সাদা মেঘ যেন রঙের ভেলায় ভেসে লুকোচুরি খেলে

প্রকাশ:| শুক্রবার, ৬ সেপ্টেম্বর , ২০১৩ সময় ১০:৫৭ অপরাহ্ণ

জাহিদ রুমান>>শুভ্র কাশবনদৃষ্টি আকুল করা মনোরম নীল আকাশ। দিগন্ত জোড়া সাদা মেঘের রাজত্ব, বাতাসে ভেসে বেড়ায় পেঁজা তুলোর মতো। এমন দিনে সাদা মেঘ যেন রঙের ভেলায় ভেসে লুকোচুরি খেলে। সুয্যির মায়াবী দীপ্তিতে অপূর্ব প্রকৃতি। আর তাতে মনে পড়ে কবিগুরুর গানের কথা :
নীল আকাশে কে ভাসালে সাদা মেঘের ভেলা রে ভাই_ লুকোচুরি খেলা…
ওদিকে দূরের নদীটি ভরা স্বচ্ছ জলে। ভরা গাঙে হাওয়ার দাপটে জাগে জলতরঙ্গ। নদীর দু’ধারজুড়ে শুভ্র কাশবন। যতদূর চোখ যায় কেবল ফুলের বাসর। ঋতুর আপন খেলায় যেন বসেছে ফুলের মেলা। এ যে শরতেরই দান।
নদীর জলের স্বচ্ছতা আর কাশবনের সৌন্দর্য নিয়ে কবিগুরু লিখেছেন:
চিক চিক করে বালি কোথা নাই কাদা
একধারে কাশবন ফুলে ফুলে সাদা।
আষাঢ়-শ্রাবণের টানা বর্ষণের পর মেঘমুক্ত আকাশের অবারিত নীলে ঝিলমিল শরতের দিনলিপি। কখনও ডানা মেলে উড়ে যায় একঝাঁক সাদা বক। এ সময়ের রোদ্দুরও ভারি মিষ্টি! ভালোবাসার আলতো ছোঁয়ায় গা জুড়িয়ে দেয়।
যার সৌরভ ছাড়া অপূর্ণ থাকে শরতের আলপনা আঁকা, সে তো
শুভ্র শিউলি। সাত সকালে ঘাসের বুকে ঠাণ্ডা শিশিরে সিক্ত শিউলি ফুলের রূপ-মাধুর্য দেখে আর পরান আকুল করা মধুগন্ধে ভরে ওঠে সুখপিয়াসীর মন। শরৎ মানেই যেন শিউলির শুভ্রতা। শিউলির রঙেই যেন শরতের পরিচয় :’শরৎ কাঁপে শিউলি ফুলের হরষে।’ একে ডাকা হয় শেফালি নামেও। কেবল প্রভাত নয়, শিউলি সুবাসে মাতিয়ে রাখে শরৎসন্ধ্যাও। কারণ, কমলা-হলুদ বোঁটা আর সাদা পাপড়ির ফুলকলিরা মুখ তোলে সন্ধ্যায়। সারা রাত গন্ধ বিলিয়ে ঝরে পড়ে নিশিভোরে। তলার ঘাসে, ঝরাপাতার কোলে।
ভোরের আলো ফোটার আগে ঝরে গেলেও যেন শেষ হতে চায় না শিউলির রূপ। ঝরা ফুল কুড়ানো নিয়ে কোলাহলে মেতে ওঠে দুরন্ত শিশু-কিশোরের দল।
শরতের জলাভূমিও ফুলের প্রাচুর্যে ভরা। বিলে-ঝিলে, পুকুরে-দীঘিতে ফোটে নানা রঙের শাপলা_ লাল, সাদা, গোলাপি। ঢাকার বলধা গার্ডেনে দেখা যায় দুর্লভ হলুদ শাপলাও। এ ছাড়া জলের বুকে ফোটে শালুক, রক্তকমল, সাদা ও নীলপদ্ম। আর বাগানে বাগানে হাসে দুপুরমণি, বকফুল, স্থলপদ্ম, শারদমলি্লকা ও ঢোলকলমির ফুল। এ সময় মাঠে মাঠে বেড়ে ওঠে সবুজ ধান।
ভাদ্র-আশ্বিন দু’মাসে ব্যাপ্ত শরৎ একান্ত আমাদের নিজস্ব ঋতু। পুরো উত্তর গোলার্ধে ঋতুচক্রে আছে চারটি ঋতু :গ্রীষ্ম, শীত, হেমন্ত ও বসন্ত। শীতের দেশেও শরৎ নেই, আছে হেমন্ত।
শরতের ঝলমলে লাবণ্য স্পর্শ করেছে কবি-সাহিত্যিকদের লেখনীও। গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধ, গান-কবিতা, স্মৃতিকথায়_ শরৎ এসেছে সাহিত্যের সব অনুষঙ্গে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের গীতবিতানের ২৮৩টি গানের মধ্যে ৬৮টিই শরতের সুর বন্দনায় মুখর।
যে ঋতু এত শুভ্র, এত যার রূপ তার রাত্রিকালীন নিসর্গও উপভোগ করার মতো। শরতের চাঁদনি অপূর্ব সুন্দর। মিষ্টি গন্ধে আমোদিত শরৎ রাতে স্বচ্ছ জলে ঝলমল করে ওঠে চাঁদের আলোকরশ্মি।
গ্রীষ্ম, বর্ষা কিংবা শীতের মতো জমকালো আয়োজনে নয়, শরৎ আসে লাজুক মেয়ের মতো ধীরে-সুস্থে। ঘুমপাড়ানি গানের মতো শান্ত-সি্নগ্ধ ও মধুর শরতের রূপ। শরতের আছে একটু ঔদাসীন্য, রাজকীয় ভাব। এর সৌন্দর্য খুঁজে নিতে হয়, অনুভব করতে হয়। তাই খানিকটা প্রকৃতিপ্রেমী না হলে প্রকৃতির বিচিত্র রঙ আর ঋতু বদলের খেলায় শরতের অস্তিত্ব টের পাওয়ার কথা নয়। বিশেষ করে এই নগরের যান্ত্রিকতায় নিসর্গের শুভ্রতা যেখানে ঝাপসা হয়ে যাওয়া স্মৃতির মতো, অস্পষ্ট। যন্ত্রদানবের উৎপাত সত্ত্বেও পল্লীবাংলায় আজও খানিকটা পাওয়া যায় ঋতুর পালা বদলের ছাপ। আর তাই মনোরম শরৎকে পেতে হলে থাকা চাই একটি নিবিষ্ট মন। তৃষিত নয়ন।