স্মরণের ফুলে ছেয়ে গেছে স্মৃতির বেদি

নিউজচিটাগাং২৪/ এক্স প্রকাশ:| বুধবার, ১১ জুলাই , ২০১৮ সময় ০৭:১৯ অপরাহ্ণ


আবু সাঈদ ভূঁইয়া, মিরসরাই:
কালের তিমিরে হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতির বেদি’তে ফুলেল ভালোবাসায় মিরসরাই ট্র্যাজেডির ৭ম বর্ষপূর্তি পালিত হলো। অশ্রুসজল নয়নে আদরের সন্তানদের স্মরণ করলো স্বজন, সহপাঠী আর শুভাকাঙ্খীরা। বুধবার (১১ জুলাই) নানা আয়োজনে পালিত হলো মিরসরাই ট্র্যাজেডি। ২০১১সালের এইদিনটিতে একসাথে ৪৩ শিশু-কিশোর, এক গ্রামবাসী আর একজন অভিভাবকের মৃত্যু স্তব্ধ করেছিল পুরো জাতিকে। ৪৫টি তাজা প্রাণ মুহুর্তেই স্মৃতি হয়ে মিলিয়ে গিয়েছিল সেদিন।
দিবসটি উপলক্ষ্যে সকাল ৯টায় বের করা হয় শোক র‌্যালী। র‌্যালীতে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, শিক্ষকবৃন্দ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে নেতৃবৃন্দ, জনপ্রতিনিধি, নিহত ছাত্রদের স্বজন বৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। র‌্যালি শেষে নিহত ছাত্রদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ ‘আবেগ’ ও ‘অন্তিম’ এর স্থলে পুষ্পস্তবক অর্পন করে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এমপি।
পরে আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এক স্মৃতিচারণ ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। এম আলা উদ্দিনের সভাপতিত্বে ও আওয়ামীলীগ নেতা এসএম গোলাম সরওয়ারের সঞ্চালনায় এতে প্রধান অতিথি ছিলেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এমপি। অন্যানের মধ্যে বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দিন, বিঞ্জান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান রুহেল, চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের সদস্য শেখ আতাউর রহমান, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) ইয়াসিমন শাহীন কাকলী, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কায়সার খসরু, উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী, উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ফেরদৌস হোসেন আরিফ, মায়ানী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কবির নিজামী, মঘাদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের জাহাঙ্গীর মাস্টার, ইছাখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুল মোস্তফা, প্রফেসর কামাল উদ্দিন কলেজের অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) নুরুল আবছার, আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মর্জিনা আক্তার প্রমুখ।
প্রধান অতিথি গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এমপি বলেন, মিরসরাই ট্র্যাজেডি শুধু মিরসরাই বাসীর জন্য শোকগাঁথা নয়। এটি পুরো দেশকে নাড়া দিয়েছিল। সে আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ছুটে এসেছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান, তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়াসহ অনেক রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ।
তিনি আরো বলেন, আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয়কে সরকারিকরণ করা দাবি উঠেছিল। বিষয়টি সরকারের নজরে রয়েছে। নতুন করে উচ্চ বিদ্যালয় সরকারি করণে ঘোষনা এলে আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয়কে প্রথমে সরকারিকরণ করা হবে।

এদিকে মঙ্গলবার সকালে আবুতোরাব এলাকায় আসেন উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন। তিনি স্মৃতিস্তম্ভ ‘আবেগ’ ও ‘অন্তিম’ এ ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।

ফিরে দেখা:
২০১১ সালের ১১ জুলাই মিরসরাই সদর স্টেডিয়ামে বঙ্গবন্ধু এবং বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্টের খেলা জয়ের আনন্দ নিয়ে একটি মিনিট্রাকে চড়ে বাড়ি ফিরছিল প্রায় ৮০জন শিক্ষার্থী। বড়তাকিয়া-আবুতোরাব সড়কের সৈদালী নামক স্থানে চালকের গাফেলতির কারণে উল্টে গিয়ে খাদে পড়ে ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হন ৩৮জন শিক্ষার্থী একজন এলাকাবাসী। পরবর্তীতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আরো পাঁচ শিক্ষার্থী এবং একজন অভিভাবক। নিহত শিক্ষার্থীদের সকলেই স্থানীয় আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয়, আবুতোরাব কলেজ ও আবুতোরাব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত ছিলেন। সেদিন একসাথে ৪৩ শিশু-কিশোর, এক গ্রামবাসী আর একজন অভিভাবকের মৃত্যু স্তব্ধ করেছিল পুরো জাতিকে। ৪৫টি তাজা প্রাণ মুহুর্তেই স্মৃতি হয়ে মিলিয়ে গিয়েছিল সেদিন। তার সাথে হারিয়ে গিয়েছিল অজানা হাজারো রঙিন স্বপ্ন। লাশের মিছিলে ভারী হয়ে ওঠেছিল গ্রামের পর গ্রাম। শোকের জনপদে পরিনত হয়েছিল মায়ানী, আবুতোরাব, মঘাদিয়াসহ পার্শ্ববর্তী ৪টি গ্রাম। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে, তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী, সাবেক রাষ্ট্রপতি, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের জাতীয় নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন বেসরকারী প্রতিষ্ঠান এসেছিলেন নিহতদের স্বজন-সহপাঠীদের সান্তনা দিতে। কিন্তু কিছুতেই শোক ভুলতে পারেনি স্বজন কিংবা সহপাঠিরা। ঘটনার প্রথম কয়েক মাস ধরে মানসিক অস্বাভাবিকতা বিরাজ করত সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মধ্যে। শ্রেণীকক্ষে এসে অজ্ঞান হয়ে যেত অনেক শিক্ষার্থী। অনিয়মিত হয়ে পড়েছিল পাঠদান কার্যক্রম। অজানা আতংক উৎকন্ঠায় দিন কাটতে থাকে অভিভাবকদের। এখনো এসব স্মৃতি ভাবতে গিয়ে আঁতকে ওঠেন নিহতদের পরিবার, স্বজন, সহপাঠি কিংবা শিক্ষকরা।

দায়ী চালকের জেল অতঃপর মুক্তিঃ
ভয়াবহ এই দূর্ঘটনার হোতা পিকআপ চালক মফিজ ঘটনার পরপরই গাঁ ডাকা দেয়। অবশেষে নয়দিন পর বরিশালের কাউনিয়া থানা এলাকার এক আত্মীয়ের বাসা থেকে মফিজকে গ্রেফতার করে পুলিশ। চারদিকে রব উঠে ঘাতক ড্রাইবার মফিজের দৃষ্টান্তমুলক শাস্তির। পরবর্তিতে আদালত চালক মফিজকে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর অপরাধে ৩ বছরের কারাদন্ড, ১০হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরো ৬ মাসের কারাদন্ডের আদেশ দেন। এছাড়াও বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালিয়ে গুরুত্বর জখমের অপরাধে আরো দুই বছর কারাদন্ড ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরো ৩মাসের সশ্রম কারাদন্ডের আদেশ দেন। সর্বমোট ৫ বছর ৯ মাস সাজা হয় ওই চালকের। আদালতের দেয়া সেই সাজা খেটে ২০১৫ সালের ২৮ জুলাই মুক্তি পান চালক মফিজ।