শিরোনাম
You are here: প্রচ্ছদ / শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি

বিভাগ: শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি

Feed Subscription

রজনীকান্ত সেন

রজনীকান্ত সেন (জন্মঃ ২৬ জুলাই১৮৬৫ – মৃত্যুঃ ১৩ সেপ্টেম্বর১৯১০) প্রখ্যাত কবি, গীতিকার এবং সুরকার হিসেবে বাঙালি শিক্ষা-সংস্কৃতিতে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের সমসাময়িক এই গীতিকারের গানগুলো খুবই জনপ্রিয়। ঈশ্বরের আরাধনায় ভক্তিমূলক ও দেশের প্রতি গভীর মমত্ববোধ বা স্বদেশ প্রেমই তাঁর গানের প্রধান বৈশিষ্ট্য ও উপজীব্য বিষয়।

পিতা গুরুপ্রসাদ সেন ও মাতা মনোমোহিনী দেবীর ৩য় সন্তান ছিলেন রজনীকান্ত। গুরুপ্রসাদ চারশত বৈষ্ণব ব্রজবুলী কবিতাসঙ্কলনকে একত্রিত করে ‘পদচিন্তামণিমালা’ নামক কীর্তন গ্রন্থ প্রকাশ করেন। এছাড়াও ‘অভয়াবিহার’ গীতি-কাব্যের রচয়িতা ছিলেন তিনি। মনোমোহিনী দেবী সু-গৃহিণী ছিলেন। রজনীকান্তের জন্মের সময় তিনি কটোয়ায় কর্মরত ছিলেন। তাঁর শৈশবকালীন সময়ে তিনি অনেক জায়গায় চাকুরী করেন। ১৮৭৫ সালে বরিশালের সাব-জজ পদ থেকে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করেন। ফলে তাঁদের পুরো পরিবার জ্যেঠার বড় ছেলে – বরদা গোবিন্দ এবং কালী কুমারের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। দূর্ভাগ্যবশতঃ ১৮৭৮ সালে তারা উভয়েই আকস্মিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন। রজনী’র ছোট ভাই জানকীকান্ত জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়েও মারা যায়। ফলে, আকস্মিকভাবেই আর্থিকভাবে স্বচ্ছল পরিবারটি চরম আর্থিক সঙ্কটে নিপতিত হয়। বড় ভাই গোবিন্দনাথও একজন সফল আইনজীবী ছিলেন।

শিক্ষাজীবন[সম্পাদনা]

শৈশবে রজনী খুবই দুষ্টপ্রকৃতির অধিকারী ও সদা-সর্বদাই খেলাধূলায় ব্যস্ত থাকতেন। কিন্তু তাঁর নৈতিক চরিত্র সকলের আদর্শস্থানীয় ছিল। তিনি পড়াশোনায় কিঞ্চিৎ সময় ব্যয় করার সুযোগ পেতেন। তারপরও পরীক্ষায় আশাতীত ফলাফল অর্জন করতে পারতেন তিনি। পরবর্তীকালে এ বিষয়ে তিনি তাঁর দিনপঞ্জী বা ডায়রীতে উল্লেখ করেছেন[১] –

বিদ্যালয় অবকাশকালীন সময়ে প্রতিবেশীর গৃহে সময় ব্যয় করতেন। সেখানে রাজনাথ তারকরত্ন মহাশয়ের কাছ থেকে সংস্কৃত ভাষা শিখতেন। এছাড়াও, গোপাল চন্দ্র লাহিড়ীকে তিনি তার শিক্ষাগুরু হিসেবে পেয়েছিলেন। রজনীকান্ত বোয়ালীয়া জিলা স্কুলে (বর্তমান রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল) ভর্তি হন। ১৮৮৩ সালে কুচবিহার জেনকিন্স স্কুল থেকে ২য় বিভাগে এন্ট্রান্স পাস করেন। এরফলে তিনি প্রতিমাসে দশ রূপি বৃত্তি পেতেন। পরবর্তীতে ১৮৮৫ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে ২য় বিভাগে এফ.এ পাশ করে সিটি কলেজে ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৮৮৯ সালে বি.এ পাশ করে করেন। অতঃপর একই কলেজ থেকে ১৮৯১ সালে পরিবারকে সহায়তা করার জন্য আইন বিষয়ে বি.এল ডিগ্রী অর্জন করেন রজনীকান্ত সেন।[২]

ব্যক্তিগত জীবন[সম্পাদনা]

তিনি হিরন্ময়ী দেবী নাম্নী এক বিদূষী নারীকে ১৮৮৩ সালে (৪ঠা জ্যৈষ্ঠ, ১২৯০ বঙ্গাব্দ) বিবাহ করেন। হিরন্ময়ী দেবী রজনী’র লেখা কবিতাগুলো নিয়ে আলোচনা করতেন। কখনো কখনো তাঁর কবিতার বিষয়বস্তু সম্পর্কে মতামত ও সমালোচনা ব্যক্ত করতেন। তাঁদের সংসারে চার পুত্র – শচীন্দ্র, জ্ঞানেন্দ্র, ভুপেন্দ্র ও ক্ষীতেন্দ্র এবং দুই কন্যা – শতদলবাসিনী ও শান্তিবালা ছিল। কিন্তু ভুপেন্দ্র খুব অল্প বয়সেই মারা যায়। রজনী দুঃখ-ভারাক্রান্ত মনে এবং ঈশ্বরের উপর অগাধ আস্থা রেখে পরদিনই রচনা করেন –

সাহিত্য-সংস্কৃতি[সম্পাদনা]

রজনীকান্ত সেনের মা মনোমোহিনী দেবী বাংলা সাহিত্যের প্রতি বেশ অনুরক্ত ছিলেন। তিনি এ বিষয়ে কিশোর রজনীকান্তের সাথে আলাপ-আলোচনা করতেন। এই আলোচনা-পর্যালোচনাই তাঁর ভবিষ্যত জীবনে ব্যাপক প্রভাব পড়েছিল। ভাঙ্গাকুঠি’র তারকেশ্বর চক্রবর্তী ছিলেন তাঁর বন্ধু। তাঁর সঙ্গীত সাধনাও রজনীকে সঙ্গীতের প্রতি দূর্বার আকর্ষণ গড়তে সাহায্য করে।

শৈশবকাল থেকেই তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে ও স্বাবলীল ভঙ্গীমায় বাংলা ও সংস্কৃত – উভয় ভাষায়ই কবিতা লিখতেন। তিনি তাঁর রচিত কবিতাগুলোকে গান আকারে রূপ দিতে শুরু করেন। পরবর্তীতে বাদ্যযন্ত্র সহযোগে গান পরিবেশন করতেন। রজনী’র কবিতাগুলো স্থানীয় উৎসআশালতা প্রমূখ সংবাদ-সাময়িকীতে অনেকবার প্রকাশিত হয়েছিল। কলেজ জীবনের দিনগুলোতে তিনি গান লিখতেন। অভিষেক অনুষ্ঠান ও সমাপণী বা বিদায় অনুষ্ঠানেই গানগুলো রচনা করে গাওয়া হতো। তিনি তার অতি জনপ্রিয় গানগুলো খুবই স্বল্প সময়ের ব্যবধানে রচনা করতে সক্ষমতা দেখিয়েছিলেন। তেমনি একটি গান রাজশাহী গ্রন্থাগারের সমাবেশে মাত্র এক ঘন্টার মধ্যে রচনা করেছিলেন[১] –

১৫ বছর বয়সে কালীসঙ্গীত রচনার মাধ্যমে তাঁর অপূর্ব কবিত্বশক্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটে। আইন পেশার পাশাপাশি তিনি সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বিশেষতঃ সঙ্গীতসাহিত্যনাটকে অভিনয় ইত্যাদিতে গভীরভাবে মনোঃসংযোগ ঘটান। এরই প্রেক্ষাপটে রাজশাহীতে অবস্থানকালে তাঁর বন্ধু ও বিখ্যাত ঐতিহাসিক অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় মহাশয় এবং স্ত্রীর কাছ থেকে বেশ সক্রিয় সমর্থন পান।[৩][৪]

শরৎ কুমার রায়কে লিখিত চিঠিতে সঙ্গীতের আসক্তির কথা লিখেছিলেন।

রজনীকান্ত ওকালতি পেশায় গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট ও সন্তুষ্ট হতে পারেননি। এ সময় থেকে মৃত্যুর প্রায় এক বৎসর পূর্ব পর্যন্ত রজনীকান্তের জীবন এক অখণ্ড আনন্দের খনি ছিল। তাঁর সঙ্গীত-প্রতিভাই তাঁকে অমর করে রেখেছে। সঙ্গীত-রচনা করা তাঁর পক্ষে এমনই সহজ ও স্বাভাবিক ছিল যে, তিনি অবহেলায় উপেক্ষায় অতি উৎকৃষ্ট সঙ্গীত রচনা করতে পারতেন। সঙ্গীতের প্রতি তার প্রবল আগ্রহের কথা ব্যক্ত করে তিনি শরৎ কুমার রায়কে চিঠিতে জানিয়েছিলেন –

বঙ্গভঙ্গ ও স্বদেশী আন্দোলন[সম্পাদনা]

স্বদেশী আন্দোলনে তাঁর গান ছিল অসীম প্রেরণার উৎসস্থল। ৭ আগস্ট, ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে কলকাতার টাউনহলে একটি জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিলাতী পণ্য বর্জন এবং স্বদেশী পণ্য গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন বাংলার প্রখ্যাত নেতৃবর্গ। ভারতের সাধারণ জনগণ বিশেষতঃ আহমেদাবাদ এবং বোম্বের অধিবাসীগণ ভারতে তৈরী বস্ত্র ব্যবহার করতে শুরু করেন। কিন্তু এ কাপড়গুলোর গুণগতমান বিলাতে তৈরী কাপড়ের তুলনায় তেমন মসৃণ ও ভাল ছিল না। এর ফলে কিছুসংখ্যক ভারতবাসী খুশী হতে পারেননি। এই কিছুসংখ্যক ভারতীয়দেরকে ঘিরে রজনীকান্ত রচনা করেন তার বিখ্যাত দেশাত্মবোধক ও অবিস্মরণীয় গান –

