সিন্ডিকেটের কারসাজি চিনির দাম বাড়ছে

প্রকাশ:| মঙ্গলবার, ৯ জুলাই , ২০১৩ সময় ০৩:২৫ অপরাহ্ণ

কাজী আবুল মনসুর ।
রমজান সামনে রেখে চিনির বাজার অস্থির করার অপতৎপরতা চলছে। চিনি সিন্ডিকেটের কারসাজিতে সোমবার থেকে দেশের চিনিসবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে বস্তাপ্রতি দাম বেড়েছে ২০০ থেকে ২২০ টাকা। চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের বাজারের ওপর নির্ভর করে পুরো দেশের বাজার। চট্টগ্রাম বিভাগে চিনির বাজার নিয়ন্ত্রণ করে একটি গ্রুপ। অভিযোগ রয়েছে, এ গ্রুপের নিজস্ব লোক বলে পরিচিত কয়েকজন ডিও ব্যবসায়ীর মাধ্যমে চিনির বাজার অস্থির করা হচ্ছে। এ ছাড়া সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা ৫০ ডিও ব্যবসায়ী রমজানে চিনির বাজার নিয়ে তৎপর রয়েছে। রমজানের শুরুতে প্রতি কেজি চিনি ৫০ টাকায় নিয়ে যাওয়ার জন্য সিন্ডিকেট তৎপর। সোমবার থেকে খুচরা বাজারে চিনির দাম বেড়েছে কেজিতে তিন টাকা। ৪২ টাকার চিনি বিক্রি হচ্ছে ৪৫ টাকায়। অথচ চিনিতে গুদাম ভর্তি। বন্দরে ২ লাখ মেট্রিক টনেরও বেশি অপরিশোধিত চিনি নিয়ে খালাসের অপেক্ষায় আছে ৪টি জাহাজ। সিন্ডিকেটে রয়েছে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের বেশ কয়েকজন ডিও ব্যবসায়ী। এসব ডিও ব্যবসায়ী পরিকল্পিতভাবে চিনির বাজার অস্থির করছে অভিযোগ উঠেছে।

দেশে প্রতি বছর চিনির চাহিদা রয়েছে ১৩ থেকে ১৪ লাখ মেট্রিক টন। বিদেশ থেকে অপরিশোধিত চিনি এনে চাহিদা পূরণ করা হয়। দেশে সাধারণত ৫০ থেকে ৬০ হাজার মেট্রিক টন চিনি উৎপাদিত হয়ে থাকে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত চিনির দাম বাড়েনি। ফলে দেশেও চিনির বাজার স্থির ছিল। ব্যবসায়ী সূত্রে জানা যায়, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অপরিশোধিত চিনি এনে দেশে পরিশোধিত চিনি বাজারজাত করতে প্রতি কেজিতে খরচ পড়ে ৩০ থেকে ৩২ টাকা। সাধারণ চিনির মূল্য বাজারে থাকা উচিত ছিল ৩৫ থেকে ৩৮ টাকা। সেখানে সিন্ডিকেট কৌশলে চিনির বাজার ৫০ টাকায় স্থির রাখার জন্য সরকারের দৃষ্টি কাড়ে। এতে সফলও হয়। সে অনুসারে কাজ চলছে। প্রথম দফায় চিনির দাম প্রতি ৫০ কেজি বস্তায় ২০০ থেকে ২২০ টাকা বাড়িয়ে বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বাজারে দাম উঠেছে ৪৫ থেকে ৪৬ টাকা।

