১১টি উপজেলায় আজ বৃহস্পতিবার সকাল-সন্ধ্যা হরতালের ডাক দিয়েছে স্থানীয় বিএনপি

প্রকাশ:| বৃহস্পতিবার, ২০ ফেব্রুয়ারি , ২০১৪ সময় ০৯:১৬ পূর্বাহ্ণ

বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের প্রথম পর্যায়ের ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। গতকাল বুধবার দেশের ৪০ জেলার ৯৭টি উপজেলায় ভোট গ্রহণ করা হয়।
বিরোধী দলবিহীন ‘একতরফা’ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ৪৪ দিনের মাথায় অনুষ্ঠিত এ স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে গ্রাম-গঞ্জে মানুষের উৎসাহ ছিল চোখে পড়ার মতো। গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করলেও উপজেলা নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতসহ ১৯-দলীয় জোট অংশ নিয়েছে। ফলে কাগজে-কলমে নির্দলীয় এ নির্বাচন কার্যত আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কাছে জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের নির্বাচনে পরিণত হয়েছে।
গতকাল সকাল আটটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত ৯৭ উপজেলার ছয় হাজার ৮৮৯টি কেন্দ্রে প্রথম দফার ভোট গ্রহণ করা হয়। রাত দুইটায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ৯১টি উপজেলার বেসরকারি ফলাফল পাওয়া গেছে। তাতে চেয়ারম্যান পদে বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীরা ৪০টি উপজেলায়, আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থীরা ৩১টিতে, জামায়াত-সমর্থিত প্রার্থীরা ১১টিতে, বিএনপির বিদ্রোহীরা তিনটিতে, জাতীয় পার্টি-সমর্থিত প্রার্থী একটিতে, নির্দলীয় প্রার্থীরা দুটিতে এবং পার্বত্য এলাকায় জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ও ইউপিডিএফের প্রার্থীরা তিনটি উপজেলায় জয়লাভ করেছেন।
প্রথম আলোর প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর অনুযায়ী, অন্তত ১৬টি উপজেলার ৬৫টি কেন্দ্রে নির্বাচনী অনিয়ম হয়েছে। এর মধ্যে ছিল ব্যালট পেপারে সিল মারা, ককটেল ফাটিয়ে ব্যালট বাক্স ও নির্বাচনী সরঞ্জাম ছিনতাই, জাল ভোট ও কেন্দ্রের বাইরে সংঘর্ষ। তবে বিএনপি দাবি করেছে, ৯৭টি উপজেলার ৭৬৩টি কেন্দ্রে অনিয়ম হয়েছে।
অনিয়মের অভিযোগ এনে ১১টি উপজেলায় আজ বৃহস্পতিবার সকাল-সন্ধ্যা হরতালের ডাক দিয়েছে স্থানীয় বিএনপি। উপজেলাগুলো হলো মেহেরপুর সদর, পাবনার সুজানগর, বরিশালের বাকেরগঞ্জ ও গৌরনদী, ঝিনাইদহের সদর ও শৈলকুপা, নড়াইয়ের কালিয়া, সিরাজগঞ্জের সদর ও কাজীপুর, বগুড়ার সোনাতলা এবং ভোলার লালমোহন।
বিচ্ছিন্ন এসব ঘটনার বাইরে বাকি ভোটের চিত্র অন্য রকম। রাস্তায় ছিল সেনাবাহিনী, র‌্যাব ও পুলিশের টহল। কেন্দ্রের ভেতরে ভোট দিচ্ছেন ভোটাররা। বাইরে কিছুটা দূরে গল্পে মেতে আছেন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা। চলছে চা পান, কোথাও আবার বিক্রি হচ্ছে বাহারি সব খাবার। আর প্রার্থীরা এক কেন্দ্র থেকে আরেক কেন্দ্রে ছুটে বেড়াচ্ছেন।
সকাল ১০টার দিকে খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার ব্রহ্মগাতী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে এসে ভোট দেন পপি বেগম। নির্বাচন কেমন হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতি পারিনি। এবার ভোট দিতি পেরে খুব ভালো লাগছে।’
