খেতে পারি না, মনে হয় ছেলে এসে বলবে, মা ভাত দাও

প্রকাশ:| বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই , ২০১৫ সময় ০৯:৩০ অপরাহ্ণ

আমি ভাত খেতে পারি না, মনে হয় ছেলে এসে বলবে, মা ভাত দাও। আমি রাতে ঘুমাতে পারি না। মানুষ দেখলে আমার বিষ লাগে। কারও সঙ্গে আমার কথা বলতে ইচ্ছে করে না।’
Capture1১
এসব কথা সন্তানহারা মা অর্চনা দাশের। ২০১১ সালের ১১ জুলাই মিরসরাইয়ের আবু তোরাব সড়কের দক্ষিণ সৈদালি গ্রামে স্কুলছাত্রদের বহনকারী একটি ট্রাক খাদে পড়ে ৪৪ জন ছাত্র মারা যায়। সেই মৃত্যুর মিছিলে ছিল অর্চনার ছেলে টিটু চন্দ্র দাশও।

স্থানীয় স্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্র টিটু মায়ের হাতে ভাত খেয়ে স্কুলে গিয়েছিল। স্কুল থেকে আর জীবিত ফেরত আসেনি, এসেছিল তার লাশ।

হাতে তুলে ভাত খাওয়ানোর সেই দৃশ্য আর ছেলের লাশ হয়ে ঘরে ফেরার দৃশ্য গত চার বছরেও ভুলতে পারছেন না অর্চনা। ছেলের মৃত্যুর পর বাবা দুলাল চন্দ্র দাশও বিছানায় শয্যাশায়ী। মেয়েকে বিয়ে দিয়েছিলেন, সেই মেয়ে এখনও বাবার বাড়িতে এসে ভাইয়ের শ্মশানের সামনে বসে কাঁদে। আরেক ছেলে আছে অর্চনার, সে সারাক্ষণ ঘরের ভেতরে বসে থাকে। টিটু মারা যাবার আগে সে কখনও এমন ছিল না, জানান অর্চনা।

দুর্ঘটনাকবলিত ওই ট্রাকে ছিল আবু তোরাব উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র হাবিব সাগরও। ট্রাকের সঙ্গে সে-ও খাদে পড়ে গিয়েছিল। তবে প্রাণে বেঁচে যায়। কিন্তু বাঁচতে পারেনি তার সহপাঠী বন্ধু কামরুল।

কামরুলের শোকে এক বছর স্কুলে যেতে পারেনি হাবিব। অজানা আশংকা, ভয় তাকে এখনও তাড়া করে বেড়ায়।

হাবিব এখন মিরসরাইয়ের প্রফেসর কামাল উদ্দিন কলেজের একাদশ শ্রেণীর ছাত্র। কলেজ যেতে, পড়তে বসলে তার এখনও কামরুলের কথা মনে হয়।

হাবিব সাগর জানান, দুর্ঘটনার পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের কয়েকজন ছাত্র-শিক্ষক ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। তাদের কাছে কাউন্সেলিং করেছেন হাবিব। কিন্তু এখনও সে স্বাভাবিক হতে পারছে না।

অর্চনা কিংবা হাবিব সাগরের মত পরিণতি আবু তোরাবের দক্ষিণ সৈদালি গ্রামের অনেকের। স্বজন হারানো পরিবারগুলো তো আছেই, প্রতিবেশিরাও এমন অস্বাভাবিক আচরণ করেন। যেসব ছাত্র মারা গেছে তাদের মধ্যেও আছে এমন অস্বাভাবিক আচরণ।

বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা উৎস’র সহযোগিতায় মেন্টাল হেলথ অ্যাডভোকেসি অ্যাসোসিয়েশন (এমএইচএএ) জরিপে পেয়েছে, স্বজন-সহপাঠী হারানো ৭৮ শতাংশ মানুষের মধ্যে এখনও ভয়, আতংক, দুশ্চিন্তা, দুঃস্বপ্ন, উদ্বেগের মত মানসিক সমস্যা বিদ্যমান এবং ক্রমেই তা বাড়ছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারি অধ্যাপক সৈয়দ মুহাম্মদ সাজ্জাদ কবীরের মতে, এসব মনোবৈকল্যে আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ। আস্তে আস্তে এ অস্বাভাবিক আচরণ আরও বাড়বে। পর্যাপ্ত চিকিৎসা না পেলে এ অসুস্থতার মধ্য দিয়েই জীবন পার করতে হবে।

তিনি বাংলানিউজকে বলেন, ঘটনার পর তাদের একক ও সমষ্টিগতভাবে যে কাউন্সেলিংয়ের দরকার ছিল সেটা দেয়া হয়নি। এর ফলে তারা মনোবৈকল্য কিংবা অস্বাভাবিক আচরণের রোগীতে পরিণত হয়েছেন। তারা মানুষের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে মিশতে পারছেন না। মানুষকে তাদের কাছে শত্রু মনে হচ্ছে। এটার জন্য ধাপে ধাপে কাউন্সেলিং দরকার।

