শিরোনাম
You are here: প্রচ্ছদ / নির্বাচিত খবর/ লেখা

বিভাগ: নির্বাচিত খবর/ লেখা

Feed Subscription

রোহিঙ্গা ইস্যু: চুড়ান্ত সময় এসে গেছে এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে-ব্যারিস্টার মনোয়ার

ছবি- তসলিম খাঁ

 আন্তর্জাতিক অভিবাসন বিশেষজ্ঞ, খ্যাতিমান ব্রিটিশ আইনজ্ঞ, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ইন্টারন্যাশনালের সেক্রেটারী জেনারেল, চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম চেয়ারম্যান, এক সময়ের কেন্দ্রীয় ছাত্রনেতা, যুক্তরাজ্য প্রবাসী ব্যারিস্টার মনোয়ার হোসেন। যিনি দেশের বাইরে থাকলেও দেশ প্রেম তাঁকে বার বার চুম্বুকের মত স্বদেশের মাটিতে নিয়ে আসে এমন একজন হচ্ছেন আমাদের চট্টগ্রামের প্রিয় মানুষ মনোয়ার আহমেদ। গতকাল রাতে রোহিঙ্গা বিষয়ে চট্টগ্রামের প্রথম ২৪ ঘন্টার অনলাইন পত্রিকা “নিউজচিটাগাং২৪” এর নির্বাহী সম্পাদক মির্জা ইমতিয়াজ শাওন’র  সাথে তাঁর কথা হয়। সাক্ষাৎকারটি পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল-

  • সবচেয়ে নির্যাতিত জনগোষ্ঠী হলো রোহিঙ্গারা। তাদের এ নাজুক পরিস্থিতি দেখে মেডিসিনস স্যান ফ্রন্টিয়ারস বলেছে, পৃথিবী থেকে বিলুপ্তপ্রায় আদিগোষ্ঠীর তালিকায় ভয়াবহ অবস্থানে রয়েছে রোহিঙ্গারা। রোহিঙ্গা শব্দের উত্পত্তি ও রোহিঙ্গা নামের জনগোষ্ঠী নিয়ে বিশেষজ্ঞরা নানা মত পোষণ করে থাকেন। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী নিয়ে এ মতপার্থক্য আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি ভয়ংকর অভিশাপ হিসেবে গ্রাস করে ফেলেছে এ জনগোষ্ঠীর সদস্য আদমসন্তানদের। রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার শুধু ভূলুণ্ঠিতই নয়, পদপৃষ্ট হয়েছে। নিপীড়নের নিত্যনতুন কৌশলের কাছে মানবতা লজ্জাবনত হয়েছে বারবার। ফলে আদমসন্তান হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করতে হলে যে ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা আর অধিকার উপভোগ করতে হয় তার কোনোটিই তাদের ভাগ্যে জোটে না। উপরন্তু নির্যাতনের মাত্রা সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শুধু বেড়েই চলছে তা নয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ নিপীড়ন-নির্যাতন কল্পনাকেও হার মানায়।

নিউজচিটাগাং-  মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতার শিকার হয়ে গত তিন সপ্তাহে প্রায় ৪ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে বাংলাদেশে আশ্রয় ও বেসরকারি সংস্থাসমূহকে প্রবেশ করতে দিয়ে বাংলাদেশ নৈতিক সাফল্য অর্জন করেছে। ১৬ কোটি মানুষ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সঙ্গে খাবার ভাগাভাগি করছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, স্যাটেলাইটের মাধ্যমে পাওয়া নতুন ছবিতে ওই এলাকায় ব্যাপক হারে ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র পাওয়া গেছে, যা তাদের আগের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি। রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে আগামী শুক্রবার মালেশিয়ায় যে বায় হবে এটা কোন কাজে আসবে বলে আপনার কি মনে হয়?

ব্যারিস্টার মনোয়ার হোসেন- দেখুন, আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে আপাতত কোন সমাধান পাওয়া যাবে না। আর্ন্তজাতিক ক্রিমিনাল কোর্টের কনভেনশনে বার্মা স্বাক্ষর করে। তবে বার্মার বিরুদ্ধে যে কোন ধরণের সিদ্ধান্ত বার্মা সরকারকে আন্তর্জাতিক ভিত্ত্বিকে দুর্বল করবে। এটাই হচ্ছে কথা।

নিউজচিটাগাং- আপনি হয়ত জানেন যে, প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রামে এসেছিলেন রোহিঙ্গাদের দেখতে। এটাকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?

ব্যারিস্টার মনোয়ার হোসেন- মূল্যায়ন করব একারণে যে, প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগ ও সফর প্রসংসার দাবী রাখে এবং আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশ এবং তাঁর নিজের ভাবমূর্তিকে বাড়িয়েছে।

নিউজচিটাগাং- আপনি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস্ ইন্টারন্যাশনালের সেক্রেটারী জেনারেল, সে হিসেবে এই রোহিঙ্গা সমস্যা ও করণীয় সম্পর্কে কিছু বলবেন কি?

ব্যারিস্টার মনোয়ার হোসেন- শুধু এটা বলতে চাই, সমস্যাটি দীর্ঘদিনের। এ যাবত আন্তর্জাতিকভাবে কার্যকর কোন কিছুই করা হয়নি। তবে এখন চুড়ান্ত সময় এসে গেছে জাতিসংঘ ও বিভিন্ন উন্নত দেশ গুলো এখন তাদের দৃষ্টি বার্মা বাংলাদেশের দিকে। প্রবল চাপ সৃষ্টি ছাড়া দীর্ঘমেয়াদী কোন সমাধান আসবে না অন্তত আমার মনে হচ্ছে। আর পদক্ষেপের মধ্যে অর্থনৈতিক ও বানিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা, এমনকি বিমান ও নৌ পথে বার্মাকে কঠোর নিষেধাজ্ঞার মধ্যে আনতে হবে। একই সাথে ক্যাম্পের শরনার্থীদের মধ্যে আশ্রয়, চিকিৎসা, খাদ্য, নিরাপত্তা ও শিশুদের জন্য শিক্ষার ব্যাবস্থা করতে না পারলে তারা ক্যাম্পের বাহিরে গিয়ে নিরাপদ জীবন যাপনে সুযোগ খুঁজবে। বার্মা সরকারকে বাধ্য করতে হবে যাতে করে শরনার্থীরা নিরাপদে সেখানে তাদের নিজ নিজ বাসস্থানে পিরে যেতে পারে এবং নিরাপদ থাকতে পারে এবং অত্যাচার, হত্যা, নির্যাতনের সাথে জড়িতদের শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রোহিঙ্গাদের জন্য সাংবিধানিকভাবে বার্মায় যথাযথ মানবিক ও মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা করতে হবে। প্রয়োজনে জাতি সংঘের শান্তি বাহিনী নিয়োগ করা যেতে পারে ঝুকিপূর্ণ এলাকায়।

নিউজচিটাগাং- মায়ানমার সরকার বাহিনী নির্বিচারে রোহিঙ্গাদের নিশংসভাবে হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট করছে। সে জন্য তারা প্রাণভয়ে সিমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে ডুকে পড়ছে। আমাদের সরকারের উচিত কি দায়িত্ব পালন করা উচিত?

ব্যারিস্টার মনোয়ার হোসেন- সরকারের উচিত আন্তর্জাতিকভাবে প্রবল চাপ ও মত সৃষ্টির জন্য প্রধানমন্ত্রী তথা সরকার যথাযথ উদ্যোগ নিতে পারে। সিমান্তবর্তী ও অভ্যন্তরে দেশের নিরাপত্তা বাহিনীকে সজাগ ও শক্তিশালীভাবে প্রস্তুত রাখা। যাতে করে প্রয়োজনে সামরিক চাপের কৌশল নিতে পারে।

নিউজচিটাগাং- রোহিঙ্গা বিষয় নিয়ে দেশে প্রথম ছবিশ ঘন্টার অন লাইন সংবাদপত্র নিউজ চিটাগাং ২৪ ডট কমের সাথে কথা বলার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ, ভাল থাকবেন।

ব্যারিস্টার মনোয়ার হোসেন- চট্টগ্রামের প্রথম ২৪ ঘন্টার অনলাইন পত্রিকা “নিউজচিটাগাং২৪.কম” আরো এগিয়ে যাক। আমার প্রত্যাশা গণমানুষের হয়ে সব সময় কাজ করে যাবে এ পত্রিকাটি। সবশেষে নিউজচিটাগাং এর সকল পাঠকের জন্য রইলো শুভেচ্ছা। সবাই ভালো থাকুন, নিউজচিটাগাং পরিবারেরকে ও আপনাকে ধন্যবাদ।

 

 

 

