শিরোনাম
You are here: প্রচ্ছদ / নির্বাচিত খবর/ লেখা

বিভাগ: নির্বাচিত খবর/ লেখা

Feed Subscription

“শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করন সময়ের দাবী”

শিক্ষকরাই হচ্ছেন জাতি গড়ার কারিগর। মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষক সমাজ আজ বঞ্চনার শিকার। এমপিওভুক্ত সাড়ে ৫ লাখ শিক্ষক-কর্মচারীদের তাঁদের ন্যায্য পাওনা আদায়ের লক্ষ্যে বারবার রাস্তায় নামতে হচ্ছে বা আন্দোলন করতে হচ্ছে। এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীগণ মূল বেতন স্কেলের সাথে ৫% বার্ষিক প্রবৃদ্ধি সহ সুযোগ-সুবিধার আশ্বাসে টাইমস্কেল বন্ধ করে দেয়া হয়। এখন শিক্ষকরা না পাচ্ছেন ৫% বার্ষিক প্রবৃদ্ধি, না পাচ্ছেন টাইমস্কেল। বাড়িভাতা ১০০০ টাকা, চিকিৎসাভাতা ৫০০ টাকা, উৎসবভাতা সরকারি চাকরিজীবীদের চারভাগের একভাগ।বৈশাখীভাতা প্রদানের আশ্বাস দিলেও শিক্ষকদের রাস্তায় নেমে মানববন্ধন, সভা-সমাবেশ করে ও কোন  সুফল আসেনি , উল্টো গত ১৫ ও ২০ জুন পৃথক দুইটি গেজেটের মাধ্যমেঅবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টেরবিদ্যমান চাঁদার হার ৬% এর পরিবর্তে মূল বেতনের ১০ % উন্নীত করেন,চাঁদার হার বাড়ালেও শিক্ষকদের অবসর সুবিধা থাকবে আগের মতোই। এরপর থেকেই অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে ৫ লাখ শিক্ষক-কর্মচারীর মধ্যে।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, যার প্রতিফলন ঘটে দেশের শীর্ষ স্থানীয় দৈনিক সংবাদ পত্র সমূহে ।অবশেষে গত ২০/০৭/২০১৭ ইং মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় এক বিবৃতির মাধ্যমে অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টে অতিরিক্ত কর্তনের গেজেট অনির্দিষ্ট কালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন ।

উল্লেখ্য, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়েকর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীরা ৫% বার্ষিক প্রবৃদ্ধি, মূল বেতনের ৪৫% বাড়িভাতা, ১৫০০ টাকা চিকিৎসাভাতা, ১০০% উৎসব ভাতা, ২০%  বৈশাখীভাতা ,যাতায়াত ভাতা ,শ্রান্তি বিনোদন ভাতা, ভ্রমনভাতা, স্বল্প সুদে ব্যাংক ঋণ ,আবাসন সুবিধা,পেনশন সহ সরকারের দেয়া সকল সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন।

অথচ এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীরা প্রারম্ভিক বেতনের সাথে বাড়িভাতা ১০০০ টাকা, চিকিৎসাভাতা ৫০০ টাকা, উৎসবভাতা সরকারি চাকরিজীবীদের চারভাগের একভাগ । আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ বিশ্বের অনেক দেশে শিক্ষকদের সর্বোচ্চ সম্মানী প্রদান করা হয়। শিক্ষার যাবতীয় দায়িত্ব রাষ্ট্রের যেখানে সরকারী বেসরকারি বিভাজন নেই।

আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা সরকারি ও বেসরকারি ছাড়া ওবহুধা বিভক্ত। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে স্কুল, কলেজ ও মাদরাসা। পরিসংখ্যান অনুযায়ী সরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার সংখ্যা হচ্ছে মাত্র ২% এবং বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার সংখ্যা হলো ৯৮%। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকগণ শুধুমাত্র মূল বেতন ও নামমাত্র সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন।

২০১০ সালের শিক্ষানীতি অনুযায়ী শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন স্কেল প্রদানের অঙ্গীকার রয়েছে। যা আজও আলোর মুখ দেখেনি। উল্লেখ্য, সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একই সিলেবাস ও একই যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকরা শিক্ষা দিয়ে থাকেন। সঙ্গত কারণে কেন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা আজ এই বৈষম্যের শিকার? কেন শিক্ষকগণ তাঁদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত? মূল বেতন স্কেল প্রদান করা স্বত্ত্বেও কেন তাঁরা আনুসাঙ্গিক সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত? কেন বেসরকারি শিক্ষকরা বৈশাখীভাতা, পূর্ণাঙ্গ বাড়িভাতা, পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাভাতা, পূর্ণাঙ্গ উৎসবভাতা ও বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট থেকে বঞ্চিত? কেন বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহকেজাতীয়করণ করা হচ্ছে না? কেন আংশিকভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা হচ্ছে? কেন বেসরকারি শিক্ষকদের অবহেলায় চোখে দেখা হচ্ছে? দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৈশাখীভাতা, ইনক্রিমেন্ট এবং পূর্ণাঙ্গ উৎসব বোনাস, বাড়িভাতা ও চিকিৎসাভাতাসহ বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজ জাতীয়করণের দাবিতে মানববন্ধন, মিছিল, সভা-সমাবেশ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্ঠি আকর্ষণের চেষ্টা করাহয়েছে। জাতির জনকের কন্যা জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকট এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ন্যায্য দাবির যৌক্তিকতা তুলে ধরতে পারলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বেসরকারি শিক্ষকদের চাকুরী জাতীয়করণের ঘোষণা দিয়ে সরকারী বেসরকারি বৈষম্য দূরীকরণে সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন ।

যেমনি ভাবে১৯৭২-৭৩সালেজাতিরপিতাবঙ্গবন্ধুশেখমুজিবুররহমানসদ্যস্বাধীনদেশের৩৬,০০০এরঅধিকসংখ্যকপ্রাথমিকবিদ্যালয়জাতীয়করনকরেবাঙ্গালীজাতিরভবিষ্যৎপ্রজন্মেরশিক্ষারভিত্তিপ্রস্তরস্থাপনকরেনবদিগন্তেরসূচনাকরছিলেন।একবিংশশতাব্দীরবাঙ্গালীজাতিরআইকনমাননীয়প্রধানমন্ত্রীশেখহাসিনা২০১৪সালে২৬০০০এরঅধিকসংখ্যকরেজিস্টার্ডপ্রাথমিকবিদ্যালয়জাতীয়করনকরেপ্রাথমিকশিক্ষাকেপূর্ণতাদানকরেছিলেন।সেইদিনআরবেশীদুরেনয়, যেদিনবঙ্গবন্ধুকন্যাসমগ্রশিক্ষাব্যবস্থাজাতীয়করনকরেএদেশকেমধ্যমআয়েরদেশহিসেবেউন্নতদেশগুলোরকাতারেপৌছেঁ দেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রনী ভুমিকা পালন করবেন ।তাই এদেশের পাঁচ লক্ষাধিক বেসরকারি শিক্ষকদের বিশ্বাস, যদি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে শিক্ষক নেতৃবৃন্দ বোঝাতে সক্ষম হন তাহলে প্রধানমন্ত্রী বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ ও মাদরাসাকে জাতীয়করণ করে ইতিহাসের পাতায় চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহ

বিগত ৩০ নভেম্বর ২০১৫ইং সোমবার সাবেক শিক্ষা সচিব মো. নজরুল ইসলাম খানমাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাতে গেলে বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা জাতীয়করণে সরকারের ব্যয় কত হবে ? সরকারি সুযোগ-সুবিধার বাইরে মোট কতটি প্রতিষ্ঠান রয়েছেতা জানতেচেয়েছিলেন? প্রধানমন্ত্রী জানতে চান, দেশের সব স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা জাতীয়করণে সরকারের অতিরিক্ত কত খরচ হতে পারে, মোট কয়টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে? প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নের জবাবে সাবেক শিক্ষা সচিব মো. নজরুল ইসলাম খানজানিয়েছিলেন, সারাদেশে প্রায় ৩০ হাজারের মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের বাইরে রয়েছে। এগুলো জাতীয়করণ করতে সরকারের প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা খরচ হবে। সব শুনে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ঠিক আছে, জাতীয়করণের লক্ষ্যে কাজ শুরু করতে হবে। শিক্ষক ও শিক্ষার মানোন্নয়নে কষ্ট করে হলেও এ টাকা খরচ করতে হবে।

পরিশেষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এদেশের পাঁচ লক্ষাধিক বেসরকারি শিক্ষকদের পক্ষ থেকে আপনার প্রতি নিবেদনসরকারী বেসরকারি বিভাজন আর নয়,এখনই সময় বৈষম্য দূর করে শিক্ষা ব্যবস্থায় সমতা ফিরিয়ে আনা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর পদাঙ্ক অনুসরণ করে জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করন করে সময়ের দাবী পূরনের মাধ্যমেবঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণ নিশ্চিত করুন ।

লেখক:

 

 

কাপ্তাই হ্রদে কার্পজাতীয় মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন

মো. আবুল বাশার::কাপ্তাই হ্রদটি দেশের অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত জলাশয়ের মধ্যে সর্ববৃহত্ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কৃত্রিমভাবে তৈরি হ্রদসমূহের মধ্যে অন্যতম।  মোট ৬৮ হাজার ৮০০ হেক্টর আয়তনের এ হ্রদটি মূলত জলবিদ্যুত্ উত্পাদনের জন্য তৈরি হলেও মত্স্য উত্পাদনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। কাপ্তাই হ্রদ দেশীয় মত্স্য প্রজাতির এক বৈচিত্র্যময় ও সমৃদ্ধ জলভাণ্ডার। বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ অন্যান্য গবেষণার সর্বশেষ রেকর্ড অনুযায়ী, এ হ্রদে মোট ৭৫ প্রজাতির মিঠা পানির মাছ রয়েছে। তার মধ্যে ৬৭টি দেশীয় প্রজাতির মাছ, আর বাকী ৮টি বিদেশি প্রজাতির মাছ। বিগত ৪ দশকে হ্রদে মত্স্য আহরণ বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে উত্সাহব্যঞ্জক। তবে আশঙ্কাজনক দিক হচ্ছে, মূূল্যবান কার্পজাতীয় মাছের ক্রমবনতি। ১৯৬৫-৬৬ সালে রুই, কাতল, মৃগেল ও কালিবাউস সহ সামগ্রিকভাবে মেজর কার্প ছিল মোট মত্স্য সম্পদের প্রায় ৮১.৩৫%; যা ক্রমশ হ্রাস পেয়ে ২০১৫-১৬ সালে ৪-৫% এর নিচে নেমে এসেছে। অন্যদিকে ছোট মাছ বিশেষ করে চাপিলা, কেচকি, মলা ইত্যাদির পরিমাণ ৩-৪% (১৯৬৫-৬৬ ) থেকে বেড়ে ২০১৫-২০১৬ সালে প্রায় ৮৫% এর কাছাকাছি পৌঁছেছে।

 

কার্পজাতীয় মাছের আশঙ্কাজনক অধঃগতি অবশ্যই ভাবার বিষয়। এ প্রেক্ষিতে ইনস্টিটিউট ২০১৫ সাল থেকে একটি গবেষণা প্রকল্পের মাধ্যমে হ্রদে কার্পজাতীয় মাছের উত্পাদন হ্রাস পাওয়ার কারণ অনুসন্ধানের কাজ করে যাচ্ছে। ফলে ২০১৬ সালে হ্রদের কাসালং চ্যানেল থেকে সীমিত আকারে কার্পের নিষিক্ত ডিম সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু প্রথমবার ডিম ফোটানোর ভালো ব্যবস্থা না থাকায় ডিমগুলো কোন মাছের তা শনাক্ত করতে পারা যায়নি। পরবর্তী সময়ে অর্থাত্ ২০১৭ সালে ডিম ফোটানোর সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করা হয় এবং এতে ব্যাপক সফলতা আসে। প্রায় ১ মাস ৭ দিন পর আমরা  রুই, কাতলা, মৃগেল, কালিবাউস মাছের আঙ্গুলি পোনা নিশ্চিত করি।

 

চলতি বছরের ২ ও ৩ জুন কাসালং চ্যানেলের ফরেস্ট ঘাটসংলগ্ন মাস্তানের টিলা নামক স্থান থেকে কার্পজাতীয় মাছের প্রাকৃতিক প্রজননকৃত ডিম সংগ্রহ করা হয়। এ বছর আমরা প্রায় ৫ কেজি কার্প জাতীয় মাছের নিষিক্ত ডিম সংগ্রহ করি। সংগ্রহকৃত ডিম থেকে লংগদু উপজেলার মারিশ্যার চরে অবস্থিত বাংলাদেশ মত্স্য উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি) এর হ্যাচারীতে রেনু ফোটানো হয়। পরে রেনুগুলো পিটে (মাটির তৈরি গর্ত) ১ মাস ৭ দিন লালন-পালন করে আঙ্গুলি পোনা তৈরি করা হয়। উত্পাদিত পোনার মধ্যে রুই, কাতলা, মৃগেল এবং কালিবাউসের পোনা শনাক্ত করা হয়। এর ফলে  কাপ্তাই হ্রদে রুই, কাতলা, মৃগেল, কালিবাউস মাছের প্রকৃতিক প্রজনন নিশ্চিত হয়।

 

 এই সাফল্যে অন্যতম কারণ প্রজনন মৌসুমের পূর্বে জাঁক (মাছ ধরার ফাঁদ) অপসারণের ফলে কাপ্তাই হ্রদে কার্পজাতীয় মা মাছ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সঠিক সময়ে অর্থাত্ ১ মে হ্রদ থেকে সকল প্রকার মাছ ধরার উপর জেলা প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার ফলে ডিমওয়ালা মা মাছগুলো কম ধরা পড়েছে যা পরে প্রাকৃতিক প্রজননে অংশগ্রহণের ফলে প্রচুর পরিমাণে ডিম পাওয়া গেছে।

 

জাঁক অপসারণ, মা মাছ রক্ষা এবং লেকে অভায়শ্রমের কার্যকারিতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্রগুলো পুনঃখননের মাধ্যমে এলাকাগুলোকে অভয়াশ্রম ঘোষণা করে যথাযথ ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে পারলে হ্রদে কার্পজাতীয় মাছের মজুদ বৃদ্ধি পাবে।

 

n লেখক: উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউট।

হিমু আমার প্রেম

ইয়াসিন হাসান:

ক্লাস সিক্স কিংবা সেভেনে স্কুলে নতুন ছাত্রের আগমন হলো। মাঝারি মানের ছাত্র ছিলাম বলে আমার রোল নাম্বার সব সময়ই মাঝের সারিতেই থাকত। স্কাউটিং করতাম বলে যদিও আমার পরিচিতি সে তুলনায় বেশি ছিল। ক্লাস টিচার নতুন ছাত্রকে সবার আগে পরিচয় করিয়ে দিলেন আমার সঙ্গে। সেই থেকে আজও আমরা একসঙ্গে। কলেজ, ভার্সিটিতে একসঙ্গে পড়ার সুযোগ না হলেও আমাদের বন্ধুত্বে ফাটল ধরেনি। অনেকটাই আত্মার সঙ্গে মিশে আছি দুজন। আশা করছি বাকিটা পথ এভাবেই থাকবো।

তবে দুজনের বন্ধুত্ব শুরু হয়েছিল অসাধারণ এক ঘটনায়। সে কারণে আমার সারাজীবন মনে থাকবে ওকে। আমার তেমন বই পড়ার অভ্যাস ছিল না। ক্রিকেট মাঠ, বন্ধু-বান্ধবের আড্ডা ছিল আমার সবচেয়ে পছন্দের জায়গা। ক্রিকেট নিয়ে সারাদিন পড়ে থাকতাম। কে কোন রেকর্ড করত, কে কয়টি ছক্কা মারত, সেগুলো আমি স্কুলে সবার সঙ্গে আলোচনা করতাম। কিন্তু ওই বন্ধু ছিল আমার উল্টো। একদিনের আড্ডায় আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, হুমায়ূন আহমেদকে চিনিস?

আমার স্পষ্ট মনে আছে আমি ওকে উত্তর দিয়েছিলাম, না। কোন দেশের প্লেয়ার? নাম তো বাংলাদেশি মনে হচ্ছে। কোন ক্লাবের? বল না।

সবার সামনে আমাকে কড়া ভাষায় অপমান করে সে বলেছিল, বেটা কোনো দেশের প্লেয়ার না। লেখক হুমায়ূন আহমেদ।

আমি তখন গুরুত্ব না দিয়ে বলেছিলাম, ধুর বেটা! সিরিয়াস আড্ডায় এগুলো কি বলিস। অন্য কথা বল। কোথাকার কে!

বন্ধু আমার কথায় সেদিন খুব অপমানিত হয়েছিল। আড্ডা ছেড়ে নিজের সিটে গিয়ে বসে ছিল। বুঝতে পারছিলাম, ও হয়ত রাগ করেছে। হুয়ামূন আহমেদ হয়ত ওদের কোনো আত্মীয়। এভাবে বলা আমার উচিত হয়নি। স্কুল শেষে বাড়ি ফেরার পথে ‘সরি’ বলে জানতে চাইলাম, ‘কিরে, হুমায়ূন আহমেদ তোর কি হয়?

ও বলেছিল, আমার কিছু হয় না। আমি তার লেখা পড়ি। বাবা সব সময় তার বই কিনে পড়ে। আমিও পড়ি মাঝে মাঝে। অনেক সময় তার লেখা বুঝি না। কিন্তু খুব ভালো লাগে পড়তে।

বন্ধুর কথা শুনে আমারও আগ্রহ হলো। ওকে বললাম, আচ্ছা, আঙ্কেল আর তোর পড়া হলে যেকোনো একটা বই আমাকে দিস তো। পরের সপ্তাহে আমার জন্য হিমু বইটি নিয়ে এসেছিল ও। হুমায়ূনপ্রেমীদের জন্য হিমু বিশেষ কিছু। অসাধারণ একটি উপন্যাস। আমি তখন উপন্যাস কি বুঝতাম না। আমার মনে নেই আমি হিমু বইটি পড়ে কি বুঝেছিলাম! কিন্তু সত্যি কথা সেদিন থেকে হিমুর প্রেমে পড়েছিলাম। সেই থেকে হিমু আমার প্রেম। হুমায়ূন আহমেদ স্যারের অন্যান্য লেখার ওপর আমার ততটা আগ্রহ নেই, যতটা না হিমুকে নিয়ে আছে। যতটুকু আমি জানি হিমুকে নিয়ে স্যার বই লিখেছেন ২৫টি। যার প্রতিটি আমার একবার হলেও পড়া হয়েছে। হিমুকে নিয়ে স্যারের প্রথম উপন্যাস ‘ময়ুরাক্ষি’। শেষ উপন্যাস ‘হিমু এবং হার্ভার্ড Ph.D. বল্টু ভাই’ যেটি স্যার নিউইয়র্কে বসে লিখেছিলেন ২০১১ সালে। হিমু চরিত্রটি স্যারের কাল্পনিক চরিত্র হলেও স্যার সব সময় নিজেকে হিমু মনে করতেন বলেই আমার মনে হয়েছে।

