সৌদি আরবের কিং আব্দুল আজিজ ইউনিভার্সিটিতে স্কলারশিপ নিয়ে উচ্চ শিক্ষা

প্রকাশ:| সোমবার, ৮ মে , ২০১৭ সময় ১০:৩১ অপরাহ্ণ

মোহাম্মদ ফিরোজ, সৌদিআরব:

বাংলাদেশী ছাত্রদের জন্য সউদি আরব হতে পারে উচ্চশিক্ষার আদর্শ স্থান। একই মহাদেশে অবস্থিত দুটি মুসলিম দেশের ধর্মীয়, সামাজিক ও সংস্কৃতিক মিল থাকার কারণে শিক্ষার্থীরা সউদিতে পড়াশুনা করে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতে পারেন।

এক সময় সউদি আরব শিক্ষা-ব্যবস্থায় অতটা উন্নত ছিল না। কিন্তু বিগত দশ-পনেরো বছরে এদেশে শিক্ষা ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক উন্নতি সাধন হয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে সউদি আরব খুব শক্তিশালী হওয়ার কারণে শিক্ষা খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করতে রাষ্ট্রের কোনো বেগ পেতে হয় না।

মরহুম বাদশা আব্দুল্লাহর শাসনামলে সউদি আরবের শিক্ষা খাতকে ব্যাপক গুরুত্ব দেয়া হয়। কোটি কোটি ডলার বিনোয়োগ করে এ খাতকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া হয়। শিক্ষা খাতের এই উন্নয়নের ধারা বর্তমান বাদশাহ সালমান বিন আব্দুল আজিজও অব্যাহত রেখেছেন।

বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থীই সউদি আরবে উচ্চশিক্ষার ব্যাপারে তেমন কিছু জানেন না। অনেকে মনে করেন, সউদি আরব শুধু ইসলামী শিক্ষার স্বর্গরাজ্য। আসলে তা কিন্তু নয়। এখানে ইসলামী শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক সাবজেক্টগুলোর পড়ালেখার মানও বেশ উন্নত। আধুনিক ক্লাসরুম, সুপরিসর ক্যাম্পাস, অত্যাধুনিক লাইব্রেরি ও ল্যাবরেটরি, উন্নত হোস্টেল ব্যবস্থাপনা এবং গবেষণা উপযোগী সুন্দর পরিবেশ শিক্ষার্থীদের জন্য অবশ্যই আকর্ষণীয়। সউদি আরবে প্রায় ৩০টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এরমধ্যে পবিত্র মক্কা নগরীতে অবস্থিত উম্মুল ক্বুরা ইউনিভার্সিটি, পবিত্র মদিনা শরিফে অবস্থিত মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, রিয়াদে অবস্থিত কিং সউদ ও আল-ইমাম ইউনিভার্সিটি ইসলামী শিক্ষার জন্য বিখ্যাত। এসব বিশ্ববিদ্যালয় প্রত্যেক বছর শত শত শিক্ষার্থীদের স্কলারশীপ দিয়ে থাকে। কিং আব্দুল আজিজ ইউনিভার্সিটি (KAU), কিং ফাহাদ পেট্রলিয়াম অ্যান্ড মিনারেল ইউনিভার্সিটি (KFPMU), কিং আব্দুল্লাহ সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ইউনিভার্সিটি (KAUST), কিং সউদ ইউনিভার্সিটি (KSU), দাম্মাম ইউনিভার্সিটি (UOD), কিং ফয়সাল ইউনিভার্সিটি (KFU), কিং খালেদ ইউনিভার্সিটি (KKU), নাজরান ইউনিভার্সিটি (NU)গুলোর বিশেষ খ্যাতি রয়েছে সাইন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং এর সাবজেক্টসমূহে উচ্চশিক্ষায়। সউদি আরবের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের জন্য আলাদা ক্যাম্পাস আছে। পুরুষ শিক্ষার্থীদের মতো সকল সুযোগ-সুবিধা মেয়েরা আলাদাভাবে ভোগ করেন। তাছাড়া শুধুমাত্র মেয়েদের জন্যও কয়েকটি ইউনিভার্সিটি রয়েছে। এরমধ্যে রিয়াদের প্রিন্সেস নওরাহ ইউনিভার্সিটি এবং মদিনা শরিফের আত তাইবাহ ইউনিভার্সিটি বেশ বিখ্যাত।