বেলা ১১টার দিকে একই উপজেলার এম এ মজিদ ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্রে ভোট দিতে আসেন আবদুল হামিদ। তিনি বলেন, ‘এইবার সব দল মিলের নির্বাচন করতেছে। তাই ভোট দিতে আসলাম। সব সময় যদি সব দল মিলের কাজ করে তাহলি দেশে কোনো মারামারি, খুনখারাপি থায়ে না।’
ঢাকার পাশে নবাবগঞ্জ ও দোহার উপজেলার প্রায় সব কেন্দ্রে নারী ভোটাররাই ছিলেন নির্বাচনের প্রাণ। ভোটারের সারিতে ছিলেন প্রবীণেরাও। বেলা পৌনে ১১টার দিকে ঢাকার দোহার উপজেলার কুসুমহাটী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে লাঠিতে ভর করে ভোট দিতে আসেন জমিলা খাতুন (৮৫)। তাঁর বক্তব্য, ‘সামনে আর যদি ভোট দিতে না পারি!’
এর বিপরীতে গতকাল সবচেয়ে বেশি বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটে বগুড়ার সোনাতলায়। সেখানে অন্তত ১৫টি কেন্দ্রে ব্যালট পেপারে সিল মারা, ব্যাটল বাক্স ও নির্বাচনী সরঞ্জাম ভাঙচুর-ছিনতাই, ব্যালট পেপার ছিঁড়ে ফেলা ও ককটেল হামলার ঘটনা ঘটে। এখানে পাঁচ কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে। সারা দেশে স্থগিত করা হয়েছে ১১ কেন্দ্রের ভোট।
ভোট গ্রহণের সময় অনিয়মের কারণে বিভিন্ন জায়গায় দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। সোনাতলায় দুই ব্যক্তিকে দুই বছর করে এবং দুই নারীকে এক বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। মেহেরপুরের সোনাপুরে এক ব্যক্তিকে ১০ দিনের এবং ঝিনাইদহ সদর উপজেলার দোগাছি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ফয়জুল্লাহ ফয়েজকে তিন মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। মাগুরায় কেন্দ্রে গিয়ে ভোট চাওয়ায় দুই ব্যক্তিকে ও মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরে জাল ভোট দেওয়ায় একজনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
বরিশালের গৌরনদীতে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ও পুলিশ কর্মকর্তাকে এবং শৈলকুপা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) প্রত্যাহার করা হয়।
নির্বাচন কমিশন বলেছে, দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। আওয়ামী লীগও প্রায় একই দাবি করে বিএনপির সব অভিযোগ মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিয়েছে। বিএনপি তিন দফা ব্রিফিং করে ৭৬৩টি কেন্দ্রে নানা ধরনের অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ এনেছিল।
বেসরকারি নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ব্রতী বলেছে, উৎসবমুখর পরিবেশে অবাধ ও শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন হয়েছে। ২৩টি উপজেলায় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ শেষে গতকাল তারা প্রাথমিক প্রতিবেদন দেয়।
১৯৮২ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পর উপজেলা পরিষদ গঠন করেন। ১৯৮৫ সালে দেশের ৪৬০টি উপজেলা পরিষদে প্রথমবারের মতো নির্বাচন হয়। দ্বিতীয়বার নির্বাচন হয় ১৯৯০ সালে। এরপর দীর্ঘ ১৯ বছর এ নির্বাচন হয়নি। ২০০৯ সালে তৃতীয়বার উপজেলা পরিষদ নির্বাচন হয়। চতুর্থবারের উপজেলা নির্বাচন শুরু হয়েছে গতকাল।
২৭ ফেব্রুয়ারি ১১৭ উপজেলায় দ্বিতীয় দফার ভোট গ্রহণ করা হবে। ১৫ মার্চ তৃতীয় দফায় ৮৩ উপজেলায় এবং ২৩ মার্চ চতুর্থ দফায় ৯২টি উপজেলায় ভোট গ্রহণ করা হবে।


আরোও সংবাদ