ফরায়েজি হত্যা মামলার বছর পেরিয়ে গেলেও চার্জশীট হয়নি!

প্রকাশ:| সোমবার, ৫ ডিসেম্বর , ২০১৬ সময় ০৮:৩২ অপরাহ্ণ

 

গিয়াস উদ্দিন, পেকুয়া
এক বছর দুই মাস হল পেকুয়া উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আ ক ম সাহাবউদ্দিন ফরায়েজি হত্যাকান্ড। ঘটনার পর একমাস তদন্ত করেছে থানা পুলিশ। এরপর মামলার বাদী গণভবনে দেখা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে। চলতি বছর ১৭ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ভিকটিমের বাড়িতে গিয়ে খোঁজ খবর নেন। ফল হিসেবে মামলাটির তদন্ত যায় কক্সবাজার সিআইডির কাছে। সিআইডির তদন্তও এক বছর পেরিয়েছে। কিন্তু মামলার চার্জশীট হয়নি। এ নিয়ে হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভিকটিমের ছেলে ও মামলার বাদী মেহেদী হাসান ফরায়েজি। তদন্ত কারী সংস্থার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আলোচিত এ মামলার তদন্ত গুছিয়ে আনা হয়েছে।

জানা গেছে, গত বছরের নভেম্বর মাসে মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পান কক্সবাজার জেলা সিআইডি’র সহকারী পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান। এর আগে থানা পুলিশ একমাস তদন্ত করে চাঞ্চল্যকর এ মামলাটি।

নিহতের পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০১৫ সালের ৬ অক্টোবর রাতে ফরায়েজিকে গভীর জঙ্গলে নিয়ে নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। পরদিন ভোরে উপজেলার টৈটং ইউনিয়নের একটি নির্জন পাহাড়ি ছড়া থেকে ফরায়েজির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় নিহত ব্যক্তির ছেলে মেহেদী হাসান ফরায়েজি বাদি হয়ে পেকুয়া থানায় ১৭ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। গ্রেফতারকৃত আসামিদের তথ্য অনুযায়ী এরপর আরো দুইজনকে আসামি হিসেবে শনাক্ত করা হয়। ঘটনার এক মাস পর ১ নভেম্বর সন্ধ্যায় গণভবনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ফরায়েজির স্ত্রী জেবুন্নেছা। সঙ্গে ছিলেন ছেলে মেহেদী হাসান ফরায়েজি ও পেকুয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ। এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের শান্তনা দেন এবং হত্যাকান্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের আশ্বাস দিয়েছিলেন। এরপর মামলাটির তদন্ত সিআইডিতে যায় বলে জানিযেছেন মেহেদী হাসান ফরায়েজি।

নিহতের পরিবারের দাবি, তিন কারণে পরিকল্পিত হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছিলেন ফরায়েজি। প্রথমত প্রতিবেশী নেজামত উল্লাহ গংদের সাথে জমিজমার বিরোধ, দ্বিতীয়ত, স্থানীয় বিএনপি নেতা মুসলেম উদ্দিনের সাথে রাজনৈতিক বিরোধ, ডাকাত চক্র বোরকা বাহিনীর সদস্য ওয়াসিমকে পুলিশে ধরিয়ে দেয়ায় বাহিনীর প্রধান শাহাদাত মেম্বার ওরফে কিলার শাহাদাত এবং তার ডানহাত বলে পরিচিত অপর এক প্রভাবশালীর ক্ষুব্ধ হওয়া।

মামলার বাদি মেহেদীর দাবি, ‘সানাউল্লাহ, ছমিউল্লাহ ও নেজামত উল্লাহ-তারা তিনভাই। দীর্ঘদিন ধরে জায়গা নিয়ে এ তিন ভাইয়ের সাথে তার বাবার বিরোধ চলছিল। ঘটনার ৬ মাস আগে পুলিশের মধ্যস্থতায় একটি জায়গা আপোষ মীমাংসা করে তার বাবাকে বুঝিয়ে দিলে ক্ষুব্ধ হন নেজামত উল্লাহ এবং তার ভাইয়েরা। পুলিশ ঘটনাস্থল ত্যাগ করার পর ৬ মাসের মধ্যে তার বাবাকে মেরে ফেলার প্রকাশ্যে হুমকি দেন তারা। এক সময় তার বাবার রাজনৈতিক সহচর ছিলেন স্থানীয় ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান মোসলেম উদ্দিন। নানা কারণে তার বাবাকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ভাবতেন মোসলেম। দলে সুবিধা করতে না পেরে পরে বিএনপিতে যোগ দেন এ মোসলেম উদ্দিন।