ফিলিস্তিন টু আরাকান…

মুহাম্মদ কামাল হোসেন::বিশ্বজুড়ে এক ভয়াবহ নৃশংসতা ও গণহত্যার মচ্ছব চলছে। সামান্য ঘটনায় তিলকে তাল বানিয়ে যখন-তখন মুসলমানদের পাইকারি হারে হত্যা ও নিধন করা হচ্ছে। কেউ কোনো উচ্চবাক্য করছে না। প্রকৃতপক্ষে মুসলমানদের পাশে কেউ নেই। কখনো ছিলও না। স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর দল ও সাম্রাজ্যবাদী দোসররা মাঝেমধ্যে সর্বস্ব লুটপাটের ধান্ধায় বন্ধুত্বের রূপ নিয়ে হাত বাড়িয়েছে। স্বার্থ উদ্ধার হওয়ার পর প্রকৃত মুখোশ উন্মোচিত হয়ে গেছে। নামসর্বস্ব ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও প্রতিষ্ঠানগুলো মুসলমানদের পক্ষে মাঝেমধ্যে কাগুজে বিবৃতি, লম্পঝম্প ও হাঁকডাকেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রেখেছে। কাজের কাজ মূলত কেউ করছে না। বিশ্বব্যাপী মুসলমানই একমাত্র জাতি যারা সবচেয়ে নিগৃহীত ও নির্যাতিত। প্রকৃতপক্ষে মানুষ হিসেবে কেউ তাদের গণ্য করছে না। দিকে দিকে মজলুম অসহায় মুসলমান নারী-পুরুষকে নিধন করা হচ্ছে। ভূমিষ্ঠ নিষ্পাপ শিশুদেরও হত্যা করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, গর্ভের অনাগত সন্তানরাও রেহাই পাচ্ছে না। তাদের আর্তনাদে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। খোদার আরশ কেঁপে উঠছে। মুসলমানদের আহাজারি ও কান্না কাউকে সামান্যতম স্পর্শ করছে না। মুসলমানরা মার খেতে খেতে সামান্য প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করলে বিশ্বময় সবাই সমস্বরে জঙ্গিবাদের ধুয়া তুলছে। অথচ জঙ্গিবাদের প্রকৃত দোসর হিসেবে তারাই নতুন নতুন জঙ্গি গ্রুপ বিশ্বময় ছড়িয়ে দিচ্ছে। শান্ত পৃথিবীকে অশান্ত ও অগ্নিগর্ভ করে তুলছে। এসব জঙ্গিবাদের ওপর স্ট্যাম্প লাগাচ্ছে শান্তিময় ইসলাম ধর্মের। কলুষিত করার চেষ্টা চলছে মুসলমানদের সুদীর্ঘ বর্ণাঢ্য অতীত ইতিহাস ও ঐতিহ্য। ‘ফিলিস্তিন টু আরাকান’ আজ একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। এই রোডম্যাপ শুধুই দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। প্রতিদিন যোগ হচ্ছে নতুন নতুন দেশ। যেখানে মুসলমান সেখানেই বর্বরতা ও গণহত্যা চালানো হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী চলমান নৃশংসতা ও হত্যাকান্ডের ধরন বারবার একই চিত্রনাট্যের দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে।

আজ বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের ঘোর দুর্দিন, ঘোর অমানিশা। এক দুর্বিষহ জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে তারা প্রতিটি মুহূর্ত পার করছে। নিজ দেশেই তারা পরবাসী। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের শিকার। দুনিয়াজুড়ে আধিপত্যবাদ ও সা¤্রাজ্যবাদীদের নীলনকশায় তারা নিগৃহীত। বিশেষত যেসব দেশে মুসলমানরা সংখ্যালঘু সেখানে তাদের ধর্মীয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকারসহ সব কিছুই পর্যুদস্ত। বিশ্বে এক সময়ের শির উঁচু করা জাতি, আজ ন্যুব্জ হয়ে রয়েছে। অত্যাচারীদের নির্মম খড়গ তাদের ঘাড়ে চেপে আছে। কিন্তু যারা এক দিন গোটা বিশ্ব শাসন করত, যাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও সভ্যতার আলো দ্বারা সমগ্র বিশ্ব আলোকিত হয়েছিল, তারা আজ সতত বিশ্বব্যাপী চরমভাবে নির্যাতন, জুলুমের শিকার হচ্ছে এবং নৃশংসতা ও বর্বরতার বলি হচ্ছে বিরোধী অপশক্তি দ্বারা। এর জন্য মুসলমানদের অনৈক্য, ভোগবাদী মনোভাব ও স্বেচ্ছাচারিতাই মূলত দায়ী। তারা নিজেরা সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদকে জন্ম দিয়ে মিডিয়াকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ব্যবহার করে দায় চাপাচ্ছে মুসলমানদের ওপর। শক্তিশালী কোনো আন্তর্জাতিক তথ্য মিডিয়াও মুসলমানদের হাতে নেই। অথচ কিছু কিছু মুসলিম রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের ধনকুবের বিলাসবহুল প্রাসাদ, ভোগবিলাস ও আরাম আয়েশের দিকে মগ্ন থেকে নিজেদের তথা জাতিরাষ্ট্র ও সম্প্রদায়ের ধ্বংস ডেকে আনছে। বরং বিরুদ্ধ শক্তির কাছে এরা প্রিয়ভাজন ও প্রিয় ব্যক্তিত্ব। মুসলিম বিশ্বের প্রায় সব রাষ্ট্রপ্রধানই ওদের হাতের পুতুল। দুয়েকটি দেশ ব্যতিক্রম হলেও আন্তর্জাতিক বিরোধী গোষ্ঠীর দাপটে তারা কার্যকর কিছুই করতে পারে না।

রাবেতা, আরব লিগ ও ওআইসি নামের সংস্থাগুলোর ভূমিকা ইতিবাচক নয় বললে বাড়িয়ে বলা হবে না। নিন্দা প্রস্তাব ও কাগুজে বিবৃতিদানের মধ্যেই তাদের কাজ সীমাবদ্ধ। ফিলিস্তিন, চেচনিয়া, কসোভা, মেসিডোনিয়া, মিন্দানাও, ইরাক, মিসর, লিবিয়া, আফগানিস্তান ও আজকের মিয়ানমারের আরাকানে কারবালার প্রান্তর তৈরি করে রাখা হলেও এসব সংস্থা এবং বিশ্ব মুসলিম সমাজ নির্লিপ্ত এবং জড়। হয়তো এরপর নতুন কোনো মুসলিম দেশ আক্রান্ত হবে। মুসলিম অধ্যুষিত নির্যাতিত দেশের তালিকাটা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হবে। পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্বলতম জাতিগোষ্ঠী আরাকান মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের খড়গ চালাতে মিয়ানমার সরকারের মানবিক বোধে কোনো আঁচড় কাটেনি। দিন দিন তাদের স্পর্ধা ও ধৃষ্টতা লাগামহীনভাবে বেড়ে চলেছে। বাংলাদেশের আকাশসীমা বারবার লংঘন করে যাচ্ছে। এর একটা ছেদ চিহ্ন আজ জরুরি হয়ে পড়েছে। সময় এসেছে মুসলিম বিশ্বকে সব মতভেদ ভুলে একই প্লাটফর্মে এসে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার। মিয়ানমারের চলমান মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য, তাদের ওপর শক্তভাবে চাপ সৃষ্টি করে বাংলাদেশে অবস্থানরত মুসলমান রোহিঙ্গাদের আবার তাদের নিজেদের দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি গ্রহণ করা। এর জন্য সবার আগে যা প্রয়োজন তা হলো ‘বিশ্ব মুসলিমের ঐক্য এবং সাম্য প্রতিষ্ঠার ঘোষণা’। এ মুহূর্তেই যা শুরু হতে পারে।