হিমু বইটিতে স্যার লিখেছিলেন: ‘হিমু আমার প্রিয় চরিত্রের একটি। যখন হিমুকে নিয়ে কিছু লিখি- নিজেকে হিমু মনে হয়, এক ধরনের ঘোর অনুভব করি। এই ব্যাপারটা অন্য কোনো লেখার সময় তেমন করে ঘটে না। হিমুকে নিয়ে আমার প্রথম লেখা ময়ূরাক্ষি। ময়ূরাক্ষি লেখার সময় ব্যাপারটা প্রথম লক্ষ করি। দ্বিতীয়বার লিখলাম দরজার ওপাশে। তখনো একই ব্যাপার। কেন এরকম হয়? মানুষ হিসেবে আমি যুক্তিবাদী। হিমুর যুক্তিহীন, রহস্যময় জগৎ একজন যুক্তিবাদীকে কেন আকর্ষণ করবে? আমার জানা নেই। যদি কখনো জানতে পারি- পাঠকদের জানাব।’

এরপর স্যার হিমু চরিত্রকে বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন উপন্যাসে তুলে এনেছেন। স্যারের অনবদ্য সৃষ্টিতে পাঠক বিমোহিত হয়েছে বারবার। নিজেকে হিমু ভাবতে শুরু করেছে অনেকেই। হলুদ পাঞ্জাবি মানেই হিমু। রাতের বেলায় খালি পায়ে ঘুরে বেরানো মানেই হিমু। বেকার থেকেও মানুষের কল্যাণে কাজ করা মানেই হিমু। বড় ডিগ্রি না থাকলেও সাধারণ জ্ঞান দিয়ে মানুষকে ভালো পরামর্শ দেয়া মানেই হিমু। লোভ, লালসা, ঈর্ষা, অকুতোভয় মানেই হিমু। বুদ্ধিমান ও রসবোধসম্পন্ন ব্যক্তি মানেই হিমু। সব মিলিয়ে হিমু এমন এক চরিত্র যার প্রেমে পড়তে কোনো বাঁধা নেই, নেই কোনো বয়স।

স্যার আজ নেই। হিমু চরিত্র নিয়ে নতুন কোনো উপন্যাস তৈরি হবে না। কিন্তু স্যার হিমুকে অমরত্বের স্বীকৃতি দিয়ে গেছেন। আজ আমার মনে পড়ছে সেই বন্ধুকে যে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল হিমুর সঙ্গে। নইলে আমি অনেকটা পথ পিছিয়ে থাকতাম।

 

জরুরি মিটিংয়ে আছি, বাবার লাশ আঞ্জুমানে দেন

বাবা কোটিপতি। সন্তানদেরও করেছেন প্রতিষ্ঠিত। লিখে দিয়েছেন তাদের নামে ফ্ল্যাট-বাড়ি। তারপর… একটা সময় বুঝতে পারেন বাবা, সন্তানদের ঘরে তিনি ‘জঞ্জাল’হয়ে উঠছেন। একটা সময় সন্তানরাই তাকে বাসা থেকে তাড়িয়ে দেন। এক পর্যায়ে ধুঁকে ধুঁকে সেই বাবা মারা যান। লাশ নেয়ার জন্য সন্তানকে খবর দিলে ‘জরুরি মিটিংয়ে আছেন’ জানিয়ে লাশটি আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামে দিয়ে দিতে বলেন।

আমাদের দেশে ঘটে চলা অসংখ্য ঘটনার মধ্যে একটি সত্য গল্প সবার সঙ্গে শেয়ার করেছেন রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাহেদ। সোমবার রাত ১০টায় তিনি তার ফেসবুকে লেখেন- `একটি সত্য ঘটনা, সবাইকে পড়ার অনুরোধ রইলো`।

মোহাম্মদ সাহেদের সেই স্ট্যাটাসটি পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো-

‘লোকটির নাম হামিদ সরকার। তিনি সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। গ্রামের বাড়ি জামালপুরে। আমার সাথে তার পরিচয় সূত্রটা পরেই বলছি।

আমি যখন উত্তরায় রিজেন্ট হাসপাতালের প্রথম শাখা উদ্বোধন করি, তখন উত্তরা পশ্চিম থানার তৎকালীন ওসি এবং মসজিদের ইমাম সাহেব আমার কাছে আসেন। তারা বললেন যে, একজন লোক অনেকদিন ধরে মসজিদের বাইরে পড়ে আছে। অনেকে ভিক্ষুক ভেবে তাকে দু-চার টাকা ভিক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন।

ইমাম সাহেব তার জন্য প্রেরিত খাবার থেকে কিছু অংশ লোকটিকে দিয়ে আসছেন প্রতিদিন। হঠাৎ লোকটি অসুস্থ হয়ে পড়ায় তারা আমার সরনাপন্ন হয়েছেন। এমতাবস্থায় আমি লোকটিকে আমার হাসপাতালে নিয়ে এসে চিকিৎসার ব্যবস্থা করি এবং দায়িত্বরত ডাক্তার ও অন্যান্য সকল কর্মকর্তা/কর্মচারীকে অবগত করি যে, এই লোকটির চিকিৎসার সকল দায়ভার আমার ও এর চিকিৎসায় যেন কোন ত্রুটি না হয়।

হামিদ সরকার নামক লোকটির সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে আমি রীতিমত অবাক হলাম। তিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত জোনাল সেটেলম্যান্ট অফিসার। তার তিন ছেলের মধ্যে তিন জনই বিত্তশালী। উত্তরা তিন নম্বর সেক্টরে তার নিজস্ব বাড়ি আছে যা ছেলেদের নামে দিয়েছেন। তার বড় ছেলে ডাক্তার। নিজস্ব ফ্ল্যাটে স্ত্রী, শালী এবং শ্বাশুড়ী নিয়ে থাকেন, অথচ বৃদ্ধ বাবার জায়গা নেই।

মেঝ ছেলে ব্যবসায়ী, তারও নিজস্ব বিশাল ফ্ল্যাট আছে। যেখানে প্রায়ই বাইরের ব্যবসায়ীক অতিথীদের নিয়ে পার্টি হয়। অথচ বাবা না খেয়ে রাস্তায় পড়ে থাকে। ছোট ছেলেও অবস্থাসম্পন্ন। কিন্তু স্ত্রীর সন্তুষ্টির জন্য বাবাকে নিজের ফ্ল্যাটে রাখতে পারে না। সকল সন্তান স্বাবলম্বী হওয়া স্বত্তেও বাবার স্থান হয়েছে শেষে মসজিদের বারান্দায়। সেখান থেকে আমার হাসপাতালে।

প্রসঙ্গত, আমার হাসপাতালে আগত রোগীর ক্ষেত্রে রক্তের প্রয়োজন হলে আমি রক্ত দেবার চেষ্টা করি। সেদিনও হামিদ সরকার নামক অসুস্থ লোকটিকে আমি রক্ত দিয়েছিলাম। অবাক করা বিষয় হলো, তিনি দিন ১৫ আমার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন, অথচ কোন একটা ছেলে পনের মিনিটের জন্যও তার খোঁজ নেয়নি।

আরও দুঃখজনক হলো, সর্বোচ্চ চেষ্টার পরেও পনের দিন পরে আরো একটা কার্ডিয়াক অ্যাটাকে হামিদ সাহেব মারা যান। তার মৃত্যুর পরে আমি তার বড় ছেলেকে ফোন করি। তিনি আমাকে প্রতি উত্তরে জানান যে, তিনি জরুরী মিটিংয়ে আছেন এবং লাশটি যেন আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম এ দিয়ে দেওয়া হয়। পরে কোন আত্মীয় স্বজনের কাছ থেকে সাড়া না পেয়ে আমি নিজ উদ্যোগে স্থানীয়ভাবে তার লাশ যথাযথ মর্যাদায় দাফন করি।

লেখাটি আমি কোন প্রকার বাহবা নেওয়ার জন্য লিখিনি। আজ আমি নিজেও একজন বাবা। সন্তানের একটু সুখের জন্য দিনরাত একাকার করছি। সেই সন্তান যদি কোনদিন এধরনের আচরন করে তখন আমার কেমন লাগবে, শুধু এই অনুভূতি থেকে লেখা।

আমার মনে একটা প্রশ্ন, আমরা যারা বাবা-মাকে অসম্মান, অবহেলা করি তারা কি একবারও ভেবে দেখি না যে, একদিন ওই জায়গাটাতে আমরা নিজেরা গিয়ে দাঁড়াব।

আজ আমি আমার বাবা-মায়ের সাথে যে আচরণ করছি, তা যদি সেদিন আমার সন্তান আমার সাথে করে তবে? আজ আমাদের বাবা-মায়েরা সহ্য করছে। কাল আমরা কি সহ্য করতে পারব?’