এই একটি গান রচনার ফলে রাজশাহীর পল্লী-কবি রজনীকান্ত সমগ্র বঙ্গের জাতীয় কবি – কান্তকবি রজনীকান্ত হয়ে উঠলেন ও জনসমক্ষে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করলেন।[৫] প্রায়শঃই তাঁর গানগুলোকে কান্তগীতি নামে অভিহিত করা হতো।

এ গানটি রচনার ফলে পুরো বাংলায় অদ্ভুত গণ-আন্দোলন ও নবজাগরণের পরিবেশ সৃষ্টি করে। গানের কথা, সুর ও মাহাত্ম্য বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করায় রজনীকান্তও ভীষণ খুশি হয়েছিলেন। স্বদেশী আন্দোলনেরসাথে জড়িত ব্যক্তিবর্গও গানটিকে উপজীব্য করে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপণায় অগ্রসর হতে থাকেন। ভারতীয় বিপ্লবী নেতারাও পরবর্তী বছরগুলোয় বেশ সোৎসাহে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন গানটিকে ঘিরে।

পরবর্তীকালে তিনি প্রায় একই ঘরানার আরো একটি জনপ্রিয় গান রচনা করেন –

গানটির পরবর্তী চরণগুলো ছিল মূলতঃ ব্রিটিশ পণ্য বর্জন সংক্রান্ত। বিখ্যাত আরো একটি গান তিনি প্রার্থনা সঙ্গীত হিসেবে রচনা করেছিলেন –

সঙ্গীত জীবন[সম্পাদনা]

রজনীকান্ত শৈশবকাল থেকে সঙ্গীতপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। কোথাও কোন সুমধুর সঙ্গী শুনলেই তিনি সুর, তাল-সহ তৎক্ষণাৎ তা কণ্ঠস্থ করতে পারতেন। তাঁর পিতা গুরুপ্রসাদ সেন একজন দক্ষ সঙ্গীতজ্ঞ হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। ফলে পিতার সাহচর্য্যেই শৈশবে সঙ্গীত অনুশীলন করার সুযোগ ঘটে তাঁর। বস্তুতঃ কাব্যের চেয়ে গানের ক্ষেত্রে তাঁর কৃতিত্ব অধিক। যৌবনে সঙ্গীত রচনায় বিশেষ পারদর্শীতার পরিচয় প্রদান করেন রজনীকান্ত।[৬]

অক্ষয়কুমারের বাসভবনে আয়োজিত গানের আসরে তিনি স্বরচিত গানের সুকণ্ঠ গায়ক হিসেবে আবির্ভূত হন তিনি। রাজশাহীতে অবস্থানকালে রজনীকান্ত সেন তৎকালীন সময়ের অত্যন্ত জনপ্রিয় কবি দ্বিজেন্দ্রলালের কণ্ঠে হাসির গান শুনে হাসির গান রচনা শুরু করেন। অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সঙ্গে গান রচনায় তার জুড়ি মেলা ভার ছিল। তিনি কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের লেখনীর দ্বারা ভীষণভাবে প্রভাবান্বিত হয়েছিলেন। ফলে তিনিও তাঁর মতো করে সমগোত্রীয় লেখা লিখতে শুরু করেন।

তাঁর রচিত গানগুলোকে বিষয়বস্তু অনুযায়ী চারটি ভাগে বিভাজিত করা হয়েছে –

  1. দেশাত্মবোধক গান
  2. ভক্তিমূলক গান
  3. প্রীতিমূলক গান
  4. হাস্যরসের গান।

তন্মধ্যে – রজনীকান্তের দেশাত্মবোধক গানের আবেদনই বিশাল ও ব্যাপক। স্বদেশী আন্দোলন (১৯০৫-১৯১১) চলাকালে ‘মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নেরে ভাই’ গানটি রচনা করে অভূতপূর্ব গণআলোড়নের পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল।

বাংলাদেশ এবং ভারতের অনেক সঙ্গীত শিল্পী কান্তগীতি গানগুলো গেয়েছেন। তন্মধ্যে – কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায়নীলা মজুমদারপান্নালাল ভট্টাচার্য্যঅনুপ ঘোষালনিশীথ সাধুহেমন্ত কুমার মুখোপাধ্যায়শ্রীকান্ত আচার্য্যঅর্ঘ্য সেনজুঁথিকা রায়সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়আরতী মুখোপাধ্যায়মান্না দেমানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ছবি বন্দ্যোপাধ্যায়ইফফাত আরা দেওয়ানউৎপলা সেন প্রমুখ অন্যতম।

কবিতা[সম্পাদনা]

মূল নিবন্ধ: কবিতা

কবি হিসেবেও যথেষ্ট সুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন রজনীকান্ত সেন। নির্মল আবেগ ও কোমল সুরের ব্যঞ্জনায় তাঁর গান ও কবিতাগুলো হয়েছে ঋদ্ধ ও সমৃদ্ধ।

ব্যঙ্গ কবিতা[সম্পাদনা]

রজনীকান্ত সেন ব্যঙ্গ কবিতা রচনায় সিদ্ধহস্তের অধিকারী ছিলেন। তাঁর বুড়ো বাঙ্গাল কবিতাটি তেমন-ই একটি।[৭] কবিতাটি রস-নিবেদনে এবং ব্যঙ্গ চাতুর্যতায় – এক কথায় অপূর্বঃ-

তিনি সমাজের বিভিন্ন দিক নিয়ে তীব্র ব্যঙ্গ করেছিলেন। তৎকালীন সামাজিক সংস্কার, শিক্ষিত সমাজের বিকৃতি ইত্যাদি উপকরণ নিয়ে ব্যঙ্গ করার সাথে সাথে গ্লানিমুক্ত নির্দোষ হাসির কবিতাও তিনি লিখেছেন।[৮]এদেশের ঐতিহাসিক গবেষণার প্রতি প্রচ্ছন্ন শ্লেষের সাথে কৌতুকরসের পরিবেশনা রয়েছে পুরাতত্ত্ববিৎ কবিতায় –

নীতি কবিতা[সম্পাদনা]

গল্পকাহিনী বা নিছক কলাশিল্পের সাহায্যে কবি জ্ঞানগর্ভ নীতিকথা বা তত্ত্ব প্রচার করেন। নীতিকথার তীব্রতা কল্পনার স্পর্শে যাতে কোমল ও কান্তরূপ পরিগ্রহ করে, তাই কবি হৃদয়ের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। সেই দৃষ্টিকোণে রজনীকান্ত সেনের অমৃত কাব্যগ্রন্থটি একটি স্বার্থক নীতি কবিতার অন্তর্ভুক্ত।[৯] উপযুক্ত কাল কবিতায় তিনি লিখেছেন –

কর্মজীবন[সম্পাদনা]

বি.এল ডিগ্রী অর্জনের মাধ্যমে শিক্ষাজীবন শেষ করে ১৮৯১ সালে তিনি রাজশাহীতে আইন পেশায় নিয়োজিত হয়েছিলেন। তাঁর জ্যেঠা অর্থাৎ বাবার বড় ভাই তখন রাজশাহীতে উকিল হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ফলে আইন পেশায় রজনী’র দ্রুত উত্তরণ ঘটতে থাকে। কিন্তু আইন পেশার পাশাপাশি সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অঙ্গনেই বেশি সম্পৃক্ত রাখতেন নিজেকে। ফলশ্রুতিতে তিনি তাঁর সুনাম হারাতে থাকেন। মক্কেলদের কাছে চাহিদামাফিক সময় দিতে পারতেন না। পরবর্তীকালে কিছুদিন তিনি নাটোর এবং নওগাঁ জেলায়ও অস্থায়ীভাবে মুন্সেফ হিসেবে কাজ করেছিলেন রজনীকান্ত সেন।

অন্যান্য[সম্পাদনা]

রজনী শারীরিক কসরৎ এবং খেলাধূলায় বেশ আগ্রহী ছিলেন। খেলাধূলায় অতি উৎসাহের কারণে নিজ ব্যয়ে ভাঙ্গাবাড়ীতে ফুটবল এবং ক্রিকেট খেলতে পছন্দ করতেন। নিজ গ্রামে তিনি বেশ সুপরিচিত ও জনপ্রিয় ছিলেন। সর্ববিদ্যায় পারদর্শীতা অর্জন – বিশেষ করে গান-বাজনা, খেলাধূলা, অভিনয়-কলা প্রভৃতি বিষয়ে পারঙ্গমতাই এর মূল কারণ। গ্রামের নিরক্ষর মহিলাদের মাঝে শিক্ষা প্রসারের জন্যেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন রজনীকান্ত সেন। এরফলে পশ্চাদমুখী, অশিক্ষিত গ্রামবাসীর অনুন্নত চিন্তা-ভাবনার মুখোমুখি হন তিনি। এমনকি তাঁর ছাত্রদের কাছ থেকেও বিভিন্ন ধরণের সমস্যার সম্মুখীন হয়ে তা মোকাবিলা করতে হয়েছে তাঁকে।

রচনাসমগ্র[সম্পাদনা]

রাজশাহী থেকে প্রচারিত উৎসাহ মাসিক পত্রিকায় রজনীকান্তের রচনা প্রকাশিত হতো। তাঁর কবিতা ও গানের বিষয়বস্তু মূখ্যতঃ দেশপ্রীতি ও ভক্তিমূলক। হাস্যরস-প্রধান গানের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। জীবিত থাকাকালে তিনটি গ্রন্থ রচনা করেছেন তিনি। সেগুলো হলো –

  • বাণী (১৯০২)
  • কল্যাণী (১৯০৫)
  • অমৃত (১৯১০)