লেখক : কথাসাহিত্যিক, গবেষক ও কলামিস্ট

kamal83_alif@yahoo.com

চাঁনখালী নদীকে ঘিরে বেঁচে উঠে জীবন, জগৎ সংসার

এ.কে.এম. আবু ইউসুফ: বাংলাদেশ নদী মাতৃক দেশ। অসংখ্য নদ-নদী ঘিরে রয়েছে এই দেশের চারিদিকে। আমাদের এই বাংলাদেশের নদ-নদী, খাল-বিলের দৈর্ঘ্যও কম নয়, প্রায় ১৫ হাজার মাইল। কোন এক ঐতিহাসিক লিখেছিলেন বাংলার ইতিহাস এক হিসেবে নদীর ইতিহাস। আবার “নদী জননী জন্মভূমির স্তন্যধার” বলেন অনেকে। নদীর এপার ভাঙ্গে ওপাড় গড়ে, এই ভাঙ্গার গড়ার ভেতর দিয়ে বাংলার মানুষের জীবন প্রবাহিত। সংস্কৃতি পেয়েছে নিজস্বতা। অসংখ্য নদী ছুটতে ছুটতে মিলেছে বঙ্গোপসাগরে, বদলে দিয়েছে জীবনের গতিপথকে। নদী পার্শ্বের জনজীবনকে বার বার শাসন করেছে এই নদী। নদীকে ঘিরে বেঁচে উঠে জীবন, জগৎ সংসার। এইসব নদীর মাঝে আছে খরস্রোতা পাহাড়ি নদী, আছে শান্ত নদী, রয়েছে সমুদ্রের মত বিশাল পদ্মা-মেঘনার মত উত্তাল নদী। বাংলাদেশের প্রধান নদীর কয়েকটি পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রক্ষ্মপুত্র, করতোয়া, তিস্তা, কর্ণফুলী ইত্যাদি। আর এই চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর প্রবাহমান ধারায় সৃষ্টি হয়েছে চাঁনখালী নদী। যাহা কর্ণফুলী নদীর সংযোগ শিকলবাহা খালের পর থেকে শুরু হয়েছে। পটিয়া, আনোয়ারা ও চন্দনাইশ এই তিন উপজেলার বুক চিরে থর থর করে বয়ে চলেছে চাঁনখালী নদী। এই নদী মিলিত হয়েছে শংঙ্খ নদী হয়ে বঙ্গোপসাগরে। কখনও শান্ত কখনও প্রবল খরস্রোতা বহমান এই নদীকে ঘিরে রয়েছে এই জনপদের ও জনজীবনের অনেক ঐতিহ্য ও ইতিহাস। আমি চাঁনখালী নদীকে দেখেছি খুব কাছ থেকেই, দেখেছি এই নদীর জৌলুসতা। কেননা আমার জন্মস্থান চন্দনাইশ থানাধীন বরকল ইউনিয়নের কানাইমাদারী গ্রামে। এই ইউনিয়ন ও গ্রামের পশ্চিম পাশ দিয়ে বহমান চাঁনখালী নদী। তৎকালীন সময়ে এই এলাকার লোকজন অধিকাংশ নির্ভরশীল ছিল চাঁনখালী নদীর উপর। চাষাবাদ, ব্যবসা-বানিজ্য গড়ে উঠেছিল চাঁনখালী নদীকে ঘিরেই। পটিয়া উপজেলার পশ্চিমাংশ, আনোয়ারা উপজেলার পূর্বাংশ ও চন্দনাইশ উপজেলার দক্ষিণ-পশ্চিমাংশের লোকদের যাতায়াত, ব্যবসা-বানিজ্য ও চাষাবাদের একমাত্র ভরসা ছিল চাঁনখালী নদী। শংঙ্খ নদীর উপর দিয়ে বাঁশখালীর চাম্বল থেকে ছেড়ে আসা লঞ্চ (স্থানীয় ভাষায় স্টিমার) চলত নদীর বুক চিড়ে। এই জনপদের লোকদের তখনকার যাতায়ত ও মালামাল পরিবহনের বাহন হিসেবে লঞ্চ, সাম্পান ও নৌকা ছিল একমাত্র ভরসা। নির্ধারিত সময়সূচী অনুযায়ী কর্ণফুলীর চাক্তাই ব্রিজঘাট থেকে ছেড়ে আসতো এই লঞ্চ, শেষ ষ্টেশন ছিল বাঁশখালী চাম্বল। আবার চাম্বল থেকে ছেড়ে গিয়ে চাক্তাই ব্রিজঘাট পৌঁছাতো এই লঞ্চ। প্রতিমধ্যে যাত্রীই ছিল পশ্চিম পটিয়া, ভেল্লাপাড়া, জিরি, কৈগ্রাম, কালারপোল, টাঙ্গারপোল, মুরালী, খরনা, ওষখাইন, লাউয়ারখীল, চামুদরিয়া ঘাটকুল, তিশরী, বরকল, টিনেরঘরের হাট, কেশুয়া, মাস্টারহাট হয়ে বাঁশখালীর নাপোড়া ও চাম্বলের। এই চাঁনখালী নদীর রয়েছে অনেক উপ-খাল। যে খাল গুলোতে পানি উন্নয়ন বোর্ড স্থায়ী স্লুইস গেইট দিয়ে এতদঅঞ্চলের জনজীবনের চাষাবাদের সুযোগ করে দিয়েছে। লবনের বোঝাই করা পাল তোলা সারি সারি নৌকা, সাম্পান, পন্য বোঝাই বড় নৌকার বহর ও স্থানীয় জেলেদের মাছ ধরার নৌকায় মুখরিত ছিল এই নদী। পার্শ্বে সারি সারি চাটাই পাতার বন, কেওড়া গাছ ছিল চোখে পড়ার মতো। কিশোর বয়সের দুরান্তপনায় শালুক তোলা, দলবেঁধে সাঁতরিয়ে নদী পার হওয়া ও মাছ ধরা ছিল মজার বিষয়। বি¯তৃর্ণ এলাকায় চাঁনখালী নদীর পানি দ্বারা বোরো মৌসুমে সেচ দিয়ে চাষাবাদ, শীতকালীন সবজির চাষাবাদ সবই করত এই এলাকার লোকজন। তৎসময়ে জৌলুসও ছিল এই নদীকে ঘিরে। চামুদরিয়া ঘাটকুলে ছিল দিনরাত ২৪ ঘন্টা সরগরম বাজার। পৌষ মাসের শেষের দিক থেকে নানান মেলা, ওরশ ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজনে নদীর উপর দিয়ে চলাচলে উৎসবমুখর পরিবেশ ছিল। চামুদরিয়া ঘাটকুল থেকে ওষখাইন হযরত শাহ আলী রেজা (র.) প্রকাশ কানুশাহের পবিত্র বিষু মোবারকে অনেক দুরদুরান্তের লোকজন চাঁনখালী নদী দিয়ে নৌকাযোগে পার হয়ে সমবেত হতো। আবার এতদঅঞ্চলে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা পটিয়া থানাধীন ভাটিখাইন টেগরপুনির (বুড়া গোসাই) মেলায় যাতায়াত করত এই চাঁনখালী নদী দিয়ে। ঐতিহাসিক নিকুঞ্জের বলী খেলায় দলে দলে লোকজন নৌকা, সাম্পান যোগে চাঁনখালী তিশরীঘাট দিয়ে যাতায়াত করত। চাঁনখালী নদীর বরকল কানাই মাদারী অংশের উপ-নদী তেরমুজ খালী ছিল এই অঞ্চলের লোকদের আশির্বাদ স্বরূপ। ঐতিহাসিক এই তেরমুজ খালীর পাড়ে রয়েছে চট্টগ্রামে প্রথম মুসলমান আগমনের সময় যে কয়েকজন মনীষী এই উপ-মহাদেশে এসেছিলেন তাঁদেরই একজন হযরত সৈয়দ মোছন শাহ আরবি (র.) এর মাজার শরীফ। দীর্ঘ কয়েক যুগ এই মাজারের খেদমতে ছিলেন অত্র এলাকার নিদাগের পাড়ার সুফী মোহাম্মদ জৈনুদ্দিন প্রকাশ জুনু ফকির। তাঁর নির্দেশ মোতাবেক মৃত্যুর পর তাঁকেও দাফন করা হয় হযরত সৈয়দ মোছন শাহ আরবি (র.) এর মাজার শরীফের পার্শ্বে। চামুদরিয়া ঘাটকুলের ঐতিহ্যবাহী আবদুল হাকিম মাস্টারের ঔষধের দোকান, আনুর বাপের চায়ের দোকান আর বাছা সওদাগরের মুদির দোকান ছিল এতদঅঞ্চলের বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান। কালের বিবর্তনে যা হারিয়ে গেছে এখন আছে শুধু ইতিহাসটুকু। নব্বইদশকের দিকে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন হতে শুরু হয়। এই উন্নয়নের প্রভাব পড়ে গ্রামের প্রত্যন্ত জনপদে। চাঁনখালী নদীর উপর বরকল নামক স্থানে ১৯৯৪ সালে বেলি ব্রিজ স্থাপন হয়, প্রসার হয় রাস্তাঘাট। মানুষ নৌযানের পরিবর্তে গাড়িতে করে চলাচল শুরু করে। নৌ-পথ ভূলতে বসে। নানা কারণে জোয়ার-ভাটা ঠিক থাকলেও নদীর তলদেশ ভরাট হতে শুরু করে ও নদীর নাব্যতা কমে যায়। বন্ধ হয়ে যায় নৌযান। আর দেখা মিলে না সারি সারি পালতোলা নৌকা ও পন্য বোঝাই বড় নৌকা। হারিয়ে যায় চাঁনখালী নদীর জৌলুস। তবে এই চাঁনখালী নদীকে পুনরায় বাঁচিয়ে তুলে নৌ-রুট চালু করা ও নদীর জৌলুসতা ফিরিয়া আনার চেষ্টায় কাজ করতেছে চাঁনখালী তেরমুজখালী নদী সংরক্ষন কমিটি। লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও পরিবেশবাদী সংগঠক, চট্টগ্রাম। abuyousuf7919@yahoo.com

ঈদের দিনের আনন্দ

মাহফুয আহমদ>>
ঈদের দিন আনন্দ প্রকাশ করা ইসলামের নিদর্শনাদির অন্যতম। খুশির ঈদ আমরা কীভাবে উদযাপন করব, সে বিষয়ে রয়েছে ইসলামের সুস্পষ্ট নির্দেশনা। এখানে আমি সেদিকে যাচ্ছি না। আমি বরং ঈদ পালনে পূর্বসূরিদের কিছুঅভিব্যক্তি, ঘটনা এবং শিক্ষার প্রতি বিজ্ঞ পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাচ্ছি। কোনোরকম সংযোজন ছাড়াই আমি হুবহু কিছু বিষয় উদ্ধৃত করে দিচ্ছি।

প্রকৃত ঈদ
হাসান বসরি (রহ.) বলেন, যেদিন নিজেকে আল্লাহ তায়ালার নাফরমানি থেকে নিবৃত্ত রাখতে পারবে, তোমার জন্য সেদিনই ঈদের দিন। বস্তুত মোমিন বান্দা যেই দিনটি আপন মাওলার স্মরণ, কৃতজ্ঞতা ও আনুগত্যে অতিবাহিত করল,সেই দিনটি তার জন্য মহা আনন্দের দিন। (লাতায়িফুল মাআরিফ; ইবনে রজব হাম্বলি, ১/২৭৮, দারু ইবনে হাজম,১ম সংস্করণ ১৪২৪ হি.)

দৃষ্টি সংযত রাখা
ওয়াকি (রহ.) বলেন, ঈদের দিন আমরা মুহাদ্দিস সুফিয়ান সাওরি (রহ.) এর সঙ্গে বের হলাম। তিনি আমাদের সম্বোধন করে বললেন, যে বিষয় দিয়ে আমরা ঈদের দিনটি শুরু করি তা হলো, নিজেদের দৃষ্টি সংযত রাখা। (আল ওয়ারা’; ইবনে আবিদ দুনিয়া, পৃ. ৬৩, কুয়েত, ১ম সংস্করণ ১৪০৮ হি.)

আবু হাকিম বলেন, হাসসান ইবনে আবি সিনান ঈদের নামাজ শেষে যখন ঘরে ফিরলেন, তখন তার স্ত্রী অগত্যা বলে উঠলেন, আজ কজন সুন্দরীর দিকে চোখ তুলে তাকিয়েছ? প্রত্যুত্তরে হাসসান বললেন, দূর যা! ঘর থেকে বের হওয়া থেকে নিয়ে তোমার নিকট ফিরে আসা পর্যন্ত আমার দৃষ্টি পায়ের বৃদ্ধাঙুলির দিকেই ছিল, চোখ তুলে কোনোদিকে তাকাই নি। (প্রাগুক্ত, পৃ. ৬৪)

পরদেশে ঈদ
হাদিস ও ফিকহ শাস্ত্রের পণ্ডিত আবুল মুতাররিফ আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান আল কানাজিয়ি আল কুরতুবি (রহ.) বলেন, একবার ঈদের সময় আমি মিসরে ছিলাম।

নামাজ শেষে সবাই যার যার নীড়ে চলে গেল আর আমি নীলনদ অভিমুখে রওয়ানা হলাম। খাওয়ার মতো আমার নিকট কিছু ছিল না, শুধুমাত্র একটি থলেতে কিছু তুরমুস (গবাদি পশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত গুল্মবিশেষ) অবশিষ্ট ছিল। তো নদীর পাড়ে বসে আমি এগুলো খেতে লাগলাম। খাচ্ছি, ছোলাগুলো নিচের দিকে নিক্ষেপ করছি আর মনে মনে ভাবছি, দেখো তো! আজ ঈদের এই দিনে পুরো মিসরে আমার থেকে দুরবস্থায় আর কি কেউ আছে? এসব ভাবতে ভাবতে যখন মাথা তুলে নিচের দিকে তাকালাম, দেখতে পেলাম একজন আমার নিক্ষেপ করা ছোলাগুলো উঠিয়ে মুখে দিচ্ছে! আমার বোঝতে আর বাকি রইলো না যে, এটি মূলত আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি সতর্কবার্তা। আমি হৃদয় থেকে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলাম। (আল মুগরিব;ইবনে সাঈদ আল মাগরিবি, ১/১৭১, দারুল মাআরিফ,কায়রো, ৩য় সংস্করণ ১৯৫৫ ঈ.)