প্রকৃতিবিরোধী সমৃদ্ধিতে জীবন বাঁচে না

খলিলউল্লাহ্‌প্রকৃতির বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো কিছু করতে গেলে তার ফল ভয়ানক হয়, সে কথা অনেক দিন ধরেই বলা হচ্ছে। বিশ্বজোড়া জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে ঘটে চলা লাগামহীন বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, আকস্মিক বন্যা, জীববৈচিত্র্য ও ফসলহানি—এর সবই তার প্রমাণ। উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে না করলে প্রকৃতি তার উল্টো ফল দেবেই। এর সত্যতা নিয়েও কেউ প্রশ্ন তুলতে পারে না। কয়েক দিন আগে পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড়ধসে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা আমরা সবাই জানি। পাহাড়ধসের ঘটনা এ দেশে নতুন নয়। অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন ও বনায়ন ধ্বংসের পরিণতিই এই পাহাড়ধস।
প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মানুষ তার জীবনধারণ ও উন্নয়ন পরিকল্পনা করতে না পারার কারণ এসব বিপর্যয়। মানুষ সর্বশ্রেষ্ঠ প্রজাতি। এই বিশ্বাস থেকেই মানুষ প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করার নামে ধ্বংস করে চলেছে। কিন্তু শ্রেষ্ঠতার মানে যে ধ্বংস নয়, বরং সংরক্ষণ—সেই বোধ মানুষের মনে জাগ্রত হচ্ছে না। এর ফলাফল আমরা পাচ্ছি অহর্নিশি।
প্রকৃতি ছাড়া মানুষ সুখী-স্বাস্থ্যবান হতে পারে না। মানুষের কল্যাণ ও সমৃদ্ধি, বিশেষ করে দরিদ্র মানুষের জন্য প্রকৃতির অবদানকে আমাদের সামাজিক অগ্রগতির মাপকাঠিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। যত দিন পর্যন্ত তা করা না হবে, তত দিন যতই আমরা উচ্চপর্যায়ের বৈঠক আর আলোচনা করি না কেন, তা কোনো কাজে আসবে না।
অনেক দিক থেকেই প্রকৃতি মানুষের জন্য মূল্যবান। খাদ্য, নির্মল বাতাস ও পানির মতো মৌলিক প্রয়োজন ছাড়াও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে মানুষকে রক্ষা করে চলেছে এই প্রকৃতি। এ ছাড়া মানুষের নিজস্ব সত্তার উপলব্ধির জন্য প্রকৃতির রয়েছে মৌলিক অবদান। পৃথিবীর বিভিন্ন সংস্কৃতিতে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। মানুষের সুখানুভূতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ প্রকৃতি। একবার ভাবুন তো! কোনো পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখছেন বা কোনো সুন্দর নদীর মনোরম বয়ে চলার দৃশ্য উপভোগ করছেন বা কোনো সবুজ উন্মুক্ত মাঠ পেরিয়ে চলেছেন? এ সবই মানুষের সুখী হওয়ায় অবদান রাখে, যা শারীরিক ও মানসিক উভয় প্রকার সুস্বাস্থ্যের জন্য অনস্বীকার্য।
প্রকৃতি থেকে এত কিছু পাওয়ার পরও আমাদের সমৃদ্ধি ও কল্যাণের মাপকাঠি এতই সংকীর্ণ যে সেখানে প্রকৃতির জায়গা হয় না। শুধু দৃশ্যমান ও বস্তুগত দিক থেকেই আমরা সমৃদ্ধি পরিমাপ করি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা ও মানুষের কল্যাণ পরিমাপের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মাধ্যম হচ্ছে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি)। প্রকৃতি আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ও ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও এই পরিমাপে প্রকৃতিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয় না।
তবে এর বিকল্প আছে। যেমন অন্তর্ভুক্তিমূলক সম্পদ সূচক বা ইনক্লুসিভ ওয়েলথ ইনডেক্স মানুষ ও প্রকৃতির বৃহত্তর পরিমাপ পদ্ধতি গ্রহণ করেছে। তাদের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ১৯৯২-২০১০ সময়কালে প্রথাগত জিডিপির মাধ্যমে প্রবৃদ্ধিকে অতিরঞ্জন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক উন্নয়নে আমরা দেখি জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন সূচক ও বহুমুখী দারিদ্র্য সূচকে অনেক বিষয়কে বিবেচনা করা হয়। বস্তুগত উন্নয়নের পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও শিক্ষাকে এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু এখনো প্রকৃতির ভূমিকাকে যথাযথ মূল্যায়ন করা হয় না।
প্রকৃতিকে বাদ দিয়ে এসব সূচক তৈরি করা হলে তার কিছু বিকৃত বৈপরীত্য দেখা যায়। যেমন পরিবেশ ধ্বংস করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটে। পরিবেশের এসব ক্ষতির আঁচ কিন্তু জিডিপির গায়ে লাগে না। একটি দেশ তার অতিপ্রয়োজনীয় বন কেটে উজাড় করে ধনী হয়ে যেতে পারে (অনেক দেশ সেটা করেও থাকে)। কিন্তু এর ফলে যে জীববৈচিত্র্য ও বন্য প্রাণী ধ্বংস হলো তার হিসাব রাখা হয় না।
যুক্তরাজ্যের তিনটি প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে পরিচালিত ইকোসিস্টেম সার্ভিসেস ফর পভার্টি এলেভিয়েশন (ইএসপিএ) এমন একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যার উদ্দেশ্য হলো পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বহুমুখী দারিদ্র্যের মাপকাঠি তৈরি করা। যখন প্রকৃতিতে মানুষের প্রবেশাধিকার থাকে না, তখন মানুষ আরও বেশি দরিদ্র হয়। জুডিথ স্লাইশার ও ভাস্কর ভিরা এ বিষয়ে একটি নিবন্ধ লিখেছেন। তাঁরা মানব উন্নয়ন ও কল্যাণের মাপকাঠিতে প্রকৃতিকে বিবেচনার দাবি করেছেন। তাঁদের মতে বর্তমান স্থিতাবস্থায় গরিব মানুষের স্থান নেই। সমৃদ্ধির চলমান এসব সূচক ব্যবহারে বিশ্বব্যাপী এলিটদের লাভ হয়, যারা পরিবেশ ধ্বংস করে মুনাফা অর্জন করতে পারে। আর ক্ষতি হয় সেসব গরিব মানুষের, যারা জীবিকার জন্য প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল এবং পরিবেশ ধ্বংসের ফলে বিপন্ন হয়ে পড়ে। এই দুই গবেষক আরও দাবি করেন, প্রকৃতিকে যতটুকু মূল্যায়ন করা হয়, তা পণ্য আকারে মুদ্রামানে রূপান্তরের মাধ্যমে। ফলে যারা সামর্থ্যবান, শুধু তারাই এর ফল ভোগ করতে পারে।
বোতলজাত পানি এমন একটি উদাহরণ। এখন বাতাসও বিক্রয়যোগ্য পণ্য। কয়লা পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ফলে ব্যাপক হারে পরিবেশদূষণের শিকার হয়েছে চীনের রাজধানী বেইজিং। বাতাস এতটাই দূষিত হয়েছে যে সেখানে নিশ্বাস নেওয়ার মতো নির্মল বাতাস পাওয়া যাচ্ছে না। গত বছর সিএনএনের খবরে বলা হয়েছে লিও ডি ওয়াটস নামে এক ব্রিটিশ ব্যবসায়ী বাতাস বিক্রি করে হাজার হাজার ডলার কামিয়েছেন। প্রতি বোতল বাতাসের দাম ধরা হয়েছে ১১৫ মার্কিন ডলার।
এ থেকেই বোঝা যায় যে প্রকৃতিকে অবহেলা করতে থাকলে এ রকম ভয়ানক ফল আরও বেশি ভোগ করতে হবে ভবিষ্যতে। অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায্য ও টেকসই সমাজ নির্মাণে প্রকৃতির ভূমিকাকে অস্বীকার করা হবে বোকামি। প্রকৃতিকে অবহেলা করতে থাকলে মানবজাতির শ্রেষ্ঠত্বের বদলে তার ধ্বংসের পথেই আমরা এগিয়ে যাব। এর ফলে নিশ্বাসের বাতাস যেমন কিনতে হবে, তেমনি পাহাড়ধসে জীবননাশও ঠেকানো যাবে না।

খলিলউল্লাহ্‌: সহকারী সম্পাদক, প্রতিচিন্তা
khalil.jibon@gmail.com

প্রকৃতির প্রতিশোধ

এস এম মুকুল::প্রাকৃতিক দুর্যোগে সম্প্রতি দেশে ঘটে গেছে বিপর্যয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় ভারী বর্ষণ ও পাহাড় ধসের ঘটনায় ১৫৬ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এতে দেশব্যাপী শোকের ছায়া নেমে আসে। এই নির্মমতা প্রকৃতির প্রতিশোধ ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। আর এজন্য কেবল মানুষই দায়ী। কারণ প্রকৃতিরও একটা নিয়ম আছে। সে আঘাত সইতে সইতে একসময় হুঙ্কার দিয়ে গর্জে ওঠে, ভয়ংকর প্রতিশোধ নেয়। আমরা জানি, পাহাড় হচ্ছে পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষাকারী পিলার। পবিত্র কোরআনে পাহাড়কে পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষাকারী ‘পেরেক’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিজ্ঞানীরাও স্বীকার করে নিয়েছেন যে, পাহাড় হলো পৃথিবীর ‘পিলার। তাই পাহাড় প্রকৃতিকে তার মতো থাকতে না দিলে প্রতিশোধ সে নেবেই। এই প্রতিশোধ কেবল পাহাড় ধস, ভূমিধস নয় এর ভয়াবহতা আরো ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনতে পারে। কারণ মানুষ তার সীমাহীন লোভ ও লাভের লালসায় পাগলপারা হয়ে অকাতরে পরিবেশ নষ্ট করছে। সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন এসব ঘটনা কি সরকার বা স্থানীয় প্রশাসনের দৃষ্টির আড়ালে হচ্ছে? নিশ্চয়ই নয়। পাহাড় কেটে বসতি, আবাসন, কটেজ বাণিজ্য এমনকি খামারও করা হচ্ছে। এসব কাজ হঠাৎ করে লোকচক্ষুর অন্তরালে করা সম্ভব নয়। প্রশাসন জেনেও কেন নিশ্চুপ থাকছে। বন পরিবেশ মন্ত্রণালয়, পরিবেশ আইন এবং আমাদের পরিবেশবাদী সংগঠনের নজরের বাইরে কিছুই হচ্ছে না। তার মানে যারা করছেন তারা সরকার যন্ত্রের চেয়েও ক্ষমতাধর। স্থানীয় প্রশাসন কি তাদের কাছে নিতান্তই অসহায়? তথ্য-তালাশে জানা গেছে, চট্টগ্রামের জনৈক জনপ্রিয় বিরোধীদলীয় নেতা পাহাড় কেটে খামার তৈরি করেছেন। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে সে দলের বলয়ে বড় বড় নেতাসহ সাঙ্গোপাঙ্গরা প্রশাসনের ছত্রছায়ায় এসব অপকর্ম করে দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশকে বিনষ্ট করছেন। আর তার খেসারত দিচ্ছে হতদরিদ্র সাধারণ মানুষ।