দেশে চিনির বাজার নিয়ন্ত্রণ করে ৫টি প্রতিষ্ঠান। এরা বিদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি অপরিশোধিত চিনি আমদানি করে থাকে। দেশের চাহিদার অর্ধেকেরও বেশি চিনির নিয়ন্ত্রণ থাকে এ কয়েকটি কোম্পানির হাতে। রমজান এলে এসব কোম্পানি নানা রকম ছলচাতুরী করার অভিযোগ রয়েছে। এসব কোম্পানি রমজানকে চিনির বাজারে সবচেয়ে মুনাফার সময় হিসেবে বেছে নেয়। রমজানে প্রতিদিন চিনির চাহিদা রয়েছে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টন পর্যন্ত। কোম্পানিগুলো বছরের শুরু থেকে অপরিশোধিত চিনি গতবারের তুলনায় কম আমদানি করে। কিন্তু রমজান আসার সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে যায় আমদানি। সিন্ডিকেটের কারসাজিতে রমজানের প্রথম দিকে চিনির সাময়িক সঙ্কট সৃষ্টির জন্য অপতৎপরতা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। যাতে সঙ্কটকালীন সময়ে দাম বাড়িয়ে বর্তমানে আমদানি করা অপরিশোধিত চিনি বাজারে এনে চড়া মূল্যে বিক্রি করতে পারে। গত বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত যেখানে ছয় লাখ চল্লিশ হাজার মেট্রিক টন চিনি আমদানি হয়েছে। সেখানে বিগত জানুয়ারি থেকে চলতি জুনের মাঝামাঝি পর্যন্ত আমদানির পরিমাণ আড়াই লাখ মেট্রিক টনের মতো। জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত এক লাখ মেট্রিক টন আমদানি হয়েছে। বর্তমানে বড় আমদানিকারকরা দ্রুতগতিতে চিনি আমদানি করছেন।

চট্টগ্রাম বন্দর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে চারটি জাহাজে ২ লাখ টনেরও বেশি অপরিশোধিত চিনি এসেছে। স্টেলা মারিস জাহাজে ৫০ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন, গুমা জাহাজে ৫২ হাজার ২০০ মেট্রিক টন, নোনা উলিয়া জাহাজে ৫১ হাজার ৬০০ মেট্রিক টন এবং পেরিগ্রিন জাহাজে ৪৮ হাজার মেট্রিক টন খালাসের অপেক্ষায় আছে। তাছাড়া খাতুনগঞ্জ এবং আমদানিকারকদের গুদামও চিনি ভর্তি। তারপরও দাম বাড়ানোর প্রতিযোগিতা থেমে নেই। খাতুনগঞ্জ সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামের চিনি সিন্ডিকেটের ওপর নির্ভর করে দেশের পুরো বাজার। আর চট্টগ্রামের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে একটি গ্রুপ। এ চিনি দিয়ে বাজার চলে চট্টগ্রাম বিভাগের। আর এই এস আলম গ্রুপ তাদের নিজস্ব কিছু লোক দিয়ে পুরো বাজারের নিয়ন্ত্রণ নেয়। অভিযোগ উঠেছে, খাতুনগঞ্জে গ্রুপের রয়েছে বেশ কয়েকজন নিজস্ব ব্যবসায়ী গ্রুপ শুধু তাদেরই চিনি দিয়ে থাকে। তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ডিও ব্যবসায়ী ইব্রাহীম, চিনি বশর, সাইদুল হক। প্রতিদিন চিনির যে চাহিদা থাকে তা সরবরাহ করে সিন্ডিকেট। দাম বাড়ানোর ইচ্ছে থাকলে চিনির সরবরাহ কমিয়ে দেয়া হয়। বাজারকে কৌশলে চিনি সঙ্কটের মাঝে ফেলা হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না বলে জানা গেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশের মিল মালিকগুলো চিনি পরিশোধন করে সেসব চিনি ডিও ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে বাজারে ছাড়ে। এরই মধ্যে ডিও ব্যবসায়ী অনেকের হাতে রয়েছে হাজার হাজার টন চিনি। চিনির দাম বাড়ার পর এসব চিনি তারা বাজারে ছাড়বে। আবার দাম বাড়ানোর কৌশল হিসেবে এরই মধ্যে অনেক মিল মালিক তাদের মিলও বন্ধ রেখেছে। সংস্কারের নামে এসব মিল সাধারণত রহস্যজনকভাবে রমজানের আগেই বন্ধ হয়ে যায়।

আলোকিত বাংলাদেশ এর সৌজন্যে