হিমালয়ের পাদদেশেই দিনাজপুর

প্রকাশ:| সোমবার, ৪ নভেম্বর , ২০১৩ সময় ০৮:৫২ অপরাহ্ণ

কৃত্রিম হ্রদ, পাহাড়, লেক, উদ্যান, বৈচিত্র্যপূর্ণ গাছগাছালি ও ফুলের সমারোহ, শিশুপার্ক, চিড়িয়াখানা, কৃত্রিম পশুপাখি, ফুলবাগিচা, ইটখোলা, কৃত্রিম ঝরনা, ঘোড়ার রথ, হংসরাজ সাম্পান, শালবাগান, খেলামঞ্চ, নামাজঘর, কুঞ্জ, ভাস্কর্য, ডাকবাংলো, মাটির কুটির, বাজার, প্রকৃতিতে বাংলাদেশের মানচিত্র

শাহ আলম শাহী, দিনাজপুর থেকে: আম আর মিষ্টি চালের জেলা দিনাজপুর। সেখানকার লিচু দেশ-বিদেশে রসগোল্লা নামে পরিচিত। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার হিমালয়ের পাদদেশেই এই জেলার অবস্থান। সুন্দর আর সৌন্দর্যের সঙ্গে সেখানে গড়ে উঠেছে মনকাড়া বিনোদন কেন্দ্র স্বপ্নপুরী। সেখানে দর্শনার্থীদের গাদাগাদি। বিদেশী পর্যটকদের ছবি তোলার কসরত। নাট্যকার ও চলচ্চিত্র নির্মাতারা তার মাঝে খেলছেন সুন্দর স্বপ্নের খেলা।
দিনাজপুর শহর থেকে সড়ক পথে ৩৩ মাইল বা ৫২ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে নবাবগঞ্জ উপজেলার খালিশপুর এলাকায় এই স্বপ্নপুরীর অবস্থান। ফুলবাড়ি শহর থেকে স্বপ্নপুরীর দূরত্ব ১২ কিলোমিটার। দিনাজপুর থেকে ফুলবাড়ি আফতাবগঞ্জ হাট হয়ে সম্পূর্ণ পাকা রাস্তা দিয়ে সেখানে যাওয়া যায়। স্বপ্নপুরীতে এসে পৌঁছলে স্বাগত জানাবে স্বপ্নপুরীর গেটে দণ্ডায়মান দুটি বিশাল আকৃতির পরীর প্রতিকৃতি। এ দুটি পরী তাদের দুই ডানা প্রসারিত করে ও এক হাত উঁচু করে গেটের দু’পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে। গেট পেরিয়ে পথের দু’ধারে বিভিন্ন গাছের সমারোহ। চোখে পড়বে পথের দু’ধারে সারি সারি দেবদারু গাছ। এর ফাঁকে ফাঁকে নারিকেল গাছের সারি। এর মধ্য দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে মনে পড়বে-
এ পথ যদি আর শেষ না হয়,
তবে কেমন হতো, তুমি বলো তো।
না…না…. তুমি বলো।
এখানে রয়েছে কৃত্রিম হ্রদ, পাহাড়, লেক, উদ্যান, বৈচিত্র্যপূর্ণ গাছগাছালি ও ফুলের সমারোহ, শিশুপার্ক, চিড়িয়াখানা, কৃত্রিম পশুপাখি, ফুলবাগিচা, ইটখোলা, কৃত্রিম ঝরনা, ঘোড়ার রথ, হংসরাজ সাম্পান, শালবাগান, খেলামঞ্চ, নামাজঘর, কুঞ্জ, ভাস্কর্য, ডাকবাংলো, মাটির কুটির, বাজার, প্রকৃতিতে বাংলাদেশের মানচিত্র। যেন এক মোহনীয়-মায়াবী স্বপ্নীল ভুবন। কয়েক ভাগে বিভক্ত করা এই স্বপ্নময় জগতের পথ চলতে চলতে দেখা যাবে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম কিংবা ঘাড়গুঁজো বসে থাকা অবসন্ন কৃষকের ভাস্কর্য। সেখানে সারিবদ্ধ চেয়ার, টুল বসানো আছে। হংসরাজ সাম্পানে চড়ে স্বচ্ছ নীল পানির লেকে হারিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। সাম্পানে যেতে দেখা যায় কোথাও একাকী দঁাঁড়িয়ে আছে নারী, মাথা নিচু করে বসে আছে হতাশাগ্রস্ত যুবক অথবা ফুটে আছে বিশালকৃতি কচুপাতা। এরপর রয়েছে কৃত্রিম পশু দুনিয়া। প্রবেশ পথে দুটি ড্রাগন সাদর সম্ভাষণ জানানোর জন্য প্রস্তুত রয়েছে। দেয়ালে চুন-সুরকি দিয়ে তৈরি করা হয়েছে বিলুপ্তপ্রায় হিংস্র প্রাণীদের প্রতিকৃতি। এরপর দু’-এক পা ফেলতেই চমকে উঠতে হয়। সামনেই পথজুড়ে হাঁ করা এক নর-করোটি। এই নর-করোটির মুখের ভেতর দিয়েই মূল পশু দুনিয়ায় পৌঁছাতে হবে। এখানে রয়েছে কৃত্রিম পাহাড় ও