সাগর তীরে ঝুকিঁপূর্ণ বসবাস

প্রকাশ:| শুক্রবার, ১৭ জুন , ২০১৬ সময় ০৯:৪৩ অপরাহ্ণ

সাগর তীরে ২

দুই যুগেও কেউ খোজ নেয়’নি ছিন্নমুল পরিবারগুলোর

এস কে লিটন কুতুবী, কুতুবদিয়া:
ছনের ঘেরা স্যাঁত স্যাঁেত কর্দমাক্ত ঝুপড়ি ঘরের বাইরে ছালা পেতে মরিয়ম খাতুন (৬০) জাল বুনছেন। গেল ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর আঘাতে তার ঘরটি লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। ঊনবিংশ শতাব্দির প্রলংকারী ৯১’র ঘূর্ণিঝড়ে স্বামী গোলাম ছোবহান, পুত্র আদুল মালেকসহ অনেক আতœীয়কে হারিয়েছেন। তখন থেকেই অসহায় হয়ে পড়েন তিনি। অর্থের অভাবে সাগর পাড়ের স্বামীর ভিটায় ঝুপড়ি ঘর তৈরী করে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। ৯১ সনে মরিয়মের সাজানো সংসারের সব কিছু হারিয়ে আবার নতুন সংসার শুরু করেন। ৯১ সন থেকে এ পর্যন্ত এক এক করে দুই যুগ পাড়ি দিয়েছেন ঝুপড়ি ঘরের ছাউনি আগলিয়ে। অতীকষ্টের সাজানো সংসারের সব কিছু গেল ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু আর মধু পূর্ণিমার জোয়ারে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। গেল ৯১ সন থেকে এ পর্যন্ত তিনি সিড়র , আইলা , মালা , গিরি,রোয়ানুসহ নাম না জানা অনেক ঘূর্ণিঝড়সহ ৫২টি দূর্যোগ তার চোখের উপর বয়ে গেছে বলে দাবী করেন। চলতি বর্ষা মৌসুমের শুরুতে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিন্মচাপের থেকে ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর সময় বেড়িবাঁধের ভিতর আশ্রয় কেন্দ্রে ছুটে জীবন বাচাঁলেও ছোট সংসারের মালামাল কিছুই বাচাঁতে পারেন নি। জোয়ারের স্্েরাতে তার সব কিছু কেড়ে নিয়ে গেছে। আবার নতুন করে সংসারের একেকটি জিনিস যোগাড় করতে হবে তাকে। তবে এভারে তিনি মনোবল হারিয়ে ফেলেছে। কিন্তু তা কত দিনে সম্ভব এ চিন্তায় দিশে হারা সে। স্বামী সন্তানহারা এ অভাগা কক্সবাজার জেলার কুতুবদিয়া দ্বীপের কৈয়ারবিল ইউনিয়নের মফজল ডিলার পাড়া গ্রামে বেড়িবাঁেধর বাইরে ঝুপড়ি ঘরে বাস করা এ মরিয়ম খাতুন। তার মতো অসংখ্য গৃহহারা মফজল ডিলার পাড়া, মহাজনপাড়া, সিকদার পাড়া, মতিরবাপের পাড়ায় দুই শতাধিক পরিবার রয়েছে। ১৯৯১ সন থেকে এ পর্যন্ত জলোচ্ছ্বাসে সব কিছু হারিয়ে এখনো পর্যন্ত সাগরের সাথে যুদ্ধ করে বেড়িবাঁেধর বাইরে বসবাস করছে এসব পরিবার। এখনো পর্যন্ত এসব পরিবারে লোকজনকে পূর্ণবাসন করার জন্য এগিয়ে আসেনি সরকার কিংবা এনজিওরা। পানি উন্নয়ন বোর্ড কক্সবাজার জেলার ৭১ পোল্ডারের কুতুবদিয়া দ্বীপের ৪০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ে ভিটি-বাড়ি হারিয়ে ভূমিহীন হয়ে বেড়িবাঁেধর ওপর প্রায় দুই হাজার পরিবার ঝুপঁটি বাসা বেঁেধ রয়েছে। বিশেষ করে কৈয়ারবিল,দক্ষিণ ধুরুং, উত্তর ধুরুং, লেমশীখালী,বড়ঘোপ,আলী আকবর ডেইল ইউনিয়নে বেড়িবাঁেধর ওপর বসবাস