১৯ সেকেন্ড কলের সূত্র ধরেই উদঘাটিত জোড়া খুনের রহস্য

প্রকাশ:| বুধবার, ২৭ মে , ২০১৫ সময় ১১:৪৪ অপরাহ্ণ

নালাপাড়ায় বহুতল ভবনের মা-মেয়ে হত্যাকাণ্ডের মূল আসামি বেলাল ঠান্ডা মাথায় জবাই করেন আপন খালাতো ভাইয়ের স্ত্রী নাসিমা বেগম ও মেয়ে রিয়া আক্তার ফ্লাগুনীকে। খুন করেও এতোদিন সে ছিল ধরা ছোঁয়ার বাইরে। এমনকি গত ৭ মে হত্যাকাণ্ডের পর টাকা ও স্বর্ণালংকার নিয়ে পালিয়ে গিয়ে নিজেকে স্বাভাবিকও রাখেন তিনি।

বন্ধুর মোবাইলে নিজ ভাবী ও ভাতিজির খুনের খবর পেয়ে বাসায় এসে খালাতো ভাই শাহ আলমকে জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটিও করেন। সারাদিন সেখানে অবস্থান করে ছয় তলা ভবনের চারতলা থেকে পুলিশের সাথে নিজ হাতে খুন করা মা-মেয়ের লাশও নিচে নামান। ভাবীর চেহলাম, দোয়ায়ও নিয়মিত অংশ নিতে থাকতেন তিনি। এমনিক এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে তদন্ত সংস্থার কার্যালয়ে এসে একাধিকবার বিভিন্ন তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করারও ভান করেছেন।

খুনের পর চোরাই টাকা দিয়ে প্রেমিকা গার্মেন্টসকর্মী ফারজানাকে নিয়ে ফয়েস লেকসহ বিভিন্নস্থানে ঘুরাফেরাও করেন। বন্ধুদের সাথে দেয়া আড্ডায়ও হাত খুলে টাকা পয়সা খরচ করেন। নিজের জন্য বিভিন্ন পোশাক কেনার পাশাপাশি প্রেমিকাকে খুশী করতে উপহার দেন টিভি, ডিভিডি প্লেয়ারসহ বিভিন্ন সামগ্রী। তবে কখনো তার আচরণে টের পাওয়া যায়নি সে-ই এই জোড়া খুনের একমাত্র খুনী।

অবশেষে গত ২৩ মে ১৯ সেকেন্ড ব্যাপ্তিকালের একটি মাত্র মোবাইল কলের সূত্র ধরেই উদঘাটিত হয় চাঞ্চল্যকর এই জোড়া খুনের রহস্য। একে একে আটক করা হয় বেলালের প্রেমিকা ফারজানা, তার ভাই রুবেল ও রুবেলের এক বন্ধুকে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে বের হয় এই জোড়া খুনের একমাত্র খুনী তাদেরই নিকট আত্মীয় শাহ আলমের খালাতো ভাই বেলাল। এর আগেও বেলাল ডিবি কার্যালয়ে মামলার তদন্তে সহযোগিতার জন্য আসেন। তবে নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার এস এম তানভীর আরাফাতের ফোন পেয়ে মঙ্গলবার বিকেলে ডিবি কার্যালয়ে আসেন তিনি। এরপরই তাকে আগে থেকে আটক প্রেমিকা ফারজানাসহ তিনজনের মুখোমুখি করা হয় এবং চাঞ্চল্যকর এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। রাতভর ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করে উদঘাটন করা হয় খুনের বিস্তারিত বর্ণনা। গোয়েন্দা পুলিশ ও খুনী বেলালের সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

নগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার এস এম তানভীর আরাফাত বলেন, ‘শাহ আলমের নিকটাত্মীয় হওয়ায় তার বাসায় অবাধে যাতায়তের সুযোগ পেতো বেলাল। সেই সুযোগে খুনের একদিন আগেও ওই বাসায় রাতের খাবার খেয়ে সেখানে রাত্রি যাপন করে। গত মা-মেয়ে হত্যা৭ মে সকালে সুযোগ বুঝে বাসায় প্রবেশ করে ছুরি দিয়ে তার ভাবী নাসিমাকে প্রথমে পেটে আঘাত করে পরে তার শরীরের ওপর ওঠে গলা কেটে হত্যা করে। এঘটনা দেখে ফেলায় নাসিমার মেয়ে রিয়াকে বাথরুমে নিয়ে গলা কেটে হত্যা করে। এরপর সে পরিস্কার হয়ে চাবি দিয়ে আলমিরা খুলে টাকা ও কিছু স্বর্ণালংকার নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে স্বাভাবিক জীবন-যাপন শুরু করে। পরবর্তীতে সে লাশের পাশে থেকে কান্নাকাটিও করে। চার তলা থেকে নিজ হাতে লাশও নামান পুলিশের সাথে।’

Ctg Photo 02_Murderতিনি আরো বলেন, ‘মামলাটির তদন্তকালে বেলালসহ শাহ আলমের অনেক আত্মীয়ের সাথে আমরা একাধিকবার কথা বলে খুনী সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করেছি। খুনের পর নাসিমার ব্যবহৃত দুটি মোবাইল ফোনসেট টাকা ও স্বর্ণালংকার সাথে নিয়ে যায় খুনী বেলাল। আমাদের বিভিন্ন তথ্য দিয়ে তদন্তে সহযোগিতার ভান করেছিল সে। তবে শেষ পর্যন্ত তাকে ধরা পড়তেই হয়েছে।’

রহস্য উদঘাটন নিয়ে এডিসি তানভীর বলেন, ‘নাসিমার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনসেট দুটি বেলাল তার প্রেমিকা গার্মেন্টসকর্মী ফারজানাকে গিফট করে। এরমধ্যে খুনের পর চোরাই করা স্বর্ণালংকার বিক্রি করা টাকা ও আলমিরা থেকে নেয়া টাকা দিয়ে প্রেমিকাকে একটি টিভি, ডিভিডি প্লেয়ার ও ২টি সাউন্ড বাক্সও গিফট করে। হাত খুলে বন্ধুদের সাথে সে টাকা পয়সাও খরচ করতে থাকে। প্রেমিকা নিয়ে একাধিকবার ফয়েস লেকসহ নগরীর বিভিন্নস্থানে বেড়াতে যায়। তবে গত ৭ মে থেকে ২২ মে পর্যন্ত মোবাইল ফোন দুটি ব্যবহার করা হয়নি। এরমধ্যে প্রেমিকা ফারজানার অনুরোধে সপ্তাহ খানেক আগে তার ভাই রুবেলকে স্মার্টফোনটি দেয়। সেই ফোনটি আবার ফারজানার ভাই আরেকজনের কাছে বিক্রি করে দেয়।’

‘গত ২৩ মে সকালে এই মোবাইলে একটি নতুন সিম ঢুকিয়ে একটি কল করা হয়। সেই কলের ব্যাপ্তিকাল ছিল মাত্র ১৯ সেকেন্ড। এরপর সিমটি আবার বন্ধ করে রাখা হয়। কেননা নাসিমার ব্যবহৃত মোবাইল দুটির সিম ব্যবহার না হলেও সেটের আইএমই নাম্বার বের করে তা সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হচ্ছিল। কলারকে উন্নত প্রযুক্তির সহায়তায় আমরা চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়। আমরা পরিস্কার হই এই মোবাইল ফোন চোরই জোড়া খুনের মূল আসামী। ওই সিমের অবস্থান সনাক্ত করে প্রথমে তাকে আটক করা হয়। মোবাইল ক্রয়কারী যুবক জানান, এই মোবাইলটি রুবেল নামের এক যুবকের কাছ থেকে তিনি কিনেছেন।