এছাড়াও ৫টি বই তাঁর মৃত্যু-পরবর্তীকালে প্রকাশিত হয়েছিল।[১০] সেগুলো হচ্ছে –

  • অভয়া (১৯১০)
  • আনন্দময়ী (১৯১০)
  • বিশ্রাম (১৯১০)
  • সদ্ভাবকুসুম (১৯১৩)
  • শেষদান (১৯১৬)

তন্মধ্যে – বাণী এবং কল্যাণী গ্রন্থটি ছিল তাঁর গানের সঙ্কলন বিশেষ। তিনি কান্ত কবি নামেও পরিচিত। অমৃত কাব্যসহ দু’টি গ্রন্থে বর্ণিত রয়েছে শিশুদের পাঠ্য উপযোগী নীতিবোধ সম্পর্কীয় ক্ষুদ্র কবিতা বা ছড়া। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কণিকা কাব্যগ্রন্থটিই তাকে অমৃত কাব্যগ্রন্থ রচনা করতে ব্যাপক প্রভাবান্বিত করেছে।[১]

উল্লেখযোগ্য সাহিত্য-কর্ম এবং অবিস্মরণীয় আধ্যাত্মিক গানগুলো রচনার মাধ্যমে রজনীকান্ত সেন অমরত্ব লাভ করে চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছেন। প্রধানতঃ তাঁর গানগুলো হিন্দুস্তানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ঘরণার। এতে তিনি কীর্তনবাউল এবং টপ্পার যথাযথ সংমিশ্রণ ঘটাতে সক্ষমতা দেখিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশের অগণিত শ্রোতা-লেখকের মন জয় করেছেন।

শেষ দিনগুলোয়[সম্পাদনা]

১৯০৯ সালে রজনীকান্ত কণ্ঠনালীর প্রদাহজনিত কারণে সমস্যা ভোগ করতে থাকেন। আর্থিক সঙ্কট প্রকট আকার ধারণ করা সত্ত্বেও একই বছরের ১০ সেপ্টেম্বর তারিখে তাঁকে জোরপূর্বক কলকাতায় প্রেরণ করেন পরিবারের সদস্যরা। একজন ব্রিটিশ ডাক্তার তাঁকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন ও তাঁর ল্যারিঙ্কস্‌ ক্যানসার হয়েছে বলে সনাক্ত করেন। অতঃপর তিনি কলকাতার বিভিন্ন প্রথিতযশা ডাক্তারের শরণাপন্ন হন। কিন্তু তাঁর অবস্থার আর উত্তরণ হয়নি, বরঞ্চ উত্তরোত্তর অবনতি হতে থাকে।

শেষ আশ্রয় হিসেবে বারাণসীতে ঈশ্বরের কাছ থেকে প্রকৃতি প্রদত্ত আরোগ্য লাভের আশায় বেশ কয়েকমাস ব্যয় করেন। এ ব্যয়ভার বহনের লক্ষ্যে খুবই বিষাদ চিত্তে তাঁর প্রকাশিত বাণী এবং কল্যাণী বই দু’টোর গ্রন্থস্বত্ত্ব বিক্রী করে দিতে বাধ্য হন তিনি। কলকাতায় পুণরায় ফিরে আসলেও শারীরিক অবস্থা ক্রমশঃ আরো ভেঙ্গে পড়ে। অতঃপর তিনি ১০ ফেব্রুয়ারি, ১৯১০ তারিখে ক্যাপ্টেন ডেনহ্যাম হুয়াইটের তত্ত্বাবধানে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে ট্রাকিওটোমি অপারেশন করান। এরফলে তিনি কিছুটা আরোগ্য লাভ করলেও চীরতরে তাঁর বাকশক্তি হারান। অপারেশন পরবর্তী জীবনের বাকী দিনগুলোয় হাসপাতালেরকটেজ ওয়ার্ডে ব্যয় করেন।

হাসপাতালে থাকাকালীন তিনি তাঁর দৈনিক দিনলিপি বা ডায়রী সংরক্ষণ করতেন। এছাড়াও, আত্মজীবনী লিখতে শুরু করলেও একটিমাত্র অধ্যায়েই তা শেষ হয়ে যায় মৃত্যুজনিত কারণে। কিছু কবিতাপ্রেমী ব্যক্তিত্ব এবং কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্ররা তাঁর দেখাশোনা ও খোঁজ-খবর নিতেন। মহারাজা মনীন্দ্র চন্দ্র নন্দী এবং শরৎ কুমার রায় তাঁকে আর্থিক দিক দিয়ে যথাসাধ্য সহযোগিতা করেন। স্মর্তব্য যে, ১১ জুন, ১৯১০ তারিখে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রজনীকান্ত সেনকে দেখার জন্যে হাসপাতাল পরিদর্শন করতে গিয়েছিলেন। তখন রজনী’র লিখিত একটি গান তাঁর পুত্র ক্ষিতীন্দ্রনাথ এবং কন্যা শান্তিবালা হারমোনিয়াম সহযোগে গাচ্ছিলেন। রজনী বিশ্বাস করতেন যে, ঈশ্বর তাঁকে ব্যথা-বেদনা দিয়ে তার পবিত্র আত্মাকে শুদ্ধ করছেন। এ বিশ্বাসটুকু তার অন্তঃশক্তি প্রদান করে শারীরিকভাবে ব্যথা থেকে সাময়িক বিমুক্ত রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। তাঁকে আত্মনিমগ্ন রেখে এ গান রচনা করতে সাহায্য করেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে ঐদিন সাক্ষাতের প্রতিফলন হিসেবে নিম্নবর্ণিত গানটি রচনা করেছেন রজনীকান্ত সেন।

তারপর তিনি গানটিকে কবিতা আকারে বোলপুরে রবীন্দ্রনাথের কাছে পাঠিয়ে দেন।[১] উষ্ণপ্রকৃতির এ কবিতা হাতে পেয়ে রবিঠাকুর ৩০ জুলাই একটি চিঠি লেখেন।[১] তাতে তিনি রজনী’র ব্যাপক সাহিত্য প্রতিভা এবং গৌরবময় ভূমিকার কথা সবিশেষভাবে উল্লেখ করেন। এর মাধ্যমেই তাঁর অন্তরাত্মা শক্তি ও সাহস জুগিয়ে সর্বপ্রকার ব্যথা-বেদনা থেকে মুক্ত থাকবে বলে ব্যক্ত করেন। এ সময়ে তিনি বেশ কিছু আগমণী এবং বিজয়া’র গান রচনা করেন।

মহাপ্রস্থান[সম্পাদনা]

রজনীকান্তের শেষ দিনগুলো ছিল অসম্ভব ব্যথায় পরিপূর্ণ। তিনি ১৩ সেপ্টেম্বর, ১৯১০ সালে (১৩১৭ বঙ্গাব্দের ২৮শে ভাদ্র) মঙ্গলবার রাত্রি সাড়ে আট ঘটিকার সময় লোকান্তরিত হন।[১][৫]

স্বীকৃতি[সম্পাদনা]

ক্ষণজন্মা এই অমর সঙ্গীতকার ও লেখক ব্যক্তিত্বকে সম্মান জানিয়ে বাংলাদেশের প্রখ্যাত কবি ও সাহিত্যিক আসাদ চৌধুরী ১৯৮৯ সালে রজনীকান্ত সেন শিরোনামে একটি জীবনীগ্রন্থ রচনা করেন।

মনোজ বসু

বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র মনোজ বসু। বাংলার মাটি, মানুষ, আকাশ, জলপাই রংয়ের গাছ গাছালি, গঙ্গা পদ্মার শব্দ নৈশব্দের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে মনোজ বসু সাহিত্যকর্ম।

১৯০১ সালের ২৫ জুলাই যশোর জেলার কেশবপুর থানার ডোঙাঘাটা গ্রামের বিখ্যাত বসু পরিবারে মনোজ বসু জন্মগ্রহণ করেন। মধ্যবিত্ত একান্নবর্তী পরিবারের সন্তান তিনি। সম্পদ-সম্পত্তি বলতে যা বোঝায় তা ছিল না তাঁদের। গ্রামে তাঁদের ছিল বংশ গৌরব ও প্রচুর খ্যাতি।

তাঁর ঠাকুর দাদার লেখার অভ্যাস পিতা রামলাল বসুর মধ্যেও ছিল। তিনি ভাল কবিতা লিখতে পারতেন। দুই পুরুষের সাহিত্যচর্চার সঞ্চয় ছিল মনোজবসুর লেখক হওয়ার পাথেয়। মনোজ বসু সাত বছর বয়সেই বঙ্কিম বাবুর লেখা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে কবিতা লিখতে শুরু করেন।

শিক্ষা ও কর্মজীবন:
১৯০৯ সালের জুন মাসে মাত্র আট বছর বয়সে লেখক মনোজ বসু হলেন পিতৃহীন। তখনও পাঠশালার গন্ডি শেষ হয়নি। লেখক হওয়ার সাধ, স্বপ্ন, বাসনা সব কিছুর উপর পড়ল যবনিকা। এক নিদারম্নন অনিশ্চয়তার মধ্যে প্রথমে নিজ গ্রামে পরে কলকাতায় তাঁর শিক্ষাজীবন চলতে থাকে। কলকাতায় তিনি ভর্তি হন রিপন কলেজিয়েট স্কুলে। ১৯১৯ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় তিনি কয়েকটি বিষয়ে লেটারসহ প্রথম বিভাগে পাশ করেন। এর পর তিনি বাগেরহাট কলেজে ভর্তি হন। এই বাগেরহাট কলেজের ছাত্র থাকাকালীন তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন এবং  স্বদেশী আন্দোলনে যোগ দেন। ১৯২২ সালে তিনি আই. এ পরীক্ষায় পাশ করেন। ১৯২৪ সালে সাউথ সাবারবন কলেজ (বর্তমান আশুতোষ কলেজ) থেকে ডিস্টিংশন নিয়ে বি. এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। শুরু করলেন আইন পড়া। কিন্তু অর্থনৈতিক কারণে তিনি আইন পড়া বন্ধ করতে বাধ্য হন।