করার দৃশ্য চোখে পড়ে। কৈয়ারবিল ইউনয়নের পশ্চিমে বেড়িবাঁেধর বাইরে ১৯৯১সনের ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত ২’শ পরিবার এখনো মারাতœক ঝুকিঁতে বসবাস করছে। সাগর তীরেএসব গরীব দূঃখী মানুষ বেড়িবাঁেধর ভিতরে এসে ঘর তৈরী করার সামসর্থ না থাকায় বাঁেধর বাইরে ঝুকিঁর মধ্যে থাকছে এসব শত শত লোক। বড়ঘোপ মাতবরপাড়ার পশ্চিমে সাইটপাড়ার বাসিন্দা রোকেয়া বেগম (৫০) জানান,বর্তমানে তারা সাইটপাড়া গ্রামে শতাধিক পরিবার ঝাউবাগানের ভীতরে ঘর করে আছে। এসব ভূমিহীন পরিবারগুলোকে পূনবাসন করার জন্য কোন সরকারই উদ্যোগ নিচ্ছে না দীর্ঘ দুই যুগ ধরে। বর্ষা এলেই অমাবষ্যা আর পূর্ণিমার জোয়ারে রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়। জোয়ারে কোন সময় তাদেরকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। আতঙ্কের মধ্যে জীবন কাটাচ্ছে পরিবারগুলো। সহায় সম্বলহীন মানুষের পূনবাসনের কথা বলে মাথা বিক্রি করে রাজনৈতিক ব্যক্তি ও এনজিওরা অর্থবান হচ্ছে। কিন্তুু ভূমিহীনরা ভূমিহীন রয়ে গেছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশ বিজ্ঞান (ইনষ্টিটিউট) বিভাগের প্রধান প্রফেসার (ডক্টর) মুহাম্মদ কামাল হোছাইনের সাথে কথা হলে তিনি জানান, বঙ্গোপসাগর বেষ্টিত কুতুবদিয়া দ্বীপে পাউবোর ৪০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। এ দ্বীপের ছয় ইউনিয়নে বেড়িবাধেঁর উপর শত শত পরিবার বসবাস করে। এ পরিবারগুলো চরম দারিদ্র সীমার নিচে মানবেতর জীবন যাপন করে। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছাসের মতো প্রাকৃতিক দূর্যোগ এদের খড় কুঠোর মতো ভাসিয়ে নিয়ে যায়। এতে সর্বস্ব হারালেও তাদের ভাগ্যে ত্রাণের কয়েক কেজি চাল ছাড়া কিছুই জুটছেনা । বর্তমানে আর্ন্তজাতিক জলবাযু পরিবর্তন তহবিলের অর্থ উপকূলীয় এলাকার দারিদ্র সীমার নীচে বসবাসরত মানুষের উন্নয়নের কাজে লাগিয়ে বেড়িবাঁেধর বাইরে ও বাধেঁর ওপর বসবাসরত শত শত পরিবারকে স্থায়ী পূর্ণবাসন করাসহ, দ্বীপের চতুরপার্শ্বে স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং বাঁেধর ওপর বনায়ন করার জন্য সরকারের প্রতি দাবী জানান তিনি।
কুতুবদিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এ,টি,এম,নুরুল বশর চৌধুরী বলেন, উপজেলার মহাজন পাড়া, নাথ পাড়া, মফজল ডিলার পাড়া, মতিরবাপেরপাড়া, কাহারপাড়া, তেলিপাড়া, হাইদরবাপেরপাড়া, তাবলরচর , কাইছারপাড়া দক্ষিণ অমজাখালী, আজম কলোনীসহ ছয় ইউনিয়নের বেড়িবাধেঁর বাইরে এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড়ের (পাউবো) বাধের উপর শত শত পরিবার বসবাস করছে। তাদের পুনর্বাসনের জন্য ইতিমধ্যে উপজেলা পরিষদ থেকে ছিন্নমূল পরিবারগুলো জরিপ করে তাদের পুনর্বাসনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে চিঠি প্রেরণ করা হয়েছে বলে এ প্রতিনিধিকে জানান।