নির্মম বাস্তবতা হলো পাহাড় নেই পাহাড়ের জায়গায়। পাহাড়ের উপত্যকা নেই, টিলা নেই। অতিবৃষ্টিজনিত পাহাড়ি ঢল ছাড়াও পাহাড় কেটে অপরিকল্পিত বসতি স্থাপন ও গাছপালা উজাড় করার কারণে ভয়াবহ পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেই চলেছে। পাহাড় ধসে কেবল মানুষের প্রাণহানি ঘটছে যে তা নয়-পাহাড় কাটা, গাছ কাটা, জঙ্গল উজাড় করা, বৃষ্টিতে পাহাড় ক্ষয়ে পানির ঢল নামার কারণে নদীর পানি ঘোলাটে হয়ে যাচ্ছে। কাটা পাহাড়ের মাটি ও বালি নেমে এসে ভরাট হচ্ছে নালা-নর্দমা-খাল। রাস্তা নির্মাণে প্রাকৃতিক বিপর্যয় বিবেচনা না করা, পর্যটনের জন্য কটেজ, সরকারি বেসরকারি অফিস, এমনকি খামার ও কারখানাও তৈরি হয়েছে এই পাহাড়ে। কিন্তু এই পাহাড় থাকার কথা শুধুই গাছপালার বনবনানী, পশুপাখি, ফলমূল, ভেষজ অরণ্য-উদ্যান। তার চেয়েও দুঃখের ব্যাপারটি হলো-পাহাড়িরা পাহাড় থেকে বিতাড়িত হয়েছে। অথচ তারাই ছিল পাহাড়ের প্রকৃতির সঙ্গে মানানসই জীবনধারণে অভ্যস্ত। এখন তাদের সরিয়ে দখলবাজরা গাছ লাগিয়ে লিজের নামে দখল প্রতিষ্ঠা করেছে। পাহাড়খাদকরা বাঁচার আশা দিয়ে সমতলের উদ্বাস্তুদের পাহাড়ে বসতির সুযোগ নিয়ে বাণিজ্য করছে। কিন্তু সমতলের বাঙালিরা তো পাহাড়ে জীবনযাপনের কায়দা-কানুন জানে না। তারা কি মাটি আর পাহাড়ের আচরণবিধি বুঝতে না পারার কারণে বা পাহাড়ের ভাষার সঙ্গে নিজেদেরও মানিয়ে নেওয়ার আগেই এসব প্রাণবিধ্বংসী দুর্ঘটনা ঘটছে। আমাদের বাংলাদেশে প্রায় ২৬ ভাষাভাষীর ৪৫ জাতিসত্তার প্রায় এক মিলিয়ন ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী রয়েছে। এদের মধ্যে চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, মনিপুরি, কুকি, রাখাইন, গারো, সাঁওতাল, হাজং, বম ও ত্রিপুরা জাতি রয়েছে। বংশানুক্রমে ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর লোকেরা পাহাড়ি এলাকাতে বসবাস করে আসছিল। পাহাড়ি পরিবেশের সঙ্গে এদের জীবন, ঐতিহ্য, কৃষ্টি, সংস্কৃতির মিলমিশ রয়েছে। কারণ তাদের জন্ম ও জীবন প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠা। পাহাড় তাদের কাছেই বরং নিরাপদ ছিল।

ভাবতে অবাক লাগে প্রশাসনের নাকের ডগায় অবৈধভাবে পাহাড়ে বসতি গড়ে নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে ভাড়া দিচ্ছে প্রভাবশালী চক্র। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে ঘর বানানো থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের সংযোগ দিয়েও পাহাড়ে বসবাসকারীদেরও নিয়ন্ত্রণ করছে। উল্টো রাজনৈতিক শক্তির প্রভাবে পাহাড় দখলমুক্ত করতে অসহায় আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন। পাহাড়ি এলাকা নির্বিচারে কেটে বনজঙ্গল ধ্বংস করা হচ্ছে। পাহাড় কেটে সমতল বসতি স্থাপন করা হচ্ছে। এসব বিধ্বংসী কার্যকলাপের ফলে পাহাড়ের অভ্যন্তরীণ বন্ধন শক্তি অনেকাংশে দুর্বল হয়ে পড়ছে। মূলত এই দুর্বলতার কারণেই বৃষ্টিপাতের ফলে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, বান্দরবানসহ অন্যান্য পাহাড়ি এলাকায় পাহাড় ধসে পড়ছে; ঘটছে প্রাণহানি এবং অনেক ক্ষয়ক্ষতি। ভয়ের ব্যাপার হচ্ছে এই ক্ষতিটি শেষ ক্ষতি নয়-এটি মানবসমাজের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সূত্রপাত মাত্র। কেননা পাহাড়, সাগর, ও সমতল এগুলো প্রকৃতির সৃষ্টি। মানুষ চাইলেও পাহাড় তৈরি করে পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষা করতে পারবে না। কারণ এটি মহান আল্লাহতায়ালার অপরিসীম মহিমার সৃষ্টি-যা কেবল তিনিই জানেন কিভাবে মাটি, পানি, পাহাড় আর আকাশের ভারসাম্য ঠিক থাকবে। মোটকথা প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় পাহাড় ব্যবস্থাপনায় যে ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা আমাদের কাজ ছিল, আমরা তা করতে পারিনি। মানুষের লোভের লালসায় মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণে পাহাড়ের অপব্যবহারের কারণে আজ ক্ষুব্ধ হয়ে মানবজাতির ওপর প্রতিশোধ নিচ্ছে পাহাড় প্রকৃতি। যদিও পাহাড়ধস শুধু বাংলাদেশের একক দুর্যোগ নয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তথা কানাডা, সোভিয়েত ইউনিয়ন, তাজিকিস্তান, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাহাড় ধসের ইতিহাস রয়েছে। ১৯৯৯ সালে ভেনিজুয়েলাতে মাটিধসে প্রায় দশ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। ২০১১ সালে ব্রাজিলের রিওডি জেনিরোতে ভূমি ধসে ৬১০ জনের মৃত্যু হয়। আশঙ্কার ব্যাপার হচ্ছে-দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ভারত, বাংলাদেশ, নেপালে পাহাড়ধস উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব অপকর্মের মূলে রয়েছে মানুষের লোভ। অর্থের লালসার রাক্ষুসী ক্ষুধা। কথায় আছে লোভে পাপ-পাপে মৃত্যু। এখানে লোভীর পাপে তার নিজের মৃত্যু হয় না। কিছু লোভী মানুষের পাপের ফল ভোগ করে অন্যরা। তারচেয়ে ভয়ঙ্কর পরিণতি হয়তোবা অপেক্ষা করছে দেশবাসীর জন্য। কেননা প্রকৃতির ভারসাম্যতা নষ্ট হলে ভূমিকম্প বা পাহাড় ধসের মতো বড় বিপর্যয় থেকে পরিত্রাণ পাবে না কেউই। জানা গেছে, শুধু প্রভাবশালী ও বিত্তবানরাই নয় বিভিন্ন সরকারি সংস্থা যেমন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সিটি করপোরেশন, বাংলাদেশ রসায়ন শিল্প করপোরেশনও বিপুল পরিমাণ পাহাড় কেটে রাস্তাঘাট ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান তৈরি করছে। অপরিকল্পিতভাবে পাহাড়ের মতো প্রাকৃতিক পরিবেশের প্রতি এই অবিচার সামাল দিতে পারবে তো পাহাড়ি এলাকার মানুষরা। পত্রিকার পাতায় পাহাড়ের ধসে মানুষের মৃত্যুর খবরে দেশবাসী আতঙ্কিত ও সোচ্চার। কিন্তু সরকার, প্রশাসন কেন নীরব? বিরোধী দলের ভূমিকা কী? পরিবেশবাদীরা কী করছেন? মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ভূমিকা কী? ওইসব পাহাড়ে সেনা ক্যাম্প রয়েছে, তাদের চোখও কি এড়িয়ে ঘটছে এসব কার্যক্রম? এমন অনেক জিজ্ঞাসা সাধারণ মানুষের মনে। বাংলাদেশে পরিবেশ আইনে পাহাড় কাটা নিষিদ্ধ। আইন লঙ্ঘনের দায়ে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত কারাদ-, এক কোটি টাকা অর্থদ-, পাহাড় কাটলে হাতেনাতে আটক যন্ত্র-সামগ্রী জব্দ, নিষেধাজ্ঞা, পাহাড়কে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনার বিধিবিধান রয়েছে। তবে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে সীমিত ও পরিকল্পিতভাবে পাহাড় কাটার সুযোগ রয়েছে।

