২৪ জন হত্যার তিন দশক পেরিয়ে গেলেও শেষ হয়নি বিচার

নিউজচিটাগাং২৪/ এক্স প্রকাশ:| বুধবার, ২৪ জানুয়ারি , ২০১৮ সময় ০৬:২৪ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রামের লালদীঘি মাঠে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার জনসভার আগে গুলি চালিয়ে ২৪ জনকে হত্যার তিন দশক পেরিয়ে গেলেও শেষ হয়নি মামলার বিচার ।চলতি বছরই হত্যা মামলাটির বিচার কাজ শেষ করা সম্ভব বলে মনে করেন মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি। তবে তিন দশকেও মামলার বিচার শেষ না হওয়ায় হতাশ নিহতদের পরিবারের সদস্যরা।

গত তিন দশকে মামলার গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকজন সাক্ষী, দুই আসামি চট্টগ্রামের পুলিশ কমিশনার রকিবুল হুদা ও পুলিশ কনস্টেবল বশির উদ্দিন, মামলার বাদী আইনজীবী মো. শহীদুল হুদা এবং সর্বশেষ তদন্ত কর্মকর্তা এএসপি আব্দুল কাদের মারা গেছেন।

আগামী ২৮ জানুয়ারি মামলার পরবর্তী সাক্ষ্য নেওয়ার দিনে ১১ জন সাক্ষীকে হাজির করতে গত ১০ জানুয়ারি পরোয়ানা জারি করেছে আদালত।

মামলাটি বর্তমানে চট্টগ্রামের বিভাগীয় বিশেষ জজ মীর রুহুল আমিনের আদালতে বিচারাধীন।

১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি বন্দরনগরীর লালদীঘি মাঠে আওয়ামী লীগের জনসভা ছিল। ওইদিন বেলা ১টার দিকে শেখ হাসিনাকে বহনকারী ট্রাকটি আদালত ভবনের দিকে আসার সময় গুলিবর্ষণ শুরু হয়।

বিভিন্ন সময় এই মামলার সাক্ষীরা আদালতে বলেছেন, ওইদিন পুলিশের গুলিতে মোট ২৪ জন মারা যান।

গুলিবর্ষণের পর আইনজীবীরা মানববেষ্টনি তৈরির মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীকে রক্ষা করে তাকে আইনজীবী সমিতি ভবনে নিয়ে গিয়েছিলেন।

গুলিতে নিহতদের কারও লাশ পরিবারকে নিতে দেয়নি তৎকালীন সরকার। হিন্দু-মুসলিম নির্বিচারে সবাইকে বলুয়ার দীঘি শ্মশানে পুড়িয়ে ফেলা হয়।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক শাসনের অবসানের পর ১৯৯২ সালের ৫ মার্চ আইনজীবী মো. শহীদুল হুদা বাদী হয়ে এ মামলা করেন।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর মামলাটি পুনরুজ্জীবিত হয়।

দুই-দফা তদন্ত শেষে দেওয়া অভিযোগপত্রে মামলার আট আসামি হলেন- চট্টগ্রামের তখনকার পুলিশ কমিশনার মীর্জা রকিবুল হুদা, কোতোয়ালি অঞ্চলের পেট্রোল ইনসপেক্টর জে সি মণ্ডল, কনস্টেবল আব্দুস সালাম, মুশফিকুর রহমান, প্রদীপ বড়ুয়া, বশির উদ্দিন, মো. আবদুল্লাহ ও মমতাজ উদ্দিন।

১৯৯৭ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত গত ২০ বছরে এ মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন ৪৬ জন। এরমধ্যে ২০১৬ সালে মামলাটি চট্টগ্রামের বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতে আসার পর এখন পর্যন্ত সাক্ষী দিয়েছেন ১১ জন।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, মামলাটি আমাদের আদালতে আসার পর থেকে মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এবং সমাজবিজ্ঞানী ড. অনুপম সেনসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ হয়েছে।

“ইতোমধ্যে মামলার অগ্রগতি বিষয়ে আইনমন্ত্রী মহোদয়ের সাথেও আলাপ করেছি। ১১ জন সাক্ষীকে হাজির করতে পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। আর বেশি সাক্ষীর প্রয়োজন হবে না। পরবর্তী প্রক্রিয়া এ বছরের মধ্যে শেষ করা সম্ভব।”