অতঃপর তিনি যোগ দিলেন শিক্ষকতায়। ভবানীপুর সাউথ সাবারবন বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন তিনি শিক্ষকতা করেন। সাহিত্যে আকৃষ্ট হয়ে পরে তিনি পরিপূর্ণভাবে সাহিত্যেচর্চার জন্যে শিক্ষকতা পেশা ত্যাগ করেন। শিক্ষকতাকালীন সময়ে শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি স্কুলের পাঠ্য পুস্তক লেখার কাজেও মনোনিবেশ করেন। ফলশ্রম্নতি হিসেবে পরবর্তীতে তিনি ‘বেঙ্গল পাবলিশার্স’ নামে একটি প্রকাশনী সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন।


সাহিত্যচর্চা:
মনোজ বসুর গল্প ও উপন্যাস হৃদয় দাক্ষিণ্যে আবেগ বিহবল। স্কুলে পড়াকালীন কয়েকজন উৎসাহী বন্ধু মিলে একটি হস্ত মুদ্রিত পত্রিকা প্রকাশ করেন। এর পর তিনি ‘বিকাশ’ পত্রিকার সাথে যুক্ত হন। ক্ষুদ্রাকার ডিমাই সাইজের পত্রিকার প্রথম সংখ্যা থেকেই মনোজ বসু লিখতে শুরু করেন। পত্রিকার দ্বিতীয় বর্ষ, তৃতীয় সংখ্যায় লেখকের একটি গল্প প্রকাশিত হয়। গল্পটির নাম ‘গৃহহারা’, লেখক মনোজ মোহন বসু। ‘বাঁশরী’র পৃষ্ঠাতেও ঐ নামে তাঁর প্রথম আত্নপ্রকাশ। পিতৃ প্রদত্ত নামের মধ্যপদ লোপ করে পরে তিনি মনোজ বসু হলেন। ‘নতুন মানুষ’ (বিচিত্রা কার্ত্তিক, ১৩৩৭) প্রথম পদক্ষেপ হলেও প্রকৃতপক্ষে ‘বাঘ’-ই মনোজ বসুর কৃতিত্বের পরিচায়ক-এতেই তাঁর সাহিত্যিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা। ‘বাঘ’ গল্পটি সম্পর্কে বিভূতি ভূষণ বন্দোপাধ্যায় তাঁর উচ্ছাসিত প্রশংসা করেছেন। বিভূতি ভূষণ কবি জসীম উদ্দীনের সঙ্গে তাঁর ছিল আনত্মরিক সম্পর্ক।

গল্পের পাশাপশি প্রকাশিত হচ্ছিল মনোজ বসুর সৃষ্টিধর্মী কবিতা। তাঁর প্রথম মুদ্রিত কবিতা ‘গেপন কথা’ হেমলতা দেবী সম্পাদিত মেয়েদের কাগজ ‘বঙ্গলক্ষী’ তে ১৯৩০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রকাশিত হয়।

সই কিবা কর, কারোও কবি না-কহিব তব সে কথা।
বিল কিনারায় উড়ে চলেছিল সাদা সাদা বকগুলি
মেঘের গলায় সাতনরী – হায় যায় যেন দুলি দুলি।
তুলসীতলায় সন্ধ্যার দীপ বাতাসে কাঁপিয়ে মরে।
এত বড় বাড়ি – কেউ কোথা নাই, দু’জনে একেলা ঘরে।
দূরে বিয়াবাড়ি কত কোলাহল, বাজিতেছে ঢোল কাঁশি।
ও কহে তখন সেই পুরাতন, ভালবাসি, ভালবাসি।

গুরু সদয় দত্ত প্রতিষ্ঠিত ‘বাংলার শক্তি’ পত্রিকাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৪৪ সালের জুলাই মাসে। মনোজ বসু এই পত্রিকাটি সম্পাদনাসহ ‘সাহিত্যের খবর’ পত্রিকাটিও সম্পাদনা করতেন। তিনি ‘বাংলা সাহিত্য একাডেমীর’ (পশ্চিম বাংলা) সভাপতি মন্ডলীর অন্যতম এবং কলকাতার নিখিল ভারত লেখক সম্মেলন ও নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তিনি সর্ব ভারতীয় ও আঞ্চলিক একাধিক সম্মেলনে পৌরহিত্য করা ছাড়াও অসংখ্য সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংস্থার পৃষ্ঠপেষকতা করেছেন।

জীবনে দুঃসহ অবস্থার মধ্যেও কখনও থেমে থাকেনি মনোজ বাসুর সাহিত্যচর্চা। মনোজ বসুর সাহিত্য চিন্তা তাঁর জীবন র্চায় একান্ত অনুগামী হয়ে দেখা দিয়েছিল। জীবন অভিজ্ঞতার মধ্যে রয়েছে সাহিত্য চিন্তার প্রতিফলন। ‘আমি সম্রাট’, ‘সেই গ্রাম সেইসব মানুষ’, নিশিটুকুম্ব, ‘নবীন যাত্রা’, ‘একদা নিশিথকালে’, ‘কিংশুক’, ‘মায়াকন্যা’, ‘বন কেটে বসত’, ‘রূপবতী’, ‘সেতুবন্ধ’, ‘ঝিলমিল’ মনোজ বসুর রচনাবলী।

তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার ফসল জমা হয়ে আছে ‘আগস্ট ১৯৪২’, ‘ভুলিনাই’, ‘সৈনিক’, ‘বাঁশের কেল্লা’ এই সকল রাজনৈতিক উপন্যাসগুলিতে। মনোজ বসু ভারতীয় সাংস্কৃতিক দলের প্রতিনিধি হিসেবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। ভ্রমণের বিচিত্র অভিজ্ঞতায় তাঁর লিখিত ‘ভ্রমণ কাহিনী’, ‘চীন দেখে এলাম’, ‘সোভিয়েতের দেশে দেশে’, ‘নতুন ইউরোপ নতুন মানুষ’, ‘পথচলি’ বিশেষভাবে সমাদৃত হয়েছে। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থাবলীর মধ্যে বেশ কয়েকটি গ্রন্থ হিন্দী, ইংরেজী, গুজরাটি, মারাঠা, মালয়ালাম ভাষায় মুদ্রিত হয়েছে এবং বেশ কয়েকটি গ্রন্থ চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে।

কর্মের স্বীকৃতি:
স্বদেশে ও বিদেশে লেখক পেয়েছেন অভাবনীয় স্বীকৃতি ও পুরস্কার। ‘একাডেমী পুরস্কার’ ও ‘নরসিংহদাস’ পুরস্কার, কলকাতা বিশ্বাবিদ্যালয় প্রদত্ত ‘শরৎচন্দ্র পদক ও পুরস্কার’ অমৃত বাজার পত্রিকা প্রদত্ত ‘মতিলাল ঘোষ’ পুরস্কারে তিনি ভূষিত হয়েছেন। জগৎ ও জীবনের রূপকার মনোজ বসু তাঁর লেখনীতে বিচিত্র রামধনু এঁকেছেন, সৃষ্টি করেছেন রোমান্টিক সাহিত্য জগৎ।

পরলোক গমন:
বাংলা সাহিত্যের প্রবাদ পুরম্নষ মনোজ বসু ১৯৮৭ সালের ডিসেম্বর মাসে পরলোকগমন করেন।

আলেক্সাঁদ্র্ দ্যুমা

আলেক্সাঁদ্র্ দ্যুমা (জুলাই ২৪, ১৮০২ – ডিসেম্বর ৫, ১৮৭০) বিখ্যাত ফরাসি ঔপন্যাসিক। একজন প্রখ্যাত ফরাসী ঔপন্যাসিক যিনি মূলত ইতিহাস আশ্রিত এডভেঞ্চার উপন্যাস লেখক হিসেবে খ্যাতি কুড়িয়েছেন। তাঁর পুরো নাম দ্যুমা ডেভি ডি লা পাইল্লেটারিয়া। তাঁর লেখা উপন্যাসগুলো প্রায় ১০০ টি ভাষায় অনুবাদিত হয়েছে যা তাঁকে ফরাসী লেখকদের মধ্যে বহির্বিশ্বে সবচাইতে বেশি পরিচিত লেখক করে তুলেছে। তাঁর লেখা অনেক উপন্যাস প্রাথমিকদিকে মূলত ধারাবাহিক হিসেবে প্রকাশিত হয়েছিল। এইসব উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে, দি কাউন্ট অফ মন্টে ক্রিস্টো, দি থ্রি মাস্কেটিয়ার্স, টোয়েন্টি ইয়ার্স আফটার, দি ভিকোমটে ডি ব্রাগেলোন্নিঃ টেন ইয়ার্স লেটার ইত্যাদি। তাঁর লেখা উপন্যাসগুলো অবলম্বনে প্রায় ২০০ এর কাছাকাছি চলচিত্র তৈরি হয়েছে। দ্যুমা তাঁর শেষ উপন্যাস “দি নাইট অফ সেইন্ট হেরমাইন” সম্পূর্ণ করে যেতে পারেন নি। অসম্পূর্ণ উপন্যাসটি পরবর্তীতে ২০০৫ সালে সম্পূর্ণ করা হয় এটি সেই বছরের সর্বাধিক বিক্রিত উপন্যাস হয়। ২০০৮ সালে “দি লাস্ট ক্যাভেলিয়ার” নামে এর ইংরেজী অনুবাদ প্রকাশিত হয়।

এঁর লেখা কয়েকটি উপন্যাস:

দ্য কাউন্ট অব মন্টি ক্রিস্টো
থ্রি মাস্কেটিয়ার্স

মোহাম্মদ কাজেম আল কোরেশী ‘কায়কোবাদ’

