স্নিগ্ধ শরতে মনকাড়া রঙিন ফুল

প্রকাশ:| শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর , ২০১৫ সময় ০৭:৫১ অপরাহ্ণ

শরতের ফুলবর্ষার বারিধার পেরিয়ে এসেছে সিগ্ধ শরৎ। সাদা মেঘের ভেলা ভেসে বেড়াচ্ছে প্রাচীন আকাশের নীলে। রাতে চাঁদের উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত হয়ে উঠছে পৃথিবী। প্রকৃতি সেজেছে বাহারি ফুলের সাজে। নদীর দু’ধারজুড়ে শুভ্র কাশের বন। ঢেউয়ের ছন্দের তালে মাথা দুলিয়ে ওরাও হচ্ছে আনন্দের ভাগিদার।

সাদা শাপলা : শরতে পুকুর, ডোবা, হাওর, বিল- সব জায়গায় ফুটেছে শাপলা ফুল। শাপলা আমাদের জাতীয় ফুল। বীরুৎ জাতীয় জলজ উদ্ভিদ। এই উদ্ভিদের বৈজ্ঞানিক নাম : Nymphaea nouchali. শাপলার কন্দ বা মূল পানির নিচে মাটিতে থাকে। পাতা বড়, গোলাকার, বোঁটা লম্বা। ফুল বড়, রঙ সাদা। গাঢ় লাল ও গোলাপি রঙের শাপলাও দেখতে সুন্দর। ফুল ফোটে সারা বছর। ফলে থাকে ছোট ছোট বীজ। বীজ থেকে খৈ ভেজে খাওয়া যায়। শাপলার পরিণত ফলকে ঢ্যাপ বা ভেট বলে। শাপলার লম্বা ডাঁটা ও ফুল সবজি হিসেবে রান্না করে করে খাওয়া যায়। ঢাকার বলধা গার্ডেনে দেখা যায় দুর্লভ হলুদ শাপলাও।
ঝুমকো জবা : গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ ঝুমকো জবা। এর বৈজ্ঞানিক নাম : Hibiscus schizopetalus. এটি Malvaceae পরিবারের উদ্ভিদ। ইংরেজিতে এই ফুল Fringed Hibiscus নামে পরিচিত। গাছ বহু শাখা-প্রশাখাবিশিষ্ট। কাণ্ড খসখসে, পাতা মসৃণ ও চকচকে। পাতার দু’ধার করাতের মতো খাঁজকাটা। এই উদ্ভিদ খুব কষ্টসহিষ্ণু। ঝুমকো জবার গঠন অন্যান্য জবা থেকে ভিন্ন রকম। ফুল একক, উপরের দিক বাঁকানো। ফুলের চেয়ে বোঁটা বেশি দীর্ঘ এবং ফুল ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে। এর আদি বাসস্থান পূর্ব আফ্রিকা। গুটিকলম বা কাটিং দিয়ে বংশ বৃদ্ধি করা যায়।

কাশফুল : কাশ তৃণ বা ঘাসজাতীয় উদ্ভিদ। নদী বা বিলের ধারে দেশের প্রায় সবখানে এই ঘাসটি দেখা যায়। নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা আর কাশফুল দেখলেই আমরা সবাই বুঝি শরৎ এসেছে। কারণ কাশফুল শরতের আগমনের প্রতীক। এই উদ্ভিদের বৈজ্ঞানিক নাম : Saccharum spontaneum. বাতাসে দোলে মোহনীয় ভঙ্গিমায় কাশগাছ ৫ থেকে প্রায় ২৩ ফুট পর্যন্ত উঁচু হয়। শরতকালে কাশের সাদা ও রুপালি ফুল ফোটে। শরতের হালকা বাতাসে সাদা কাশফুলের দুলতে থাকার দৃশ্য মনোরম। এই উদ্ভিদের আদি বাসস্থান রোমানিয়া।

কামিনী : কামিনী চিরসবুজ ক্ষুদ্র বৃক্ষ। ফুল ফোটে সন্ধ্যায়, ঝরে ভোরবেলায়। কামিনীর বৈজ্ঞানিক নাম : Murraya paniculata. ফুল ক্ষুদ্র, সাদা, সুগন্ধী, মঞ্জরীতে উৎপন্ন হয়। ঘন সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে থোকায় থোকায় বের হয়। কামিনী ফুলের গন্ধে চারদিক হয় সুবাসিত। ঝোপ জাতীয় এ ফুলগাছ কেটেছেঁটে আকর্ষণীয় করে তোলা যায়। বাগান সজ্জায় অনন্য। এ ফুলটির আদিনিবাস চীন।

