সান্নিধ্যের উষ্ণতা নামাজে

প্রকাশ:| শুক্রবার, ২০ জুন , ২০১৪ সময় ১১:০৮ অপরাহ্ণ

ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী
সান্নিধ্যের উষ্ণতা নামাজে
‘অতঃপর আমার ওপর দৈনিক ৫০ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হলো। তা নিয়ে আমি আল্লাহর আরশ থেকে ফেরার পথে ষষ্ঠ আসমানে মুসা (আ.) এর সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম। তিনি জানতে চাইলেন, আপনাকে কী বিধান দেয়া হয়েছে? বললাম, আমাকে দৈনিক ৫০ ওয়াক্ত নামাজের হুকুম দেয়া হয়েছে। মুসা (আ.) বললেন, আপনার উম্মত প্রতিদিন ৫০ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতে পারবে না। (আমার অভিজ্ঞতা হতে এ কথা বলছি)। আপনার আগে মানুষকে নিয়ে বার বার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছি। বনি ইসরাঈলদের নিয়ে আমি যারপরনাই চেষ্টা করেছি, পারিনি। কাজেই আপনার প্রভুর কাছে গিয়ে আপনার উম্মতের খাতিরে ছাড় দেয়ার জন্য অনুরোধ করুন। তার কথামতো আমি ফিরে গেলাম। অতঃপর আমার জন্য ১০ ওয়াক্ত নামাজ কমানো হলো।

যখন ফিরে আসছিলাম, মুসা (আ.) এর সঙ্গে আবারও একই ধরনের কথাবার্তা হলো। আমি ফিরে গেলাম, আরও ১০ ওয়াক্ত নামাজ কমানো হলো। ফেরার পথে মুসা (আ.) এর সঙ্গে আবার কথা হলো। আবার ফিরে গেলাম। পুনরায় ১০ ওয়াক্ত নামাজ হ্রাস করা হলো। আসার পথে মুসা পথ আগলে পুনরায় একই পরামর্শ দিলেন। আমি আবার ফিরে গেলাম আল্লাহর দরবারে। ফেরার পথে আবারও মুসা (আ.) জিজ্ঞেস করলেন, কী পেলেন? বললাম, ১০ ওয়াক্ত নামাজ। তিনি একই কথা বললেন। আমি ফিরে গেলাম। এবার দেয়া হলো দিনে ও রাতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ। (আমার মনের গতি অাঁচ করে) তিনি বললেন, আপনার উম্মত দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতে পারবে না। আপনার আগে মানুষকে নিয়ে আমার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আছে। বনি ইসরাঈলকে নিয়ে আমি বহু চেষ্টা করেছি, পারিনি। আপনি ফিরে যান, আরও কমিয়ে নিন। আমি বললাম, আল্লাহর কাছে গিয়ে বারবার অনুরোধ করেছি। আমার আবার যেতে লজ্জা লাগে। আমি এ পাঁচ ওয়াক্ত নিয়েই সন্তুষ্ট এবং তা মাথা পেতে নিয়েছি। এরপর যখন সেখান থেকে রওনা দিলাম, পেছন থেকে জনৈক আহ্বানকারী ঘোষণা শোনালেন_ ‘আমার ফরজ সুনির্ধারিত করলাম আর আমার বান্দার ওপর থেকে হ্রাস করে দিলাম।’

এ বর্ণনা হজরত নবী করিম (সা.) এর এবং এটিই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হওয়ার প্রেক্ষাপট। হাদিসটি আনাস ইবনে মালেক (রা.) সূত্রে বোখারি ও মুসলিমে বর্ণিত। মুসলিম শরিফে সাবেত আল বুনানি বর্ণিত অপর হাদিসে গায়েবি ঘোষণাটি এরূপ_ ‘হে মুহাম্মদ! রাত-দিনের জন্য এ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজই ফরজ করা হলো। প্রত্যেক ওয়াক্তের জন্য ১০ গুণ। কাজেই যে এ পাঁচ ওয়াক্ত আদায় করবে তা তার জন্য ৫০ ওয়াক্ত গণ্য হবে।’