পাহাড় রক্ষায় পাহাড়গুলোর ওপর এই অবিচার বন্ধ করতে হবে। পাহাড়ের পাদদেশের বাসিন্দাদের সরিয়ে পাহাড়ি অঞ্চলে বসতি স্থাপন বন্ধ করতে হবে। পাহাড়ে প্রচুর গাছ লাগিয়ে ঘন বনায়ন সৃষ্টি করতে হবে। পাহাড়ে ফলদ, ঔষধি বৃক্ষ হতে পারে অর্থনীতির নতুন ক্ষেত্র। পাহাড় আছে এমনসব দেশের মতো পাহাড়ের স্তরে স্তরে টিলা কাটিং ‘স্লোপ’ পদ্ধতিতে পাহাড়ের ওপর থেকে পানি নিসরণের ব্যবস্থা নিলে ধসের ঘটনা ঘটবে না। আমরা জানি, পাহাড়-পর্বত ও টিলারাশি সুরক্ষায় উন্নয়নে বিশ্বে অতুলনীয় এক নজির স্থাপন করেছে পাহাড়-পর্বতের দেশ নেপাল। দেশটিতে উঁচু পাহাড়-পর্বতের শানুদেশ ও ঢালুতে সিঁড়ির ধাপের মতো ‘স্লোপ’ সৃষ্টি করেছে। নেপালে স্লোপ অ্যাগ্রিকালচার ল্যান্ড টেকনোলজি বা ‘সল্ট’ হিসেবে পরিচিত। সেখানে বিভিন্ন ধরনের প্রচুর মৌসুমি ফল-ফসল, খেত-খামার এবং বনায়ন করা হয়েছে। এতে করে স্লোপের মাটি আলগা বা সরছে না। বরং মাটিক্ষয় কার্যকরভাবে রোধ করা সম্ভব হচ্ছে। স্লোপ অতিক্রম করে বৃষ্টির পানি নিচের দিকে অপসারণ হচ্ছে। সল্টের কারণে পাহাড় রক্ষার পাশাপাশি এর সুফল ভোগ করছে প্রান্তিক কৃষকরা। তাই পাহাড়ের দেশ নেপালে বর্ষায় পাহাড় ধসের ঘটনা নেই বললেই চলে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক ধরনের গুল্মজাতীয় গাছ যার গুচ্ছ শেকড় মাটির অনেক গভীরে ছড়িয়ে পড়ে মাটির বন্ধন শক্তিকে আরো মজবুত করে তোলে। এ ধরনের গাছ লাগানোর পাশাপাশি আমাদের দেশীয় তালগাছ লাগানোর কথাও ভাবা যেতে পারে। তালগাছের শেকড়ও মাটির বন্ধন শক্তি বাড়ায়। এছাড়াও তালগাছ বজ্রপাত নিরোধক।

লেখক : বিশ্লেষক ও উন্নয়ন গবেষক

writetomukul36@gmail.com

কেন পাহাড় ধস

বাংলাদেশে পাহাড় ধসের কারণে নানা সময়ে অনেক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হওয়ার সংখ্যাও কম নয়। গতকাল চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানে পাহাড় ধসে একশোরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। কিন্তু কেন হয় পাহাড় ধস। এ নিয়ে ভূ বিজ্ঞান ঘেঁটে দেখা গেছে, এর মূল কারণ হলো— আমাদের পাহাড়ি অঞ্চলের উপরের দিকের মাটিতে কঠিন শিলার উপস্থিতি নেই বললেই চলে। ফলে আমাদের পাহাড় ধসের আশঙ্কা এমনিতেই বেশি। তা ছাড়া মানুষ এসব জায়গায় বসবাসের জন্য ও চাষাবাদের জন্য পাহাড়ের উপরের দিকের শক্ত মাটির স্তরও কেটে ফেলে। পাশাপাশি বড় গাছপালা কেটে ফেলায় ভারি বৃষ্টিপাত হলেই পাহাড়ের মাটি ধসে পড়ে।
জিও সায়েন্স অস্ট্রেলিয়ার এক গবেষণায় বলা হয়েছে, পাহাড় ধসের পেছনে প্রাকৃতিক কারণ এবং মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড মূল প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। প্রাকৃতিক কারণ হলো— পাহাড়ের ঢাল যদি এমন হয় যে ঢালের কোনো অংশে বেশি গর্ত থাকে। তখন অতিবৃষ্টিতে ভূমি ধস হতে পারে। এ ছাড়া ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত এবং পাহাড়ের পাদদেশের নদী ও সাগরের ঢেউ থেকেও পাহাড় ধস হতে পারে। আর মনুষ্য সৃষ্ট কারণ হিসেবে গবেষণায় বলা হয়েছে, পাহাড়ের গাছ পালা কেটে ফেলা, মাটি কেটে ফেলা, পাহাড়ে প্রাকৃতিক খাল বা ঝর্ণার গতি পরিবর্তন, পাহাড়ের ঢালুতে অতিরিক্ত ভার দেওয়া এবং খনি খননের কারণে পাহাড় ধস হতে পারে। তবে আমাদের ভূতাত্ত্বিকরা বলছেন, বাংলাদেশে মূলত পাহাড়ের উপরের দিকে কঠিন শিলার অভাব, পাহাড়ের মাটি কেটে ফেলা এবং বড় গাছপালা কেটে ফেলার কারণেই পাহাড় ধস হয়ে থাকে।
বাংলাদেশের পাহাড়গুলোতে কোন কঠিন শিলা নেই। তাই বৃষ্টির কারণে এ ধরনের মাটি পানি শুষে ফুলতে থাকে। তাছাড়া কঠিন শিলা না থাকায় মাটিগুলো নরম ও পিচ্ছিল হয়ে যায়। ফলে ভারি বর্ষণের সাথে সাথে মাটি ভেঙ্গে পড়ে। তাছাড়া যারা পাহাড়ে থাকেন তারা ঘর নির্মাণের জন্য পাহাড়ের সবচেয়ে শক্ত মাটির স্তরও কেটে ফেলেন। এতে পাহাড় ধ্বসের শঙ্কা আরও তীব্র হয়।>আহসান হাবীব রাসেল

বৃষ্টির পানি সংগ্রহ এনে দেবে সুফল g

সনাতন চক্রবর্তী বিজয়:: নদীমাতৃক বিপুল জনসংখ্যার বাংলাদেশে পানি সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনার প্রায় সবটাই নির্ভর করছে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর। এ কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতিবছর প্রায় ৩ মিটার নিচে নেমে যাচ্ছে। ফলে অদূর ভবিষ্যতে সহজে পানি পাওয়া নিয়ে সমস্যার মুখে পড়তে যাচ্ছে দেশ। এ ছাড়া রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন শহর মারাত্মক ভূমিধসের ঝুঁকির মুখেও পড়ছে। অথচ সত্তরের দশকের আগে দেশের মানুষের কাছে সুপেয় পানির প্রধান উৎস ছিল ভূপৃষ্ঠ, পুকুর, নদী-খাল, বৃষ্টি আর জমিয়ে রাখা পানি। সত্তরের দশকের শুরুতে কৃষিকাজের জন্য দেশে প্রথম ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার শুরু হয়। আশির দশকে তা ব্যাপকতা পায়। সেই যে শুরু এরপর আর থামেনি। গত চার দশকে দেশে ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার বেড়েছে প্রায় শতভাগ। খাবার পানি, রান্না, গোসল, সেচ, এমনকি দৈনন্দিন কাজেও ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর নিভর্রশীল হয়ে পড়েছে মানুষ। এখন চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ পানিই মেটাতে হচ্ছে ভূ-গর্ভস্থ উৎস থেকে। আর অপরিকল্পিতভাবে গভীর ও অগভীর নলকূপের মাধ্যমে এই পানি উত্তোলনের ফলে রাজধানী ঢাকা চট্টগ্রামসহ সারাদেশেই ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে।

