২৫টি পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা উচ্ছেদ হঠাৎ থেমে গেছে

প্রকাশ:| মঙ্গলবার, ২৩ জুন , ২০১৫ সময় ১১:৩৩ অপরাহ্ণ

বর্ষায় পাহাড় ধসে প্রাণহানি রোধে নগরীর ২৫টি পাহাড়ে গড়ে উঠা ৬৬৬টি অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা উচ্ছেদ হঠাৎ করেই মাঝপথে থেমে গেছে। এসব পাহাড়ে বসতি স্থাপনকারীদের মৃত্যুকূপে রেখেই দুই দিনের অভিযানে দায় সেরেছে জেলা প্রশাসন। এই দুই অভিযানে পাহাড় থেকে সবমিলিয়ে ৫৮টি স্থাপনা উচ্ছেদ করা হলেও এখনো পাহাড়েই থেকে গেছে ৬০৮টি স্থাপনা। চলতি বর্ষা মৌসুমে ভয়াবহ পাহাড় ধসের আশঙ্কা থাকার পরও এসব স্থাপনায় বসবাস করছেন কয়েক হাজার মানুষ। এখন সচেতন মহল থেকে প্রশ্ন উঠেছে, পাহাড় ধসে ফের আরেক দফা মৃত্যুর মিছিল সৃষ্টি হলেই কি ফের তৎপর হবে জেলা প্রশাসন?
পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি
২০০৭ সালের ১১ জুনই স্মরণকালের ভয়াবহ পাহাড় ধ্বসে চট্টগ্রামে ১২৭ জনের প্রাণহানি ঘটেছিল। আর এখন চলছে সেই জুন মাস। চট্টগ্রামে গতকাল থেকে মুষলধারে বৃষ্টির সাথে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। সে কারণে পাহাড় ধসে প্রাণহানির আশংকা করা হচ্ছে। মঙ্গলবার সদরঘাট থানার মাদারবাড়ীতে রেল গেট সংলগ্ন এলাকায় দেয়াল ধসে নারীসহ দুই জনের মৃত্যুর পর এই আশংকাকে আরো জোরালো করেছে। তবে যেই বৃষ্টিকে কেন্দ্র করে প্রাণহানীর এত ভয়, সেই বৃষ্টির কারণেই পাহাড়ে উচ্ছেদ অভিযান চালানো সম্ভব হচ্ছেনা বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসক।

সর্বশেষ গত ২ জুনের পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৯ জুন থেকে উচ্ছেদ অভিযান শুরুর কথা থাকলেও তা পিছিয়ে গত ১৪ জুন পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি উচ্ছেদে অভিযান শুরু করে জেলা প্রশাসন। ওই দিন লালখান বাজারের মতিঝর্ণায় গণপূর্তের পাহাড় থেকে ১২টি ও রেলওয়ের পাহাড় থেকে ছয়টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়।

এরপর গত ১৮ জুন চট্টগ্রামের মতিঝর্ণা এলাকায় এ কে খান কোম্পানির মালিকানাধীন পাহাড় থেকে ৪০টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে জেলা প্রশাসন। এরপর থেকে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীনতার কারণে পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি উচ্ছেদে আর কোন অভিযান পরিচালনা করেনি জেলা প্রশাসন।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন বলেন, ‘বৃষ্টির কারণে পাহাড়ে গড়ে উঠা অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান বন্ধ রয়েছে। আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে ফের উচ্ছেদ অভিযান শুরু হবে।’

তবে জেলা প্রশাসন সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, রমজান উপলক্ষে চলমান ভেজাল বিরোধী অভিযানের কারণেই মূলত পাহাড়ে উচ্ছেদ অভিযান চালাচ্ছে না জেলা প্রশাসন।

জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, বর্তমানে নগরীর ২৫টি পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে ৬৬৬টি পরিবার বসবাস করছে। এর মধ্যে নগরীর একে খান মালিকানাধীন পাহাড়ে ১৮৬ পরিবার, ইস্পাহানি পাহাড়ের দক্ষিণ পাশে হারুন খানের পাহাড় ও বায়তুন আমান সোসাইটির কাছে পাহাড়ে ৫টি, কৈবল্যধাম বিশ্ব কলোনি পাহাড়ে (পানির ট্যাংক) ২৭টি, লেকসিটি আবাসিক এলাকার পাহাড়ে ১২টি, আকবর শাহ আবাসিক এলাকা পাহাড়ে ২২টি।

পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে সিটি কর্পোরেশন পাহাড়ে ১১টি, ফয়েজ লেক আবাসিক এলাকার কাছে পাহাড়ে ৯টি, ফরেস্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউট অ্যাকাডেমির উত্তর পাশে মীর মোহাম্মদ হাসানের মালিকানাধীন পাহাড়ে ৩৮টি, নাসিরাবাদ শিল্প এলাকা সংলগ্ন পাহাড়ে ৩টি, জালালাবাদ হাউজিং সোসাইটি সংলগ্ন পাহাড়ে ৩৩টি, মতিঝর্ণা ও বাটালি হিল পাহাড়ে ৩২০টি পরিবার ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে। এ ১১টি পাহাড় ছাড়াও আরো ১৪টি পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি রয়েছে।

জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, বর্ষা মৌসুমে পাহাড় ও দেওয়াল ধ্বসে গত ৮ বছরে প্রায় ২০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এর মধ্যে ২০০৭ সালের ১১ জুন স্মরণকালের ভয়াবহ পাহাড় ধ্বসে চট্টগ্রামে ১২৭ জনের প্রাণহানি ঘটে। ২০০৮ সালের ১৮ আগস্ট লালখানবাজারের মতিঝর্ণা এলাকায় পাহাড় ধ্বসে মারা যান ১১ জন, ২০০৯ ও ২০১০ সালে নগরীর পাহাড়তলী, সিআরবি, ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে মারা যান আরও ১৫ জন।

২০১১ সালের ১ জুলাই পাহাড় ধ্বসে একই পরিবারের ৮ জনসহ বাটালি পাহাড়ের রিটেইনিং দেয়াল ধ্বসে ১৭ জন মারা যান। ২০১২ সালে ১৭ জুন নগরীর ফিরোজ শাহ কলোনিসহ বিভিন্ন এলাকায় ২৩ জন মারা গেছেন। ২০১৩ সালে পাহাড় ও দেয়াল ধ্বসে মৃত্যু হয়েছে কমপক্ষে ৫ জনের।

ভয়াবহ এ সব ট্রাজেডির পরও বেঁচে থাকা সহায়-সম্বলহীন মানুষের অন্য কোথাও ঠিকানা হয়নি। ২০০৭ সালে পাহাড় ধ্বসের ঘটনার পর চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে একটি কমিটি ২৮টি কারণ নির্ধারণ করে ৩৬টি সুপারিশ প্রণয়ন করে। তবে সুপারিশগুলো আজও বাস্তবায়ন হয়নি। বরং এখনও ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে এসব মানুষ।
পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্তের মধ্যে ছিল- পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসরতদের উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত রাখা, পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ করতে পাহাড়ে পুলিশ ও আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়োজিত থাকা, পাহাড়ে কাঁটাতারের ঘের দেয়া এবং সামাজিক বনায়নের আওতায় আনা, উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের জন্য আধুনিক ও উন্নতমানের সরঞ্জামাদি ক্রয় করা ইত্যাদি।

লালখান বাজারের আকবর কলোনীর বাসিন্দা শাহনাজ বেগম বলেন, ‘বর্ষা মৌসুম এলে পাহাড় ধসের শঙ্কা বাড়ে। এখানে ঘর ভাড়া অনেক কম। তাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করতে হয়।’

মতিঝর্ণা পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী মো. ইউসুফ জানান, ‘সামান্য আয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। তাই বাসা ভাড়া বাঁচাতে ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ে বসবাস করতে হচ্ছে। এখন আমাদের সরে যেতে বললেও বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় অন্যত্র যেতে পারছি না।’