জেদ্দায় অবস্থিত কিং আব্দুল আজিজ ইউনিভার্সিটি ২০১৬ সালে টাইমস হায়ার এডুকেশনের র‌্যাংকিং অনুযায়ী আরব রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে শীর্ষ অবস্থান অর্জন করেছে। বর্তমানে স্কলারশিপের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমান সেশনে পাকিস্তান থেকে ৪০ জন ছাত্র, ভারত থেকে ২০ জন শিক্ষার্থী কিং আব্দুল আজিজ ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছেন। আর বাংলাদেশ থেকে গিয়েছেন মাত্র 02 জন! বর্তমানে এখানে কয়েক সেশন মিলিয়ে বাংলাদেশী ছাত্রের সংখ্যা মাত্র 12 জন। বাংলাদেশ থেকেও প্রচুর ছাত্র এখানে স্কলারশিপ নিয়ে পড়ার সুযোগ আছে বলে মনে করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও আধ্যায়ন রত শিক্ষার্থীরা।

কিং আব্দুল আজিজ ইউনিভার্সিটির গ্রাজুয়েট স্টাডিজ এর ডীন প্রফেসর ড. সউদ মোহাম্মদ আল সুলামী বলেন, আমরা এখানে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ছাত্রদের সম্মানজনক স্কলারশীপ অফার করে থাকি। এখানে মান সম্মত ও উন্নত পরিবেশে বিশ্বের মেধাবী ছাত্ররা সাইন্স, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিভিন্ন বিভাগে মাস্টার্স-পিএইচডি করার সুযোগ পাচ্ছেন। বাংলাদেশ একটি মুসলিম দেশ। আমরা চাই বাংলাদেশের ছাত্ররাও বেশী বেশী এখানে আসুক এবং আধুনিক সুযোগ সুবিধা নিয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় তারা অবদান রাখুক। বাংলাদেশী ছাত্রদের জন্য আমাদের দুয়ার সব সময় খোলা। আপনাদের মাধ্যমে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের এখানে উচ্চ শিক্ষা নেয়ার অনুরোধ করছি।

কিং আব্দুল আজিজ ইউনিভার্সিটির ক্যামিক্যাল বায়োকেমিষ্ট্রি বিভাগের প্রফেসর ড. ফাহাদ আহমেদ আল আব্বাসী বলেন, কিং আব্দুল আজিজ ইউনিভার্সিটি ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টদের উচ্চ শিক্ষার জন্য আদর্শ বিদ্যাপীঠ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এখানে শিক্ষকতা করছেন বিশ্বের বিখ্যাত স্কলারগণ। আধুনিক ল্যাবরেটরি, সুপরিসর লাইব্রেরী, আধুনিক রিচার্স ইকুইপমেন্ট ও গবেষণার উন্নত পরিবেশের কারনে এখানের শিক্ষার্থীরা বেশ ভাল করছে। institute for scientific information (ISI) জার্নালে আমাদের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ডজনকে ডজন আর্টিকেল প্রকাশ পাচ্ছে। এ কারনে এ বিশ্ববিদ্যালয় এখন বিশ্বের প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। আমার বিভাগ থেকে মাস্টার্স পাশ করা বাংলাদেশী ছাত্র মোহাম্মদ মিছবাহ উদ্দীন ছাত্র থাকা কালীন আইএসআই জার্নালে ৫টি আর্টিকেল পাবলিশ করতে সক্ষম হয়। সে এখন ডেনমার্কে ভাল স্কলারশীপ নিয়ে পিএইচডি করছে। আমরা চাই বাংলাদেশী শিক্ষার্থীরা আরো আসুক। এখানে বাংলাদেশী শিক্ষকগণও বেশ সুনামের সাথে শিক্ষকতা করছেন। তারা সবাই স্ব স্ব ক্ষেত্রে খ্যাতিমান স্কলার।

ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ড. মুহাম্মদ আমিনুল হক বলেন, আমি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করার সুযোগ পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে করি। বাংলাদেশের সন্তান হিসেবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টদের নেতৃত্ব দিতে পারাটা ভাগ্যের ব্যাপার। এখানের স্কলারশিপ, পড়ালেখার মান সবকিছুই মান সম্মত। পবিত্র কাবা শরীফ ও রাসূলের দেশের পবিত্র আবহে পড়াশুনা করতে পারা আসলেই ভাগ্যের ব্যাপার। বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থীই সৌদিতে উচ্চ শিক্ষার ব্যাপারে তেমন কিছু জানেন না। বিশেষ করে সাইন্সের বিষয়গুলোতে যে এখানে উন্নতমানের উচ্চশিক্ষা আছে সে ব্যাপারে অনেকেই অন্ধকারে। আমি সাংবাদিক বন্ধুদের মাধ্যমে বাংলাদেশী সকল শিক্ষার্থীদের সৌদিতে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করার জন্য অনুরোধ করছি। আমরা চাই, বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা ভাল সুযোগ গ্রহণ করে উন্নত পড়া শুনা করে বিশ্বের দরবারে মাথা উচু করে দাড়াক।

