২৭৩ প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রায় ১৪৩ কোটি টাকা পৌরকর পাওনা

প্রকাশ:| বুধবার, ৬ ডিসেম্বর , ২০১৭ সময় ১১:২৪ পূর্বাহ্ণ

সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া পৌরকর পরিশোধ করছে না চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে (চসিক)। চলতি অর্থ বছরের (২০১৭–২০১৮) পাঁচ মাস অতিবাহিত হলেও ধার্যকৃত পৌরকরের মাত্র ২ দশমিক ৩৮ শতাংশ পরিশোধ করেছে প্রতিষ্ঠানগুলো। এমন পরিস্থিতিতে, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যে সব মন্ত্রণালয়ের অধীন ওইসব মন্ত্রণালয়ের সচিবদের কাছে পৃথক চিঠি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে চসিক। পত্রে মন্ত্রণালয়গুলোর অধীনস্থ সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ মঞ্জুর করার অনুরোধ জানানো হবে। পত্র পাঠানোর অংশ হিসেবে গতকাল সোমবার চসিকের রাজস্ব শাখা ৩৩ মন্ত্রণালয়ের অধীন ২৭৩ প্রতিষ্ঠানের একটি তালিকাও তৈরি করেছে। তালিকানুযায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে চসিকের ১৪২ কোটি ৩৩ লাখ ৩৯ হাজার ২৬০ টাকা পৌরকর পাওনা আছে।

এদিকে আজ মঙ্গলবার প্রস্তুতকৃত তালিকাটি এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র চসিক মেয়র আ.জ.ম নাছিরের কাছে উপস্থাপন করা হবে। মেয়র অনুমোদন দিলেই চলতি সপ্তাহে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হবে। বিষয়টি চসিকের প্রধান নিবার্হী কর্মকর্তা মো. সামসুদ্দোহা দৈনিক আজাদীকে নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ বকেয়া কর পরিশোধের জন্য আমরা মন্ত্রণালয়গুলোকে দাপ্তরিক চিঠি পাঠাব। আগামীকাল (আজ) মেয়রের কাছে ফাইল উপস্থাপন করা হবে। অনুমোদন পেলেই এ সপ্তাহে চিঠি পাঠাবো। প্রাথমিকভাবে চিঠির ড্রাফটও প্রস্তুত করেছি। ’

চসিকের রাজস্ব শাখা সূত্রে জানা গেছে, নগরীতে সরকারি হোল্ডিং আছে ২ হাজার ২৮১টি। এরমধ্যে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের হোল্ডিংও রয়েছে। হোল্ডিংগুলোর বিপরীতে সরকারি বিধান মেনেই পৌরকর ধার্য করে থাকে চসিক। চলতি অর্থ বছর পর্যন্ত সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের হোল্ডিংগুলোর বিপরীতে ২১৪ কোটি ৪৫ লাখ ৩০ হাজার ১৩৮ টাকার পৌরকর ধার্য করে। এর বিপরীতে গত ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত মাত্র ৫ কোটি ৯৭ লাখ ৫২ হাজার ৮৬ টাকা পরিশোধ করেছে প্রতিষ্ঠানগুলো।

এদিকে বকেয়া পৌরকর পরিশোধ করার জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে বারবার তাগিদ দিয়েছে চসিক। দীর্ঘদিন ধরে অনাদায়ী এসব পৌরকর আদায়ে চসিক ইতোমধ্যে প্রতিটি সংস্থার কাছে পৃথক চিঠি প্রেরণ করেছে। তবুও আশানুরূপ সাড়া মিলছে না। বিভিন্ন সময়ে সেবাসংস্থাগুলোর সাথে অনুষ্ঠিত বৈঠকেও বকেয়া কর পরিশোধে অনুরোধ করা হয়েছিল। গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মন্ত্রী বরাবর ডি.ও লেটারও দিয়েছিলেন চসিক মেয়র। গত ৩০ নভেম্বরও রেল মন্ত্রীকে একটি ডি.ও লেটার দিয়েছিলেন মেয়র। এর আগে ২৩ মে চসিকে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানদের নিয়ে অনুষ্ঠিত সমন্বয় সভায় মেয়র বকেয়া কর পরিশোধে তাগাদা দিয়েছিলেন। ‘সভায় মেয়র বিভিন্ন সংস্থার কাছে চসিকের পাওনা পৌরকর প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘এখানে অপরাজনীতি আছে। তাই সরকারি প্রতিষ্ঠান সহযাগিতা না করলে অন্যরা সুযোগ পাবে।’

সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বকেয়া কর পরিশোধ না করা করা প্রসঙ্গে চসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা ড. মুহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহের কাছেই বড় অংকের পৌরকর বকেয়া আছে। এসব টাকা আদায়ে আমরা ইতোমধ্যে আটটি সার্কেলের মাধ্যমে চিঠি দিয়েছি। এখন আমরা মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিব। আশা করছি বকেয়া কর পরিশোধে মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বাজেট মঞ্জুর করবে।

যে ৩৩ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিবে চসিক :

রাজস্ব শাখার তথ্য অনুযায়ী, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কাছে বকেয়া আছে ১৫ কোটি ৩২ লাখ ৭৮ হাজার ৮৩৩ টাকা। মন্ত্রণালয়টির আওতায় ১৭টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে নগরীতে। মূলত এসব প্রতিষ্ঠানের পৌরকর বকেয়া রয়েছে। আর চিঠিতে মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানানো হবে, তাদের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানগুলোকে যেন চসিকের বকেয়া কর পরিশোধের তাগিদ দেয় মন্ত্রণালয় এবং বাজেটও যেন মঞ্জুর করে।