ঝরনা। ঝরনার পানি গড়িয়ে একটি ছোট জলাশয়ে পড়ছে। লেকের পাশে রয়েছে ২৫০০ বর্গফুট বিস্তৃত বাংলাদেশের মানচিত্র, যা ইট-সিমেন্ট দিয়ে সুন্দরভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে। এই স্বপ্নময় স্বপ্নপুরীতে ইচ্ছা করলেই দু’একদিন থাকাও যাবে। এজন্য রয়েছে নিশিপদ্ম, নীলপরী, সন্ধ্যাতারা, রজনীগন্ধা মেঠোঘর এবং ভিআইপি কুঞ্জ নামের পাঁচটি ডাকবাংলো। অবসর যাপনের জন্য এসব ডাকবাংলো ভাড়া দিতে হয়। এখানে অল্প দামে খাবারের সুব্যবস্থা আছে। স্বপ্নপুরীতে শিশুদের জন্য রয়েছে শিশুপার্ক। রয়েছে দোলনা ও চরকি। ঘোড়ার গাড়ির ওপরে রয়েছে সুদৃশ্য রঙিন ছাতা, যা চলার সঙ্গে সঙ্গে ঘুরছে। রয়েছে অফিস চত্বরে কেনাকাটার জন্য বাজার, রেস্টুরেন্ট। রান্নার সহায়তার জন্য বিভিন্ন ধরনের ভাড়া চুলা। এছাড়াও চেয়ার, টেবিল, হাঁড়ি-পাতিলসহ ডেকোরেশনের সব জিনিস ভাড়া পাওয়া যায়। আছে নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা। নবাবগঞ্জ উপজেলাধীন আফতাবগঞ্জের খালিশপুর মৌজায় প্রায় ৪০০ একর জমির ওপর বিনোদন স্পট ‘স্বপ্নপুরী’। ১৯৮৯ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি জনপ্রিয় বংশীবাদক মো. দেলোয়ার হোসেন মাত্র ৭ একর ৩৮ শতাংশ জমি নিয়ে ব্যক্তিগত উদ্যোগে স্বপ্নপুরীর যাত্রা শুরু করেন। বর্তমানে এর ৪০০ একর জমি বিস্তৃত পেয়েছে। স্বপ্নপুরীর প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. দেলোয়ার হোসেনের ইচ্ছা, স্বপ্নপুরীকে বাংলাদেশের সেরা অবকাশ যাপনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা এবং এখানে একটি পূর্ণাঙ্গ স্টুডিও নির্মাণ করা। যেন দেশ-বিদেশের আসা পর্যটকরা তা দেখে মুগ্ধ হন। এ পর্যন্ত স্বপ্নপুরী নির্মাণে প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলে তিনি জানান। ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন এই স্বপ্নপুরী। বর্তমানে পূর্ণাঙ্গ জীবন্ত চিড়িয়াখানা, হাসপাতাল, অত্যাধুনিক চায়নিজ হোটেল, রেস্তোরাঁর নির্মাণ কাজ চলছে। ভবিষ্যতে মুক্তিযুদ্ধের স্মরণে স্বতন্ত্র স্পট, পাখির রাজ্য, মাছের রাজ্য, রেল কার, রোপ কার, মানবিক চৈতন্যের ভাস্কার্য শিল্প নির্মাণের পরিকল্পনা আছে। এই স্বপ্নময় স্বপ্নপুরীতে ইচ্ছা করলেই দু’-একদিন থাকাও যাবে। এজন্য রয়েছে পাঁচটি মনোমুগ্ধকর ডাকবাংলো। অবসরযাপনের জন্য এসব ডাকবাংলো ভাড়া দেয়া হয়। ঘরপ্রতি ভাড়া ৪০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা (২৪ ঘণ্টার জন্য)। ডাকবাংলোগুলোতে এসি ও নন-এসি রুম রয়েছে। এসব ডাকবাংলো বুকিংয়ের জন্য রয়েছে টেলিফোন সুবিধা। ইচ্ছে করলে (কোড নং-০৫৩২৭, ফোন-২৮৮, ৩৪০ অথবা ৮৯১৪৩) টেলিফোনে ডাকবাংলো আগে থেকে বুকিং করে রাখা যায়। যে কেউ স্বপ্নপুরীতে বেড়াতে কিংবা পিকনিক করতে চাইলে পূর্বেই যোগাযোগ করতে পারেন। ঢাকার হোটেল সফিনা, ১৫২, ওসমান গনি রোড (আলুবাজার), ঢাকা। ফোন- ৯৫৫৪৬৩০, ৯৫৬২১৩০; কিংবা দিনাজপুরের হোটেল কণিকা, স্টেশন রোড, দিনাজপুর কিংবা স্বপ্নপুরীর অফিস ০১৭২১৩৪০৯৫, ০১৭২৫৬০৬৬, ০১১৩৭০৫১১, ফোন- ০৫৩১-৬৩৭১১ নবাবগঞ্জ, দিনাজপুর, যোগাযোগ করতে পারেন। এখানে অল্প দামে খাবারের সুব্যবস্থা আছে। ভাত, সবজি, ডিম ডাল ২০ টাকা, ভাত, মাংস, মাছ, ডাল ৮০ টাকা, ভাত সবজি, মুরগি, ডাল ৫৫ টাকা।