হারিয়ে গেছে প্লাবন ভূমি, সামান্য বৃষ্টিতে ডুবছে চট্টগ্রাম

প্রকাশ:| শুক্রবার, ২৪ জুলাই , ২০১৫ সময় ০৫:৪৪ অপরাহ্ণ

নিউজচিটাগাং স্পেশাল::
১৯৯৫ সালে চট্টগ্রামে সুষ্ঠু পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা গড়ে তুলতে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরুর কথা থাকলেও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), সিটি করপোরেশন ও ওয়াসাসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে ১৯ বছর পেরিয়ে গেছে। এই প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের কাজ এখনো শুরু হয়নি।

বরং অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে নগরীতে বৃষ্টির পানি জমে থাকার যেসব প্লাবন ভূমি ছিল, সেগুলোও হারিয়ে গেছে। এ কারনে সামান্য বৃষ্টি আর সামুদ্্িরক জোয়ার একটু ফুঁসে উঠলেই যে কোন মৌসুমে নগরীর উঁচু এবং মধ্যঞ্চল বলে পরিচিত প্রায় ৩০ বর্গ কিলোমিটার এলায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। যত দিন যাচ্ছে, ততই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে এ জলাবদ্ধতা।
প্লাবন ভূমি
হঠাৎ হঠাৎ অল্প বৃষ্টিতেও চট্টগ্রাম মহানগরীতে জলাবদ্ধতার চিত্র দেখা যাচ্ছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং ‘বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ মহাপরিকল্পনা’ নামের ওই প্রকল্পের কাজ শুরু না করার কারণে যে কোন মৌসুমেই সামান্য বৃষ্টিতেই গলাসমান পানিতে বন্দরনগরীর দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা তলিয়ে যাচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞ মহলের অভিমত।

মহাপরিকল্পনা তৈরির সাথে শুরু থেকে জড়িত বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী প্রফেসর আলী আশরাফ বলেন, ‘বৃষ্টির পানি জমা হওয়ার যেসব প্লাবন ভূমি (ফ্লাড প্লেইন) ছিল অপরিকল্পিত নগারায়ণের ফলে সেগুলো এখন আর নেই। ফলে সামান্য বৃষ্টির জমে থাকা পানি সরে যাওয়ার জায়গা পায় না। তাই সংগত কারণে বৃষ্টির পানি এখন রাস্তাঘাট, মানুষের বাড়িঘর আর দোকানপাটকে প্লাবিত করছে। মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন না করায় আগামিতে নগরীর অবস্থা আর ভয়াবহ হতে পারে।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, নগরীর প্রায় ১৫০ বর্গ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে সুষ্ঠু পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ইউএনডিপি’র আর্থিক সহায়তায় ‘বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ মহাপরিকল্পনা’ তৈরির কাজ শুরু হয়েছিল ১৯৯২ সালে। টানা তিন বছরের গবেষণা শেষে ১৯৯৫ সালে এ মহাপরিকল্পনার রূপপ্লাবন ভূমি১রেখা চূড়ান্ত করা হয়। এটি সরকারি গেজেট আকাওে প্রকাশিত হয় ১৯৯৯ সালে। ১৯৯৫ সাল থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে ২০ বছরে পাঁচটি আলাদা পর্যায়ে মহাপরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের কথা ছিল। কিন্তু গত ১৯ বছরেও সেই প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজে হাত দেয়া হয়নি। ওই পরিকল্পনায় মাত্র ৯২ কোটি টাকায় নতুন কিছু খাল-উপখাল খনন ও পুরোনোগুলোকে সংস্কার, বিভিন্ন নিচু এলাকায় জলাধার তৈরি, বন্যার পানির সঙ্গে আসা পলি আটকানোর ব্যবস্থা করা, সাগরের সঙ্গে সংযুক্ত খালগুলোতে স্লুইস গেট নির্মাণ এবং কিছু এলাকায় বন্যা প্রতিরোধ বাঁধ নির্মাণের প্রস্তাব ছিল।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বলেন, ‘এত দিন অর্থের অভাবসহ নানা কারণে পানি নিষ্কাশন মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যায়নি। এবার প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারি সহায়তার আশ্বাস পাওয়া গেছে। তাই জলাবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন বড় আকারে উদ্যোগ গ্রহণ করছে।’
টানা বর্ষণে বন্দর পতেঙ্গায় ও ইপিজেড এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি

সরকারি গেজেট হওয়ার পরও কেন এতদিন পানি নিষ্কাশন মহাপরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন শুরু হলো না জানতে চাইলে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান মো. আব্দুচ ছালাম বলেন, ‘মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মূল দায়িত্ব সিডিএ’র। এর পাশাপাশি সিটি করপোরেশন এবং ওয়াসা’র বেশ কিছু দায়িত্ব রয়েছে। মহাপরিকল্পনা তৈরি পর থেকে যদি সকল সংস্থা নিজ নিজ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতো তাহলে এতোদিন কোন কাজ অবশিষ্ট থাকতো না। আমি যখন দায়িত্ব নিয়েছে, তখন মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়নের মেয়াদ অনেকটা পেরিয়ে গেছে। বর্তমানে সিডিএ’র সকল প্ল্যান মহাপরিকল্পনার আলোকে। এই সরকারি গেজেট আকারে প্রকাশিত পরিকল্পনার বাকি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ আগামী এক বছরের মধ্যে গ্রহণ করা হবে। কারণ ২০ মেয়াদের পরিকল্পনার বাস্তবায়নের সময় সীমা ২০১৫ সাল। এ ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন এবং ওয়াসা উদ্যোগ গ্রহণ করলে সিডিএ সব ধরনের সহায়তা দেবে।’

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি রেজাউল করিম বলেন, ‘আমরা ভবন বানাচ্ছি কিন্তু চারপাশে প্রয়োজনীয় জায়গা ছাড়ছি না। রাস্তা বানাচ্ছি, কিন্তু পাশে প্রয়োজনমতো ড্রেন করছি না। এ অবস্থায় পানি তো ঘরবাড়িতে উঠবেই।’

বিভিন্ন গবেষক ও নগর পরিকল্পনাবিদদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, চট্টগ্রাম শহরে মধ্যাঞ্চল বলে পরিচিত প্রায় ৩০ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় এক ৮-১০ বছর আগেও বৃষ্টির পানি জমে থাকত না। এখন সামান্য বৃষ্টিতেও এসব এলাকা কোমর থেকে গলাসমান পানিতে ডুবে যায়। পানি নামতেও সময় নিচ্ছে বেশি। এসব এলাকার মধ্যে রয়েছে সেনানিবাস এলাকা, বায়েজীদ বোস্তামি রোড, ষোলশহর ২ নম্বর গেট, মুরাদপুর, পূর্ব নাসিরাবাদ, খতিবের হাট, চকবাজার, কাপাশগোলা, পাঁচলাইশ, কাতালগঞ্জ, শুলকবহর ইত্যাদি। সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে পাহাড়ি অঞ্চল হিসেবে পরিচিত সেনানিবাসের বিভিন্ন স্থাপনায় হাঁটুসমান পানি জমতে দেখা যায়। যা আগে কখনো দেখা যায়নি।

চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতাজলাবদ্ধতার কারণ হিসেবে তাদের অভিমত, ‘বিগত প্রায় ২২ বছরে নগরীর খাল-উপখালগুলো পরিকল্পিতভাবে সংস্কার হয়নি। বরং বেদখল হয়ে গেছে অনেক। এছাড়া খতিবের হাট, পগারবিল, বাকলিয়া, সিডিএ নতুন আবাসিক এলাকা কল্পলোক ও অনন্যা এবং বাকলিয়া বিএসএস অফিসার্স সমিতি আবাসিক এলাকার বিস্তীর্ণ প্লাবন ভূমিগুলো অপরিকল্পিতভাবে ভরাট করে ফেলা হয়েছে। ফলে সাময়িকভাবে পানি জমে থাকার বা গড়িয়ে যাওয়ার কোন জায়গা অবশিষ্ট নেই। নগরীর ষোলশহর সিডিএ এভেনিউর বিমান অফিসের সামনে সামান্য বৃষ্টিতেই তিব্র পানির ¯্রােত দেখা দেয়। আগে এই এলাকায় ¯্রােত তো দূরের কথা, পানিও জমতে দেখা যায়নি।’