নামের সঙ্গে ঈদ
মুসলিম উম্মাহর স্বীকৃত মহান একজন ফকিহের নামের সঙ্গে ঈদ শব্দটি যুক্ত আছে। তিনি হলেন ইমাম ইবনু দাকিকিল ঈদ (রহ.)। এটি মূলত বড় বড় কয়েকজন জ্ঞান তাপসের পারিবারিক নাম। সর্বপ্রথম যিনি এই উপনামে পরিচিত হয়েছিলেন, তিনি হলেন ইমাম ওয়াহব ইবনে মুতি’ আল কোশাইরি আল মানফালুতি (রহ.)। তিনি ছিলেন খুব সুন্দর এবং শুভ্র দাড়ির অধিকারী। একবার তিনি সাদা একটি রুমাল পরে যখন ঈদগাহে গেলেন, তাঁকে দেখে লোকেরা বলতে লাগল, আপনি তো ঈদের (মিষ্টান্ন তৈরির) ‘দাকিক’ বা আটার মতো (শুভ্র ও সুন্দর) হয়ে গেলেন! পরে এই দাকিকুল ঈদ উপনামটি তাঁর এবং তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের ক্ষেত্রে প্রসিদ্ধ হয়ে গেল। তবে এই নামে সবচেয়ে বেশি পরিচিতি লাভ করেছেন তাঁর নাতি প্রখ্যাত ফকিহ ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে আলী ইবনে ওয়াহব আল কোশাইরি (রহ.)। বস্তুত হাদিস,ফিকহ ও ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থাদিতে সাধারাণভাবে ‘ইবনে দাকিকিল ঈদ’ বলে তাঁকেই বোঝানো হয়। (জায়লুত তাকয়িদ; মুহাম্মাদ আল ফাসি, ১/৩৫৮, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১ম সংস্করণ ১৪১০ হি.)

ঈদ ও কিয়ামত
আল্লামা ইবনুল জাওযি (রহ.) কতইনা সুন্দর লিখেছেন,ঈদের দিনে লোকদের সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে এটাকে কিয়ামতের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ মনে হয়েছে। কেননা লোকেরা ঈদের দিন ভোর সকালে ঘুম থেকে জেগে ঈদগাহের দিকে ছুটতে থাকে; তেমনিভাবে কিয়ামতের দিন কবর থেকে উঠে সবাই হাশরের ময়দানের দিকে ছুটতে থাকবে। ঈদের দিন কারো পোশাক ও গাড়ি থাকে খুব উন্নতমানের, কারো থাকে মাঝারি মানের আবার কারো থাকে একেবারে নিম্নমানের;তেমনিভাবে কিয়ামতের দিন মানুষের স্তর হবে ভিন্ন ভিন্ন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘সেদিন দয়াময়ের কাছেপরহেজগারদেরকে অতিথিরূপে সমবেত করব। ‘ (সূরা মারইয়াম: ৮৫) অর্থাৎ আরোহী অবস্থায়। তারপর আল্লাহ বলেন, ‘এবং অপরাধীদেরকে পিপাসার্ত অবস্থায় জাহান্নামের দিকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাব। ‘ (সূরা মারইয়াম: ৮৬) অর্থাৎ তৃষ্ণার্তঅবস্থায়। এক বর্ণনায় রয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘কিয়ামত দিবসে লোকদের সমবেত করা হবে, কেউ আরোহী অবস্থায়, কেউ পায়ে হেঁটে আবার কেউ উপুড় অবস্থায়। ‘ (সুনানে তিরমিজি: ২৪২৪) ঈদের দিন ভিড়ের কারণে কোনো মানুষ পৃষ্ঠ হয়ে প্রাণ হারায়;তেমনিভাবে কিয়ামতের দিনে জালিমদেরকে মানুষ পা দিয়ে পৃষ্ঠ করবে। ঈদের দিন কোনো মানুষ থাকে ধনী এবং দানকারী; তেমনিভাবে কিয়ামতের দিন দুনিয়ার দানশীলগণ ওখানেও দানশীল প্রমাণিত হবে, পক্ষান্তরে কিছু মানুষ থাকবে ভিক্ষুক ও (নেকির) মুখাপেক্ষী। ঈদের দিন লোকেরা নামাজ শেষে বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে ঘরে আসে, ফুর্তি করে,অন্যদের জানায় যে, এরা সব তার বন্ধু; তেমনিভাবে কিয়ামত দিবসে মানুষ নিজের আমলের পুরস্কার পেয়ে পুলকিত হয়ে নিজ জান্নাতে ফিরবে, পক্ষান্তরে কিছু মানুষ খালি হাতে শূন্য ঘরে ফিরবে। সুতরাং বুদ্ধিমানদের জন্য উচিত হলো এসব থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা। (সায়দুল খাতির;ইবনুল জাওযি, পৃ. ৪৮০-৪৮১, দারুল কলম, দামেস্ক, ১ম সংস্করণ ১৪২৫ হি.)
লেখক : আলোচক, ইকরা টিভি, লন্ডন

এ দিনের রয়েছে করণীয় ও বর্জনীয়

মাওলানা এ এইচ এম আবুল কালাম আযাদ >>
ঈদুল আজহা ত্যাগ ও আনন্দের দিন। ইসলাম আনন্দ-উৎসবের এ দিনকে ইবাদত-বন্দেগি দ্বারা সুসজ্জিত করেছে। এ দিনের রয়েছে করণীয় ও বর্জনীয়।

ঈদুল আজহায় করণীয়

গোসল করা : ঈদের সালাতের আগে গোসল করা সুন্নাত। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ঈদের নামাজে যাওয়ার আগে গোসল করতেন। (মুয়াত্তা ইমাম মালিক)

উত্তম পোশাক পরিধান : ঈদের দিন রাসুল (সা.) ভালো পোশাক পরিধান করতেন। হাদিসে আছে, রাসুল (সা.)-এর লাল ও সবুজ ডোরার একটি চাদর ছিল, তিনি তা দুই ঈদ ও জুমার দিন পরিধান করতেন।

সুগন্ধি ব্যবহার : সুগন্ধি ব্যবহার সুন্নাত। আর ঈদের দিনে রাসুল (সা.) বিশেষভাবে সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। রাসুল (সা.)-এর তিনটি পছন্দনীয় জিনিসের মধ্যে একটি হলো সুগন্ধি। তাই ঈদের দিনের পোশাক পরিধানের পর সুগন্ধি ব্যবহার করা চাই।

ঈদের দিনে খাওয়া : কোরবানির দিনে ঈদের নামাজের আগে কিছু না খাওয়া মুস্তাহাব। নবী করিম (সা.) ঈদুল আজহার দিন কিছুই খেতেন না, যে পর্যন্ত ঈদের নামাজ আদায় করতেন। (তিরমিজি, ইবনে মাজাহ)

ঈদগাহে যাওয়া : ঈদগাহে একপথ দিয়ে যাওয়া ও অন্যপথ দিয়ে ফেরা সুন্নাত। (বুখারি, হাদিস : ৯৮৬) সম্ভব হলে ঈদগাহে পায়ে হেঁটে যাওয়াও সুন্নাত। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১০৭১)

তাকবির পাঠ করা : ঈদের দিন তাকবির পাঠের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলাকে বেশি বেশি স্মরণ করা সুন্নাত। পুরুষরা এ তাকবির উঁচু আওয়াজে পাঠ করবে, মেয়েরা নীরবে। এ তাকবির জিলহজ মাসের ৯ তারিখ থেকে ১৩ তারিখ পর্যন্ত পাঠ করবে। (ফাতহুল বারি : ২/৫৮৯)

ঈদের নামাজ আদায় : ঈদের নামাজ সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। ঈদের নামাজ সব নফল নামাজের মধ্যে ফজিলতপূর্ণ। ঈদের নামাজের আগে ও ফজরের নামাজের পরে কোনো নামাজ নেই। ঈদের নামাজের কোনো আজান ও ইকামত নেই।

শুভেচ্ছা বিনিময় : ঈদের দিনে ছোট-বড় সবার সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করা সুন্নাত। ঈদের দিনে সাহাবায়ে কিরামদের সম্ভাষণ ছিল—‘তাক্বাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকা’।

কোরবানি করা : ঈদুল আজহার দিনে সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব। কোরবানির গোশত নিজে খাবে, নিজের পরিবারবর্গকে খাওয়াবে, আত্মীয়-স্বজনকে হাদিয়া-তোহফা দেবে ও গরিব-মিসকিনকে দান করবে। মুস্তাহাব হলো, কোরবানির গোশত তিন ভাগে ভাগ করা। ১. নিজ পরিবার-পরিজনের জন্য এক ভাগ। ২. আত্মীয়-স্বজনের জন্য এক ভাগ। ৩. দরিদ্রদের জন্য এক ভাগ। আর যদি পরিবারের লোকসংখ্যা বেশি হয়, তাহলে কোরবানির সব গোশত খেলেও অসুবিধা নেই। (শামী ৫/২০৮)

পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা : ঈদুল আজহায় পশুর রক্ত, আবর্জনা ও হাড় থেকে যেন পরিবেশ দূষিত না হয়, সে দিকে প্রত্যেক মুসলমানের সতর্ক হওয়া উচিত। কোরবানি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রক্ত, আবর্জনা ও হাড় নিরাপদ দূরত্বে নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলে দিতে হবে। বেশির ভাগ লোকই নিজস্ব জায়গায় পশু জবাই করে। এতে করে অলিগলিতে বর্জ্য যেমন পড়ে, তেমনি রক্ত পড়ে দূষিত হয় পরিবেশ, চলাচলের অনুপযোগী হয় রাস্তাঘাট। তাই ঈদুল আজহায় পশুর রক্ত, আবর্জনা পরিষ্কারে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবেও উদ্যোগ গ্রহণ করে পরিবেশ দূষণের হাত থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য কাজ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ।