এবার রুবেলকে আটক করলে সে জানায়, এটি তার বোন ফারজানা তাকে দিয়েছে। এই দু’জনের কথায় পোশাক কারখানার কর্মী ও রুবেলের প্রেমিকা ফারজানাকে আটক করা হয়। সেই জানায় বেলালই তাকে এই মোবাইল ফোনসেট গিফট করেছে। খুনীর বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে ২৬ মে বিকেলে বেলালকে নালা পাড়া থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে ফারজানাসহ তিনজনের মুখোমুখি করলে সে খুনের ঘটনা স্বীকার করে। পরবর্তীতে তার স্বীকারোক্তিতে, বাকলিয়া থেকে চোরাই করা স্বর্ণালংকারগুলো উদ্ধার করা হয় এবং প্রেমিকার বাসা থেকে একটি টিভি, একটি ডিভিডি প্লেয়ার ও ২ডঁ সাউন্ড বক্স উদ্ধার করা হয়।’

তানভীর আরাফাত বলেন, ‘মূলত বেলালের প্রেমিকা ফারজানার চাপে পড়ে বেশি টাকা খরচ করতে গিয়েই টাকার লোভে সে এই খুন করেছে। এছাড়া ফারাজানার পক্ষ থেকে বিয়ে করার জন্য বেলালের ওপর একরকম চাপও ছিল। সেই সব মিলিয়ে বেশি টাকার প্রয়োজনবোধ থেকেই এ হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে।’

এদিকে ডিবি কার্যালয়ে কথা হয় চাঞ্চল্যকর এ জোড়া খুনের মূল আসামী বেলালের সাথে।

তিনি বলেন, ‘গত বৈশাখের পর থেকে লক্ষীপুরের বাসিন্দা পোশাক কারখানার শ্রমিক ফারজানার সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ি। আমার বাসার কাছাকাটি বাংলাবাজার এলাকায় ফারজানার বাসা হওয়ায় নিয়মিত কথা হতো, দেখা সাক্ষাত হতো। এমনকি দিনে ১৫ বার ২০ বারও কথা বলতে থাকি। বিশেষ করে তার ( ফারজানা) কাছ থেকে আমার প্রতি অন্যরকম চাপ ছিল। একপর্যায়ে তাকে আমিও ভালোবেসে ফেলি। সেই থেকে তাকে নিয়ে ডেটিং করতে অনেক টাকার প্রয়োজন বোধ করি। আমি ইলেকট্রিক মিস্ত্রীর কাজ করে মাসে যে ৭-৮ হাজার টাকা ইনকাম করি তাতে চট্টগ্রামে বাস করে পরিবারকে দিয়ে প্রেম করা সম্ভব হচ্ছিলনা। সেজন্য আমি বেশি করে টাকা ইনকামের পথ খুঁজতে থাকি।’

খুনের বর্ণনা দিয়ে বেলাল বলেন, ‘ভাইয়ার (শাহ আলম) মাংসের দোকানে তার শালা আলালের সাথে আমি এক বছর আগে কাজ করতাম এবং তাদের বাসায় খেতাম ও ঘুমাতাম। পরবর্তীতে মুনস্টার রং ফ্যাক্টরির পাশে একটি জেনারেটর এর দোকানে ৮ হাজার টাকায় মিস্ত্রি হিসেবে কাজ নিলে ভাইয়ের বাসা থেকে চলি আসি। তবে মাঝে মধ্যে বাসায় যেতাম এবং খাওয়া দাওয়া করে আসতাম। ঘটনার দুই দিন আগেও ভাইয়ের বাসার ফ্যান মেরামত করতে গেলে সেখানে রাতের খবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। পরের দিন সকালে আমার কাজে চলে আসি।’