আধুনিক বাংলা মহাকাব্য ধারার শেষ কবি কায়কোবাদ ১৮৫৭ সালে ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রকৃত নাম মোহাম্মদ কাজেম আল কোরেশী। ‘কায়কোবাদ’ তাঁর সাহিত্যিক ছদ্মনাম। এন্ট্রান্স পরীক্ষার আগেই পোস্টমাস্টারের চাকরি নিয়ে তিনি স্বগ্রাম আগলায় চলে যান। সমগ্র চাকরি জীবনে তিনি এ পদেই বহাল ছিলেন এবং এখান থেকেই অবসর গ্রহণ করেন। অতি অল্প বয়স থেকে কায়কোবাদের সাহিত্য প্রতিভার স্ফুরণ ঘটে। মাত্র ১৩ বছর বয়সে তাঁর প্রথম কাব্য ‘বিরহবিলাপ’ প্রকাশিত হয়। তাঁর অন্যান্য কাব্যগ্রন্থ হচ্ছে : কুসুম কানন, অশ্রুমালা, মহাশ্মশান, শিব-মন্দির, অমিয়ধারা, শ্মশান-ভস্ম ও মহরম শরীফ। কবির মৃত্যুর বহুদিন পরে প্রেমের ফুল, প্রেমের বাণী, প্রেম-পারিজাত, মন্দাকিনী-ধারা ও গওছ পাকের প্রেমের কুঞ্জ কাব্যগুলো প্রকাশিত হয়। সম্প্রতি বাংলা একাডেমি চার খণ্ডে কায়কোবাদ রচনাবলি প্রকাশ করেছে। কায়কোবাদ বাংলার অপর দুই মহাকবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ও নবীনচন্দ্র সেনের ধারায় মহাকাব্য রচনা করেন। তবে নবীনচন্দ্রই ছিলেন তাঁর প্রধান আদর্শ। কায়কোবাদের মহাশ্মশান হচ্ছে মহাকাব্য। তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধ অবলম্বনে রচিত এ কাব্যে জয়-পরাজয় অপেক্ষা ধ্বংসের ভয়াবহতা প্রকট হওয়ায় এর নাম হয়েছে ‘মহাশ্মশান’। এটি তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনা এবং এর দ্বারাই তিনি মহাকবিরূপে খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর গীতিকবিতায় প্রেম, প্রকৃতি, স্বদেশ ও আধ্যাত্মিকতা প্রকাশ পেয়েছে। কায়কোবাদের কাব্যসাধনার মূল উদ্দেশ্য ছিল পশ্চাত্পদ মুসলমান সম্প্রদায়কে তার অতীত ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন করা এবং তা পুনরুদ্ধারে উদ্বুদ্ধ করা। তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার অধিকারী, যার প্রকাশ ঘটেছে তাঁর বিভিন্ন রচনায়। তিনি হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বিষয় নিয়ে কাব্য রচনা করেছেন। ১৯৩২ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সম্মেলনের মূল অধিবেশনে তিনি সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। বাংলা কাব্যসাহিত্যে অসাধারণ অবদানের জন্য নিখিল ভারত সাহিত্য সংঘ তাঁকে ‘কাব্যভূষণ’, ‘বিদ্যাভূষণ’ ও ‘সাহিত্যরত্ন’ উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৫১ সালের ২১ জুলাই ঢাকায় তাঁর মৃত্যু হয়।

কবিতা গুলো মনকে অনাবিল তৃপ্তির রাজ্যে নিয়ে যায়

কবি শফিকুল ইসলাম এর  “তবুও বৃষ্টি আসুক” গ্রন্থ পর্যালোচনায় বাংলা একাডেমীর সাবেক মহাপরিচালক ডঃ আশরাফ সিদ্দিকী

‘তবুও বৃষ্টি আসুক’ কবি শফিকুল ইসলামের অনন্য কাব্যগ্রন্থ। গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে আগামী প্রকাশনী। তার কবিতা  আমি ইতিপূর্বে  পড়েছি । ভাষা বর্ণনা প্রাঞ্জল এবং তীব্র  নির্বাচনী। ‘তবুও  বৃষ্টি  আসুক’ গ্রন্থে  মোট ৪১ টি কবিতা  রচিত হয়েছে। প্রথম  থেকে শেষ  পর্যন্ত এ গ্রন্থ  পাঠ  করে  পূর্বেই  বলেছি, মন অনাবিল তৃপ্তিতে ভরে যায়।
বইটির প্রথম কবিতায় মানবতাহীন এই হিংস্র পৃথিবীতে কবির চাওয়া বিশ্ব মানবের সার্বজনীন আকাংখা হয়ে ধরা দিয়েছে।

কবি বলেছেন–
‘তারও আগে বৃষ্টি নামুক
আমাদের বিবেকের মরুভূমিতে-
সেখানে মানবতা ফুল হয়ে ফুটুক,
আর পরিশুদ্ধ হোক ধরা,হৃদয়ের গ্লানি…
(কবিতা:তবুও  বৃষ্টি  আসুক’)
প্রকৃতি, প্রেম, নারী, মুক্তিযোদ্ধা, মা এবং  সুলতা নামের এক  নারী  তার হৃদয়  ভরে রেখেছে। তাকে  কিছুতেই  ভোলা যায় না। মা তার  কাছে  অত্যন্ত  আদরের ধন। মাকে তার বারবার  মনে পড়ে।
মনে পড়ে  সুন্দরী  সুলতাকে, যে তার হৃদয়ে  দোলা দিয়েছিল। বেচারা তার জীবন, মৃত্যুহীন মৃত্যু  । তাই  তিনি  এখন ও  সুলতাকে  খুঁজেন । যার জন্য তিনি  অনন্তকাল  প্রতীক্ষায়  আছেন।  এই  প্রিয়তমা  তার হৃদয়-মন ভরে  আছে।  নদীর জল ও  তীরের মত  এক  হয়ে  মিশে  আছে । এই  প্রেম  বড়ই  স্বর্গীয়, বড়ই  সুন্দর । একে ভোলা যায় না। প্রকৃতি  আর  সুলতা  কখন   একাকার  হয়ে  যায়  হৃদয়ে।
কাব্যগ্রন্থটি পড়ে আমার খুব ভাল লেগেছে। বইটির ছাপা অত্যন্ত সুন্দর। ধ্রুব এষের প্রচছদ  চিত্রটি  অত্যন্ত  প্রশংসনীয়।
[প্রাপ্তিস্থান– আগামী প্রকাশনী, ৩৬ বাংলাবাজার, ঢাকা–১১০০। ফোন– ৭১১১৩৩২, ৭১১০০২১। মোবাইল– ০১৮১৯২১৯০২৪] এছাড়া www.rokomari.com থেকে অনলাইনে সরাসরি বইটি সংগ্রহ করা যাবে।
তবুও বৃষ্টি আসুক…শফিকুল ইসলাম

বহুদিন পর আজ
বাতাসে বৃষ্টির আভাস,
সোঁদা মাটির অমৃত গন্ধ-
এখনই বুঝি বৃষ্টি আসবে
সবারই মনে উদ্বেগ-
তাড়াতাড়ি ঘরে ফেরার ব্যস্ততা।
তবু আমার মনে নেই বৃষ্টি ভেজার উদ্বেগ
আমার চলায় নেই কোনো লক্ষণীয় ব্যস্ততা।
দীর্ঘ নিদাঘের পর
আকাঙ্ক্ষিত বৃষ্টির সম্ভাবনা
অলক্ষ্য আনন্দ ছড়ায় আমার তপ্ত মনে –
আর আমি উন্মুখ হয়ে থাকি
বৃষ্টির প্রতীক্ষায় –
এখনই বৃষ্টি নামুক
বহুদিন পর আজ বৃষ্টি আসুক।
দীর্ঘ পথে না থাকে না থাকুক বর্ষাতি –
বৃষ্টির জলে যদি ভিজে যায় আমার সর্বাঙ্গ
পরিধেয় পোশাক-আশাক-
তবুও বৃষ্টি আসুক –
সমস্ত আকাশ জুড়ে বৃষ্টি নামুক
বৃষ্টি নামুক মাঠ-প্রান্তর ডুবিয়ে।
সে অমিতব্যয়ী বৃষ্টিজলের বন্যাধারায়
তলিয়ে যায় যদি আমার ভিটেমাটি
তলিয়ে যাই যদি আমি
ক্ষতি নেই।
তবুও বৃষ্টি নামুক
ইথিওপিয়ায়, সুদানে
খরা কবলিত, দুর্ভিক্ষ-পীড়িত
দুর্ভাগ্য জর্জরিত আফ্রিকায়-
সবুজ ফসল সম্ভারে ছেয়ে যাক
আফ্রিকার উদার বিরান প্রান্তর।
তার ও আগে বৃষ্টি নামুক
আমাদের বিবেকের মরুভূমিতে
সেখানে মানবতা ফুল হয়ে ফুটুক,
আর পরিশুদ্ধ হোক ধরা, হৃদয়ের গ্লানি।
মানুষের জন্য মানুষের মমতা
ঝর্ণাধারা হয়ে যাক
বৃষ্টির সাথে মিলেমিশে –
সব পিপাসার্ত প্রাণ ছুঁয়ে ছুঁয়ে
বয়ে যাক অনন্ত ধারাজল হয়ে।
বহুদিন পর আজ
অজস্র ধারায় অঝোরে বৃষ্টি নামুক
আজ আমাদের ধূলি ধূসরিত
মলিন হৃদয়ের মাঠ-প্রান্তর জুড়ে ॥

তারুণ্য ও দ্রোহের প্রতীক কবি শফিকুল ইসলাম

উদভ্রান্ত যুগের শুদ্ধতম কবি শফিকুল ইসলাম। তারুণ্য ও দ্রোহের প্রতীক । তার কাব্যচর্চ্চার বিষয়বস্তু প্রেম ও দ্রোহ। কবিতা রচনার পাশাপাশি তিনি অনেক গান ও রচনা করেছেন। তার দেশাত্ববোধক ও সমাজ-সচেতন গানে বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে দেশবাসীকে জাগিয়ে তোলার প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। তিনি বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত গীতিকার।