ঈদুল আজহায় বর্জনীয়

ঈদের দিনে রোজা : ঈদের দিনে রোজা রাখা হারাম। ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিনে রোজা রাখতে নিষেধ করেছেন। (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)

ঈদের দিনকে কবর জিয়ারতের জন্য নির্দিষ্ট করা : ঈদের দিনকে কবর জিয়ারতের বিশেষ দিন মনে করে জিয়ারত করা বিদআত (সহিহ ফিকহুস সুন্নাহ : ১/৬৬৯), তবে পূর্বনির্ধারিত রুটিন ছাড়া হঠাৎ সুযোগ হয়ে গেলে একাকী কেউ জিয়ারত করলে দোষণীয় নয়।

ঈদের সালাত আদায় না করে শুধু আনন্দ-ফুর্তি করা : অনেকে ঈদের আনন্দে মশগুল হয়ে নতুন জামা-কাপড় পরিধান, সেমাই, ফিরনি ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, ঈদের সালাত আদায় করার কথা ভুলে যায়। অথচ এই দিনে ঈদের সালাত ও কোরবানি করাই হচ্ছে মুসলমানদের মূল কাজ।

মুসাফাহা-মুআনাকা এ দিনে জরুরি মনে করা : ঈদগাহে বা ঈদের দিন সাক্ষাৎ হলে মুসাফাহা ও মুআনাকা করতেই হবে—এমন বিশ্বাস ও আমল করা বিদআত। তবে এমন বিশ্বাস না করে সালাম ও মুসাফাহার পর মুআনাকা (গলায় গলা মিলানো) করায় কোনো অসুবিধা নেই। কারণ মুসাফাহা ও মুআনাকা করার মাধ্যমে পারস্পরিক সম্পর্ক বৃদ্ধি হয়। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘একদা হাসান ইবনে আলী (রা.) নবী করিম (সা.)-এর কাছে এলেন, তিনি তখন তাঁকে জড়িয়ে ধরেন ও মুআনাকা (কোলাকুলি) করেন। ’

কোরবানির কোনো কিছু বিক্রি করা : কোরবানির গোশত, চামড়া ও এর কোনো অংশ বিক্রি করা যাবে না। অর্থাৎ বিক্রি করে নিজে উপকৃত হওয়া যাবে না। এমনকি কসাইকে পারিশ্রমিকস্বরূপ গোশত দেওয়া নিষিদ্ধ। (বুখারি, হাদিস : ১৭১৭, মুসলিম, হাদিস : ১৩১৭) তবে সাধারণভাবে তাকে খেতে দেওয়ায় অসুবিধা নেই।

গান-বাজনা করা, অশ্লীল সিনেমা ও নাটক দেখা : ঈদের দিন উপলক্ষে যেখানে গান-বাজনা, অবাধে নারী-পুরুষ বিচরণ ইত্যাদির আয়োজন থাকে, এমন মেলা আয়োজন করা, অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা দেওয়া সম্পূর্ণ হারাম। অনুরূপ ঈদ উপলক্ষে বাড়িঘরে গান-বাজনার বিশেষ আয়োজন, নারী-পুরুষের বিশেষ সাক্ষাৎ ও অবাধে যেখানে-সেখানে ঘোরাফেরা অমুসলিমদের কালচার। মুসলিমদের জন্য এগুলো সম্পূর্ণ হারাম। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৪৯, সুরা লুকমান, আয়াত : ৬, ৭)

লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ জাতীয় মুফাসসির পরিষদ, টাঙ্গাইল জেলা।

মহামিলনের মহাসোপান

অধ্যাপক মির্জা মুহম্মদ শহীদুল্লাহ:
হজ ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। অর্থাৎ ইসলামের পাঁচ ফরজের অবিচ্ছেদ্র একটি ফরজ। প্রত্যেক আর্থিক সামর্থ্যবান মুসলিমের জন্য জীবনে একবার হজ ফরজ। আজ ৯ জিলহজ্ব বৃহস্পতিবার পবিত্র হজ দিবসে আরাফার ময়দানে সারা দিনমান অবস্থান কওে হজের অন্যতম ফরজ আমন গ্রহণ করার দিন। এ দিন আরাফাত ময়দানের মসজিদে নামেরা থেকে দুপুরতক খুৎবাই হজ দেয়া হয়। যে কুৎবার পরপরই আজান হবে। এরপর আজানের মাধ্যমে দুবার ইকামতে জোহর এবং আছর নামাজ আদায় করবেন সমবেত আল্লাহর মেহমানগণ। তবে দুই ওয়াক্ত নামাজই হবে কসর অর্থাৎ দুই রাকাত করে।
এই আরাফাত ময়দানে জাতি হিসেবে মুসলমানদেও আদি পিতা হযরত আদাম আলাইহেস সালাম ও আদি মাতা পিতা হযরত হাওয় আলাইহেস সালাম এর দীর্ঘ বিচ্ছিন্ন জীবনের পর পুনরায় এক সাথে হওয়ার স্থান। আর আজ বিশ্ব মুসলিদেও মহামিলনে এই পবিত্র আরাপাতেই হাজির থাকবে প্রায় অর্ধ কোটি মুসলমান।

লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক, লাব্বায়েক লা শারীকা লাকা লাব্বায়েক, ইন্নাল হামদা ওয়া নি’মাতা, লাকা ওয়াল মূলক, লা শারীকা লাকা…। (আমি হাজির হয়েছি, হে আল্লাহ, আমি হাজির হয়েছি, হ্যাঁ আমি হাজির হয়েছি, তোমার কোন শরীক নেই, আমি হাজি হয়েছি, নিশ্চয়ই সকল প্রশংসা এবং নিয়ামত সমূহ তোমারই। আর তোমারই জন্য সকল ক্ষমতা, তোমার কোন অংশীদার নেই)”।’ ধ্বনিতে ধ্বনিতে মুখরিত আরাফাত ময়দান যেন অর্ধকোটি মসিলমানের আলআরহর নৈকট্য লাভের এক মহাসোপান। যেটাকে বলা হয়ে থাকে “… আরাফা।” ফজরের নামাজের পর তকবীর ই তাশরকি এবং তিনবার উচ্চস্বরে তালাবিয়া পাঠ করা হয়। তাশরিক ১৩ই জিলহজ্ব আছরের নামাজ পড়া পর্যন্ত ওয়াজিব।

আরাফাতের কাচাকাছি“জাবলে রহমতে”র কাছে অবস্তান নিতে পারলে ভালো। জোহর এবং আছরের নামাজ মসজিদে নামিরায় এক সঙ্গে আদায় করতে নিদিষ্ট শর্ত অনুযায়ী আদায় করতে পারা উত্তম। তবে জামাতে শরিক হতে না পাড়লেও নিজ নিজ তাবুতে যথা সময়ে নামাজ আদায় করা যায়। উল্লেখ করা যেতে পাওে বাংলাদেশের বেশির ভাগ তাবু সবুজ জিয়ায় নম গাছের মাঝে থাকে। আরাফাতের ময়দানে হাজীরা আল্লাহর যিকির ও তছবীহ তাহলীল থাকেন। এবং আল্লাহর কাছে যা চান তা-ই পান। চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে অসমানের দিকে দু হাত তুলে ফরিয়াদ এবং তা যদি হয় সমষ্টিক ভাবে মোনাজাতে আরো বেশি কার্যকর হয়। এর পর তাবু থেকে বেড়িয়ে খোলা আকাশের দিকে দুহাত তুলে গুনাহ মাফ চাইলে সারা জীবনের গুনাহ মাফ হয়ে যায়।

সারাদিনমান আরাফাতের দিকে কাটিয়ে ঠিক সূর্যাস্তের পরপরই হাজীগণ তালবিয়া পাঠ করতে করতে বা আল্লাহর যিকির মুখে মুখে মুজদালিফার দিকে রওনা হন। এ সময় দ্রুত হাটতে গিয়ে খেয়াল রাখতে হয় যাতে অন্য হাজিরা কষ্ট না পান। আরাফাতের ময়দান থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূওে মোজদালিফায় পৌছে এক আযানে মাগরিব ও এশারের নামাজ আদায় করা হয়। মোজদালিফায় আসার সময় মাঝ পথে মাগরিবের নামাজ পড়া যায়না। এ মোজদালীফায় রসুলে পাকের অনুসরণে সুন্নতে মোয়াককাদা আর আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য খোলা আকাশের নিচে ঘুমিয়ে রাত যাপন করতে হয়। যে ঘুম সম্পর্কে বিভিন্ন রেবায়েত প্রচলিত আছে। যার একটি হ”্ছে শুয়ার সাথে সাথে মরনসম ঘুম হয়। এ মুজদালিফা তেকে পরের দিন জামারায় গিয়ে শয়তানকে মারার জন্য ৭০টি পাথর খুঁজে সংরক্ষিত রাকত হয়।

মোজদালিফায় রাত যাপন শেষে সূর্যদয়ের সামান্য পূর্বে মিনার উদ্দ্যেশ্যে রওনা। এখানে যে কোন স্থানে রাত্রি যাপন করা গেলেও আশ-আব-ই হারাম এ অবস্থান করতে পারা উত্তম। কিন্তু আযাবের স্থান ওযাদিয়ে মুহাসসরে অবস্থান করা যায় না। এ কারনে মুজদালিফা ত্যাগের সময় এ জায়গাটি দ্রুত অতিক্রম করা হয়।