পানির মূল উৎস বৃষ্টি, আর গৌণ উৎস ভূগর্ভস্থ পানি। বৃষ্টির পানি মাটির নিচে যাওয়ার আগে সংরক্ষণকে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ (রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং) বলে। আর্সেনিক এলাকায় বৃষ্টির পানির ব্যবহার জরুরি। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নামা থেকে রক্ষা পেতে হলে বৃষ্টির পানি ব্যবহার করতে হবে। বৃষ্টির পানির সুবিধা হচ্ছে, এর মান ভালো ও হাতের নাগালে পাওয়া যায়। যদি আমরা আমাদের মূল উৎসকে অবহেলা করে গৌণ উৎসের পানি ব্যবহার করতেই থাকি তাহলে অদূর ভবিষ্যতে ভয়ঙ্কর সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে। বাংলাদেশে অঞ্চলভেদে এক হাজার ২০০ থেকে তিন হাজার মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়। উপকূল ও পাহাড়ি অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বেশি। এসব অঞ্চলে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ সুফল দেবে। আমাদের বেশির ভাগ পানির কাজই বৃষ্টির পানি দিয়ে করতে পারি। বাংলাদেশে গড়ে ২৪৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। ঝুঁকি বিবেচনায় দেখা গেছে, বৃষ্টির পানিতে অসুখ-বিসুখের ভয় কম। ভবনের নিচে অথবা ছাদে টেকইস রিজার্ভার স্থাপন করে বৃষ্টির পানি ধরে রেখে তা সহজেই ব্যবহার করা যাবে। অন্যদিকে জমিয়ে রাখা পানির একটি অংশ পাইপের মাধ্যমে মাটির গভীর স্তরে পাঠিয়ে দেয়া হবে। পাশের দেশ ভারতের আহমেদবাদসহ ইউরোপের অনেক দেশে এই পদ্ধতির সফলতা রয়েছে। বাংলাদেশও এক্ষেত্রে একটি মডেল হতে পারে। ভারতের রাজস্থানসহ বেশ কয়েকটি রাজ্যে পানির স্বল্পতা রয়েছে। তবে ভারত সরকার রাষ্ট্রীয়ভাবে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ওপর জোর দিয়েছে, সেখানে আইনও সেভাবে করা হয়েছে। চেন্নাইসহ অনেক রাজ্যে অনেক ক্ষেত্রে এর সুফলও এসেছে ।
পানি ভূগর্ভে যাওয়ার উপায় দুটি। একটি বৃষ্টির পানি আর অন্যটি ভূ-উপরিভাগের জমে থাকা (পুকুর, খাল, নদী প্রভৃতি) পানি চুইয়ে চুইয়ে ভূগর্ভে প্রবেশ করা। বাংলাদেশ এবং ভারতে আগে বৃষ্টির পানি থেকেই ভূগর্ভস্থ পানি রিচার্জ হতো। কিন্তু বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাত কমে গেছে। নানান প্রতিবন্ধকতার কারনে বৃষ্টির পানি ভূগর্ভে কম মাত্রায় প্রবেশ করে। সেক্ষেত্রে একমাত্র উপায় ভূ-উপরিভাগের জমে থাকা পানি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি শহরগুলোতে এখন পুকুরের সংখ্যা নিতান্তই কম। আমরা প্রায় সকল পুকুর ভরাট করে ফেলেছি। বৃষ্টির পানির সঠিক সংরক্ষণ করতে পারলে বর্ষাকালে বন্যা এড়ানোও সম্ভব। এমতাবস্থায় ভূ-গর্ভস্থ পানির উপরে চাপ কমানো এবং অতিরিক্ত ব্যবহারে নেমে যাওয়া ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রিচার্জ করার বিষয়ে সরকার যথেষ্ট সচেষ্ট। সম্প্রতি রাজধানীতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বাড়াতে সরকার উপায় খুঁজছে বলে সাংবাদিকদের জানান মাননীয় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এমপি। সরকার বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য অনেকগুলো প্রকল্প হাতে নিয়েছে। রাজধানীসহ সব বড় বড় শহরে বহুতল ভবনগুলোতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা যাতে রাখা হয় তার জন্য আইন করা হচ্ছে। সরকারের স্বদিচ্ছা থাকা সত্তেও ব্যবহারকারীদের সচেতনতার অভাবে এ সমস্যা ক্রমশঃ ঘনিভূত হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে বৃষ্টির পানির সঠিক সংরক্ষণ ও ব্যবহার জরুরি। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ভাবনা একটা সময়োপযোগী বিষয়। গ্রামাঞ্চলে পুকুরে এবং শহরে বাড়ির ছাদে বৃষ্টির পানি সংরক্ষনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বহুতল ভবনগুলোতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের বিষয়ে বেশ কয়েকটি ডেভেলোপার প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করেছে ঢাকা ও চট্রগ্রামে। কিন্তু এ সংখ্যা আরো বাড়ানো দরকার। এ ছাড়া সম্ভবপর আবাসন প্রকল্পগুলোতে জলাশয় ও খোলা জায়গার পরিমান বাড়ানো যেতে পারে। এর ফলে ভূ-গর্ভে বৃষ্টির পানি প্রবেশ করতে পারে। পুকুর, জলাশয়ের পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি স্থাপনাগুলোতেও বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। এখন স্কুল-কলেজের ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি বেশ গুরুত্ব সহকারে বিবেচিত হচ্ছে। কিন্তু সাইক্লোন সেন্টারগুলোতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হলেও সেগুলোর ঠিক মতো ব্যবহার হচ্ছে না। এক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা একটি বড় সমস্যা হয়ে দাড়িয়েছে। অনেকের মতে এটি ব্যয় সাপেক্ষ। কিন্তু বৃষ্টির পানি সংগ্রহের ব্যবস্থা করা খুব ব্যয় সাপেক্ষ নয়। অনেক ক্ষেত্রে একটা জেনারেটর স্থাপনের খরচের চেয়েও এর খরচ কম হয়। এ বিষয়ে আরো ব্যাপক জনসচেতনতা গড়ে তোলা দরকার।
আমাদের ৬৪ জেলার মধ্যে ৪৫টি জেলার পানির স্তরই স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে নিচে নেমে গেছে। তাই ভূগর্ভস্থ পানি রিচার্জ করা ছাড়া উপায় নেই। শুধুমাত্র সরকারের মুখাপেক্ষী না হয়ে কিংবা দোষারোপ না করে বৃষ্টির পানির ব্যবহার বাড়াতে হবে এবং মাটিতে বৃষ্টির পানির প্রবেশ নিশ্চিত করতে হবে। নতুবা ক্রমাগত পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার কারনে যে কোনো সময় বড় ধরনের ভূমিধ্বস হতে পারে। বিপদে পড়ার আগেই আমাদের সচেতন হতে হবে। এ জন্য সবার আগে দরকার মানসিকতার পরিবর্তন ।
লেখকঃ প্রকৌশলী, প্রাবন্ধিক।

ফেলে আসা শৈশব এবং বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপট

“কানা মাছি ভোঁ ভোঁ, যাকে পাই তাকে ছোঁ” ছড়াটি কে বানিয়েছিল? কেউ কি জানে? জানে না। এমন মন মাতানো হাজারো শব্দের ডালে ছোঁয়া কি যায় সেই শৈশবকে? সেই ছড়াতে মিশে আছে আমাদের ছোটবেলার রঙ্গিন স্মৃতি।
সেই পড়ন্ত বিকেল বেলায় পাড়া মাতিয়ে এদিক থেকে সেদিকে ঘুরে বেড়ানো, কানামাছি, দৌড়াদৌড়ি, এলাটিং-বেলাটিং, ইকরি সিকরি, ইচিং বিচিং, হাড়িভাঙ্গা, লুকোচুরি, এক্কাদোক্কা, ফুলটোক্কা, পলানটুক, গোল্লাছুট সহ আরো কতো কি খেলে সারা শরীর কাদা-মাটি মেখে ঘরে ফেরা, মায়ের বকুনি, দাদার হাতে লাঠি, দাদী/ ঠাকু’মার হাতের আদর আর বাবার হাতের পরশ, কোথায় হারিয়ে গেছে যেন আমাদের সেই দিনগুলো, হারিয়ে গেছে শৈশবের খেলা, দিন দিন ব্যস্থতার ভীড়ে হারাচ্ছে শিশুদের সব রকমের শৈশবের খেলা। আরো হারাচ্ছে ব্যস্ত নগরীর ভীড়ে ধূূলো আর কাদার গন্ধ।
বর্তমান প্লে পড়–য়া একজন ছাত্রের কাছে খেলা করা তো দূরের কথা, কেবল নিজেকে দেবার মতন কোন সময়ই তার নেই। সেই সকাল থেকে শুরু করে স্কুল বড় বড় বইয়ের বোঝা, পড়ার চাপ কোচিং গান/ নাচ/ ড্রয়িং শেখা, সব মিলে ব্যস্থ সে। নিজেকে দেবার কোনরূপ সময় তার নেই। তাছাড়া ইন্টারনেট আর মুঠোফোনের যুগে, পড়ন্ত বিকেলে দৌড়াদৌড়ি বা কানামাছি এসব খেলা অথবা তাদের মুখ থেকে এসব আর্শ্চয্য সব ছন্দবদ্ধ ছড়ার লাইন শোনা কল্পনাই করা যায় না।
আমরা কি যুগের সাথে খাপ খাওয়াতে আর মানিয়ে নিতে নিজের সন্তানদের এক ভয়ংঙ্কর ভবিষ্যতের দিকে পাড় করিয়ে দিচ্ছি? নাকি, অল্প বয়সে মুঠোফোন আর ট্যাব, ল্যাপটপ আর ইন্টারনেট দিয়ে নিজের সন্তান কতোই না স্মার্ট সেটাই জাহির করছি? কোনটি? বাস্তবিক পক্ষে, আমরা সময়ের সাথে তাল মিলাতে গিয়ে নিজের সন্তানদের সময় দিতে পারছি না।
চার দেওয়াল ঘেরা বদ্ধ নগরীতে জায়গা খুঁজে না পেয়ে সময় কাটানোর অন্যতম মাধ্যম হিসেবে শিশুরা বেছে নিচ্ছে ইন্টারনেট বা স্মার্টফোন যা তাদের অনাগামী ভবিষ্যৎ কে এক কালো ছায়ার দিক নির্দেশনা করছে।
সুতরাং শিশুর বেড়ে উঠা হোক বিশুদ্ধ, পরিপূর্ণ। কেননা, আজকের শিশু আগামীর সূর্যোদয়। একটি জাতির সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হচ্ছে শিশুরা। বেগম সুফিয়া কামাল-এর একটি কবিতা আমাদের পাঠ্যবইয়ে ছিল। তা হল-
‘আমাদের যুগে আমরা যখন
খেলেছি পুতুল খেলা
তোমরা এখন সেই বয়সেই
লেখাপড়া করো মেলা’
তো আমরা সেই লেখাপড়া মেলা করা শিশুরা বড় হয়ে গেছি। এখন পুরো পৃথিবীময় আমাদের শিশুরা চষে বেড়াচ্ছে ইন্টারনেট নিয়ে।
পৃথিবীর নির্মল আলোয় আসা শিশুদের মাঝে লুকায়িত থাকে আগামীর স্বপ্ন। আমাদের সোনালী স্বপ্নীল ভবিষ্যৎ। শিশুরাই হবে দেশ ও জাতি গঠনের সু-কারিগর। শিশুর শৈশব, কৈশোরের লালিত স্বপ্নভূমির ভিত্তি মজুত করতে হবে। শিশুদের আমাদের দেশীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে অবগত করতে হবে। আগামীর সূর্যোদয় যেনো চারপাশকে আলোকিত করে, তেমনিভাবে তাকে গড়ে তুলতে হবে। শিশুর শৈশব স্বপ্ন বিকশিত হবে জীবন পরিবর্তনের নব ধারায়, নবরূপে। আর, এরই সাথে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি সাফল্যের শীর্ষ ধারায় পৌঁছে যাবে।
চারপাশের মানুষগুলোকে পরিলক্ষিত করছি প্রতিক্ষণ। ভালো থাকতে চাই এবং ভালো রাখতে চাই চারপাশটাকে। সুন্দর আগামী দিনের অনুপ্রেরণা যোগাতে চাই চারপাশটায়। সবসময় চাই, গাছের চারার পরিচর্যা করতে, যাতে তা ফুল দেয় এবং তার সুবাস ছড়াবে সবখানে, আর তাই, জেগে আছি আজো স্বপ্ন বাস্তবায়নে। আমি চাই না, আমাদের ফুটফুটে ভবিষ্যৎগুলো অমানিশার কালো মেঘে চাপা পড়–ক। চিরায়ত বাংলার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, কৃষ্টি এসব কিছু জানানো, বুঝানো ও শিখানোর মধ্য দিয়ে সংস্কৃতিবান, ঐতিহ্যবান ও কৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ হিসেবে তাদের গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ টুকু নিতে হবে সামাজিকভাবে, সরকারীভাবে, আমাকে ও আপনাকে। এই চ্যালেঞ্জ টুকু আমরা নিব নবজাতকের কাছে এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