বর্ণিত ঘটনার সময়কাল হিজরতের এক বছর বা তারও আগে। তখন আল্লাহপাক তাঁর প্রিয় নবীকে সাত আসমান ছাড়িয়ে ঊর্ধ্বলোকে মেহমান করে নিয়ে গিয়েছিলেন, যার বর্ণনা কোরআন মজিদে সূরা বনি ইসরাঈল ও সূরা নাজমে আছে। আল্লাহর আরশ আর ষষ্ঠ আসমানের মাঝে আসা-যাওয়ার পুনরাবৃত্তি হতে অনুমান করা যায়, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজের প্রক্রিয়া কতখানি তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। উম্মতে মুহাম্মদির প্রতি মুসা (আ.) এর দরদী মনের প্রতিচ্ছবিও পাওয়া যায় এ ঘটনায়। হজরত মুসা (আ.) ছিলেন একমাত্র নবী, যিনি দুনিয়াতে বসে সরাসরি আল্লাহর সঙ্গে কথা বলার সৌভাগ্য লাভ করেছেন। কাজেই তার পরামর্শকে বারে বারে গুরুত্ব দিয়েছেন প্রিয় নবীজি।

নামাজ পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ হওয়ার জন্য আল্লাহপাকের একটি নির্দেশই যথেষ্ট ছিল। সেক্ষেত্রে ৫০ থেকে ক্রমান্বয়ে পাঁচ ওয়াক্তে কমানোর পেছনে নিশ্চয়ই হেকমত আছে, রহস্য আছে। পাঁচ ওয়াক্তের বিনিময়ে ৫০ ওয়াক্তের সওয়াব দালিলিকভাবে লিখে দেয়ার জন্যই বুঝি এ প্রক্রিয়া অবলম্বন করা হয়।

ফজর ও আসর নামাজ ফরজ হয় নবুয়ত লাভের পরপরই। তবে পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরজ হয়েছে মেরাজের রাতে। এ কাজ ঊর্ধ্বাকাশে আল্লাহর আরশে নিয়ে কেন করা হলো, তার পেছনেও হেকমত আছে। বস্তুত নামাজ সাধারণ কোনো বিধান নয়। ইসলামের সর্বপ্রথম ফরজ নামাজ আর কেয়ামতের মাঠে প্রথম হিসাব নেয়া হবে নামাজের। নামাজ আল্লাহ ও বান্দার মাঝে সম্পর্ক ও নৈকট্যের অনুশীলনী। এজন্যই বলা হয়, ‘নামাজ মোমিনের মেরাজ’। এর অন্য অর্থ দাঁড়ায়_ আল্লাহর নবী মেরাজে গিয়ে উম্মতের জন্য যে উপহার নিয়ে এসেছেন, তার মাধ্যমে নামাজি ব্যক্তি দুনিয়াতে থেকে আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের সৌভাগ্য লাভ করতে পারে। কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সাক্ষাতে বা রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে যেতে হলে কিছু প্রস্তুতি আছে, শর্ত আছে। নামাজেও আল্লাহর সাক্ষাতে দাঁড়ানোর জন্য শর্ত আছে, নিয়ম আছে। শরীরপাক, কাপড়পাক, জায়গাপাক আর ওজুর মাধ্যমে শরীর ও মনের পবিত্রতা অর্জন মহামহিম আল্লাহর সঙ্গে এ সাক্ষাতের পূর্বশর্ত। বন্দির হাতে যেভাবে হাতকড়া লাগানো হয়, অনেকটা সেভাবে নামাজি নিজের ডান হাতে বাম হাত বেঁধে নামাজে প্রবেশ করে, কাজকর্ম, পানাহার, কথাবার্তা সম্পূূর্ণ বন্ধ করে নিমগ্ন হয় ধ্যানে। এ ধ্যান অসীম শূন্যতায় হারিয়ে বা কল্পনায় মনের বাড়িতে গিয়ে নয়; বরং আল্লাহকে হাজির-নাজির জেনে তার সঙ্গে আলাপনে মন ও জ্ঞানকে সক্রিয় রেখে। নামাজ মানে ভয় ও ভালোবাসায় সিক্ত মনে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো, আল্লাহর বিশালত্বের চেতনায় রুকুতে সম্পূর্ণ ঝুঁকে অবনত হওয়া, মহামহিম আল্লাহর অতি উচ্চতার উপলব্ধিতে সেজদায় লুটিয়ে পড়া। নামাজ মানে কেরাত, তাসবিহ ও তকবিরে সানি্নধ্যের উষ্ণতায় আল্লাহর সঙ্গে কথা বলা।
– See more at: http://www.alokitobangladesh.com/islam/2014/06/20/79978#sthash.ozCUe68C.dpuf