মিনায় পৌছে প্রতমে জামারায়ে আকাবায় ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি ও শাহাদাৎ আঙ্গুলি যোগে সাতটি কংক্রর নিক্ষেপ। এর মাধ্যমে ওয়াজিব আদায় হয়। যেনে রাখা উচিত প্রতিনিধিও কংকর নিক্ষেপ করতে পারে এ ক্ষেত্রে প্রতিনিধি নিজের কংকরগুরেঅ আগে নিক্ষেপ কর্ েএ দিনের তৃতিয কাজ কোরবানি করা। চতুর্থ কাজ হলো কিরান ও তামাতু আদায়কারী হাজীগণ মাথা মুন্ডন করে ইহরামের কাপড় ছেড়ে গোসল শেষে সাধারণ পোষাক পনিরধান করতে পারে। হজের হলক মিনায় করা সুন্নত। মহিলা হাজীগন মাথার চুলের চতুর্থাংশের এক ইন্ঞি পরিমান কেটে নেন। ১১ জিরহজ আবারোজামারায় গিয়ে প্রথমে সুগবা, অত:পর জামারায়ে উসতা এবং সর্বশেষ জামারায়ে আকাবায় সাতটি কওে কংকর নিক্ষেপ কওে তাকেন। ওই রাতে মিনা থেকে মক্কা শরিফে ফিরে শেষ তাওয়াফ কওে থাকেন। অথবা মিনা থেকে ১২ জিলহজ্ব তারিখে ফিরে একই নিয়মে বিদায়ী শেষ ও ফরজ তাওয়াফ কওে থাকেন। যারা ১১ তারিকে মক্কায় আসেন তারা আবার ১২ তারিকে মক্কা শরীফ থেকে খনায়ে কাবার পূর্বদিকের সুরঙ্গ পথ পেরিয়ে ৯ কিলোমিটার দূরুত্ব পায়ে হেটে মিনায় গিয়ে আবারো জামারায় শয়তানদেও পাথর নিক্ষপ করে আসেন। এমনটা আমরা করেছিলাম। এ পতে যেতে আসতে হাজীরা তীব্র গরমের অচেতন হয়ে পড়েন। যা আল্লাহর রহমতের মাধ্যমে তাদেও কবুল কওে নেয়া হয বলে যানা যায়।

মিনায় কোরবানির পর মাথা মুন্ডন কওে ইহরাম ছেড়ে সাধারণ কাপড় পরিধানকে তাহাকুলে আসগর বলে। এ সময় স্ত্রী মিলন ছাড়া সব কিছু হারাম হয়ে যায়। এর পর কাবা শরীফ গিয়ে তাওয়াফে ফরজ বা ফরজ তাওয়াফ করার মধ্য দিয়ে হজের আনুষ্টানিকতা শেষ হয়। দেশে ফিরার পূর্বে হাজীগণ শেষ বাওে মতো বিদায়ী তাওয়াফ কওে থাকেন।

হজে গমনকারী প্রতিজন হাজীসাহেবান যাতে এসব আরকান-আহকাম সুস্ত শরীরে করতে পারেন এ জন্য মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে, সবার কাছে লাখো দোয়ার আবেদন রেখে শেষ করলাম।

 

লেখক: অধ্যাপক মির্জা মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, চেযারম্যান-শিক্ষা গবেষণা কেন্দ্র চট্টগ্রাম ও প্রধান শিক্ষা কর্মকর্তা (অব:)-চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন।

সূত্র- দৈনিক পূর্বদেশ ৩১.৮.২০১৭

“শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করন সময়ের দাবী”

শিক্ষকরাই হচ্ছেন জাতি গড়ার কারিগর। মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষক সমাজ আজ বঞ্চনার শিকার। এমপিওভুক্ত সাড়ে ৫ লাখ শিক্ষক-কর্মচারীদের তাঁদের ন্যায্য পাওনা আদায়ের লক্ষ্যে বারবার রাস্তায় নামতে হচ্ছে বা আন্দোলন করতে হচ্ছে। এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীগণ মূল বেতন স্কেলের সাথে ৫% বার্ষিক প্রবৃদ্ধি সহ সুযোগ-সুবিধার আশ্বাসে টাইমস্কেল বন্ধ করে দেয়া হয়। এখন শিক্ষকরা না পাচ্ছেন ৫% বার্ষিক প্রবৃদ্ধি, না পাচ্ছেন টাইমস্কেল। বাড়িভাতা ১০০০ টাকা, চিকিৎসাভাতা ৫০০ টাকা, উৎসবভাতা সরকারি চাকরিজীবীদের চারভাগের একভাগ।বৈশাখীভাতা প্রদানের আশ্বাস দিলেও শিক্ষকদের রাস্তায় নেমে মানববন্ধন, সভা-সমাবেশ করে ও কোন  সুফল আসেনি , উল্টো গত ১৫ ও ২০ জুন পৃথক দুইটি গেজেটের মাধ্যমেঅবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টেরবিদ্যমান চাঁদার হার ৬% এর পরিবর্তে মূল বেতনের ১০ % উন্নীত করেন,চাঁদার হার বাড়ালেও শিক্ষকদের অবসর সুবিধা থাকবে আগের মতোই। এরপর থেকেই অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে ৫ লাখ শিক্ষক-কর্মচারীর মধ্যে।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, যার প্রতিফলন ঘটে দেশের শীর্ষ স্থানীয় দৈনিক সংবাদ পত্র সমূহে ।অবশেষে গত ২০/০৭/২০১৭ ইং মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় এক বিবৃতির মাধ্যমে অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টে অতিরিক্ত কর্তনের গেজেট অনির্দিষ্ট কালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন ।

উল্লেখ্য, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়েকর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীরা ৫% বার্ষিক প্রবৃদ্ধি, মূল বেতনের ৪৫% বাড়িভাতা, ১৫০০ টাকা চিকিৎসাভাতা, ১০০% উৎসব ভাতা, ২০%  বৈশাখীভাতা ,যাতায়াত ভাতা ,শ্রান্তি বিনোদন ভাতা, ভ্রমনভাতা, স্বল্প সুদে ব্যাংক ঋণ ,আবাসন সুবিধা,পেনশন সহ সরকারের দেয়া সকল সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন।

অথচ এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীরা প্রারম্ভিক বেতনের সাথে বাড়িভাতা ১০০০ টাকা, চিকিৎসাভাতা ৫০০ টাকা, উৎসবভাতা সরকারি চাকরিজীবীদের চারভাগের একভাগ । আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ বিশ্বের অনেক দেশে শিক্ষকদের সর্বোচ্চ সম্মানী প্রদান করা হয়। শিক্ষার যাবতীয় দায়িত্ব রাষ্ট্রের যেখানে সরকারী বেসরকারি বিভাজন নেই।

আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা সরকারি ও বেসরকারি ছাড়া ওবহুধা বিভক্ত। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে স্কুল, কলেজ ও মাদরাসা। পরিসংখ্যান অনুযায়ী সরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার সংখ্যা হচ্ছে মাত্র ২% এবং বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার সংখ্যা হলো ৯৮%। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকগণ শুধুমাত্র মূল বেতন ও নামমাত্র সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন।

২০১০ সালের শিক্ষানীতি অনুযায়ী শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন স্কেল প্রদানের অঙ্গীকার রয়েছে। যা আজও আলোর মুখ দেখেনি। উল্লেখ্য, সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একই সিলেবাস ও একই যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকরা শিক্ষা দিয়ে থাকেন। সঙ্গত কারণে কেন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা আজ এই বৈষম্যের শিকার? কেন শিক্ষকগণ তাঁদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত? মূল বেতন স্কেল প্রদান করা স্বত্ত্বেও কেন তাঁরা আনুসাঙ্গিক সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত? কেন বেসরকারি শিক্ষকরা বৈশাখীভাতা, পূর্ণাঙ্গ বাড়িভাতা, পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাভাতা, পূর্ণাঙ্গ উৎসবভাতা ও বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট থেকে বঞ্চিত? কেন বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহকেজাতীয়করণ করা হচ্ছে না? কেন আংশিকভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা হচ্ছে? কেন বেসরকারি শিক্ষকদের অবহেলায় চোখে দেখা হচ্ছে? দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৈশাখীভাতা, ইনক্রিমেন্ট এবং পূর্ণাঙ্গ উৎসব বোনাস, বাড়িভাতা ও চিকিৎসাভাতাসহ বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজ জাতীয়করণের দাবিতে মানববন্ধন, মিছিল, সভা-সমাবেশ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্ঠি আকর্ষণের চেষ্টা করাহয়েছে। জাতির জনকের কন্যা জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকট এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ন্যায্য দাবির যৌক্তিকতা তুলে ধরতে পারলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বেসরকারি শিক্ষকদের চাকুরী জাতীয়করণের ঘোষণা দিয়ে সরকারী বেসরকারি বৈষম্য দূরীকরণে সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন ।

যেমনি ভাবে১৯৭২-৭৩সালেজাতিরপিতাবঙ্গবন্ধুশেখমুজিবুররহমানসদ্যস্বাধীনদেশের৩৬,০০০এরঅধিকসংখ্যকপ্রাথমিকবিদ্যালয়জাতীয়করনকরেবাঙ্গালীজাতিরভবিষ্যৎপ্রজন্মেরশিক্ষারভিত্তিপ্রস্তরস্থাপনকরেনবদিগন্তেরসূচনাকরছিলেন।একবিংশশতাব্দীরবাঙ্গালীজাতিরআইকনমাননীয়প্রধানমন্ত্রীশেখহাসিনা২০১৪সালে২৬০০০এরঅধিকসংখ্যকরেজিস্টার্ডপ্রাথমিকবিদ্যালয়জাতীয়করনকরেপ্রাথমিকশিক্ষাকেপূর্ণতাদানকরেছিলেন।সেইদিনআরবেশীদুরেনয়, যেদিনবঙ্গবন্ধুকন্যাসমগ্রশিক্ষাব্যবস্থাজাতীয়করনকরেএদেশকেমধ্যমআয়েরদেশহিসেবেউন্নতদেশগুলোরকাতারেপৌছেঁ দেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রনী ভুমিকা পালন করবেন ।তাই এদেশের পাঁচ লক্ষাধিক বেসরকারি শিক্ষকদের বিশ্বাস, যদি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে শিক্ষক নেতৃবৃন্দ বোঝাতে সক্ষম হন তাহলে প্রধানমন্ত্রী বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ ও মাদরাসাকে জাতীয়করণ করে ইতিহাসের পাতায় চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহ

বিগত ৩০ নভেম্বর ২০১৫ইং সোমবার সাবেক শিক্ষা সচিব মো. নজরুল ইসলাম খানমাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাতে গেলে বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা জাতীয়করণে সরকারের ব্যয় কত হবে ? সরকারি সুযোগ-সুবিধার বাইরে মোট কতটি প্রতিষ্ঠান রয়েছেতা জানতেচেয়েছিলেন? প্রধানমন্ত্রী জানতে চান, দেশের সব স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা জাতীয়করণে সরকারের অতিরিক্ত কত খরচ হতে পারে, মোট কয়টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে? প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নের জবাবে সাবেক শিক্ষা সচিব মো. নজরুল ইসলাম খানজানিয়েছিলেন, সারাদেশে প্রায় ৩০ হাজারের মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের বাইরে রয়েছে। এগুলো জাতীয়করণ করতে সরকারের প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা খরচ হবে। সব শুনে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ঠিক আছে, জাতীয়করণের লক্ষ্যে কাজ শুরু করতে হবে। শিক্ষক ও শিক্ষার মানোন্নয়নে কষ্ট করে হলেও এ টাকা খরচ করতে হবে।

পরিশেষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এদেশের পাঁচ লক্ষাধিক বেসরকারি শিক্ষকদের পক্ষ থেকে আপনার প্রতি নিবেদনসরকারী বেসরকারি বিভাজন আর নয়,এখনই সময় বৈষম্য দূর করে শিক্ষা ব্যবস্থায় সমতা ফিরিয়ে আনা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর পদাঙ্ক অনুসরণ করে জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করন করে সময়ের দাবী পূরনের মাধ্যমেবঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণ নিশ্চিত করুন ।

লেখক:

 

 

কাপ্তাই হ্রদে কার্পজাতীয় মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন

মো. আবুল বাশার::কাপ্তাই হ্রদটি দেশের অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত জলাশয়ের মধ্যে সর্ববৃহত্ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কৃত্রিমভাবে তৈরি হ্রদসমূহের মধ্যে অন্যতম।  মোট ৬৮ হাজার ৮০০ হেক্টর আয়তনের এ হ্রদটি মূলত জলবিদ্যুত্ উত্পাদনের জন্য তৈরি হলেও মত্স্য উত্পাদনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। কাপ্তাই হ্রদ দেশীয় মত্স্য প্রজাতির এক বৈচিত্র্যময় ও সমৃদ্ধ জলভাণ্ডার। বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ অন্যান্য গবেষণার সর্বশেষ রেকর্ড অনুযায়ী, এ হ্রদে মোট ৭৫ প্রজাতির মিঠা পানির মাছ রয়েছে। তার মধ্যে ৬৭টি দেশীয় প্রজাতির মাছ, আর বাকী ৮টি বিদেশি প্রজাতির মাছ। বিগত ৪ দশকে হ্রদে মত্স্য আহরণ বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে উত্সাহব্যঞ্জক। তবে আশঙ্কাজনক দিক হচ্ছে, মূূল্যবান কার্পজাতীয় মাছের ক্রমবনতি। ১৯৬৫-৬৬ সালে রুই, কাতল, মৃগেল ও কালিবাউস সহ সামগ্রিকভাবে মেজর কার্প ছিল মোট মত্স্য সম্পদের প্রায় ৮১.৩৫%; যা ক্রমশ হ্রাস পেয়ে ২০১৫-১৬ সালে ৪-৫% এর নিচে নেমে এসেছে। অন্যদিকে ছোট মাছ বিশেষ করে চাপিলা, কেচকি, মলা ইত্যাদির পরিমাণ ৩-৪% (১৯৬৫-৬৬ ) থেকে বেড়ে ২০১৫-২০১৬ সালে প্রায় ৮৫% এর কাছাকাছি পৌঁছেছে।

 

কার্পজাতীয় মাছের আশঙ্কাজনক অধঃগতি অবশ্যই ভাবার বিষয়। এ প্রেক্ষিতে ইনস্টিটিউট ২০১৫ সাল থেকে একটি গবেষণা প্রকল্পের মাধ্যমে হ্রদে কার্পজাতীয় মাছের উত্পাদন হ্রাস পাওয়ার কারণ অনুসন্ধানের কাজ করে যাচ্ছে। ফলে ২০১৬ সালে হ্রদের কাসালং চ্যানেল থেকে সীমিত আকারে কার্পের নিষিক্ত ডিম সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু প্রথমবার ডিম ফোটানোর ভালো ব্যবস্থা না থাকায় ডিমগুলো কোন মাছের তা শনাক্ত করতে পারা যায়নি। পরবর্তী সময়ে অর্থাত্ ২০১৭ সালে ডিম ফোটানোর সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করা হয় এবং এতে ব্যাপক সফলতা আসে। প্রায় ১ মাস ৭ দিন পর আমরা  রুই, কাতলা, মৃগেল, কালিবাউস মাছের আঙ্গুলি পোনা নিশ্চিত করি।

 

চলতি বছরের ২ ও ৩ জুন কাসালং চ্যানেলের ফরেস্ট ঘাটসংলগ্ন মাস্তানের টিলা নামক স্থান থেকে কার্পজাতীয় মাছের প্রাকৃতিক প্রজননকৃত ডিম সংগ্রহ করা হয়। এ বছর আমরা প্রায় ৫ কেজি কার্প জাতীয় মাছের নিষিক্ত ডিম সংগ্রহ করি। সংগ্রহকৃত ডিম থেকে লংগদু উপজেলার মারিশ্যার চরে অবস্থিত বাংলাদেশ মত্স্য উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি) এর হ্যাচারীতে রেনু ফোটানো হয়। পরে রেনুগুলো পিটে (মাটির তৈরি গর্ত) ১ মাস ৭ দিন লালন-পালন করে আঙ্গুলি পোনা তৈরি করা হয়। উত্পাদিত পোনার মধ্যে রুই, কাতলা, মৃগেল এবং কালিবাউসের পোনা শনাক্ত করা হয়। এর ফলে  কাপ্তাই হ্রদে রুই, কাতলা, মৃগেল, কালিবাউস মাছের প্রকৃতিক প্রজনন নিশ্চিত হয়।

 

 এই সাফল্যে অন্যতম কারণ প্রজনন মৌসুমের পূর্বে জাঁক (মাছ ধরার ফাঁদ) অপসারণের ফলে কাপ্তাই হ্রদে কার্পজাতীয় মা মাছ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সঠিক সময়ে অর্থাত্ ১ মে হ্রদ থেকে সকল প্রকার মাছ ধরার উপর জেলা প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার ফলে ডিমওয়ালা মা মাছগুলো কম ধরা পড়েছে যা পরে প্রাকৃতিক প্রজননে অংশগ্রহণের ফলে প্রচুর পরিমাণে ডিম পাওয়া গেছে।

 

জাঁক অপসারণ, মা মাছ রক্ষা এবং লেকে অভায়শ্রমের কার্যকারিতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্রগুলো পুনঃখননের মাধ্যমে এলাকাগুলোকে অভয়াশ্রম ঘোষণা করে যথাযথ ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে পারলে হ্রদে কার্পজাতীয় মাছের মজুদ বৃদ্ধি পাবে।

 

n লেখক: উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউট।

হিমু আমার প্রেম

ইয়াসিন হাসান:

ক্লাস সিক্স কিংবা সেভেনে স্কুলে নতুন ছাত্রের আগমন হলো। মাঝারি মানের ছাত্র ছিলাম বলে আমার রোল নাম্বার সব সময়ই মাঝের সারিতেই থাকত। স্কাউটিং করতাম বলে যদিও আমার পরিচিতি সে তুলনায় বেশি ছিল। ক্লাস টিচার নতুন ছাত্রকে সবার আগে পরিচয় করিয়ে দিলেন আমার সঙ্গে। সেই থেকে আজও আমরা একসঙ্গে। কলেজ, ভার্সিটিতে একসঙ্গে পড়ার সুযোগ না হলেও আমাদের বন্ধুত্বে ফাটল ধরেনি। অনেকটাই আত্মার সঙ্গে মিশে আছি দুজন। আশা করছি বাকিটা পথ এভাবেই থাকবো।

তবে দুজনের বন্ধুত্ব শুরু হয়েছিল অসাধারণ এক ঘটনায়। সে কারণে আমার সারাজীবন মনে থাকবে ওকে। আমার তেমন বই পড়ার অভ্যাস ছিল না। ক্রিকেট মাঠ, বন্ধু-বান্ধবের আড্ডা ছিল আমার সবচেয়ে পছন্দের জায়গা। ক্রিকেট নিয়ে সারাদিন পড়ে থাকতাম। কে কোন রেকর্ড করত, কে কয়টি ছক্কা মারত, সেগুলো আমি স্কুলে সবার সঙ্গে আলোচনা করতাম। কিন্তু ওই বন্ধু ছিল আমার উল্টো। একদিনের আড্ডায় আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, হুমায়ূন আহমেদকে চিনিস?

আমার স্পষ্ট মনে আছে আমি ওকে উত্তর দিয়েছিলাম, না। কোন দেশের প্লেয়ার? নাম তো বাংলাদেশি মনে হচ্ছে। কোন ক্লাবের? বল না।

সবার সামনে আমাকে কড়া ভাষায় অপমান করে সে বলেছিল, বেটা কোনো দেশের প্লেয়ার না। লেখক হুমায়ূন আহমেদ।

আমি তখন গুরুত্ব না দিয়ে বলেছিলাম, ধুর বেটা! সিরিয়াস আড্ডায় এগুলো কি বলিস। অন্য কথা বল। কোথাকার কে!

বন্ধু আমার কথায় সেদিন খুব অপমানিত হয়েছিল। আড্ডা ছেড়ে নিজের সিটে গিয়ে বসে ছিল। বুঝতে পারছিলাম, ও হয়ত রাগ করেছে। হুয়ামূন আহমেদ হয়ত ওদের কোনো আত্মীয়। এভাবে বলা আমার উচিত হয়নি। স্কুল শেষে বাড়ি ফেরার পথে ‘সরি’ বলে জানতে চাইলাম, ‘কিরে, হুমায়ূন আহমেদ তোর কি হয়?

