সৌদি গমনেচ্ছুদের চাপে মন্ত্রাণালয়!

প্রকাশ:| শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি , ২০১৫ সময় ১০:৪৪ অপরাহ্ণ

দুপুর ১২টা। হঠাৎ অফিস থেকে জানানো হলো সৌদি আরব গমনেচ্ছুদের খোঁজ নিতে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে যেতে হবে। প্রশ্ন করার অবকাশ নেই। বুঝে নিতে হলো, দীর্ঘ সাত বছর পর বাংলাদেশিদের জন্য শ্রম বাজারের দ্বার খোলার ঘোষণার পরপরই সৌদি যেতে আগ্রহীদের নিবন্ধন ১০ ফেব্রুয়ারি (মঙ্গলবার) থেকে শুরু হয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় গত মঙ্গলবার থেকে বিদেশ যেতে আগ্রহীদের মধ্যে ফরম বিতরণ শুরু হয়েছে।

গণমাধ্যমে এ খবর প্রচারিত হলে সেদিন সকাল থেকেই রাজধানীর রমনা থানার বিপরিত পার্শ্বে ইস্কাটনে এ মন্ত্রণালয়ের নতুন ভবনের সামনে ভীড় করেছেন আগ্রহীরা। অফিসকে জানাতে হবে ফরম দেয়া ও জমা নেয়ার সর্বশেষ অবস্থাটা কী।

কোনো দিকে না তাকিয়ে ছুটছি গন্তব্যে। প্রকৃতিতে তখন বসন্তপূর্ব আবাহন। কাকরাইল মোড়ে পৌঁছে সাবেক কর্মসংস্থান ও জনশক্তি কার্যালয়ের সামনেই দেখি ফরম হাতে দাঁড়িয়ে থাকা অসংখ্য মানুষের ভীড়। বুঝলাম তারা সৌদি যেতে চায়। তাদের চোখে-মুখের ব্যস্ততা বলছে দেরি করলেই যেন ফ্লাইট মিস হয়ে যাবে। তাই রাস্তার মধ্যেই কেউ ফরম কিনছে, কেউ আবার তা বুঝে না বুঝেই পূরণ করছে। খানিক খটকা লাগলো, এখানে তো ফরম দেয়া বা জমা নেয়ার কথা নয়! এরা মন্ত্রণালয় ছেড়ে এখানে কেন? এগিয়ে গেলাম কার্যালয়ের বন্ধ গেটের দিকে। কৌতুহলে প্রশ্ন করলাম ফরমপূরণরত একজনকে। কাজ করতে করতেই বিরক্তিমাখা কণ্ঠে উত্তর এলো- ‘ভাই, ফটোকপির দাম ১০ টাকা আর মেইন কপি ৩০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।’ সন্দেহ খানিকটা বেড়ে গেলো। নিয়ম অনুযায়ী এ ফরম তো বিনামূল্যেই সরবরাহ করার কথা। আবার জানতে চাইলে অপর পক্ষ থেকে পাল্টা উত্তর এলো- ‘অত কিছু জানি না ভাই, ফরম কিনতে চাইলে ওই দিকে গেলেই পাবেন।’

পাশ ফিরতেই দেখি ব্যস্ত বিক্রেতাকে। ফরম কোথায় পেলেন? জিজ্ঞেস করতে না করতেই উচ্চ কণ্ঠে চেঁচিয়ে বললেন, ‘লাইন লন, না লইলে যান, অত কতা কওন যাইব না।’ অন্য কেউ জানে না কোথা থেকে বা কার নির্দেশে যেমন খুশি তেমন মূল্যে বিক্রি হচ্ছে বিনা মূল্যের এ ফরম। তবে বিক্রেতা সম্পর্কে এতটুকু জানা গেল যে, তিনি এ কার্যালয়ের কর্মচারী নন।

হঠাৎ পেছন থেকে একজন বলে উঠেন ‘ভাই ফরম পূরণ করছি। এখন জমা দিতে হবে, কিন্তু এ অফিসে তো নেয় না; নতুন অফিসটা কোন দিকে?’