মামলার নথিতে দেখা যায়, এ মামলার গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সাক্ষী হিসেবে রয়েছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ, আমির হোসেন আমু, বেগম সাজেদা চৌধুরী, আব্দুর রাজ্জাক, এম এ জলিল, এম এ মান্নান, আখাতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু এবং আতাউর রহমান খান কায়সার।

এরমধ্যে শেষ পাঁচজন গত কয়েক বছরে মারা গেছেন।

‘বুকে কষ্ট নিয়ে জীবন পার করছি’

গত ২ নভেম্বর সন্ধ্যায় নগরীর পাথরঘাটায় ‘পবিত্র জপমালা রানি গির্জায়’ ওইদিনের হামলায় নিহত এথলেবার্ট গোমেজ কিশোরের ভাই জন চপল গোমেজের সঙ্গে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কথা হয়।

সেদিন ‘অল সোলস ডে’ তে গির্জায় ভাইয়ের কবরে মোম জ্বেলে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান চপল। চোখে ছিল কান্নার জল।

বুধবার চপল গোমেজ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমার ভাই আমার সাথেই থাকত সবসময়। তার মৃত্যুর পর শেখ হাসিনা, বেগম খালেদা জিয়া, আবদুর রাজ্জাক, মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ অনেকেই আমাদের বাসায় এসেছিলেন।

“কিন্তু এতদিনেও আমরা বিচার পেলাম না। ২০০৬ সালে কিশোরের স্ত্রীও মারা গেছে। তার একমাত্র মেয়ে কোনো সরকারি সুযোগ-সুবিধা পায়নি। সে এখন একটি বেসরকারি স্কুলে চাকরি করে।”

ওইদিনের ঘটনায় নিহতরা হলেন- মো. হাসান মুরাদ, মহিউদ্দিন শামীম, স্বপন কুমার বিশ্বাস, এথলেবার্ট গোমেজ কিশোর, স্বপন চৌধুরী, অজিত সরকার, রমেশ বৈদ্য, বদরুল আলম, ডি কে চৌধুরী, সাজ্জাদ হোসেন, আব্দুল মান্নান, সবুজ হোসেন, কামাল হোসেন, বি কে দাশ, পঙ্কজ বৈদ্য, বাহার উদ্দিন, চান্দ মিয়া, সমর দত্ত, হাসেম মিয়া, মো. কাসেম, পলাশ দত্ত, আব্দুল কুদ্দুস, গোবিন্দ দাশ ও শাহাদাত।

লামাবাজার এ এস পৌর কর্পোরেশন উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন হাসান মুরাদ।

মুরাদের ভাই আবুল মনজুর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রতিবছর শুধু মিডিয়া কর্মীরা আসেন। আমরাও কথা বলি। বাকি ৩৬৫ দিন বুকে কষ্ট নিয়ে দিন কাটাই।

“আমার ভাই হত্যার অপরাধীরা আজও শাস্তি পেল না। শুধু মামলাই চলছে। জাতির জনকের হত্যাকারী এবং যুদ্ধাপরাধীদের মত চট্টগ্রাম গণহত্যায় জড়িতদেরও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই আমরা।”

স্মৃতি সৌধ ঘিরে হচ্ছে এম্ফিথিয়েটার

লালদীঘি গণহত্যায় শহীদদের স্মরণে চট্টগ্রাম আদালত ভবনের প্রবেশ পথে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয় ঘটনার পরপরই।

তবে সেটি দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত পড়ে আছে। অবশেষে এই স্মৃতিসৌধ সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)।

নগরীর আন্দরকিল্লা ওয়ার্ডের কাউন্সিলর জহর লাল হাজারী বলেন, প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর বাসায় এসেছিলেন। সেদিন তিনি ২৪ জানুয়ারির স্মৃতিচারণ করেন।

“আমরা ওই স্মৃতি সংরক্ষণে উদ্যোগ নিয়েছি। স্মৃতিসৌধ ঘিরে এম্ফিথিয়েটার আদলে একটি মুক্ত মঞ্চ করা হবে। সিডিএ এ প্রকল্পে ২০ লাখ টাকা খরচ করবে। ডিজাইন করা হয়েছে। আজ সকালে সিডিএ চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম প্রকল্প কাজ উদ্বোধন করেছেন। নির্মাণ কাজ শিগগিরই শুরু হবে।”

গণহত্যা দিবসে নিহতদের পরিবারগুলোকে নগর আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সহযোগিতার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান নগর আওয়ামী লীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক জহর লাল হাজারী।

তিনি বলেন, এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়ে গেছেন।