শফিকুল ইসলামের জন্ম ১০ই ফেব্রুয়ারী, সিলেট জেলা শহরের শেখঘাটস্থ খুলিয়াপাড়ায়। তার পিতার নাম মনতাজ আলী। তিনি পেশায় একজন কাষ্টমস অফিসার ছিলেন। তার মাতার নাম শামসুন নাহার।

শফিকুল ইসলাম সিলেট জেলার এইডেড হাইস্কুল থেকে এসএসসি ও মদন মোহন মহাবিদ্যালয় থেকে এইচএসসি উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি ও সমাজকল্যাণে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন। এছাড়া এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ থেকে এম,এ ইন ইসলামিক ষ্টাডিজ ডিগ্রী অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে শিক্ষাজীবনে অনন্য কৃতিত্বের জন্য স্বর্ণপদক প্রাপ্ত হন।

কর্মজীবনে একজন সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তা কবি শফিকুল ইসলাম চাকরীসূত্রে বিসিএস(প্রশাসন) ক্যাডারের একজন সদস্য। তার কর্মজীবনের শুরু কুষ্টিয়া ডিসি অফিসে সহকারী কমিশনার হিসেবে।তিনি ঢাকার প্রাক্তন মেট্রোপলিটান ম্যাজিষ্ট্রেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সাবেক এডিসি। এছাড়া ও তিনি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশনের জেনারেল ম্যানেজার এবং ত্রাণ ও পুনর্বাসন অধিদপ্তরে উপপরিচালক ছিলেন। তিনি স্বরাষ্ট্র্র মন্ত্রণালয়ে সিনিয়র সহকারী সচিব, অর্থমন্ত্রণালয়ের ইআরডিতে উপসচিব পদে ও বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপসচিব। তিনি সরকারী কাজে যে সব দেশ ভ্রমণ করেছেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বৃটেন, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইনও সিঙ্গাপুর।

লেখালেখির শুরু ছাত্রজীবনে স্কুল ম্যাগাজিনে লেখালেখির প্রচেষ্টা থেকে। থেকে। সেটি ছিল ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দ। তখন কবি ক্লাস সেভেনে পড়েন। কাব্যচর্চা দিয়ে লেখালেখি শুরু করেন। ১৯৮০সালে সিলেটের মুসলিম সাহিত্য সংসদের উন্মুক্ত চত্বরে কবিতা পাঠের মাধ্যমে প্রথম জনসমক্ষে আত্মপ্রকাশ।মদন মোহন কলেজে পড়াকালিন তার সম্পাদনায় ‘স্পন্দন’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা বের হয়। আর সেই ম্যাগাজিনে তার প্রথম লেখা বের হয়।সেটি ছিল একটি কবিতা। এরপর কলেজ ম্যাগাজিনে তার লেখা কবিতা ও গল্প প্রকাশিত হতে থাকে। চাকরীসূত্রে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে কর্মকালীন সময়ে তার কবিতা ও গান বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ব্যাপকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে।পরবর্তীতে স্থানীয়, জাতীয় ও অনলাইন পত্র-পত্রিকায় তার লেখা প্রকাশিত হয়।

ছা্ত্রজীবনে ১৯৮১সালে তৎকালীন ক্রীড়া ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় কর্তৃক একুশে ফেব্রুয়ারী উপলক্ষে দেশব্যাপী আয়োজিত সাহিত্য প্রতিযোগীতায় বাংলাদেশ পরিষদ সাহিত্য পুরস্কার প্রাপ্ত হন। এছাড়া আন্তর্জাতিক লেখক দিবস উদযাপন পরিষদ কর্তৃক লেখক সম্মাননা পদক ২০০৮প্রাপ্ত হন। সম্প্রতি তার জনপ্রিয় কাব্যগ্রন্থ ‘তবুও বৃষ্টি আসুক’ এই অনন্য কাব্যগ্রন্থের জন্য তিনি নজরুল স্বর্ণপদক প্রাপ্ত হন। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে সাহিত্য ক্ষেত্রে অনন্য অবদানের জন্য বিভিন্ন পদকে ভূষিত হন।

আপাতদৃষ্টিতে তাকে অনেকে প্রেম ও বিরহের কবি হিসেবে আখ্যায়িত করলে ও তিনি যে একজন সমাজ-সচেতন কবি তা তার দহন কালের কাব্য ও প্রত্যয়ী যাত্রা কাব্যগ্রন্থ পাঠে সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়। সমাজের বিভিন্ন অসংগতি ও বৈষম্য যে তাকে সংক্ষুব্ধ করেছে, অনায়াসে তা উপলব্ধি করা যায়।
কবি শফিকুল ইসলামের হাতে প্রকৃতির সকল বৈচিত্র সমাহৃত হইয়া কবির হাতে নূতন রূপে রূপায়িত হইয়া উঠিয়াছে। তুণাঙ্কুর, ধুলিকণা, শিশিরকণাটি পর্যন্ত নব নব শ্রী ও সম্পদ লাভ করিয়াছে। কবি পাঠকের মনেও সৃজনী-মাধুরীর প্রত্যাশা করিয়া তাঁহার সৃষ্টিকে ব্যঞ্জনাময়ী করিয়াছেন- ছবির আদ্‌রা আঁকিয়া কবি পাঠককে দিয়াছেন তাহার নিজের মনের রং দিয়া ভরিবার জন্য। কবি কবিতাকে নব নব রূপ দান করিয়াছেন। তিনি নিজের সৃষ্টিকে নিজেই অতিক্রম করিয়া নূতন রূপসৃষ্টি করিয়াছেন। কবি নব নব ছন্দ আবিস্কার করিয়াছেন। তাঁহার বাগ-বৈভবে ও প্রকাশ ভঙ্গিমায় কবি মানসের যে একটি অভিনব রূপ তিনি প্রকাশ করিয়াছেন তাহা বিস্ময়কর।
তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থসমূহ ঃ একুশে বইমেলায় বিভিন্ন সময়ে তার কাব্যগ্রস্থ প্রকাশিত হয়।এই ঘর এই লোকালয়(২০০০) প্রকাশিত হয় প্রবর্তন প্রকাশন থেকে । একটি আকাশ ও অনেক বৃষ্টি(২০০৪) প্রকাশিত হয় আমীর প্রকাশন থেকে। তবু ও বৃষ্টি আসুক(২০০৭) ও শ্রাবণ দিনের কাব্য (২০১০) প্রকাশিত হয় আগামী প্রকাশনী থেকে । দহন কালের কাব্য(২০১১) ও প্রত্যয়ী যাত্রা(২০১২) প্রকাশিত হয় মিজান পাবলিশার্স থেকে। গীতি সংকলন ঃ মেঘ ভাঙ্গা রোদ্দুর(২০০৮) প্রকাশিত হয় আগামী প্রকাশনী থেকে। এছাড়া রয়েছে আড়াই হাজারের অধিক গান নিয়ে ‘শফিকুল ইসলামের শ্রেষ্ঠ গীতিকবিতা’ নামের পাচ খণ্ড বিশিষ্ট গ্র্ন্থ। দেশে-বিদেশে বিভিন্ন লেখক, সাহিত্যিক. অধ্যাপক, আমলা, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক তার রচিত সাহিত্যকর্মের উপর আলোচনা ও গবেষণা করেছেন।

সকল স্রষ্টার সৃজনীপ্রতিভা যে ভাবে ক্রমবিকাশ লাভ করে কবি শফিকুল ইসলাম প্রতিভার বিকাশও সেই ভাবেই হইয়াছে। প্রথম যৌবনে অন্তর্গূঢ় প্রতিভার বিকাশ-বেদনা তাঁহাকে আকুল করিয়াছে– তখন কুঁড়ির ভিতর কেঁদেছে গন্ধ আকুল হয়ে, তখন ‘কস্তুরীমৃগসম’ কবি আপন গন্ধে পাগল হইয়া বনে বনে ফিরিয়াছেন। প্রথম জীবনের রচনায় এই আকুলতার বাণী, আশার বাণী, উৎকন্ঠা, উচ্চাকাঙ্খা, সংকল্প, ক্ষণিক নৈরাশ্যে আত্মসাধনা, মহাসাগরের ডাক, বাধা বিঘ্নের সহিত সংগ্রাম ইত্যাদির কথা আছে।
বাস্তবিক কবি শফিকুল ইসলামের সমস্ত রচনার মধ্যে এই সীমাকে উত্তীর্ণ হইয়া অগ্রসর হইয়া চলিবার একটি আগ্রহ ও ব্যগ্র তাগাদা স্পষ্টই অনুভব করা যায়। যাহা লব্ধ তাহাতে সন্তুষ্ট থাকিয়া তৃপ্তি নাই, অনায়ত্তকে আয়ত্ত করিতে হইবে, অজ্ঞাতকে জানিতে হইবে, অদৃষ্টকে দেখিতে হইবে- ইহাই কবি শফিকুল ইসলামের কথা।
সাধারণ কবিদের মত তিনি ভাববিলাসিতায় ভেসে যাননি। ভাবের গড্ডালিকা প্রবাহে নিজেকে অবলুপ্ত করে দেননি। প্রকৃত কবির মত তার কবিতায় কাব্যিক মেসেজ অনায়াসে উপলব্ধি করা যায়। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগতে পারে কি সে মেসেজ? তার কাব্যসৃষ্টিতে সাম্য, মৈত্রী ও মানবতার নিগূঢ় দর্শন অন্তঃসলিলা ফল্গুধারার মত প্রবহমান। তার ‘তবুও বৃষ্টি আসুক’ কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতায় কবি বলেছেনঃ-
“তারও আগে বৃষ্টি নামুক আমাদের বিবেকের মরুভূমিতে,
সেখানে মানবতা ফুল হয়ে ফুটুক-
আর পরিশুদ্ধ হোক ধরা, হৃদয়ের গ্লানি…”
(কবিতাঃ ‘তবুও বৃষ্টি আসুক’)
পংক্তিগুলো পাঠ করে নিজের অজান্তে আমি চমকে উঠি। এতো মানবতাহীন এই হিংস্র পৃথিবীতে বিশ্ব মানবের অব্যক্ত আকাংখা যা কবির লেখনীতে প্রোজ্জ্বলভাবে প্রতিভাত হয়েছে। এতো শুধু কবির কথা নয়, এতো একজন মহামানবের উদ্দীপ্ত আহ্বান। তার কবিতা পাঠে আমি অন্তরের অন্তঃস্থলে যেন একজন মহামানবের পদধ্বনি শুনতে পাই। যিনি যুগ মানবের অন্তরের অপ্রকাশিত আকাংখা উপলব্ধি করতে পারেন অনায়াসে আপন অন্তরের দর্পণে। তাই তিনি বিশ্ব মানবের কবি। বিশ্বমানবতার কবি।
বর্তমানে www.grontho.com, sheiboi.com, www.chorui.com, bengaleboi.com এবং www.noboboi.com, www.eakash.com সহ বিভিন্ন ওয়েব সাইট থেকে এবং banglapdf.net, www.boighar.com, kazirhut.com, www.boilovers.com ও www.boierdunia.in সহ বিভিন্ন ফোরাম থেকে তার রচিত বইসমূহ ডাউনলোড করা যায়।এছাড়া গুগোল প্লে-ষ্টোরে রয়েছে তার রচিত বইয়ের বিশাল ভাণ্ডার, যা তাৎক্ষণিকভাবে ডাউলোড করে পাঠ করা যায়। ফেসবুক গ্রুপ এবং ইউটিউবেও রয়েছে তার রচিত কবিতা আবৃত্তি ও গানের অসংখ্য ভিডিও। বর্তমানে www.rokomari.com থেকে অনলাইনে(Help: 16297 অথবা 01519521971 ফোন নাম্বারে) সরাসরি তার সকল বই সংগ্রহ করা যায়।

