স্বাগতম মাহে রামাদান, সৃষ্টিকর্তার এক মহান দান

প্রকাশ:| বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন , ২০১৫ সময় ১১:০৬ অপরাহ্ণ

রামাদান রামজান রমযান রোজা সিয়াম
মিজান মনির,
সহ-সম্পাদক, নিউজচিটাগাাং২৪.কম

দিন-মাস-বছর ঘুরে ফিরে এসেছে মুসলমানদের আত্মশুদ্ধি আর সংযমের মাস মাহে রমজান। রাতে তারাবির নামাজ পড়ার পর ভোরে সেহরি খেয়ে শুক্রবার প্রথম রোজা রাখা শুরু করবেন বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা। মুসলমানদের জন্য জুমার দিন যেমন সপ্তাহের সেরা দিন, ঠিক তেমনি রমজান মাস প্রত্যেক বছরের সেরা মাস। রমজান মাস মহান সৃষ্টিকর্তার এক নেয়ামত। এ মাস রহমত, মাগফেরাত ও নাজাতের মাস। এ মাসে রহমত নিয়ে স্রোতের দরিয়া বয়ে যায়, যে দরিয়ায় অবগাহন করে মুমিন বান্দা পারলৌকিক মুক্তির ঠিকানা খুঁজে পায়। তাই তো প্রত্যেক মুমিন নিজ নিজ আমলকে সমৃদ্ধ করার জন্য ১১ মাস অপেক্ষা করে। কেননা, এ মাসের প্রতিটি নফলের মর্যাদা অন্য সব মাসের ফরজের সমতুল্য এবং একটি ফরজ ইবাদত অন্য মাসের ৭০টি ফরজ ইবাদতের সমান। এ মাসে মহনা সৃষ্টিকর্তা পবিত্র কোরআন নাযিল করেছেন। তা ছাড়া এ মাসে এমন একটি রাত রয়েছে, যা হাজার রাতের চেয়ে উত্তম।

পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে- রমজান পবিত্র মাস, এ মাসে মানুষের দিশারী, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারী কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে। (বাকারা-১৮৫)।
এই মোবারক মাসকে তিনটি দশকে ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি দশককে আলাদা আলাদা নামে নামাঙ্কিত করা হয়েছে। প্রথম দশক রহমতের, দ্বিতীয় দশক মাগফিরাত তথা ক্ষমার এবং শেষ দশক হলো নাজাত তথা জাহান্নাম থেকে মুক্তির দিবস।
পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, হে মুমিনগণ তোমাদের ওপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপরও ফরজ করা হয়েছিল। যাতে তোমরা মুত্তাকি হতে পার। (বাকারা:১৮৩)।
সত্যিই, রমজান মাস আসার সঙ্গে সঙ্গে রহমতের ধারা প্রবাহিত হতে থাকে সারাবিশ্বে। আসলে রমজানের প্রথম দশক রহমতের ভাগটা অনেক বিশাল। হাদিসে কুদসিতে বলা হয়েছে, মহান আল্লাহ বলেন : ‘আমার রহমত আমার রাগের ওপর অগ্রগামী হয়েছে।’ রহমতের দ্বারগুলো এ মাসে সবার জন্য খোলা। ভাগ্যবানরা তা লুফে নেন সবার আগে।

হাদিসে আছে, আল্লাহর প্রিয় হাবিব হজরত মুহাম্মদ (সা.) এরশাদ করেন, যখন রমজান মাস প্রবেশ করে, তখন আকাশের দ্বারগুলো উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। অন্য এক হাদিসে আছে, জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। আর মানুষের চিরশত্রু শয়তানদের শিকলাবদ্ধ করা হয়। অপর আরেকটি হাদিসে আছে, রহমতের দ্বারগুলো অবারিত করা হয়। (মিশকাত শরিফ-১৮৫৫)

এ মাসের প্রথম রাত থেকে একজন আহ্বানকারী আহ্বান করতে থাকেন এ কথা বলে যে, হে কল্যাণ তালাশকারী সম্মুখে ‘অগ্রসর হও’ আর হে মন্দের অন্বেষণকারী ‘থেমে যাও’। (মিশকাত-১৮৬৪)

