১৫০ বিদেশীর লেনদেনের তথ্য চেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক

প্রকাশ:| সোমবার, ১ ডিসেম্বর , ২০১৪ সময় ১১:৫৩ অপরাহ্ণ

বিদেশী নাগরিক ও প্রবাসী বাংলাদেশীদের সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের তথ্য তলব করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর অংশ হিসাবে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) চলতি বছর ব্যাংকগুলোর কাছে কমপক্ষে ১৫০ বিদেশী নাগরিকের ব্যাংক হিসাবের তথ্য চেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক ম. মাহফুজুর রহমান মানবজমিনকে জানান, বিষয়টি অত্যন্ত গোপনীয় ও কথা বলতে বারণ আছে। তবে বিভিন্ন দেশের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি থাকায় তাদের অনুরোধে এসব তথ্য চাওয়া হয়েছে। এছাড়া বিএফআইইউ এগমন্ট গ্রুপেরও সদস্য। এদের সঙ্গে নিয়মিত তথ্য আদান-প্রদান করা হয়। এর অংশ হিসাবেই বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের ব্যাংক হিসাবের তথ্য চাওয়া হচ্ছে। সর্বশেষ ১০ই নভেম্বর বিএফআইইউ ব্যাংকগুলোতে চিঠি পাঠিয়ে বাহরাইনের তিন নাগরিকের হিসাবের তথ্য চেয়েছে। এরা হলো- এসাম ইউসুফ জাহানী, ইমাদ ওমর আলনেসনাস ও ওমাইমা ওথমান আলমাহমুদ। তাদের পাসপোর্ট নম্বর এবং জন্মস্থানও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে ৫ই নভেম্বর শিনিচি মিতাতে নামের এক জাপানি নাগরিকের তথ্য চাওয়া হয় ব্যাংকগুলোর কাছে, যার পাসপোর্ট নম্বর টিএইচ ৯৪৭০৪৭৬, জন্ম তারিখ ১৯৭৯ সালের ১৬ই মার্চ। দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাসরত বাংলাদেশী পাসপোর্টধারী আহমেদ শাহীন, বেলাল হোসেন ও ফেরদৌস আহমেদ এবং দক্ষিণ আফ্রিকার পাসপোর্টধারী আজমল আলী ও হুসাইন আহমেদের ব্যাংক হিসাবের তথ্য চেয়ে গত ১৮ই আগস্ট ব্যাংকগুলোতে চিঠি পাঠায় বিএফআইইউ। তার আগে জুন মাসে চাওয়া হয় কাজাখস্তানের প্রতিষ্ঠান জর্জেন হাউজের হিসাবের তথ্য। ওই চিঠিতেই সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফাস্টিন ট্যুরিজম, অস্ট্রিয়ার মেরিডিয়ান জেট ম্যানেজমেন্ট, রাশিয়ার এমএস গ্রুপ ইনভেস্টমেন্ট নামের তিন প্রতিষ্ঠানের হিসাব বা লেনদেনের তথ্য আছে কি না জানতে চাওয়া হয় ব্যাংকগুলোর কাছে। এছাড়া উজবেকিস্তান, ইসরায়েল, থাইল্যান্ড ও রাশিয়ার কয়েকজন নাগরিকের বিষয়েও তথ্য চান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দারা। বিএফআইইউ’র কর্মকর্তারা জানান, জুনের ওই চিঠিতে যেসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের তথ্য চাওয়া হয়েছে তারা আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্র ব্রাদার্স সার্কেল এর সঙ্গে জড়িত বলে সন্দেহ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র ২০১১ সালে এ চক্রকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসাবে চিহ্নিত করে তাদের সব ধরনের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, সাবেক সোভিয়েত রাষ্ট্রগুলোতে উৎপত্তি হলেও এ চক্র সারা বিশ্বেই মাদক পাচারসহ আর্থিক খাতের নানা অপরাধের জাল বিছিয়েছে। এর আগে গত বছর শেষ দিকেও ব্রাদার্স সার্কেলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এমন সন্দেহভাজন ১০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের তথ্য চেয়ে বাংলাদেশে চিঠি দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। একই ধরনের অনুরোধে চলতি বছর ৩রা এপ্রিল এক চিঠিতে ইউক্রেইনের ৩৩ জনের তালিকা পাঠিয়ে তথ্য চায় বিএফআইইউ। ১০ই এপ্রিল আর্জেন্টিনার ২১ নাগরিকের আর্থিক লেনদেনের তথ্য চাওয়া হয়। জানুয়ারিতে এক চিঠিতে বিভিন্ন দেশের ৪২ জনের নাম উল্লেখ করে চিঠি পাঠায় বিএফআইইউ। এদের মধ্যে ২৬শে জন মূল সন্দেহভাজন। বাকিরা তদের স্ত্রী বা সন্তান। ভারত, ফিলিপিন্স ও যুক্তরাজ্যের কয়েকজন নাগরিকের ব্যাংক হিসাবের তথ্যও চাওয়া হয়েছে চলতি বছরে। এছাড়া গত বছর ২৯শে ডিসেম্বর ব্যাংকগুলোতে চিঠি পাঠিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পাসপোর্টধারী বাংলাদেশী নাগরিক মিজানুর রহমান ও তার স্ত্রী শারমিন মিমি রহমানের ব্যাংক হিসাবের তথ্য চাওয়া হয়। বিএফআইইউ’র মাহফুজুর রহমান বলছেন, মুদ্রা পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে করা আন্তর্জাতিক চুক্তি ও দেশের আইনের বিধি মেনেই তারা ব্যাংক হিসাবের তথ্য সংগ্রহ বা বিনিময় করেন। তবে এসব সন্দেহভাজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কোন হিসাব বা লেনদেনের খোঁজ পাওয়া গেছে কি-না, সে বিষয়ে কিছু বলেননি তিনি। বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা- বিএফআইইউ সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন, নগদ লেনদেন, মুদ্রা পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়নের বিষয়ে তদন্ত চালিয়ে থাকে। মুদ্রা পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন ঠেকাতেই এ সংস্থার কার্যক্রম শুরু। ২০০২ সালের জুনে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি বিভাগ হিসাবে যাত্রা শুরু করে বিএফআইইউ। সে সময় এর নাম ছিল এন্টি মানি লন্ডারিং ডিপার্টমেন্ট। এর দশ বছর পর ২০১২ সালের ২৫শে জানুয়ারি এ বিভাগকে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটে রূপান্তর করা হয়। ২০১৩ সালের জুলাইয়ে বিএফআইইউ আর্থিক গোয়েন্দা কার্যক্রমের আন্তর্জাতিক সংগঠন এগমন্ট গ্রুপের সদস্য হয়। বিশ্বের ১৪০টি দেশ এ সংগঠনের সদস্য। এর বাইরেও ২০টি দেশের সঙ্গে আর্থিক তথ্য আদান-প্রদানের দ্বিপক্ষীয় চুক্তি আছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের।