সরগরম চট্টগ্রামের ফুলের গ্রাম

নিউজচিটাগাং২৪/ এক্স প্রকাশ:| মঙ্গলবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি , ২০১৮ সময় ০১:০০ অপরাহ্ণ

বিশ্ব ভালোবাসা দিবস’ আগামী রবিবার। দিবসটি সামনে রেখে চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের ব্যবসায়ীরা কক্সবাজারের চকরিয়ার ‘গোলাপ নগর’ খ্যাত বরইতলী ও হারবাং থেকে আগেভাগেই নানা প্রজাতির ফুল কিনছেন। অনেকে আগাম অর্ডার দিয়ে রেখেছেন। ফলনও হয়েছে বেশ। সব মিলিয়ে এখানকার ফুলচাষিরা মহাখুশি। এবার তাঁরা কোটি টাকার ফুল বিক্রি করার আশা করছেন।

বরইতলী ও হারবাং ইউনিয়নের ফুলচাষিরা জানান, গত দুই বছর এ সময়ে দেশে ২০ দলীয় জোটের ডাকা টানা অবরোধ-হরতালের প্রভাব পড়ে বরইতলী ও হারবাং ইউনিয়নে। ওই সময় এখানকার দেড় শতাধিক বাগানের গ্লাডিওলাস ও গোলাপ বিক্রি করতে না পেরে ক্ষেতেই নষ্ট হয়ে গেছে। বিক্রি তেমন না থাকায় বাগান থেকে ফুল তোলা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেকটা বেকার সময় পার করেছেন তিন শতাধিক নারী-পুরুষ শ্রমিক। এতে এসব পরিবারে আর্থিক-অনটন দেখা দেওয়ায় দুর্বিষহ জীবনযাপন করতে হয়। অন্তত তিন কোটি টাকার ক্ষতি হয় হাজারো ফুল চাষির। তবে এখন দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক থাকায় বেশ খুশিমনে ফুল চাষে নামেন চাষিরা। এতে চলতি বছর পুরোদমে কর্মচাঞ্চল্য ফিরে আসে ‘ফুলের রাজ্য’ বরইতলী ও হারবাং ইউনিয়নে।

চকরিয়ার বরইতলী থেকে পাইকারি দরে কিনে চট্টগ্রাম মহানগরীর চেরাগী পাহাড় মোড়ে ফুল বিক্রি করেন সুভাষ দে। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রতিদিন গড়ে ৫-১০ হাজার ফুল কেনা হয় চকরিয়ার বরইতলী থেকে। আর বিশেষ দিবসে তা কয়েকগুণ ছাড়িয়ে যায়। এবারের ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে আগাম অর্ডার দেওয়া হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার গোলাপ ও গ্লাডিওলাস ফুলের।’

বরইতলী একতা বাজার এলাকার এক ফুলচাষি বলেন, ‘আমি একসময় তামাকের চাষ করতাম। তখন মুনাফাও ভালো পেয়েছিলাম। কিন্তু হাড়ভাঙা খাটুনি ও দিন-রাত পরিশ্রমের কারণে শরীরের অবস্থা তেমন ভালো যাচ্ছিল না। তাই অন্যের দেখাদেখিতে তামাকচাষ ছেড়ে গত দুই বছর ধরে উদ্যোগী হই ফুল চাষে। কিন্তু গত দুই বছর রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ফুল বিক্রি হয়নি। এতে কম করে হলেও চার লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। তবে সেই অবস্থার পরিবর্তন হওয়ায় এবারও দুই কানি জমিতে গোলাপ ও গ্লাডিওলাস ফুলচাষ করেছি। ফলনও ভালো হওয়ায় বেশ খুশি লাগছে।’

নজির আহমদ আরো বলেন, ‘প্রতিদিন সকালে বাগান থেকে ফুল তোলার পর চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের পাইকাররা সরাসরি এসে কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। অনেকে পাইকার আগাম অর্ডারও দিয়ে রেখেছেন ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে। এতে এবার কম করে হলেও দুই লাখ টাকার ফুল বিক্রি করতে পারব আমি।’

চাষিরা জানান, দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীল পরিবেশ বজায় থাকায় প্রতিটি গোলাপের দাম মানভেদে পাইকারিভাবে বিক্রি হচ্ছে তিন থেকে চার টাকায়। আর রকমারি রংয়ের গ্লাডিওলাস ফুল বিক্রি হচ্ছে ১০ থেকে ১৫ টাকায়। এতে চাষির পাশাপাশি বাগান পরিচর্যা ও ফুল তোলায় নিয়োজিত তিন শতাধিক নারী-পুরুষ শ্রমিকের মুখে হাসি ফুটেছে নিয়মিত পারিশ্রমিক পাওয়ায়।

বাগানশ্রমিক বরইতলী পূর্ব পাড়ার নূর আয়েশা, ছলেমা খাতুন বলেন, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভালো থাকায় ফুল বাগানে শ্রম দিয়ে প্রতিদিন রোজগার করছি। এতে পরিবারের অভাব-অনটন বলতে গেলে আর নেই। গত দুই বছর আমাদের বেশ পীড়া দিয়েছিল রাজনৈতিক অস্থিরতা।

সরেজমিন ফুলচাষি ও শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দক্ষিণ চট্টগ্রামের গোলাপ ফুলের গ্রাম কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ও হারবাং ইউনিয়নের দেড় শতাধিক বাগান থেকে প্রতিদিন চট্টগ্রাম-কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গোলাপ ও গ্লাডিওলাস ফুল সরবরাহ করা হয় পাইকারদের কাছে। বিশেষ বিশেষ দিনগুলোতে এসব বাগানের ফুলের ব্যাপক কদর রয়েছে। গত দুই দশক ধরে এখানকার চাষিরা রুটি-রুজির একমাত্র অবলম্বন হিসেবে ফুলচাষ করে আসছেন। প্রথমদিকে সামান্য জমিতে নানা জাতের ফুলের চাষ হলেও বর্তমানে দুই ইউনিয়নের অন্তত ১২০ একর জমিতে চাষ হচ্ছে ফুলের।

বরইতলী ফুলবাগান মালিক সমিতির আহ্বায়কবলেন, ‘গত দুই বছর টানা অবরোধ-হরতালের কবলে পড়ে ফুলচাষিরা মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল। তবে এবার সেই পরিস্থিতি বদলে যাওয়ায় পুরোদমে ফুলচাষে নেমেছেন চাষিরা। তাই আশা করছি, এবারের ভালোবাসা দিবসে গোলাপ, গ্লাডিওলাসসহ রকমারি ফুল বিক্রি হবে কোটি টাকার। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের পাইকারি ক্রেতারা বাগানে এসে ফুল নিতে শুরু করেছেন। অনেকে আগাম অর্ডারও দিয়ে রেখেছেন চাষিদের। আগামীকাল (আজ বৃহস্পতিবার) থেকে তিনদিন সবকটি বাগানের সিংহভাগ ফুল বিক্রি হবে।’

চকরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেন, ‘বরইতলী ও হারবাং ইউনিয়নের ১২০ একর জমিতে পুরোদমে ফুলের চাষ করছেন হাজারো চাষি। গত দুই বছরের মতো রাজনৈতিক উত্তাপ না থাকায় এবারের ভালোবাসা দিবসসহ সবকটি দিবসে ফুল বিক্রিও ভালো হবে। এতে আর্থিকভাবে বেশ লাভবান হবেন চাষিরা।’

বরইতলী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমার ইউনিয়নের সিংহভাগ মানুষ তাঁদের জমিতে তামাকের আবাদ করতেন একসময়। তামাক আবাদের কারণে যেভাবে পরিবেশ ও শারীরিক ক্ষতি হয় তা আমি তাঁদের বুঝাতে সক্ষম হয়েছি। তাই তাঁরা কয়েক বছর ধরে তামাক চাষ ছেড়ে ফুলচাষের দিকেই ঝুঁকেন। ইতোমধ্যে ফুলচাষ করে আমার ইউনিয়নের অসংখ্য মানুষ আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন। কিন্তু মাঝে-মধ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতার যাঁতাকলে পড়ে তারা নিঃস্ব হতে থাকেন। তবে বর্তমানে রাজনৈতিক স্থিতিশীল অবস্থা থাকায় ফুল বিক্রিও বেড়ে গেছে।