এদিকে দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের কমপ্রিহেনসিভ ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট পারফরমেন্সের (সিডিএমপি) এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, শুধু বর্ষণের কারণে নয়, ভূমিকম্পেও চট্টগ্রামে পাহাড় ধসের ব্যাপক জানমালের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার বাংলাদেশের দক্ষিণে অবস্থিত। চট্টগ্রাম মিয়ানমার সীমান্তবর্তী। ইন্ডিয়ান টেকটোনিক প্লেট প্রতিবছর ৬ সেন্টিমিটার এবং বার্মাপ্লেট ২ সেন্টিমিটার করে বাংলাদেশকে ধাক্কা দিচ্ছে। চট্টগ্রাম এবং মিয়ানমারে টেকটোনিক প্লেটের অবস্থান। এই প্লেটটি কক্সবাজার থেকে ৩০ কিলোমিটার এবং চট্টগ্রাম শহর থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

এই প্লেট থেকে ১৭৬২ সালে রিখটার স্কেলে ৮ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল। এ পর্যন্ত ওই ফল্ট লাইনে আর কোনো বড় ধরনের ভূমিকম্প হয়নি। এই ফল্ট লাইনে ২৪৮ বছর ধরে শক্তি সঞ্চিত থাকায় যে কোনো মুহূর্তে চট্টগ্রামে বড় ধরনের ভূমিকম্প হতে পারে। যার ফলে মুহূর্তে ঘটতে পারে পাহাড় ধস। এতে ব্যাপক জানমালের ক্ষতি হবে। বৃষ্টির সময় ভূমিকম্প হলে কাদামাটির কারণে ক্ষতির পরিমাণ বাড়বে বহুগুণ।

এসব পাহাড়ে বালির পরিমাণ বেশি। বৃষ্টির সময় বালিতে পানি ঢুকে নরম হওয়ার পর ধসে পড়ে। বৃষ্টি ছাড়া ভূমিকম্পেও যে কোনো মুহূর্তে পাহাড়গুলো ধসে পড়তে পারে। বাটালি হিলের বর্তমান অবস্থান সমতলের সঙ্গে ৭৫ ডিগ্রিতে। কোনো দেয়াল নির্মাণ করে এ পাহাড় রক্ষা করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে দরকার আধুনিক এবং সঠিক পরিকল্পনা। আর এ ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ কঠিন, সময় সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুলও নয়।

অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, নেপাল ও চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সঠিক নিয়মে পাহাড় সংরক্ষণ করছে। তাতে তারা সুফলও পাচ্ছে। যারা চট্টগ্রামের পাহাড়গুলোর মালিকদের সঠিক নিয়মে পাহাড় সংরক্ষণে বাধ্য করতে হবে। যে পাহাড় ন্যাড়া তাতে ঘাস ও গাছ লাগিয়ে আচ্ছাদন তৈরি করার কথা দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের ওই সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) ভিসি ড. এম. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘চট্টগ্রামে অতিবৃষ্টি পাহাড় ধসের ফলে ফের ব্যাপক প্রাণহানীর শঙ্কা আছে। ভৌগলিক অবস্থানের কারণে চট্টগ্রাম মহানগরীর সব পাহাড়ই ঝুঁকিপূর্ণ। প্রাণহানী ও ক্ষয়ক্ষতি রোধে পাহাড়কে পাহাড়ের স্বরূপে থাকতে দিতে হবে। সেখানে বসবাসকারীদের অতি দ্রুত সরিয়ে দিতে হবে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়গুলোকে যথাযথ পরিচর্যার মাধ্যমে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে না পারলেও ঝুঁকিমুক্ত করতে হবে।’

পাহাড়ধস রোধে বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করে ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘অনেক সুপারিশ করা হলেও উল্লেখযোগ্য কোনো সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি। যার কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই পাহাড়ধসে প্রাণহানী ঘটছেই। এছাড়া পাহাড় ধসে দুর্যোগে যে পরিমাণ ক্ষতি হবে, তার চেয়ে বেশি ক্ষতি হবে আমাদের প্রস্তুতি না থাকার কারণে। জাপানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ প্রস্তুতির কারণে বিভিন্ন দুর্যোগের ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনতে সক্ষম হচ্ছে ।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স বিভাগ, সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), ওয়াসা, পিডিবি ও স্বাস্থ্য বিভাগসহ কারো কোনো প্রস্তুতি আছে বলে আমার জানা নেই। তাই যে কোনো দুর্যোগ মোকাবেলা আমাদের জন্য দুরহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

জনসাধারণের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি করা সবচেয়ে বড় কাজ বলে মনে করেন এ বিশেষজ্ঞ।