‘এরপর ৭ মে একটি কালো প্যান্ট ও কালো শার্ট গায়ে দিয়ে ভাইয়ের বাসার আশাপাশে অবস্থা নিই। ভাইয়া ও ছেলেরা বাসার বাইরে গেলে আমি বাসায় ঢুকি। এসময় ভাবি আমাকে দেখে খুবই উত্তেজিত হয়ে যায়। আমি কেন সেখানে গেলাম তা কড়া বাসায় জানতে চায়। এরআগেও সেখানে থাকার সময় আমাকে বিভিন্নভাবে নাজেহাল করতেন ভাবী। আমাকে সবসময় গালিগালাজ করতেন। এজন্য আমি এমনিতেই তার ওপর ক্ষিপ্ত ছিলাম। আমি আগে থেকেই জানতাম বাসার আলমিরাতে টাকা ছিল। সেজন্য পরিকল্পনা নিয়েই সেখানে গিয়েছিলাম। কিন্তু ভাবীর চিৎকার শুনে মাথা অস্থির হয়ে যায়। এসময় হাতের কাছে থাকা ছুরি দিয়ে তার পেটে আঘাত করি। চিৎকার দিলে তাকে মেঝেতে ফেলে ধরে গায়ের ওপর উঠে গলা কেটে তাকে হত্যা করি। এসময় পাশের রুমে ঘুমিয়ে থাকা রিয়া আমার কাছে এসে কান্নাকাটি শুরু করলে চিনে ফেলায় তাকেও বাথরুমে নিয়ে গলা কেটে হত্যা করি। এরপর বাথরুমে ঢুকে পরিস্কার হয়ে মনোহরখালী সাততলা মাঠে গিয়ে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে থাকি।’-বলেন অভিযুক্ত বেলাল।

খুনের পর নিজের স্বাভাবিক জীবন যাপন পুলিশের সাথে দেখা করা, শাহ আলমের সাথে যোগাযোগ রাখার বিষয়গুলো অকপটে বাংলামেইলের কাছে স্বীকার করেছেন বেলাল।

ডিবি তাকে নালাপাড়া থেকে গ্রেপ্তারের কথা বললেও বেলাল বলছেন ভিন্ন কথা। এ প্রসঙ্গে বেলাল বলেন, ‘স্যাররা একে একে ফারজানা, তার ভাইসহ আরেকজনকে আটক করে নিয়ে আসে। বিষয়টি আমি জানতাম, চিন্তা করলাম বাংলাদেশের যে প্রান্তেই থাকিনা কেন আমি আর বাঁচতে পারবো না। সেজন্য তানভীর স্যার যখন ফোন দিয়ে গতকাল বিকেলে এখানে আসতে বলেন-আমি কিছু চিন্তা না করেই চলে আসি। খুনের কথাও স্বীকার করি।’

নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের পর কোন অনুশোচনা রয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার কষ্ট হচ্ছে আমার ভাতিজি রিয়ার জন্য। ভাবীর জন্য আমার কোন কষ্ট হচ্ছেনা। তার সাথে মাষ্টার রকির অনৈতিক সম্পর্ক ছিল যা আমি জানতাম। সেজন্য ওই মহিলা আমাকে কখনো পছন্দ করতো না। এখন যেই শাস্তি কপালে আছে সেটি হবে আর কি।’

নিজের পরিবার সম্পর্কে বলেন, ‘আমি ছয় বোনের এক ভাই। আমার বড় দুই বোনকে বিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাকী চারজন আমার ছোট। বাবা এলাকায় রিকশা চালায়। অভাবের তাড়নায় মাদ্রাসায় দুই ক্লাস পড়লেও কোন লেখাপড়া করতে পারিনি। গত আড়াই বছর আগে চট্টগ্রামে এসে খালাত ভাই শাহ আলমের বাসায় উঠি। সেখানে থেকে তার সাথে মাংসের দোকানে চাকরি করি। এখন আমার পরিবারের কি হবে সেটিও জানিনা। মাতো অনেক আগে মারা গেছে।’

এদিকে গ্রেপ্তারের পর খুনের দায় স্বীকার করে রাতে মহানগর হাকিম রহমত উল্লাহর আদালতে বেলাল হোসেন (১৯) স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তিনি কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর উপজেলার বাজরের বাড়ী এলাকার রিকশা চালক মন মিয়ার পুত্র। পেশায় একজন টিউবয়েল মিস্ত্রী।

উল্লেখ্য, গত ৭ মে নগরীর সদরঘাট থানার দক্ষিণ নালা পাড়ার একটি ফ্ল্যাট বাসা থেকে মা নাসিমা আক্তার (৩৫) ও মেয়ে রিয়া আক্তারের (৮) গলা কাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এঘটনায় নিহতের স্বামী শাহ আলম বাদী হয়ে থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।