হাজারো পদচারনায় মুখরিত মহামুনি মেলা

প্রকাশ:| বৃহস্পতিবার, ১৩ এপ্রিল , ২০১৭ সময় ০৮:১৭ অপরাহ্ণ

শফিউল আলম, রাউজান ঃ রাউজানের মহামুনিতে বাংলা নর্ববর্ষ উপলক্ষে মেলায় হাজার হাজার উপজাতীয় নারী পুরুষের পদচারনায় এলাকা মুখরিত হয়ে উঠেছে । রাউজান উপজেলার পাহাড়তলী ইউনিয়নের মহামুনি বৌদ্ব মন্দিরে বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে দশদিন ব্যাপী মেলা শুরু হয় । গতকাল ১৩ এপ্রিল বৃহস্পতিবার থেকে ৭দিন ব্যাপী বিশাল মেলা শুরু হয়েছে । এই বিশাল মেলা শুরুর দিনে কৃহস্পতিবার দিন ও রিাতে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি জেলা খাগড়াছড়ি, বান্দরবান জেলা থেকে উপহাতীয় সম্প্রদায়ের হাজার হাজার নারী পুরুষ, কিশোর, কিশোরী, যুবক যুবতী দল বেধেঁ বাস, জীপ, সিএনজি বেবী টেক্সী নিয়ে মহামুনি মেলায় এসে মহামুনি মন্দিরের মধ্যে প্রার্থনা করে তাদের মনোবাসনা পৃর্ণ করেন । গতকাল ১৩ এপ্রিল বৃহম্পতিবার দিন থেকে রাত পর্যন্ত সময় উপজাতীয় সম্প্রদায়ের লোকজন মহামুনি মন্দিরের মধ্যে রাত যাপন করবেন । মহামুনি মন্দিরের ভেতরের মাঠে উপজাতীয় সম্প্রদায়ের লোকজন আদিবাসী নৃত্য গান ও গেীতম বৌদ্বের জীবন নিয়ে আলোচনা সভার মধ্যে রাত অতিবাহিত করেন । মহামুনির মেলায় মন্দিরের বাইরে বিশাল মেলায় পাটির দোকান, আসবাব পত্রের দোকান, সহ বিভিন্ন প্রসাধনূ সামগ্রীর দোকান সহ বিভিন্ন ধরণের খাওয়ার দোকান বসে । এই সব দোকান গুলোতে উপজাতীয় মহিলা পুরুষ সহ অনান্য সম্প্রদায়ের লোকজন দল বেধেঁ কেনাকাটা করতে দেখা যায় । মেলায় মুন সুইট নামে এক মিষ্টির দোকানের মালিক অশোক বড়–য়া জানান, মেলার শুরুর দিন তার দোকানে ৮৫ হাজার টাকার মষ্টি বিক্রয় করেছেন । সাতদিন ব্যাপী এই মেলায় বাংলা নর্ববষ বরন অনুষ্টান উপলক্ষে মহামুনি সাংস্কৃতিক সংঘ, মহামুনি তরুন সংঘ, বৌদ্ব ধর্মীয় জ্ঞানলোক পত্রিকার উদ্যোগে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্টান করে পুরাতন বর্ষকে বিদায় ও নতুন বৎসরকে স্বাগত্ব জানিয়ে পুরাতন বৎসরের সব গ্লানী ভুলে গিয়ে নতুর বৎসরকে বরন করবেন । সাতদিন ব্যাপী এই মেলায় বাংলা নর্ববষ বরন অনুষ্টান উপলক্ষে মহামুনি সাংস্কৃতিক সংঘ মাহামুনি তরুন সংঘের উদ্যোগে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্টানের মাধ্যমে বাংলা নর্ববর্ষ উপলক্ষে আনন্দ উৎসাহে মেতে উঠবেন । মহামুনি ত্রৈমাসিক জ্ঞানালো পত্রিকার ১২তম প্রতিষ্টা বার্ষির্কী উপলক্ষে ফনিতটি মঞ্চে সংবর্ধনা সভার আয়োজন করা হয়েছে বলে জানান মেলা উদযাপন পরিষদের সাধারন সম্পাদক ইউপি মেম্বার দেবাশীষ বড়–য়া মাইকেল ও মহামুনি গ্রাম উন্নয়ন কমিটির সাধারন সম্পাদক অনুপম বড়–য়া বাবলু । এই সব অনুষ্টানে এলাকার গুনি ব্যক্তি ও জে, এস, সি, পি,এস,সি পরিক্ষায় উত্তির্ন শিক্ষার্থীদের ও ধর্মীয় শিক্ষা বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদেরকে সম্মমনা প্রদান করা হবে । গত ১৮১৩ সালে পাহাড়তলী মহামুনি মন্দির প্রতিষ্টা করেন চাইঙ্গাঁ ঠাকুর । মহামুনি মন্দির নির্মান করার পর থেকে প্রতি বৎসর বাংলা নববর্ষের শুরু থেকে মহামুনিতে মাস ব্যাপী মেলা হতো । কালের বির্বতনে এই মেলা দিন দিন হৃাস পেয়ে আসছিলো । দুইশত দুই বৎসরের এই পুরানো মন্দির কে সংস্কার ও মেলার আয়োজন করতে নিরলস ভাবে মহামুনি মন্দির উন্নয়ন কমিটির সভাপতি লায়ন রুপম কিশোর বড়–য়া সহ এলাকার লোকজন এগিয়ে আসায় আবারো প্রাণ ফিরে পেল দুইশত বৎসরের পুরানো মহামুনি মেলা । মেলায় চন্দ্রঘোনা এলাকার বাসিন্দ্বা থুইচিং মারমা জানান এলাকার লোকজন নিয়ে ও পরিবারের সদস্যদের প্রতি বৎসরের মতো এবারো মেলায় এসেছে রাত থেকে সবাইকে নিয়ে চলে যাবেন । রাউজান থানার নবাগত ওসি কেফায়েত উল্লাহ বলেন মহামুনি মেলায় এক প্লাটুন পুলিশ সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন । রাউজানের পাহাড়তলী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রোকন উদ্দিন বলেন বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে মহামুনিতে বিশাল মেলায় সকল সম্প্রদায়ের মিলন মেলা পরিনত হয়েছে । মহামুনি গ্রামের ৭শত বৌদ্ব পরিবারের ঘরে ঘরে সাজ সাজ রব একে অপরকে মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়ন করছে । মহামুনি গ্রাম উন্নায়ন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বাবু অনুপম বড়–য়া বাবুল জানান, আদিবাসীরা এখানে সকাল থেকে রাতভর অবস্থান করেন। সন্ধ্যায় তারা মহামুনি মন্দিরে পুজার মাধ্যমে বাংলা বর্ষকে বিদায় জানিয়ে চৈত্র সংক্রান্তি পালন করেন। রাতে স্বনাম খ্যাত বিভিন্ন শিল্পী গোষ্ঠীর পরিবেশনায় থাকছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। দেশ বিদেশের পাহাড়ি উপজাতিদের এক মাহা মিলন মেলা। জনশ্রুতি আছে, মেলায় উপজাতিরা পারিবারিক ভাবে পাত্র-পাত্রী পছন্দের মাধ্যমে একে অপেরর সাথে আত্মীয় বন্ধন সৃষ্টি করে। এই দিন মন্দির প্রাঙ্গণে বাঙ্গালিদের প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকে।