এমএইচএএ’র কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বেঁচে যাওয়া হাবিব সাগরের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তারা কথা বলেছেন। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, হাবিব এখন কথায় কথায় রেগে যায়। জিনিসপত্র ভাংচুর করে।

দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিল বিধবা মায়ের একমাত্র ছেলে নয়ন শীল। নয়নের মা এখন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। তিনি জানান, তিনি রাতে ঘুমাতে পারেন না। প্রতি রাতে তার মনে হয় নয়ন এসে তাকে মা বলে ডাকছে। প্রতি রাতে তিনি বিলাপ ধরে ছেলের জন্য কান্না করেন।

সিএনজি অটোরিক্সাচালক খোকনের ছেলেও মারা যায় ওই দুর্ঘটনায়। তিনি জানান, দুর্ঘটনার খবর শুনে খোকন দ্রুত ঘটনাস্থলে যান। তিনি খাদের মধ্যে লাফিয়ে পড়েন। দেখতে পান, মারা যাওয়া ছেলেগুলো একেকজন আরেকজনের চুল, শার্ট ধরে রেখেছে। এসময় একজন তাকে বলেন, তোমার ছেলেকে তো রাস্তার উপর ‍শুইয়ে রাখা হয়েছে। তিনি গিয়ে দেখেন ছেলে আর নেই।

খোকন কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন, আমি ছেলেরে কোলে নিয়া কাঁদছি। সেই কথা আমার এখনও মনে পড়ে। ও আল্লাহ, আমার ছেলেটার নিঃশ্বাসটা কিভাবে বাইর হইল, আমি শুধু সেটাই ভাবি। সবসময় আমার ছেলের মুখ আমার চোখের সামনে ভেসে উঠে।

দুর্ঘটনায় নিহত ইফতেখার উদ্দিন মাহমুদের বাবা স্মৃতিশক্তি হারাতে বসেছেন। তিনি সবসময় পুকুরঘাটে বসে থাকেন, ভাবেন এই বুঝি তার ছেলে ফিরে এল। তার পরিবারের সদস্যরা জানান, ইফতেখারের বাবার আচরণ এখন শিশুদের মত।

বৃহস্পতিবার (০৯ জুলাই) স্বজন হারানো এসব মানুষের সঙ্গে কথা হয় চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে। ১১ জুলাইকে সামনে রেখে বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা উৎস’র সহযোগিতায় মেন্টাল হেলথ অ্যাডভোকেসি অ্যাসোসিয়েশন (এমএইচএএ) স্বজন হারানোদের এ সম্মিলন ঘটায়।

১১ জুলাইকে জাতীয়ভাবে স্মরণ করার আহ্বান
বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে এমএইচএএ আয়োজন করে মিরসরাই ট্র্যাজেডিতে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও করণীয় শীর্ষক অধিপরামর্শ সভা।

সভায় নিহতদের স্বজনরা ১১ জুলাইকে জাতীয়ভাবে স্মরণ করার দাবি জানান। এমএইচএএও তাদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে।

সভায় উৎস’র নির্বাহী পরিচালক মোস্তফা কামাল যাত্রা মিরসরাই ট্র্যাজেডিতে স্বজন হারানোর সঙ্গে কাজ করার নিয়ে বাধা পাবার কথা জানান।

তিনি সভায় বলেন, মিরসরাইয়ের স্থানীয় প্রশাসন, সমাজসেবা কর্মকর্তাসহ অনেকেই আমাদের হুমকি দিয়েছেন। আমাদের নিবন্ধন বাতিল করবেন বলেছেন। এরপরও আমরা আপনাদের কাছে গিয়েছি। আপনাদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার হতে হবে। আমরা আপনাদের পাশে আছি। সমস্ত বিবেকবান নাগরিকরা আপনাদের পাশে আছেন।

সভায় নিহত এক স্কুল ছাত্রের বাবা আবুল কাশেম বলেন, আমার ছেলের লাশ আমি নিজের কাঁধে করে বাড়ি নিয়ে গিয়েছিলাম। পত্রপত্রিকায় আমার ছবি ছাপা হয়েছিল। হুমকি আমিও পেয়েছি। এটা নিয়ে বাড়াবাড়ি না করার জন্য আমি হুমকি পেয়েছিলাম।

সভায় এমএইচএএ’র আহ্বায়ক শরীফ চৌহান বলেন, ১১ জুলাইকে জাতীয়ভাবে এবং সরকারিভাবে অবশ্যই স্মরণ করা উচিৎ। এজন্য আমরা আন্দোলন গড়ে তুলব। আমরা জেলা প্রশাসককে স্মারকলিপি দেব। আমাদের দাবি আদায়ে যা যা করতে হয় আমরা করব।

তিনি স্বজনদের উদ্দেশ্যে বলেন, রাষ্ট্র কখনও কাউকে অধিকার দিয়ে দেয় না। অধিকার আদায় করে নিতে হয়। আপনারা কখনোই ভাববেন না আপনাদের কেউ করুণা করছে। আপনার অধিকার অবশ্যই আপনি আদায় করে নেবেন।

সভায় আরও বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আব্দুল জলিল, মিরসরাইয়ের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন এবং আলোকচিত্রী শাহআলম নিপু।