এ মাস মহান ধৈর্যের মাস, আর ধৈর্যের প্রতিদান হলো জান্নাত। পারস্পরিক সহানুভূতির মাস হিসেবে রমজানের কোনো বিকল্প নেই। কেননা, রোজার উপবাসের মধ্য দিয়ে ধনীরা ক্ষুধা-পিপাসার অনুভূতি, আর অভাবীর দুঃখ-কষ্ট অনুধাবন করতে সক্ষম হন। ফলে তাঁরা এ মাসের ফকির-মিসকিনের প্রতি একটু বেশি সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠেন। তাই তো দেখা যায়, আল্লাহর প্রিয় হাবিব হযরত মুহাম্মদ (সা.) এ মাসে প্রত্যেক বন্দীকে মুক্তি করে দিতেন এবং প্রত্যেক ভিক্ষুককে দান করতেন।

এই বরকতময় মাসকে উপলক্ষ করে সারা বছর জান্নাতকে সুসজ্জিত করা হয়। যেমন হাদিসে এসেছে, আল্লাহর প্রিয় হাবিব হযরত মুহাম্মদ (সা.) এরশাদ করেন, বছরের প্রথম থেকে পরবর্তী বছর পর্যন্ত রমজানকে উদ্দেশ্য করে জান্নাতকে সুসজ্জিত করা হয়ে থাকে। অতঃপর যখন রমজানের প্রথম দিন আসে, তখন আল্লাহর আরশের নিচে জান্নাতের গাছের পাতা হতে ডাগর ডাগর চোখবিশিষ্ট হরদের প্রতি এক প্রকার বাতাস প্রবাহিত হয়। তখন তাঁরা (হরগণ) বলেন, হে আমাদের প্রতিপালক, আপনার বান্দাদের মধ্য থেকে আমাদের জন্য এমন স্বামীগণ নির্ধারিত করুন, যাদের দেখে আমাদের চোখ শীতল হবে এবং আমাদের দেখে তাদের চোখ ঠান্ডা হবে। (মিশকাত শরিফ-১৮৭০)

সর্বোপরি এ মুক্তির মাসে অবতীর্ণ হয়েছে বিশ্বমানবতার আলোর দিশারী মহাগ্রন্থ আল কোরআন। যেমন : আল্লাহতায়াল বলেন—

রামাদান (এমন একটি মাস), যাতে কোরআন নাজিল করা হয়েছে, আর এই কোরআন (হচ্ছে) মানবজাতির জন্য পথের দিশা, সৎপথের সুস্পষ্ট নিদর্শন এবং (মানুষের জন্য হক বাতিলের) পাথর্ক্যকারী।

তা ছাড়া এ মহান মাসের প্রথম রাতে মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর ওপর ছাইফাসমূহ অবতারিত হয়। তাওরাত নাজিল করা হয় ৭ রমজানে, ইনজিল অবতারিত হয় এই মাসের ১৪ তারিখে এবং যাবুর অবতারিত হয় অত্র মাসে ১৩ তারিখে। এ মাসে বেশি বেশি কোরআন তেলাওয়াত করা জরুরী।

তাকওয়া অর্জিত হলেই কেবল রোজা আমাদের পাপকে জ্বালিয়ে দেবে। তাই শুধু তেলাওয়াত নয়, বরং কুরআনকে অর্থ ও ব্যাখ্যাসহ পড়ে আমল করা জরুরি। এর মাধ্যমেই আমরা বুঝতে পারব আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য কী, আমাদের দায়িত্ব কী আর পশুর ন্যায় দেহটি কিভাবে পরিণত হবে মানুষে। আরো বুঝতে পারবো- রোজা আসে রোজা যায়, তবুও সমাজ থেকে পাপাচার, অন্যায়, পশুত্ব, রাহাজানি কেন দূর হয় না। তাই এই রমজান হোক নিজেকে বদলে দেয়ার, পাপ-কালিমাকে মুছে দেয়ার, আর আল্লাহর রহমত পাওয়ার উপযোগী করে নিজেকে গড়ে তোলার। আহলান সাহলান মাহে রমজান।