সীতাকুণ্ডে এখনো আতঙ্ক

প্রকাশ:| শনিবার, ২৯ এপ্রিল , ২০১৭ সময় ০৯:৫০ পূর্বাহ্ণ

সীতাকুণ্ড প্রতিনিধি :২৯ এপ্রিল জলোচ্ছ্বাসে কুমিরা ইউনিয়নের আলেকদিয়া গ্রামের আবুল হোসেন তার পরিবারের ৯ সদস্যকে হারান। কয়েক মিনিটের মধ্যে জলোচ্ছ্বাসে ভাসিয়ে নেয় আবুল হোসেনের স্ত্রী, বাবা, মা ও চার সন্তানকে। অলৌকিকভাবে বেঁচে যান তিনি। ভয়াবহ সেই দিনটির কথা স্মরণ করতে গিয়ে পঁচাত্তর বছর বয়সী আবুল হোসেন কান্নায় ভেঙে পড়েন।

ওই দিন মধ্যরাতে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় সলিমপুর থেকে সৈয়দপুর পর্যন্ত ৯টি ইউনিয়ন। প্রায় ২২৫ কিলোমিটার গতিবেগ সম্পন্ন ও ৩০৩৫ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাসে উপকূল পরিণত হয়েছিল বিরাণভূমিতে। এসময় মারা যায় এলাকার প্রায় সাত হাজার মানুষ। নিখোঁজ হয়েছিল প্রায় তিন হাজার শিশু ও নারীপুরুষ। প্রায় তিনশ কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হয়। ভয়াল সেই রাতের ২৫ বছর পেরিয়ে গেলেও উপকূলের অবস্থা সেই তিমিরেই রয়ে গেছে। এখনো এলাকার প্রায় আড়াই লাখ মানুষ মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে।

কুমিরা, বাঁশবাড়িয়া, সোনাইছড়ি, ভাটিয়ারীসহ কয়েকটি উপকূলীয় এলাকা ঘুরে বিভিন্ন লোকের সাথে কথা হয়। তারা অভিযোগ করেন, গত ২৬ বছরে উপকূলীয় এলাকায় বেড়িবাঁধ নির্মাণের নামে কয়েকশ কোটি টাকা লোপাট হয়েছে। কিছু কিছু স্থানে বেড়িবাঁধ নির্মিত হলেও তা স্থায়ী ছিল না। এক বছর না যেতেই বাঁধ ভাঙতে শুরু করে। বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের বোয়ালিয়াকুল এলাকায় বেড়িবাঁধে ভাঙনে ৮টি গ্রামের ঘরবাড়ি ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।

বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান শওকত আলী জাহাঙ্গীর বলেন, অনিয়মদুর্নীতি প্রতিরোধ করা যায় না বলে এই দুরবস্থা। ২৫টি বছর এর মাশুল দিচ্ছে এলাকার আড়াই লাখ মানুষ। তবে সম্প্রতি পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে বোয়ালিয়াকুল থেকে আকিলপুর পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার বেড়িবাঁধ সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছে।

জানা যায়, ঘূর্ণিঝড়ে ব্যাপক প্রাণহানির পর আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার অর্থায়নে উপকূলীয় এলাকায় ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। সীতাকুণ্ডের পৌর এলাকাসহ ৯টি ইউনিয়নের উপকূলীয় এলাকায় শতাধিক আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের কথা থাকলেও হয়েছে মাত্র ৫৬টি।

সলিমপুর থেকে বাঁশবাড়িয়া উপকূলীয় এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, শিপইয়ার্ড নির্মাণ করতে গিয়ে ওইসব এলাকায় বনায়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত তিন বছরে কুমিরা এবং বাঁশবাড়িয়া উপকূলীয় এলাকায় বন কেটে আরো ৬টি শিপইয়ার্ড নির্মাণ করা হয়। স্থানীয় বলছেন, ১৯৯১ সালের মতো পুনরায় যদি এসব এলাকায় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস দেখা দেয়, তাহলে আরো ব্যাপক প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি হতে পারে।

সীতাকুণ্ড উপজেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো. আব্দুর রহিম দৈনিক আজাদীকে বলেন, উপকূলীয় এলাকার মানুষের অনুপাতে আশ্রয়কেন্দ্র অপ্রতুল। যেগুলো নির্মিত হয়েছে সেগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ এবং নির্মাণের সময় সঠিক পরিকল্পনার অভাবে অধিকসংখ্যক লোক আশ্রয় নিতে পারে না।

সীতাকুণ্ড উপকূলীয় বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা জালাল আহমেদ দৈনিক আজাদীকে জানান, সীতাকুণ্ড উপকূলীয় এলাকার লোকজনকে সামুদ্রিক ঝড়ঝঞ্ঝা ও জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষার জন্য সোনাইছড়ি থেকে সৈয়দপুর পর্যন্ত বেড়িবাঁধে ১৯৯৩ সালে ব্যাপক বনায়ন করা হয়। তবে এক শ্রেণির লোক রাতের আঁধারে গাছগুলো কেটে সাবাড় করে ফেলেছে। ইতোমধ্যে দেড় শতাধিক মামলা হয়েছে। তিনি মনে করেন, এসব গাছ কেটে নেয়ায় বেড়িবাঁধ বিপন্ন হচ্ছে। এলাকাবাসীও মারাত্মক হুমকির মধ্যে আছে।