হাটহাজারীতে জলাধার ভরাটের প্রতিযোগিতা

প্রকাশ:| শুক্রবার, ২৮ জুন , ২০১৩ সময় ১১:৫৭ অপরাহ্ণ

হাটহাজারীতে প্রতিযোগিতামূলবভাবে ভরাট করা হচ্ছে জলাধার। এতে করে একদিকে পরিবেশ মারাত্বক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে hathazari পুকুর-1অন্যদিকে ফায়ার সর্ভিসের কার্যক্রম সীমাহীন ভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে জনস্বার্থ। বেপরোয়া ভাবে পুকুর-দীঘি-ডোবা ভরাট করার প্রতিযোগীতার কারণে স্থানীয় পর্যবেক্ষক মহলে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই অবস্থা দৃষ্টে এই গুরুত্বপুর্ণ বিষয় দেখার জন্য সরকারী কোন কতৃপক্ষ আছে বলে মনে না বিজ্ঞমহল। ফলে এ উপজেলায় পরিবেশ রক্ষা, অগ্নিদূর্ঘটনা রোধ ও প্রোটিন আবাদ হুমকির মুখে পতিত হচ্ছে।
উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের সরেজমিনে পরিদর্শন করতে গিয়ে স্থানীয় লোকজনের সাথে আলাপ করে জানা যায়, এ উপজেলা হালদা নদী বিধৌত নদী এশিয়ার সর্ববৃহৎ প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র। হাটহাজারী, রাউজান, ফটিকছড়ি এই তিন উপজেলার উপর দিয়ে হালদা নদী প্রবাহিত হয়ে কর্ণফূলী নদীর সাথে মিলিত হয়েছে। হালদা নদী থেকে সংগৃহীত ডিম থেকে উৎপাদিত পোনা দ্রুত বর্ধনশীল। এই পোনার মাছ অত্যানত্ম সুস্বাদু এবং প্রোটিন সমৃদ্ধ। তাই হাটহাজারী সহ উলেস্নখিত তিন উপজেলায় হালদা নদীর ডিমের পোনা সহজলভ্য হওয়ায় উপজেলায় অসংখ্য পুকুর-দীঘি-ডোবা খনন করেছে পূর্ব পূরুষেরা। স্মরণাতীতকালে স্থানীয় লোকজন এই সব পুকুর-দিঘী-ডোবা খনন করে খনন কৃত মাটি দিয়ে এক সময় বসতঘর নির্মাণের জন্য ভিটি প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাছাড়া সুদুর অতীতে বর্তমানের মতো পানিয় জলের নলকূপ বসানোর ক্ষমতা বেশীর ভাগ লোকের ছিল না। তখন স্থানীয় লোকজন পুকুর-দিঘীর পানিকে পানিয় জল হিসেবে ব্যবহার করতো। পুকুর-দিঘীতে গোসল সহ জলাচার করতো স্থানীয়রা। এক সময় লোক সংখ্যা কম থাকায় ও মানুষের আয় উপার্জন বর্তমানের মতো না থাকায় খননকৃত পুকুর-দিঘী থেকে মাছ ধরে অনেক পরিবারের ভরণ পোষণ চলতো। তাছাড়া শুষ্ক মৌসুমে পুকুর-দিঘীর পানি দিয়ে রবি শস্যের চাষাবাদ করা হতো। পুকুর দিঘীতে মাছের চাষ করে এলাকার লোকজন সহ বেশির ভাগ শিশুর প্রোটিনের চাহিদা মিটানো হতো। লোক সংখ্যা অনুপাতে পর্যাপ্ত পুকুর-দিঘী থাকায় পরিবেশের ভারসম্য রক্ষা হয়েছিল। আগুন হতে রক্ষা ও ধোয়া মুছার কাজে ব্যবহার করতে সুবিধা ও অনেক বাড়ির আসে পাশে অগ্নি দুর্যোগের সময় পানির প্রয়োজনীয়তা মাথায় রেখে অনেকে পুকুর-দিঘী খনন করতো। তাছাড়া এক সময় বিত্তশালী লোকজন, বিশেষ করে জমিদার শ্রেণী বসতঘরের দড়্গিণ পার্শ্বে পুকুর দিঘী খনন করত। গ্রীষ্মকালে পরিবারের লোকজন এর শীতলতার জন্য। অপরদিকে অপেক্ষাকৃত দরিদ্র শ্রেণী বর্তমানের মত বৈদুতিক ফ্যান না পুকুর দীঘির উত্তর পাড়ে খরা মৌসুমে শরীর শীতিল করার জন্য বিছানা পেতে ঘুমাত। প্রাচীন কালে এখনকার মত হাটহাজারী উপজেলাসহ বিভিন্ন বিভিন্ন এলাকায় ফায়ার সার্ভিস এর সেবা ছিল না। এলাকার পুকুর-দিঘীর পানি দিয়ে অগ্নি দুর্যোগের সময় জান-মাল ও সম্পদ রক্ষা করত। স্বাধীনতার পর থেকে জনকল্যাণের জন্য ফায়ার সার্ভিসের কার্যক্রম সমপ্রসারণ করা হলেও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের আনত্মরিকতা ও সৎ ইচ্ছা থাকলেও তারা আগুন নিভাতে রাসত্মার কারণে দ্রম্নত অগ্নি দুর্ঘটনার স’ানে যেতে বিলম্ব হয়। পাশাপাশি পুকুর-দিঘী ভরাট করে বাড়ি ও মার্কেট নির্মাণ করার ফলে আগুন নিভানোর কাজে তারা পানি পায় না। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার আবাসিক সমস্যা সমাধান করতে আইন অমান্য করে ফসলী জমি ও পুকুর-দিঘী ভরাট করে প্রতিযোগীতা মূলকভাবে ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে করে একদিকে যেমন পরিবেশের ভারসম্য নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে অগ্নিদুর্ঘটনার সময় পুকুর-দিঘী ভরাটের কারণে পানির অভাবে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আগুন নিভাতে অসহায় হয়ে পড়ে।
উপজেলার আওতাধীন বিভিন্ন ইউনিয়নের কথা বাদ দিলেও সাম্প্রতিক সময়ে উপজেলা সদর (বর্তমান পৌরসভা এলাকায়) অনত্মত দুই ডজনের অধিক পুকুর-দিঘী-ডোবা ভরাট করে বহুতল ভবন ও মার্কেট নির্মাণ করা হয়েছে। তাছাড়া ফটিকা, কামালপাড়া, দেওয়ান নগর, খেরম্নপাড়া, শাহজালাল পাড়া, আজিম পাড়া, মীরের খীল, চন্দ্রপুর, আলীপুর, মেহেদী পাড়া, মোহাম্মদপুর, পূর্ব দেওয়াননগর, কালাচাঁন দিঘীর এলাকা, ফকিরহাট সংলগ্ন এলাকা, সুবেদার পুকুর পাড়, সেন পাড়া, শায়েসত্মাখা পাড়া প্রভৃতি এলাকায় আরো ১৫-২০টি পুকুর-দিঘী-ডোবা ভরাট করার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সাধারণ মানুষের নজরে পড়ছে। এই সব পুকুর-দিঘী-ডোবা ভরাট করে বহুতল ভবন নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরম্ন হয়েছে। হাটহাজারী ডিগ্রী কলেজের পিছনে পুকুর ভরাট করে রাসত্মা ও ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। প্রকাশ্য এই সব পরিবেশ বিধ্বংসী কাজ চললেও সংশিস্নষ্ট দায়িত্বশীল প্রশাসন অজ্ঞাত কারণে নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। এতে করে ফায়ার সর্ভিসের সেবা কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে, পরিবেশের ভারসম্য নষ্ট হচ্ছে, মাছের উৎপাদন সীমাহিন ক্ষতিগ্রস’ হচ্ছে।
হাটহাজারী ফায়ার সার্ভিস ও জেলা ফায়ার সার্ভিস হাটহাজারীতে ব্যপক হারে পুকুর-দিঘী-ডোবা ভরাটের কথা জানলে কারো লিখিত কিান অভিযোগ না পাওয়ায় এই ভরাট কিছুতেই বন্ধ করতে পারছে না সংশিস্নষ্টরা। হাটহাজারী উপজেলার ৩ নং মির্জাপুর ইউনিয়নের উত্তর সীমানা পর্যন্ত চট্টগ্রাম উন্নয়ন কতৃপক্ষের আওতাধীন। এ সব এলাকায় কোন স’াপনা নিমার্ণের সময় বিল্ডিং কোড মেনে চউক এর অনুমোধন সাপেড়্গে করার কথা থাকলেও সে নিয়ম এখানে কেউ মানছে না। অপরদিকে দায়িত্বশীল নির্ভরযোগ্য সূত্র মতে পরিবেশ রক্ষাকারী পুকুর-দিঘী ভরাটের পিছনে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি চক্র জড়িত রয়েছে ভরাটকারীদের সাথে। কিছু স্বাথর্ানেষী ডেভলপার কোম্পানী এবং জায়গা-জমির সিন্ডিক্রেট দালাল চক্র কৌশলে পুকুর-দিঘী-ডোবা ভরাট করে চলছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। যৌথ মালিকানাধীন পুকুর-দিঘী-ডোবা স্বাথর্ানেষী মহল দুই এক জন অংশিদার থেকে খরিদ করার সময় বিভিন্ন এলাকায় পুকুর গুলোকে কৌশলে নাল জমি হিসেবে নামজারী করে অংশীদারদের কয়েকজন থেকে ঐ মহলটি খরিদ করে নিয়ে বহুতল ভবন নির্মাণের জন্য ভরাট করছে এসব জলাধার। এ অবস’া অব্যহত থাকলে জনস্বার্থে ও পরিবেশ রক্ষা সহ প্রোটিনের অভাব, অগ্নিদুর্ঘটনার সময় পানির অভাবে আগুন নিভাতে দুস্কর হয়ে পড়বে। এতে করে জানমাল ও সম্পদের ব্যাপক ড়্গতি সাধিত হবে বলে অভিমত ব্যক্ত করেন চিনত্মাশীল মহল।