এ সুযোগে কথা হলো তার সঙ্গে। নাম তবিবুর রহমান। এসেছেন গাজিপুর থেকে। তাকে সঙ্গে নিয়েই চললাম নতুন অফিসের দিকে।

রমনা থানার কাছে যেতেই দেখি ২০ দলীয় জোটের হরতালকে ছাপিয়ে সৌদি গমনেচ্ছুকদের ভীড়ে মগবাজার পর্যন্ত রাস্তায় জ্যাম বেঁধে গেছে। দেখে মনে হলো, পোড়ার দেশে ছেড়ে সবাই যেন পাড়ি জমাতে চায় বিদেশ-বিভূঁইয়ে। যেখানে সর্বনিম্ন মাসিক বেতন ধরা হয়েছে মাত্র ৮০০ রিয়াল। অথচ সর্বনিম্ন ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ রিয়াল মাসিক আয়ের স্বপ্ন কিছুদিন আগেও দেখেছিল দেশের মানুষ। তবে এতোদিন পর আরবে শ্রম বাজারের দ্বার খোলাটা সরকারের সফলতাই বটে। সান্তনা এই, ‘নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো।’

এবার মন্ত্রণালয়ে পৌঁছে দেখা গেল, ভবনের নতুন লোহার রেলিংয়ের অনেকাংশ ভেঙে ফুটপাথে পড়ে আছে। আর যে যার মতো শক্তি খাটিয়ে বন্ধ গেট টপকিয়ে ভেতরে ঢুকছে। কর্তব্যরত পুলিশরা তো তথৈবচ। কে শোনে কার কথা! এমনিতেই ভেতরে ফরম পেতে ও জমা দিতে লাইন ধরে দাঁড়ানো মানুষের ভীড়ে পা রাখা দায়। মন্ত্রণালয়ের সচিব থেকে শুরু করে দায়িত্বরত সবাই এতটাই ব্যস্ত যে, তথ্য দিয়ে নষ্ট করার সময় কোথায়? ভীড়ের মাঝে খোঁজ নিতে চাইলে কেউ তথ্যকেন্দ্রের সঠিক খবর দিতে পারলো না।

সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে অন্ত্রণালয়ের প্রধান অফিস সহকারী আশরাফ বলেন, ভাই এখন সবাই ব্যস্ত। গত তিনদিন ধরে অনেক চাপের মধ্যে আছি। কথা বলার সময় নেই। সকাল ৯টা থেকে মূলত অফিস চলাকালীন ফরম বিতরণের কথা থাকলেও আগ্রহীদের চাপে আমরা প্রতিদিন রাত সাড়ে ৭টা পর্যন্ত কাজ করে যাচ্ছি এবং এটি চলতেই থাকবে।’

ফরমের দাম সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘ফরমের কোনো মূল্য রাখা হচ্ছে না। ফরম জমা দিতে শুধু ভোটার আইডি কার্ড বা নাগরিকত্ব সার্টিফিকেটের ফটোকপি জমা দিলেই চলবে। আপাতত আর অন্য কোনো কাগজ লাগবে না। পরবর্তিতে মোবাইল বার্তার মাধ্যমে ফরম পূরণকারীদের জানানো হবে কোথায় কীভাবে টাকা জমা দিতে হবে।’

অনলাইন রেজিস্ট্রেশন সম্পর্কে আশরাফ বলেন, ‘সকালের হট্টগোলের কারণে মন্ত্রাণালয়ের সৌন্দর্য বর্ধন দেয়ালের গ্লাস ভেঙে দুজন আহত হয়েছে। সারাদেশেই এ অবস্থা। যেকারণে আগ্রহীদের অনলাইনে রেজিস্ট্রেশনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।’

আরো জানা যায়, বিদেশ গমনেচ্ছুরা সৌদি আরবসহ বিশ্বের যেকোনো দেশে গমণের জন্য অফিস চলাকালীন বিএমইটির অধীনস্থ ৪২টি জেলায় কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস এবং দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে ইউনিয়ন ডিজিটাল কেন্দ্রে গিয়ে নাম রেজিস্ট্রেশন করতে পারবেন।

গত মঙ্গলবার ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় আগ্রহীদের প্রচুর ভীড় ও হট্টগোলের কারণে মন্ত্রণালয়ের তথ্যকেন্দ্র থেকে ধৈর্য ধরতে এবং এমইটির ওয়েবসাইটের (www.bmet.gov.bd) মাধ্যমে বিদেশ গমনেচ্ছুরা অনলাইন নিবন্ধন করতে পারবে বলেও ঘোষণা দেয়া হয়। আরো জানানো হয়, একবার যারা নিবন্ধন করেছে তাদের দ্বিতীয়বার নিবন্ধনের প্রয়োজন নেই।

শ্রম দিতে সৌদি গমনেচ্ছু আগ্রহীদের মধ্যে ফরম বিতরণের চাপ সামলাতে না পেরে অবশেষে অনলাইনে নিবন্ধন করার ঘোষণা দিতে বাধ্য হলো প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।