ও বলেছিল, আমার কিছু হয় না। আমি তার লেখা পড়ি। বাবা সব সময় তার বই কিনে পড়ে। আমিও পড়ি মাঝে মাঝে। অনেক সময় তার লেখা বুঝি না। কিন্তু খুব ভালো লাগে পড়তে।

বন্ধুর কথা শুনে আমারও আগ্রহ হলো। ওকে বললাম, আচ্ছা, আঙ্কেল আর তোর পড়া হলে যেকোনো একটা বই আমাকে দিস তো। পরের সপ্তাহে আমার জন্য হিমু বইটি নিয়ে এসেছিল ও। হুমায়ূনপ্রেমীদের জন্য হিমু বিশেষ কিছু। অসাধারণ একটি উপন্যাস। আমি তখন উপন্যাস কি বুঝতাম না। আমার মনে নেই আমি হিমু বইটি পড়ে কি বুঝেছিলাম! কিন্তু সত্যি কথা সেদিন থেকে হিমুর প্রেমে পড়েছিলাম। সেই থেকে হিমু আমার প্রেম। হুমায়ূন আহমেদ স্যারের অন্যান্য লেখার ওপর আমার ততটা আগ্রহ নেই, যতটা না হিমুকে নিয়ে আছে। যতটুকু আমি জানি হিমুকে নিয়ে স্যার বই লিখেছেন ২৫টি। যার প্রতিটি আমার একবার হলেও পড়া হয়েছে। হিমুকে নিয়ে স্যারের প্রথম উপন্যাস ‘ময়ুরাক্ষি’। শেষ উপন্যাস ‘হিমু এবং হার্ভার্ড Ph.D. বল্টু ভাই’ যেটি স্যার নিউইয়র্কে বসে লিখেছিলেন ২০১১ সালে। হিমু চরিত্রটি স্যারের কাল্পনিক চরিত্র হলেও স্যার সব সময় নিজেকে হিমু মনে করতেন বলেই আমার মনে হয়েছে।

হিমু বইটিতে স্যার লিখেছিলেন: ‘হিমু আমার প্রিয় চরিত্রের একটি। যখন হিমুকে নিয়ে কিছু লিখি- নিজেকে হিমু মনে হয়, এক ধরনের ঘোর অনুভব করি। এই ব্যাপারটা অন্য কোনো লেখার সময় তেমন করে ঘটে না। হিমুকে নিয়ে আমার প্রথম লেখা ময়ূরাক্ষি। ময়ূরাক্ষি লেখার সময় ব্যাপারটা প্রথম লক্ষ করি। দ্বিতীয়বার লিখলাম দরজার ওপাশে। তখনো একই ব্যাপার। কেন এরকম হয়? মানুষ হিসেবে আমি যুক্তিবাদী। হিমুর যুক্তিহীন, রহস্যময় জগৎ একজন যুক্তিবাদীকে কেন আকর্ষণ করবে? আমার জানা নেই। যদি কখনো জানতে পারি- পাঠকদের জানাব।’

এরপর স্যার হিমু চরিত্রকে বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন উপন্যাসে তুলে এনেছেন। স্যারের অনবদ্য সৃষ্টিতে পাঠক বিমোহিত হয়েছে বারবার। নিজেকে হিমু ভাবতে শুরু করেছে অনেকেই। হলুদ পাঞ্জাবি মানেই হিমু। রাতের বেলায় খালি পায়ে ঘুরে বেরানো মানেই হিমু। বেকার থেকেও মানুষের কল্যাণে কাজ করা মানেই হিমু। বড় ডিগ্রি না থাকলেও সাধারণ জ্ঞান দিয়ে মানুষকে ভালো পরামর্শ দেয়া মানেই হিমু। লোভ, লালসা, ঈর্ষা, অকুতোভয় মানেই হিমু। বুদ্ধিমান ও রসবোধসম্পন্ন ব্যক্তি মানেই হিমু। সব মিলিয়ে হিমু এমন এক চরিত্র যার প্রেমে পড়তে কোনো বাঁধা নেই, নেই কোনো বয়স।

স্যার আজ নেই। হিমু চরিত্র নিয়ে নতুন কোনো উপন্যাস তৈরি হবে না। কিন্তু স্যার হিমুকে অমরত্বের স্বীকৃতি দিয়ে গেছেন। আজ আমার মনে পড়ছে সেই বন্ধুকে যে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল হিমুর সঙ্গে। নইলে আমি অনেকটা পথ পিছিয়ে থাকতাম।

 

জরুরি মিটিংয়ে আছি, বাবার লাশ আঞ্জুমানে দেন

বাবা কোটিপতি। সন্তানদেরও করেছেন প্রতিষ্ঠিত। লিখে দিয়েছেন তাদের নামে ফ্ল্যাট-বাড়ি। তারপর… একটা সময় বুঝতে পারেন বাবা, সন্তানদের ঘরে তিনি ‘জঞ্জাল’হয়ে উঠছেন। একটা সময় সন্তানরাই তাকে বাসা থেকে তাড়িয়ে দেন। এক পর্যায়ে ধুঁকে ধুঁকে সেই বাবা মারা যান। লাশ নেয়ার জন্য সন্তানকে খবর দিলে ‘জরুরি মিটিংয়ে আছেন’ জানিয়ে লাশটি আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামে দিয়ে দিতে বলেন।

আমাদের দেশে ঘটে চলা অসংখ্য ঘটনার মধ্যে একটি সত্য গল্প সবার সঙ্গে শেয়ার করেছেন রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাহেদ। সোমবার রাত ১০টায় তিনি তার ফেসবুকে লেখেন- `একটি সত্য ঘটনা, সবাইকে পড়ার অনুরোধ রইলো`।

মোহাম্মদ সাহেদের সেই স্ট্যাটাসটি পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো-

‘লোকটির নাম হামিদ সরকার। তিনি সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। গ্রামের বাড়ি জামালপুরে। আমার সাথে তার পরিচয় সূত্রটা পরেই বলছি।

আমি যখন উত্তরায় রিজেন্ট হাসপাতালের প্রথম শাখা উদ্বোধন করি, তখন উত্তরা পশ্চিম থানার তৎকালীন ওসি এবং মসজিদের ইমাম সাহেব আমার কাছে আসেন। তারা বললেন যে, একজন লোক অনেকদিন ধরে মসজিদের বাইরে পড়ে আছে। অনেকে ভিক্ষুক ভেবে তাকে দু-চার টাকা ভিক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন।

ইমাম সাহেব তার জন্য প্রেরিত খাবার থেকে কিছু অংশ লোকটিকে দিয়ে আসছেন প্রতিদিন। হঠাৎ লোকটি অসুস্থ হয়ে পড়ায় তারা আমার সরনাপন্ন হয়েছেন। এমতাবস্থায় আমি লোকটিকে আমার হাসপাতালে নিয়ে এসে চিকিৎসার ব্যবস্থা করি এবং দায়িত্বরত ডাক্তার ও অন্যান্য সকল কর্মকর্তা/কর্মচারীকে অবগত করি যে, এই লোকটির চিকিৎসার সকল দায়ভার আমার ও এর চিকিৎসায় যেন কোন ত্রুটি না হয়।

হামিদ সরকার নামক লোকটির সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে আমি রীতিমত অবাক হলাম। তিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত জোনাল সেটেলম্যান্ট অফিসার। তার তিন ছেলের মধ্যে তিন জনই বিত্তশালী। উত্তরা তিন নম্বর সেক্টরে তার নিজস্ব বাড়ি আছে যা ছেলেদের নামে দিয়েছেন। তার বড় ছেলে ডাক্তার। নিজস্ব ফ্ল্যাটে স্ত্রী, শালী এবং শ্বাশুড়ী নিয়ে থাকেন, অথচ বৃদ্ধ বাবার জায়গা নেই।

মেঝ ছেলে ব্যবসায়ী, তারও নিজস্ব বিশাল ফ্ল্যাট আছে। যেখানে প্রায়ই বাইরের ব্যবসায়ীক অতিথীদের নিয়ে পার্টি হয়। অথচ বাবা না খেয়ে রাস্তায় পড়ে থাকে। ছোট ছেলেও অবস্থাসম্পন্ন। কিন্তু স্ত্রীর সন্তুষ্টির জন্য বাবাকে নিজের ফ্ল্যাটে রাখতে পারে না। সকল সন্তান স্বাবলম্বী হওয়া স্বত্তেও বাবার স্থান হয়েছে শেষে মসজিদের বারান্দায়। সেখান থেকে আমার হাসপাতালে।

প্রসঙ্গত, আমার হাসপাতালে আগত রোগীর ক্ষেত্রে রক্তের প্রয়োজন হলে আমি রক্ত দেবার চেষ্টা করি। সেদিনও হামিদ সরকার নামক অসুস্থ লোকটিকে আমি রক্ত দিয়েছিলাম। অবাক করা বিষয় হলো, তিনি দিন ১৫ আমার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন, অথচ কোন একটা ছেলে পনের মিনিটের জন্যও তার খোঁজ নেয়নি।

আরও দুঃখজনক হলো, সর্বোচ্চ চেষ্টার পরেও পনের দিন পরে আরো একটা কার্ডিয়াক অ্যাটাকে হামিদ সাহেব মারা যান। তার মৃত্যুর পরে আমি তার বড় ছেলেকে ফোন করি। তিনি আমাকে প্রতি উত্তরে জানান যে, তিনি জরুরী মিটিংয়ে আছেন এবং লাশটি যেন আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম এ দিয়ে দেওয়া হয়। পরে কোন আত্মীয় স্বজনের কাছ থেকে সাড়া না পেয়ে আমি নিজ উদ্যোগে স্থানীয়ভাবে তার লাশ যথাযথ মর্যাদায় দাফন করি।

লেখাটি আমি কোন প্রকার বাহবা নেওয়ার জন্য লিখিনি। আজ আমি নিজেও একজন বাবা। সন্তানের একটু সুখের জন্য দিনরাত একাকার করছি। সেই সন্তান যদি কোনদিন এধরনের আচরন করে তখন আমার কেমন লাগবে, শুধু এই অনুভূতি থেকে লেখা।

আমার মনে একটা প্রশ্ন, আমরা যারা বাবা-মাকে অসম্মান, অবহেলা করি তারা কি একবারও ভেবে দেখি না যে, একদিন ওই জায়গাটাতে আমরা নিজেরা গিয়ে দাঁড়াব।

আজ আমি আমার বাবা-মায়ের সাথে যে আচরণ করছি, তা যদি সেদিন আমার সন্তান আমার সাথে করে তবে? আজ আমাদের বাবা-মায়েরা সহ্য করছে। কাল আমরা কি সহ্য করতে পারব?’

Scroll To Top