জানা গেছে, ২০১৫ সালের ৬ অক্টোবর বিকেলে আছরের নামায পড়ে পান আনতে স্থানীয় হাজির বাজারে যান ফরায়েজি। সেখানে নির্মল নামে হোমিওপ্যাথ এক ডাক্তার বন্ধুর দোকানে আড্ডা দেন তিনি। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে ফরায়েজিকে বাড়ি থেকে বাজারে আনা-নেওয়াকারী পূর্ব পরিচিত অটোরিকশা চালক জসিমের অনুরোধে তার গাড়িতে চড়ে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন ফরায়েজি। এসময় প্রচুর বজ্রসহবৃষ্টি হচ্ছিল। পথিমধ্যে স্ত্রী জেবুন্নেছা ফোন করলে ফরায়েজি অস্বাভাবিক সুরে বলেন, ‘আমি ফরেস্ট অফিস এলাকায় আছি।’

মোবাইল ফোনে কথা বলার সময় ফরায়েজির আশপাশে অনেক লোকের শোরচিৎকার শুনতে পান জেবুন্নেছা। এরপর একাধিকবার চেষ্টা করলেও স্বামীর মোবাইল ফোন বন্ধ পান তিনি। বিষয়টি ছেলে মেহেদীকে জানান জেবুন্নেছা। বাবা বাসায় ফিরতে দেরি হওয়ায় সম্ভাব্য সব জায়গায় মোবাইল ফোনে খোঁজ নেন মেহেদী। পরে বাবার নিত্যদিনের ব্যস্ততা ধরে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন মেহেদী। এদিকে স্বামীর অপেক্ষায় থাকতে থাকতে মধ্যরাতে ঘুমিয়ে পড়েন জেবুন্নেছাও। রাত দুইটায় হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে উঠেন তিনি। গভীর রাত পর্যন্ত বাসায় ফিরে না আসায় স্বামীর জন্য চিন্তিত হয়ে পড়েন জেবুন্নেছা। গভীর রাতেও বাসায় ফিরে না আসায় স্বামীর খোঁজে থানায় পাঠান ছেলে মেহেদীকে। থানায় গিয়ে বাবার হদিস দিতে পুলিশের সহায়তা চান মেহেদী। তখন ভোর আনুমানিক সাড়ে চারটা।

এ সময় সিএনজি অটোরিকশা চালকের কাছে গিয়ে কাকে নিয়ে আসছেন বলে জানতে চান ছমিউল্লাহ। ওই গাড়িতে মেহেদী আসার বিষয়টি জেনে দ্রুত তল্পিতল্পা নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে যান ছমিউল্লাহ। এ দৃশ্য দেখে ফেলেন জেবুন্নেছা। ভোর সোয়া পাঁচটার দিকে ফরায়েজি ‘বজ্রপাতে’ মারা গেছেন বলে ছমিউল্লার বড়বোন সুনিয়ারা বেগম তার ছোটবোন জীবন আরাকে বারবাকিয়ার শ্বশুর বাড়িতে ফোনে করে খবর দেন। ভোর সাড়ে ছয়টার দিকে স্থানীয় টৈটং এলাকার মালগড়া ছড়ায় একটি লাশ পড়ে থাকার খবর পেয়ে সেখানে ছুটে যান ছেলে মেহেদী। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখেন, ছড়ায় পড়ে থাকা লাশটি তার বাবা মুক্তিযোদ্ধা ফরায়েজির। এ ঘটনায় ১৭ জনের নাম উল্লেখ করে থানায় মামলা দায়েরকারী মেহেদী হাসান ফরায়েজি জানান, পিতার হত্যাকারীদের বিচার দেখার প্রত্যাশায় আছি। কিন্তু তদন্তইতো এখনো শেষ হল না। জানা গেছে, জেলা পরিষদ নির্বাচনে কক্সবাজার জেলা থেকে মেহেদী সদস্যপদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।