শিউলি : শিউলি ক্ষুদ্র বৃক্ষ। শরতের রাতে ফোটে শিউলি ফুল। ঝরে যায় ভোরবেলায়। শেষ রাতে শিউলির সুবাস ছড়িয়ে পড়ে বহুদূর পর্যন্ত। এ জন্য এর ইংরেজি নাম নাইট জেসমিন এবং হিন্দি ও উর্দুতে ডাকা হয় রাতকা রানী বলে। শিউলির বৈজ্ঞানিক নাম : Nyctanthes arbortristis. সুবাসের জন্য শিউলির যেমন কদর তেমনি গৃহসজ্জা ও মালা গেঁথে কোনো বিশেষ জায়গা সাজানোর জন্যও এর সমাদর বেশি। পাতায় রঙ ফিকে সবুজ। ফুল ছোট, রঙ সাদা। দেখতে কিছুটা জুঁই ফুলের মতো বাসন্তী রঙের বোঁটা ফুলের মাঝখানে দেখা যায়। শরতের সকালে হালকা শিশিরভেজা সবুজ ঘাসের ওপর শুভ্র শিউলি ফুল ছড়িয়ে পড়ে। শরৎ মানেই যেন শিউলির শুভ্রতা। শিউলির রঙেই যেন শরতের পরিচয়। শরৎ কাঁপে শিউলি ফুলের হরষে। শিউলিকে অনেকে ডাকে শেফালি বলে। কেবল প্রভাত নয়, শিউলি সুবাসে মাতিয়ে রাখে শরৎসন্ধ্যাও। কারণ, কমলা-হলুদ বোঁটা আর সাদা পাপড়ির ফুলকলিরা মুখ তোলে সন্ধ্যায়। সারা রাত গন্ধ বিলিয়ে ঝরে পড়ে নিশিভোরে, তলার ঘাসে, ঝরাপাতার কোলে। ভোরের আলো ফোটার আগে ঝরে গেলেও যেন শেষ হতে চায় না শিউলির রূপ।

টগর : ঝাঁকড়া মাথার জন্য টগর গাছ খুবই সুন্দর। টগরের বৈজ্ঞানিক নাম : Tabernaemontana coronaria. বহু শাখা-প্রশাখা নিয়ে ঝোপের মতো। বাগানের শোভা বাড়ায় সুন্দর করে ছেঁটে দিল দারুণ ঘন ঝোপ হয়। কলম করে চারা করা যায়। আবার বর্ষাকালে ডাল পুঁতলেও হয়। বাংলাদেশের বন-বাদাড়ে টগর এমনিতেই জন্মে। গাছের পাতা বা ডাল ছিঁড়লে সাদা দুধের মতো কষ ঝরে বলে একে সিলেটে দুধফুল বলে ডাকে। সারা বছর ফুল ফোটে। থোকা টগর দেখতে সুন্দর, মৃদু গন্ধ ছড়ায়। কিন্তু একক টগরে কোনো গন্ধ নেই। দক্ষিণ আমেরিকা থেকে টগর ভারত উপমহাদেশে এসেছে। ঔষুধি গুণও রয়েছে। বাংলাদেশের বনে-বাদাড়ে টগর এমনিতেই জন্মে। ফুল থেকে ফলও হয়। টগরের চল্লিশটি প্রজাতি আছে। যদিও বাংলাদেশ ও ভারতে মাত্র চারটি প্রজাতি পাওয়া যায়।

ছাতিম : ছাতিমের স্থানীয় অন্যান্য নাম : ছাতিয়ান, ছাইত্তান। বৈজ্ঞানিক নাম : Alstonia scholaris. পরিবার : Apocynaceae. ছাতিমের সরল উন্নত কাণ্ড কিছুদূর উপরে হঠাৎ শাখা-প্রশাখার একটি ঢাকনা সৃষ্টি করে আবার একলাফে একে ছাড়িয়ে অনেক দূর উঠে যায় এবং পত্রঘন কয়েকটি চন্দ্রাতপের স্তর সৃষ্টি করে। এ সব কারণে অনেক দূর থেকেই ছাতিম গাছ শনাক্ত করা যায়। ১৫ থেকে ২০ মিটার উঁচু, চিরসবুজ দুধকষভরা সুশ্রী গাছ। পাতা প্রায় ১৮ সেন্টিমিটার লম্বা, মসৃণ, উপর উজ্জ্বল সবুজ, নিচ সাদাটে। শরতে সারা গাছ ভরে গুচ্ছবদ্ধ, তীব্রগন্ধী, সবুজ-সাদা ছোট ছোট ফুল ফোটে। ফল সজোড়, থোকায় থোকায় ঝুলে থাকে। ফুল সাদা ও আকারে কিছুটা বড়। কাঠ সাধারণ আসবাবে ব্যবহার্য এবং উৎকৃষ্ট জ্বালানি। গাছের ছাল ও আঠা জ্বর এবং হৃদরোগ, হাঁপানি, ক্ষত, আমাশয় ও কুষ্ঠে উপকারী। আদি আবাস ভারত, চীন ও মালয়েশিয়া।

প্রকৃতিতে এখন শরৎকাল। শরৎকালের প্রকৃতি হয় কোমল, নির্মল, শান্ত, স্নিগ্ধ, উদার। সেই উদার শরৎকে আরও রাঙিয়ে তোলে শাপলা, পদ্ম, জুঁই, কাশ, শিউলি, জবা, কামিনী, মালতি, মল্লিকা, মাধবি, ছাতিম, দোলনচাঁপা, বেলি, জারুল, নয়নতারা, ধুতরাসহ নানা জাতের ফুল।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, সরকারি আনন্দমোহন কলেজ, ময়মনসিংহ।


আরোও সংবাদ