স্কুলছাত্র হত্যায় পুলিশ কনস্টেবলের দায় স্বীকার

প্রকাশ:| রবিবার, ১৫ মার্চ , ২০১৫ সময় ১০:২৬ অপরাহ্ণ

সিলেটের স্কুলছাত্র আবু সাঈদকে (৯) অপহরণের পর হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন পুলিশ কনস্টেবল এবাদুর রহমান। শনিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে সিলেট নগরীর কুমারপাড়া ঝর্ণার পাড় এলাকায় ওই কনস্টেবলের বাসা থেকেই সাঈদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। বুধবার স্কুল থেকে ফেরার পথে তাকে অপহরণ করা হয়েছিল।

নারায়ণগঞ্জের সাত খুনে র‌্যাব সদস্যদের জড়িত থাকার ঘটনার বিচার শেষ হওয়ার আগেই আবারো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যের বিরুদ্ধে অপহরণ ও হত্যার অভিযোগ পাওয়া গেল।

রোববার বিকেলে সিলেট মহানগর হাকিম আদালত-১ এর বিচারক শাহেদুল করিমের কাছে এই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন এবাদুর রহমান। শনিবারই এবাদুলকে আটক করেছিল পুলিশ। পরে তার বাসা থেকেই সাঈদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় র‌্যাবের এক সোর্স ও ওলামা লীগের এক নেতাকেও আটক করা হয়েছে।

স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে পুলিশ কনস্টেবল বলেছেন, মুক্তিপণ আদায়ের জন্যই সাঈদকে অপহরণ করা হয়েছিল। এ কাজে র‌্যাবের সোর্স গেদা মিয়া ও জেলা ওলামা লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রকিবও জড়িত। অপহরণের পর সাঈদ তাদের চিনে ফেলায় তাকে হত্যা করা হয়।

আদালতে এবাদুলের স্বীকারোক্তি দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মো. রহমত উল্লাহ।

স্কুলছাত্র আবু সাঈদস্কুলছাত্র আবু সাঈদ1বুধবার সাঈদকে অপহরণের পর তার বাবা ও মামার কাছে ফোন করে ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেন অপহরণকারীরা। মুক্তিপণ না দিলে সাঈদকে হত্যা করা হবেও তখন হুমকি দেয়া হয়েছিল। এরপর সাঈদের বাবা ও মামা কোতোয়ালি থানায় গিয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) দায়ের করেন।

সাঈদের মামা জয়নাল আবেদিন বলেন, ‘অপহরণকারীরা ৫ লাখ টাকা দাবি করলে আমরা বলি এতো টাকা দেয়ার সামর্থ্য আমাদের নেই। পরে তারা ২ লাখ টাকা দিতে বলে। টাকা নিয়ে হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজার শরীফে যেতে বলা হয়। আমরা টাকা নিয়ে সেখানে গেলে ফোন করে আমাদের বাইশটিলা এলাকায় যেতে বলা হয়। সেখানে যাওয়ার পর তারা ফোন করে বলে, আমরা কেন ঘটনাটি পুলিশকে জানিয়েছে। অপহরণকারীরা সাঈদকে হত্যা করা হবে বলে হুমকি দিয়ে ফোন রেখে দেয়।’

যেভাবে ধরা পড়লেন এবাদুল
সাঈদ অপহরণ ঘটনার তদন্তের দায়িত্ব পান সিলেট মহানগরী কোতোয়ালী থানার সেকেন্ড অফিসার ফয়াজ আহমদ। যে মোবাইল নম্বর দিয়ে অপহরণকারীরা সাঈদের বাবা ও মামার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন সেই নম্বর ট্র্যাক করে পুলিশ জানতে পারে সেটি মহানগরীর এয়ারপোর্ট থানার কনস্টেবল এবাদুলের মোবাইল নম্বর। এরপর কাজ আছে বলে শনিবার এবাদুলকে থানায় ডেকে আনা হয়। সেখানে তাকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। প্রথমে এবাদুল ঘটনাটি অস্বীকার করেন। পরে ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন এবং সাঈদকে হত্যার কথা জানান। এরপর রাত ১১টার দিকে নগরীর ঝেরঝেরি পাড়ার সবুজ ৩৭ নং বাসা থেকে সাঈদের বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার করা হয়। এছাড়া এবাদুলের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী নগরীর কোর্ট পয়েন্ট সংলগ্ন এলাকা থেকে র‌্যাবের সোর্স গেদা মিয়াকে এবং বন্দরবাজার থেকে জেলা ওলামা লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রকিবকে আটক করা হয়।

সাঈদের লাশ উদ্ধারের পর ময়না তদন্তের জন্য সিলেট এমএজি ওসমানী হাসপাতালে পাঠানো হয়। এরআগে ঘটনাস্থল থেকে সিআইডি (পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ) বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে।

সিআইডি, সিলেটের পরিদর্শক শামীমুর রহমান জানান, সাঈদের গলায় একটি রশি পেঁচানো ছিল। রশি পেঁচিয়ে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে।

সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মো. রহমত উল্লাহ বলেন, ‘এবাদুল, গেদা ও আব্দুর রকিব, এ তিনজনই অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডের 123হোতা। তারা সব স্বীকারও করেছে।’

তিনি বলেন, ‘এবাদুল ও গেদা একসময় আবু সাঈদদের বাসার পাশেই থাকতো। সাঈদ তাদের মামা বলে ডাকতো। অপহরণের পর এবাদুল ও গেদা প্রথমে মুক্তিপণ নিয়ে সাঈদকে ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সাঈদকে ছেড়ে দিলে সে যদি তাদের পরিচয় ফাঁস করে দেয়, এই ভয়ে তাকে হত্যা করা হয়। বুধবার অপহরণের পর বৃহস্পতিবার সকালে সাঈদকে হত্যা করা হয়।’

তিনি আরো বলেন, ‘মুক্তিপনের টাকা না পেয়ে তারা সাঈদকে হত্যা করে। পরে পুলিশ কনস্টেবল এবাদুলের বাসা থেকে বস্তা বন্দি অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।’

মামলা
পুলিশ কনস্টেবল এবাদুর রহমান, র‌্যাবের সোর্স গেদা ও ওলামা লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রকিবকে আসামি করে রোববার দুপুরে একটি মামলা করেছেন সাঈদের বাবা আব্দুল মতিন। এ মামলায় অজ্ঞাতনামা আরো ২/৩ জনকে আসামি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কোতয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসাদুজ্জামান।