একইভাবে ‘আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়’র আওতাভুক্ত জেলা রেজিস্ট্রার ও জেলা দায়রা জজের কাছে পাওনা ৩৬ লক্ষ ৩২ হাজার ২০১ টাকা। সিএমপিসহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন ১৮ প্রতিষ্টানের কাছে পাওনা ১ কোটি ৪৭ লাখ ৯৬ হাজার ৬৩৬ টাকা,প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে পাওনা ৪ কোটি ৭৯ লাখ ১৫ হাজার ৩১ টাকা, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন নগরীর বিভিন্ন স্কুল–কলেজসহ ৩৮টি প্রতিষ্ঠানের কাছে ৩ কোটি ৫৩ লাখ ১৬ হাজার ৪৪০ টাকা পৌরকর পাবে চসিক।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন নগরীতে ব্যাংক, বীমা, কাস্টমসহ ১৫টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে ১৯ লাখ ৩১ হাজার ৩৯৬ টাকা পৌরকর পাবে চসিক। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ, সিভিল সার্জন, জেনারেল হাসপাতাল, ওষুধ প্রশাসনসহ ১৫টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন। প্রতিষ্টানগুলোর পৌরকর বকেয়া রয়েছে ১ কোটি ৮২ লাখ ৭৭ হাজার ১ টাকা। ডাক,টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীন টিএন্ডটি, পোস্ট মাস্টারসহ তিনটি প্রতিষ্ঠানের ৫ লাখ ৮০ হাজার ৯৬৮ টাকা,বিভাগীয় বন কর্মকর্তা, বন গবেষনাগার ও পরিবেশ অধিদপ্তরসহ পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের অধীন ১৬টি প্রতিষ্ঠানের কাছে ১ কোটি ১০ লাখ ৪ হাজার ৩০৫ টাকা, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অধীন রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের কাছে ৮৬ কোটি ১ লাখ ২৮ হাজার ৯৮৫ টাকা, সওজ,বিআরটিসিসহ সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীন ৯ প্রতিষ্ঠানের কাছে ৩৯ লাখ ৯১ হাজার ৩৪৪ টাকা, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন ১২ প্রতিষ্ঠানের কাছে ৫ কোটি ১২ লাখ ৪৩ হাজার ৪০৩ টাকা, স্থানীয় সরকার পলহ্মী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অধীন চট্টগ্রাম ওয়াসা, জেলা পরিষদসহ ১১ প্রতিষ্ঠানের কাছে ১ কোটি ১৫ লাখ ৩৬ হাজার ১০৫ টাকা, খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন ৫ প্রতিষ্ঠানের কাছে ৩২ লাখ ৯৯ হাজার ৭শ টাকা, কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন ৯ প্রতিষ্ঠানের কাছে ৮৫ লাখ ৫ হাজার ৪৫ টাকা। বিদ্যুৎ,জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন বিদ্যুৎ বিভাগের ৮ প্রতিষ্ঠানের কাছে ৪৬ লাখ ৫০ হাজার ৩৩৪ টাকা এবং একই মন্ত্রণালয়ের জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ বিভাগের ১১ প্রতিষ্ঠানের ১৪ লাখ ৬৮ হাজার ৭৪৬ টাকা পৌরকর পাবে চসিক। শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন ১৪ প্রতিষ্ঠানের ১২ কোটি ১১ হাজার ৭৭১ টাকা, ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীন ৬ প্রতিষ্ঠানের কাছে ৭৩ লাখ ৯৭ হাজার ৬৭৯ টাকা, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীন ২ প্রতিষ্ঠানের কাছে ৬৯ লাখ ৯৫ হাজার ৩৫ টাকা, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন ৩ প্রতিষ্ঠানের কাছে ৬ লাখ ২৬ হাজার ৮৭৫ টাকা, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অধীন ৭ প্রতিষ্ঠানের কাছে ৩ কোটি ৯৯ লাখ ১৪ হাজার ১৮৯ টাকা, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীন ৬ প্রতিষ্ঠানের কাছে ২ কোটি ২৪ লাখ ৩৮ হাজার ২৭০ টাকা, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন ৫ প্রতিষ্ঠানের কাছে ৭ লাখ ৫৮ হাজার ৯৯০ টাকা, নৌ–পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীন ১০ প্রতিষ্ঠানের কাছে ১০ লাখ ১১ হাজার ৪২৯ টাকা, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন ২ প্রতিষ্ঠানের কাছে ৪ লাখ ৬৮ হাজার ৪শ টাকা, সমাজ মন্ত্রণালয়ের অধীন ৩ প্রতিষ্ঠানের কাছে ২১ লাখ ৮৪ হাজার ৪০ টাকা, সংস্কৃতি বিষযক মন্ত্রণালয়ের অধীন ৩ প্রতিষ্ঠানের কাছে ২২ লাখ ৯৪ হাজার ৭ টাকা,শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন ৪ প্রতিষ্ঠানের কাছে ২৬ লাখ ৫৮ হাজার ৬৬ টাকা, তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন ৭ প্রতিষ্ঠানের কাছে ১৯ লাখ ২৭ হাজার ৮০১ টাকা, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন ২ প্রতিষ্ঠানের কাছে ১৩ লাখ ১ হাজার ১৮৫ টাকা, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অধীন ৪ প্রতিষ্ঠানের কাছে ৬৯ লাখ ১৭ হাজার ১৪৩ টাকা এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীন পরমাণু শক্তি কেন্দ্রের কাছে পৌরকর বাবদ চসিকের পাওনা আছে ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা। এসব মন্ত্রণালয়কেও একইভাবে পৃথক চিঠি দেয়া হবে।