জানা যায়, ১৪ এপ্রিল সকালে স্থানীয় সংগঠন গুলোর যৌথ উদ্যোগে মন্দির অভিমুখী শোভাযাত্রার বর্ষবরণের প্রক্রিয়া শুরুহবে। সকাল ১০ টায় মহামুনি বটমূল খ্যাত ফণী-তটি মঞ্চ স্থানীয় সংগঠনের শিল্পীদের পরিবেশনায় মুক্তাঙ্গণ অনুষ্ঠান। একই স্থানে পর্যায়ক্রমে চলতে থাকবে স্থানীয় সংস্থা গুলোর বৃত্তি প্রদান, গুণিজন ও কৃতি সম্বর্ধনা, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সহ নানা কর্মসূচী। সপ্তাহব্যাপী চলবে এই আয়োজন।

স্থানীয় সুত্রে জানা যায়, ‘চাইঙ্গা ঠাকুর’ নামের এক বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরু এই বিহারে ১৮০৫ মতান্তরে ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দে মহামুনি অর্থাৎ মহামানব গৌতম বুদ্ধের মুর্তি স্থাপিত হয়েছে বলে এর নামকরণ করা মহামুনি মন্দির। এই মন্দিরটির কারণে মহামুনি গ্রাম ধর্মপ্রাণ বৌদ্ধ ধর্মারম্বীদের নিকট পবিত্র তীর্থ স্থানে পরিণত হয়। মহামুনি মন্দিটিকে কেন্দ্র করে মং সার্কেল রাজা ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দে মহামুনি মন্দির চত্বরে মেলার প্রবর্তন করেন। যা বাংলা চৈত্র মাসের শেষ তারিখ থেকে শুরু হয়। এ মেলাটি মহামুনি মেলা নামে পরিচিতি লাভ করে। জানা যায়, একসময় মহামুনি মেলা এতই জনপ্রিয়তা লাভ করে যে অবিভক্ত বাংলায় পশ্চিমবঙ্গ হতেও এখানে জনসমাগম ঘটেছে।
সুপ্রাচীনকাল হতে মহামুনি বিহার প্রাঙ্গনের বিশাল এলাকা জুড়ে প্রচলিত হয়ে আসা ঐতিহাসিক মহামুনি মেলাটি চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী আদিবাসী-বাঙ্গালিদের এক মিলনমেলা। আদিবাসী-বাঙালির এই মিলন মেলাটি চট্টগ্রাম ছাড়িয়ে সারাদেশের মধ্যেও পরিচিতি লাভ করেছে । ইতোমধ্যে এই মহামুনি মেলাকে ঘিরে মন্দির চত্বরে বিভিন্ন কারুশিল্প, হস্তশিল্প, রকমারি প্রসাধনী, হরেক রকম মিষ্টান্ন দ্রব্যাদি. মৌসুমী ফলফলাদি ও খাবার হোটেলসহ রকমারি জিনিসের স্টল নির্মান বসে ষ্টলগুলোতে কেনাকাটার জন্য ভীড় করছে মেলায় আগত নারী পুরুষেরা । মন্দিরের এই উৎসবকে ঘিরে পাহাড়তলীতে গোটা এলাকা জুড়ে শুরু হয়েছে আনন্দ উৎসব।
চলমান প্রেক্ষাপটে মেলার নিরাপত্তা প্রসঙ্গে উপজেলা ইউএনও শামীম হোসেন রেজা, জানান, ঐতিহ্যবাহী মহামুনি মন্দির ও মেলা সমগ্র বাংলাদেশে সুপরিচিত প্রাচীণ নিদর্শন। এটি পাহাড়া- বাঙ্গালী মহামিলন কেন্দ্র। মেলার নিরাপত্তা জন্য কতৃপক্ষের আবেদনের প্রেক্ষিতে আমরা যথাযত ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
রাউজান থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কেফায়েত উল্লাহ জানান, মেলায় ইউনিফর্ম ও সাদা পোষাকে পুলিশ নিয়োজিত থাকবে। মেলায় কোন ধরনের মদ, জুয়ার আসর চলতে দেওয়া হবে না। মেলা কমিটির সাথে সমন্বয়করে নিরাপত্তার বেষ্টনী তৈরি করা হবে।


আরোও সংবাদ