মুনমুন বড়–য়া চৌধুরী
দর্শন বিভাগ
মাষ্টার্স (নিয়মিত)
চট্টগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজ
চট্টগ্রাম।

আইন ও প্রতিকার

জাতিসংঘ প্রণীত শিশু অধিকার সনদে ১৮ বছরের কম বয়সী প্রত্যেককে শিশু বলা হয়েছে।বাংলাদেশের বিভিন্ন আইনে ১৫ বছরের কম বয়সী প্রত্যেককে শিশু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।তাই ১৪ বছরের মধ্যে সকলেই এ দেশের শিশু। জাতিসংঘের শিশু সনদ এখন একটি আন্তর্জাতিক আইন। এতে বলা হযেছে, শিশুর বেঁচে থাকা তাদের জন্মগত অধিকার। এরই সাথে শিশুর জন্য নিচের অধিকার গুলির কথাও মনে রাখতে হবে আমাদের। ক) স্নেহ, ভালবাসা ও সমবেদনা পাওয়ার অধিকার, খ) পুষ্টিকর খাদ্য ও চিকিৎসা সুবিধা পাওয়ার অধিকার, গ) অবৈতনিক শিক্ষার সুযোগ, ঘ) খেলাধুলা ও আমোদ-প্রমোদের পূর্ণ সুযোগ পাওয়ার অধিকার, ঙ) একটি নাম ও নাগরিকত্ব, চ) পঙ্গু শিশুদের বিশেষ যত্ন ও সেবা শুশ্র“ষা পাওয়া অধিকার, ছ) দুর্যোগের সময় সবার আগে ত্রাণ ব্যবস্থা পাওয়ার অধিকার, জ) সমাজের কাজে লাগার উপযোগী হয়ে গড়ে ওঠার এবং ব্যক্তি সামর্থ অর্থাৎ সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পাওয়ার অধিকার, ঝ) শান্তি ও বিশ্ব ভ্রাতৃত্বে মনোভাব নিয়ে গড়ে ওঠার সুযোগ পাওয়ার অধিকার, ঞ) এ সব অধিকার জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র ও ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে বিশ্বের সব শিশুর ভোগের অধিকার থাকবে।বাংলাদেশে শিশুদের অধিকার রক্ষা ও তাদের বিকাশের জন্য রয়েছে নানা আইন। কিন্তু তার পরেও বাংলাদেশে লঙ্ঘিত হচ্ছে শিশু অধিকার। সমাজ থেকে শিশু-কিশোরদের যেসব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করার কথা তা পদে পদে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। শিশুনীতিকে পাশ কাটিয়েই শিশুদের ভারী গৃহশ্রমসহ বেআইনি কাজে যুক্ত করা হচ্ছে।
দেশে ১৪ বছরের কম বয়সীদের গৃহশ্রমে নিযুক্ত না করায় হাইকোর্টের রায় ঘোষণার পরও তা কার্যকর হচ্ছে না। বাংলাদেশে গৃহকর্মে নিয়োজিতদের সিংহভাগই কিশোর-কিশোরী ও শিশু। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ-২০১০ সালের তথ্যানুযায়ী গৃহকর্মে নিয়োজিত মোট শিশু (৫-১৭ বছর বয়সী) শ্রমিক এক লাখ ২৫ হাজার। জাতীয় শিশুনীতি-২০১০ এর খসড়ায় বলা হয়েছে, ১৪ বছরের কম বয়সীদের সার্বক্ষণিক শিশুশ্রমে নিয়োগ করা যাবে না, কিন্তু বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে প্রায় ৩০০ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ অর্থনৈতিক কাজে শিশুরা শ্রম দিচ্ছে।দেশের প্রচলিত আইনে শিল্প কারখানায় শিশু শ্রম নিষিদ্ধ হলেও জীবিকার প্রয়োজনে শৈশব অবস্থায় অনেক শিশুকে নানা ধরনের শ্রমে নিয়োজিত হতে হচ্ছে ৷ শহর, গ্রাম উভয় অঞ্চলেই শিশু শ্রমিক নিয়োগ করা হয় ৷ সরকারের পরিসংখ্যান বিভাগের হিসেব মতে দেশের মোট শ্রমিকের ১২% শিশু শ্রমিক; এ হিসেবে কেবল মাত্র নিবন্ধনকৃত শিল্প প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিশু শ্রমিকদের ধরা হয়েছে ৷ অনিবন্ধনকৃত বা ননফরমাল সেক্টরে কর্মরত শিশু শ্রমিকদের হিসেব করলে এ সংখ্যা আরো বাড়বে ৷ শুধু শহরাঞ্চলেই চরম দারিদ্র্য ও বঞ্চনার মাঝে ১৫ বছরের কম বয়সী যে সকল শিশু শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে তাদের সংখ্যা ১ঌঌ০ সালে প্রায় ২ঌ লক্ষ বলে এক সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে ৷

আরও অতি বাস্তবতা হল নুন আনতে যাদের পান্তা ফুরায় তাদের ঘরে সন্তান এলে সে শিশুটি হয় অবহেলিত, নিগৃহীত ও অধিকার বঞ্চিত। পরিবারের মধ্যেই সে শিশু পরগাছার মত বেড়ে ওঠে। দারিদ্রের কারণেই শিশুরা একটি কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড়ায়। অতি অল্প বয়সে ভারী শ্রমের পথ বেছে নিয়ে মেনে নেয় সম্ভাব্য পঙ্গুত্বকে। নানা প্রতিবন্ধকতার সাথে যুদ্ধ করে বেড়ে ওঠে অধিকার বঞ্চিত শিশুরা। শিশুরা অনেক ক্ষেত্রে বয়স্ক শ্রমিকের কাজ করে প্রাপ্য মজুরী থেকে বঞ্চিত হয়। অদক্ষ শ্রমের দোহাই দিয়ে শিশুটিকে অধিক খাটিয়েও ন্যায্য পারিশ্রমিক দেয়া হয় না। শিশু শ্রমিকরা আইনের পথ চেনে না। ওরা নীরবে বেঁচে থাকার তাগিদে মুখ বুজে কাজ করে। পেটের জ্বালায় শিশুরা মালিক আর মনিবের দুর্ব্যবহার, অবহেলা সহ্য করেও স্বল্প আয়ে কাজ করে। আবার কোন শিশু জড়িয়ে পড়ে নানা রকম সমাজ বিরোধী কাজের সাথে। অথচ শিশুরা দেশের ভবিষ্যৎ জনশক্তি, আজকের শিশু আগামী দিনের নাগরিক এবং দেশের কর্ণধার। শিশুই আমাদের আশা ভরসা। শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সর্ব প্রথম দেশ থেকে দারিদ্র দূর করতে হবে। দূর করতে হবে নানা কুসংস্কার।যে শিশু আগামীর নাগরিক, সে শিশুর জীবন যদি অরক্ষিত হয়ে যায় তবে আমাদের গোটা সমাজই বিপণ্ণ হয়ে পড়বে। অতীত যেমন আমাদের মাঝে বেঁচে আছে। আমরাও বেঁচে থাকবো ভবিষ্যতের মাঝে। হয়তো ঠিক আমরা নই-আমাদের কীর্তি আর আমাদের স্বপ্ন। শিশুদের হাতেই জাতির উন্নয়ন সম্ভাবনার চাবিকাঠি তাই শিশুদেরকে গড়ে তুলতে হবে আমাদেরই। শিশুরা জাতির সেরা সম্পদ। আজ যারা শিশু, আগামীকাল হবে তারাই দেশ গড়ার সৈনিক। শিশুকে তার প্রাপ্য পূর্ণ অধিকার দিয়ে গড়ে তুলতে পারলেই সার্থক হবে বাংলাদেশ।

Scroll To Top