কিং আব্দুল আজিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে যে সকল বিষয়ে পিএইচডি ও মাস্টার্স প্রোগ্রামে শিক্ষার্থীরা আবেদন করতে পারবেন সেগুলো হল-

ফ্যাকাল্টি অব সায়েন্স : বায়োলজি, স্ট্যাটিস্টিক্স, কেমেস্ট্রি, বায়োকেমিস্ট্রি, ম্যাথমেটিক্স, ফিজিক্স।
ফ্যাকাল্টি অব ইঞ্জিনিয়ারিং : সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং থার্মাল ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড ডিজালিনেশন, মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকক্ট্রিকাল এন্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং, কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, এ্যারোনটিক ইঞ্জিনিয়ারিং। ফ্যাকাল্টি অব মেটেরিওলজি : এনভায়রনমেন্ট এরিড ল্যান্ড এগ্রিকালচার, এরিড ল্যান্ড এগ্রিকালচার, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স, মেটেরিওনলজি, হাইড্রলজি এন্ড ওয়াটার রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট।

ফ্যাকাল্টি অব আর্থ সায়েন্স : মিনারেল রিসোর্স এন্ড রক্স, ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড এনভায়রনমেন্টাল জিওলজি
ফ্যাকাল্টি অব ম্যারিন সায়েন্স : ম্যারিন বায়োলজি, ম্যারিন ফিজিক্স, ম্যারিন কেমেস্ট্রি, ম্যারিন জিওলজি।
ফ্যাকাল্টি অব এনভায়রনমেন্টাল ডিজাইন : আরবান এন্ড রিজিওনাল প্ল্যানিং ফ্যাকাল্টি অব কম্পিউটিং এন্ড ইনফরমেশন টেকনোলজি : কম্পিউটার সায়েন্স।

স্কলারশিপের আওতাধীন সুবিধাসমূহ:
শিক্ষার্থীরা ফ্রি থাকার পাশাপাশি মাসিক ১ হাজার ৯শ’ রিয়াল বৃত্তি পাবেন। আরো যা পাবেন তা হল- প্রতি বছর তিনমাস ছুটি এবং আসা-যাওয়ার বিমান টিকেট, ভর্তির পর এককালীন ১ হাজার ৮০০ রিয়াল এবং মেডিকেল সুযোগ সুবিধা। বিবাহিত ছাত্ররা স্বপরিবারে এখানে থাকতে পারেন। এজন্য তাদেরকে প্রতি বছর আলাদা ১০ হাজার রিয়াল করে প্রদান করা হয়।
এছাড়া থিসিস প্রিন্টের জন্য ৪ হাজার রিয়াল ও সর্বশেষ বই পুস্তক দেশে পাঠানোর জন্য ২ হাজার ৭শ’ রিয়াল দেয়া হবে শিক্ষার্থীদের।

আবেদনের জন্য যোগ্যতা:
পিএইচডিতে আবেদনকারীর বয়স অবশ্যই ৩৫ বছরের নীচে হতে হবে এবং মাস্টার্সে আবেদনকারীর ৩০ বছর। অনার্স ও মাস্টার্সে ভাল রেজাল্ট আবশ্যক। টোফেল স্কোর ৫০০/ IELTS- 5 লাগবে। মেডিক্যালি ফিট হতে হবে। দু’জন শিক্ষকের প্রত্যয়নপত্র যারা আবেদনকারীকে পড়িয়েছেন। সৌদি আরবের।কোনো বিদ্যালয় থেকে ইতোমধ্যে বহিষ্কৃত না হওয়া।

আবশ্যকীয় ডকুমেন্ট:
বায়োডাটা, পারপাজ লেটার (কেন পিএইচডি করবে তার ব্যাখ্যা), সর্বশেষ ডিগ্রির মার্কশীট এবং সার্টিফিকেটের সত্যায়িত কপি, পাসপোর্টের কপি, ফটো।

প্রত্যেক বছর ডিসেম্বর মাস থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারী পরযন্ত কিং আব্দুল আজিজ ইউনিভার্সিটির এই লিংকে গিয়ে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীরা আবেদন করতে পারবেন: http://graduatestudies.kau.edu.sa/content.aspx?Site_ID=306&lng=AR&cid=263864