কর্মকর্তারা জানান, অভয়ারণ্য সৃষ্টির বহু আগ থেকে উক্ত এলাকায় বহু ধানি-বন্দোবস্তি-খতিয়ানভুক্ত জমি, বাড়িঘর রয়েছে। বাস করছে রোহিঙ্গা পরিবারসহ বহু পরিবার, যারা প্রতিনিয়ত বন-অপরাধে লিপ্ত রয়েছে। অভয়ারণ্যটিকে টিকিয়ে রাখতে হলে জবরদখলকারীদের উচ্ছেদসহ উক্ত জমি বনবিভাগের আওতায় আসলে এটির আসল চেহারা ফিরে আসবে বলে তারা জানান। অভয়ারণ্যের বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনার ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগে জনবলের খুবই সংকট রয়েছে।

আইপ্যাক (সমন্বিত সংরক্ষিত এলাকা ব্যবস্থাপনা কমিটি) সূত্রে জানা যায়, অভয়ারণ্য এলাকায় ৩৪টি গ্রাম ও ৩ হাজার ৫১০টি পরিবার রয়েছে। জনসংখ্যা রয়েছে অর্ধ লক্ষ। ১৯৯২ সালে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের অধীনে আইপ্যাক প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। ওই সময়ে অভয়ারণ্যের গাছ অবাধে নিধন হয়ে বিলুপ্ত হয়ে যায় বহু প্রজাতির উদ্ভিদ। ২০০৩ সালে প্রকল্প এলাকায় চুনতি ও জলদী রেঞ্জের অধীনে ৭টি বিট স্থাপন করা হয়। ২০০৫ সালে অভয়ারণ্যের জীববৈচিত্র্য রক্ষার্থে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে সহ-ব্যবস্থাপনা কাউন্সিল ও কমিটি গঠন করা হয়। ইউএসআইডি’র অর্থায়নে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের নিসর্গ সহায়তা প্রকল্পের মাধ্যমে অভয়ারণ্য এলাকায় সহ-ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম জোরদার করা হয়। বনবিভাগ ও স্থানীয় জনগণের উদ্যোগী ভূমিকায় উক্ত বনাঞ্চলের মাদার-ট্রি রক্ষাসহ হারানো সবুজ ফিরে আসতে শুরু করে। ফলে ২০১২ সালে এ অভয়ারণ্যটি জাতিসংঘের পুরস্কার লাভ করে। বর্তমানে পর্যটকদের আকর্ষণের জন্য এখানে বনপুকুর ফুটট্রেইল, জাংগালিয়া ফুটট্রেইল, পর্যটন টাওয়ার, গোলঘর স্টুডেন্ট ডরমেটরি, নেচার কনজারভেশন সেন্টার ও গবেষণা কেন্দ্রসহ পর্যটক কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। অন্যদিকে পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ হতে পারে অভয়ারণ্য এলাকার পুকুর, গর্জনের বন ও গয়ালমারার প্রাকৃতিক হরদ। অভয়ারণ্যের সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যরা জানান, চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য এদেশের বিরল বন এলাকা ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ। এখানে ইকোটুরিজমের কিছু বিশেষ পর্যটন অবকাঠামো হলে এটি দেশের অন্যতম ইকোপার্কে পরিণত হবে। আয় হবে সরকারের কোটি কোটি টাকা। ২০০৯ সাল থেকে অভয়ারণ্যের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা ও সৌন্দর্য্য বৃদ্ধির জন্য কাজ করছে আন্তর্জাতিক সংস্থা জিআইজেড (জার্মান সহযোগিতা সংস্থা)। এ সংস্থার প্রজেক্ট অফিসার সালেহ মো. মুছা জানান, সংস্থাটি বনরক্ষায় বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। ইতিমধ্যে অভয়ারণ্যের বন রক্ষায় ২৭৩ জন বনপ্রহরীকে আর্থিক সাপোর্টসহ বন নির্ভর ২ হাজার ৬শ জনকে জীবিকা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। অভয়ারণ্য এলাকায় দখলদারিত্বকে উচ্ছেদ করা গেলে এটি দেশের অন্যতম একটি আধুনিক ইকোপার্কে পরিণত হবে বলে তিনি জানান।

আইইউসিএন (ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব (ন্যাচার)-এর কমিউনিটি অর্গানাইজার মো. আকতার হোসেন জানান, এ বছর থেকে অভয়ারণ্য এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে হাতি ও মানুষের মধ্যে সংঘর্ষ কমানোর জন্য বিশ্ব ব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় আইইউসিএন ও বনবিভাগ যৌথভাবে প্রকল্প শুরু করেছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা বিভাগের প্রফেসর ড. মোহাম্মদ কামাল হোসাইন ‘দৈনিক ইত্তেফাক’কে জানান, ২০১২ সালে তার নেতৃত্বে ৪ সদস্যের একটি দল চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য এলাকায় ৭ মাস জরিপ চালিয়ে ৬৯১ প্রজাতির উদ্ভিদের সন্ধান পাওয়া যায়। এ অভয়ারণ্য প্রচুর সম্পদের সমৃদ্ধ অঞ্চল। বনদস্যুদের হাত থেকে এটিকে রক্ষা করা গেলে আগামী ১০ বছরের মধ্যে তার প্রকৃতরূপ ফিরে আসবে বলে তিনি জানান। চুনতি অভয়ারণ্যের বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক কাজল তালুকদার জানান, জেআইজেড’র অর্থায়নে অভয়ারণ্যে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল উন্নয়ন ও বন্যপ্রাণীর খাদ্য বৃদ্ধি ও নিরাপত্তাসহ প্রাকৃতিক বন সুরক্ষা, বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও ইকোট্যুরিজমের কাজ চলছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. ফিজনুর রহমান জানান, চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য উপমহাদেশের জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ একটি বিরল-বিশাল বনাঞ্চল। এশিয়ান হাতি প্রজননের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবেও এটি খ্যাত।

আপনার মতামত দিন

Scroll To Top