আজি    শ্রাবণ-ঘন-গহন-মোহে

আজি       শ্রাবণ-ঘন-গহন-মোহে

                           গোপন তব চরণ ফেলে

                     নিশার মতো নীরব ওহে

                           সবার দিঠি এড়ায়ে এলে।

                                  প্রভাত আজি মুদেছে আঁখি,

                                  বাতাস বৃথা যেতেছে ডাকি,

                                  নিলাজ নীল আকাশ ঢাকি

                                         নিবিড় মেঘ কে দিল মেলে।

কূজনহীন কাননভূমি,

              দুয়ার দেওয়া সকল ঘরে,

একেলা কোন্‌ পথিক তুমি

              পথিকহীন পথের ‘পরে।

                     হে একা সখা, হে প্রিয়তম,

                     রয়েছে খোলা এ ঘর মম,

                     সমুখ দিয়ে স্বপনসম

                           যেয়ো না মোরে হেলায় ঠেলে।

বোলপুর, আষাঢ়, ১৩১৬

একুশে পদক ২০১৮ এর মনোনয়ন আহ্বান

একুশে পদক ২০১৮ এর মনোনয়ন আহ্বান করা হয়েছে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বৃহস্পতিবার এ তথ্য জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সরকারের সব মন্ত্রণালয়/বিভাগ, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন দপ্তর/সংস্থা, সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, সকল জেলা প্রশাসক এবং স্বাধীনতা পদক/একুশে পদকে ভূষিত সুধীবৃন্দকে আগামী ২ অক্টোবর, ২০১৭ এর মধ্যে মনোনয়ন/প্রস্তাব সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করতে হবে।

এ সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্যাবলী, একুশে পদক নীতিমালা এবং মনোনয়ন প্রস্তাবের ফরম সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েব সাইটে পাওয়া যাবে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয় , একুশে পদক প্রদান সংক্রান্ত নীতিমালা অনুযায়ী অন্যান্য বছরের ন্যায় ২০১৮ সালে সরকার কর্তৃক ভাষা আন্দোলন, শিল্পকলা (সংগীত, নৃত্য, অভিনয়, চারুকলাসহ সকল ক্ষেত্রে), মুক্তিযুদ্ধ, সাংবাদিকতা, গবেষণা, শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, অর্থনীতি, সমাজসেবা, রাজনীতি, ভাষা ও সাহিত্য এবং সরকার কর্তৃক নির্ধারিত অন্য কোন ক্ষেত্রে প্রশংসনীয় ও গৌরবোজ্জ্বল অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ব্যক্তি (জীবিত/মৃত), গোষ্ঠী, প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাকে একুশে পদক প্রদান করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

চিকন গুনিয়া

লাভলী ইসলাম
ডেঙ্গুর বুঝি বিদায়ক্ষন
চিকন গুনিয়ার আগমন
এডিস মশার আক্রমণ
জন জীবনে ছন্দপতন ।
:
জ্বর যেন আগুন
বিষ ব্যথা দ্বিগুণ
হাঁটতে চলতে যেমন
দেহ করছে আন্দোলন ।
::
চিকন মানুষেরা এখন
আরও চিকন হবেন
মোটা যারা আছেন
তারাও কাহিল রবেন ।
:
কর্ম কাজের জীবন
অসহ্য লাগে এখন
ভাঙ্গে শরীর মন
চিকন রোগ নির্যাতন ।

রসালাপে ছিলেন বীরবলের মতোই উজ্জ্বল

পণ্ডিত’ লোকদের নিয়ে সাধারণের ধারণা হলো তাঁরা বদমেজাজি, কাঠখোট্টা, রাশভারী, খিটখিটে ও বেরসিক। কিন্তু বিশ শতকের বাঙালি মুসলিম সমাজের মহাপণ্ডিত ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এক্ষেত্রে ছিলেন অদ্ভুত ব্যতিক্রম। তিনি একই সঙ্গে ছিলেন জ্ঞানী, ধার্মিক, অসাম্প্রদায়িক ও রসিক। রসালাপে ছিলেন বীরবলের মতোই উজ্জ্বল। তাঁর মতো জাত পণ্ডিত যে মানুষকে এমন হাসাতে পারে, তা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। তাঁর এই বিশেষ দিকটি নিয়ে লিখেছেন শারফিন শাহ

একবার বাংলা ভাষার শব্দ-সম্পদ নিয়ে কথাবার্তা হচ্ছিল। আরও দু-একজন ভদ্রলোক ছিলেন সেখানে। একজন জিজ্ঞেস করে বসলেন, ‘আচ্ছা স্যার, আপনার অভিমত কী? এই যে সম্প্রতি কথা উঠেছে যে, পূর্ব-পাকিস্তানের ভাষাকে আরবি, ফারসি, উর্দু ঘেঁষা করতে হবে?’ ড. শহীদুল্লাহ জবাব দিলেন, ‘এর জবাব তো অনেকবার দিয়েছি। সভা-সমিতিতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং মিলাদ মাহফিলে। গোঁড়ামি সবসময়ই খারাপ। গোঁড়ামি গোঁড়ামির জন্ম দেয়। বাংলা ভাষাকে কেউ কেউ সংস্কৃতঘেষা করতে চান; আবার কেউ কেউ বলেন আরবি-ফারসি-প্রধান না করলে ‘পাকিস্তানি জবান’ বলে চেনা যাবে না। দুটোই গোঁড়ামি। যেমন কামারের খাঁড়া দিয়ে তেমনি কসাইয়ের ছোরা দিয়ে বাংলা ভাষাকে হত্যা করার চেষ্টা জাতির পক্ষে অকল্যাণকর।’ আবার প্রশ্ন হলো, ‘তাহলে ভাষা ও শব্দ তৈরির ব্যাপারে কিসের উপর নির্ভর করতে হবে?’ ‘শব্দ ও ভাষা-গঠনের জন্য নির্ভরশীল হতে হবে লেখকের উপর। শক্তিশালী লেখক জন্ম দেন ভাষার, সৃষ্টি করেন নতুন নতুন শব্দের। আসলে সুন্দর ভাষার জন্ম হয় লেখকের সাধনায়। উদাহরণ দিই—ধরো ঘষে মেজে রূপচর্চা করা যেমন, ধরে বেঁধে পিরিত করা যেমন, নিয়মের ছকে বেঁধে ভাষা তৈরিও তেমনি।’ বলে হাসতে লাগলেন তিনি।

কখনো কখনো নিজের ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ নিয়ে মন্তব্য করতেন; শ্রোতাদের পরিতৃপ্ত করতেন। একবার তিনি চুয়াডাঙ্গা গেছেন। সেখানে ভিক্টোরিয়া জুবিলি হাই স্কুলে ঈদে মিলাদুন্নবি। খাবার টেবিলে গল্প হচ্ছিল। তিনি কথাবার্তা বলছিলেন রসিয়ে রসিয়ে। তাঁর সঙ্গে খাবার টেবিলে ছিলেন কয়েকজন শিক্ষক। তাঁদের একজন ডক্টর শহীদুল্লাহকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘স্যার, যদি কিছু মনে না করেন তাহলে জন্ম তারিখটা বলবেন?’ প্রসন্ন হাসিতে উত্ফুল্ল হয়ে উঠলেন তিনি। বললেন, ‘আমার জন্ম তারিখ ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দের ১০ জুলাই।’ জন্ম তারিখ দিয়েই বললেন, ‘জন্ম তারিখ দিলাম কিন্তু মৃত্যু তারিখ তো দিতে পারছি না। তবে আমার বিয়ের তারিখটি লিখে রাখ। সে তারিখটা হল, 103।’ শুনে সবার মাথা ভন ভন করে ঘুরতে লাগল। এর মানে কী? বললেন, ‘তবে শোনো। ‘টেন কিউব’ মানে হলো, দশ তিনবার অর্থাত্ ১৯১০ সালের ১০ই অক্টোবর। অক্টোবর হলো গিয়ে ইংরেজি মাসের দশম মাস। সব মিলিয়ে দাঁড়াল—বছরটা দশ (১৯১০), মাসটাও দশ এবং তারিখটাও দশ।’ এবার উক্তিটির তাত্পর্য সবাই বুঝতে পারল। হা হা করে হাসতে লাগলেন সবাই। আচার্য শহীদুল্লাহও। তিনি তার বাড়ির নাম ‘পেয়ারা ভবন’ রেখেছেন কেন? আরেক জনের একটি প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, ‘এটা আমার জন্মস্থানের স্মৃতি এবং পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে প্রিয়। এই কারণেই ‘পেয়ারা’ নামটি বেছে নিয়েছিলাম। এর চেয়ে প্রিয় নাম আর কী হতে পারে?’

বর্তমানে যেটা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সেটাই ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তখনকার কলা ভবন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তখন বাংলা বিভাগের অতিরিক্ত অধ্যাপক। একদিন কি একটা কাজে তিনি অধ্যাপকদের বিশ্রামকক্ষে ঢুকলেন। দু-তিনজন তরুণ অধ্যাপক ছিলেন সেখানে। ইসলামের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক শামসুদ্দীন মিয়া ড. শহীদুল্লাহকে অনুরোধ করলেন চা পানের জন্য। তারাও চা খাচ্ছিলেন সে সময়। তিনি চা খাবেন না বলে জানালেন। এবং একটি চেয়ার টেনে নিয়ে বসে পড়লেন। অধ্যাপকদের অবাক করে দিয়ে বললেন, ‘তার চেয়ে বরং আমি চানাচুর খাই। আমার কাছেই আছে।’ বলেই কালো শেরওয়ানির পকেটে হাত গলিয়ে দিলেন। বের করলেন চানাচুর এবং কুড়মুড় করে খেতে লাগলেন। খানিকক্ষণ পর তিনি তরুণ অধ্যাপকদের উদ্দেশে বললেন, ‘তোমরা নিশ্চয়ই চানাচুর খাওয়া দেখে আশ্চর্য হয়ে গেছ। কিন্তু অবাক হওয়ার যে কী আছে ভেবে পাই না। ইউরোপীয়রা সিগারেট খায়। তাদের দেখাদেখি আমরাও খাই। তাতে কিন্তু আমাদের লজ্জাশরম লাগে না। আর অন্য কিছু খেলেই লজ্জায় মরে যাই। এ মনোভাব প্রশংসনীয় নয়।’ বলে টেনে টেনে হাসতে লাগলেন তিনি।

সময়টা তখন ভাষা আন্দোলনের আগের বছর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ক্লাসে তিনি ছাত্রছাত্রীদের বলছিলেন, ‘জান তো মূর্খ তিন রকমের। গোমূর্খ, হস্তীমূর্খ, পণ্ডিতমূর্খ। দেশের কোটি কোটি লোক নিরক্ষর, জ্ঞানের আলো থেকে বঞ্চিত। এরা হলো গোমূর্খ। তোমাদের মতো লোকেরা হস্তীমূর্খ। লেখাপড়া শিখেও যারা আসল ছেড়ে নকল, গিল্টি করা জিনিস নিয়ে পাগল। বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানি ভাষা করতে গিয়ে অনাবশ্যক আরবি-ফারসি শব্দ জুড়ে দেওয়া অথবা তাকে ঐতিহ্যমণ্ডিত করার জন্য সংস্কৃত শব্দের প্রাধান্যে পুনঃনির্মাণ করার চেষ্টা করা—উভয়ই হস্তীমূর্খের মতো কাজ। তৃতীয় শ্রেণির মূর্খ হলো তারাই যারা খ্যাতিমান হয়েও আল্লাহ-রসূলকে ভুলে গেছে, বিদেশি চাকচিক্যের মোহে পড়ে তারা প্রত্যক্ষ-বাদী চার্বাকের চেলা হয়েছে। আজকালকার দিনে পণ্ডিতমূর্খের সংখ্যা কম নয়।’ বলেই হাসতে লাগলেন তিনি। একেবারে শিশুর মতো পবিত্র ও সরল হাসি।

তিনি খুব জটিল বিষয়কেও তার রসিকতার সাথে মিশিয়ে উপভোগ্য করে তুলতে পারতেন। এই রসিকতা অনেক সময় মাত্রা ছাড়িয়ে যেত। কিন্তু তিনি তার নিজস্ব ঢংয়ে কথাবার্তা চালিয়ে যেতেন। একবার কে একজন জিজ্ঞেস করলেন, ‘স্যার, ‘আঙ্গুর’ পত্রিকা বের করেছিলেন কেন, কিছু বলবেন এ ব্যাপারে?’ হাসতে হাসতে অত্যন্ত সহজ কণ্ঠে উত্তর দিলেন, ‘বাচ্চা ছেলেমেয়েদের মুখে থোকা থোকা আঙ্গুরের মিষ্টি রস ঢেলে দিতে পারব এই আশায়। দেখেছ ‘আঙ্গুর’ পত্রিকার পুরোনো কপি। তার প্রচ্ছদটা ছিল খাসা। কতিপয় ছেলেমেয়ে আঙ্গুরের লতাগুচ্ছের ধারে মইয়ে চড়ে আছে অথবা আছে দাঁড়িয়ে। দেখলেই কিশোর-কিশোরীদের চমক লাগত। আমার দুঃখ, আঙ্গুরের টইটম্বুর রস তারা বেশিদিন পান করতে পারেনি। কেননা উনিশ শ একুশের দিকে আমি ঢাকা চলে আসি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজে। কিন্তু যদ্দিন বেঁচেছিল ‘আঙ্গুর’, তদ্দিন আমি তার মিষ্টি রস ঢেলে দিয়েছি। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে।’

তত্কালীন পাকিস্তানের স্বার্থান্ধ ব্যক্তিরা ক্ষমতার লড়াইয়ে মত্ত হয়ে উঠেছিল। তারা ছিনিমিনি খেলছিল পূর্ব পাকিস্তানের তথা বাঙালিদের ভাগ্য নিয়ে। এসব দেখে ড. শহীদুল্লাহ তার এক ছাত্রকে বলছিলেন, ‘ওই লোকগুলোর প্রকৃতি হলো বর্ষাকালের কোলা ব্যাঙের মতো। ওদের গলা দেখেছ? নববর্ষার আগমনে নতুন পানিতে খালখন্দগুলো ভরে উঠলে কোলা ব্যাঙগুলো ঘ্যাঁও ঘুঁ ঘ্যাঁও ঘুঁ শুরু করে দেয়। তেমনি ওই লোকগুলো দেশের আজাদির শুরু থেকে কোলা ব্যাঙের মতো বড় গলায় বলতে শুরু করেছে, আমি বড় তুমি ছোট, আমি বড় তুমি ছোট। কোনো ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধে আমার নালিশ নেই, আমি শুধু ভাবি, এরাই যদি হয় রাষ্ট্রের ভাগ্যনিয়ন্তা তাহলে আমাদের ভবিষ্যত্ কি। খুঁটি শক্ত না হলে ঘর যে তাসের ঘরে পরিণত হবে।’

ড. শহীদুল্লাহ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ক্লাস নিচ্ছিলেন। পড়াচ্ছিলেন তার প্রিয় বিষয় ভাষাতত্ত্ব, যা ছাত্রদের কাছে বরাবরই নিরস ও কঠিন। তিনি ব্ল্যাকবোর্ডে লিখছিলেন এবং বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন। বুঝাতে বুঝাতে ছাত্রদের দিকে তাকালেন একবার। হঠাত্ খেয়াল করলেন সামনের বেঞ্চের এক ছাত্র তার পাশের সহপাঠিনীর সন্নিকটে গিয়ে বসার চেষ্টা করছে। ড. শহীদুল্লাহ ব্ল্যাকবোর্ডের কাছ থেকে সরে এলেন। বসলেন চেয়ারটায়। ছড়িয়ে দিলেন হাসি। বললেন, ‘এ হলো গিয়ে তোমার বকাণ্ডা প্রত্যাশা।’ ছাত্ররা মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল। মেয়েটিরও অবাক হওয়ার পালা। সবার সবিস্ময়ের ঘোর না কাটতেই তিনি বললেন, ‘বুঝলে না? মানে—এই অমুক আমার বক্তৃতা না শুনে মিসেস অমুকের কাছে ঘেঁষে বসার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু তুমি কি জান না যে, অমুক হলো গিয়ে একজনের বিবাহিতা স্ত্রী। তাহলে কোন আশায় তুমি তার প্রতি আকৃষ্ট হতে চাও?’ ছাত্ররা রহস্যের জট খুলতে পারছে না দেখে তিনি বুঝিয়ে দিলেন। বললেন, ‘গগন-দাহন গ্রীষ্মের এক পড়ন্ত বেলা। দিগন্তজোড়া মাঠ। সবুজ শ্যামল ঘাসে ছাওয়া। গোচারণ-মাঠে গরু চরছে। কোনোটা গাভী, কোনোটা বলদ, কোনোটা এঁড়ে বাছুর। তাদের গায়ের রঙের বাহারও নানান কিসিমের। মাঠে কিছু কিছু সাদা বকও এসে পড়ে। ওরা পোকমাকড় খায়। অকস্মাত্ দেখা গেল একটা সাদা বক গলাটা বাড়িয়ে দিয়ে সামনের ভয়ঙ্কর চেহারার এক দামড়া বলদের দিকে অতি সন্তর্পণে এগিয়ে চলেছে। তার লক্ষ হলো গোলগাল দুটি বস্তু। বলদটি তৃণভক্ষণে মগ্ন। এই অবসরে বাবাজি বক এক পা এক পা করে এগিয়ে যায় সামনের দিকে। সুযোগ আর আসে না। শেষে বক বাবাজির প্রত্যাশা ব্যর্থ হয়। তেমনি পড়াশোনার দিকে নজর না দিয়ে বিবাহিতা-বান্ধবীর দিকে ঘেঁষে বসাটা হলো বকাণ্ডা প্রত্যাশার মতো নিষ্ফল।’ পুরো ক্লাসে তখন হাসির জোয়ার উঠল। কিন্তু যাদের উদ্দেশে কথাগুলো বলা তারা লজ্জায় পাকা টমেটোর মতো লাল হয়ে বসে রইল।

Scroll To Top