সকল গনস্থাপনায় প্রতিবন্ধী মানুষের প্রবেশগম্যতার নিশ্চয়তা চাই

প্রকাশ:| মঙ্গলবার, ১৫ জুলাই , ২০১৪ সময় ১১:৩৫ অপরাহ্ণ

“গুরুত্বপূর্ণ গণস্থাপনায় সার্বজনীন প্রবেশগম্যতা নিরীক্ষণ;সংবাদ সম্মেলন

গত ১২ জুন থেকে ৮ জুলাই ২০১৪ পর্যন্ত বাংলাদেশ সোসাইটি ফর দ্যা চেঞ্জ এ্যান্ড অ্যাডভোকেসি নেক্সাস (বি-স্ক্যান) এর উদ্যোগে এবং ওয়াটার-এইড, পিএসটিসি ও সাজেদা ফাউন্ডেশন এর সহায়তায় ঢাকা ও চট্টগ্রামের সরকারি ২০টি গনস্থাপনায় প্রবেশগম্যতা নিরীক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এই কার্যক্রমে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যাক্তির সংগঠন রিহেবিলিটশেন সেন্টার ফর দ্যা ডিজেবেল্ড (আরসিডি), চট্টগ্রাম বধির উন্নয়ন সংস্থা, বাংলাদেশ ভিজুয়ালি ই¤েপয়ার্ড পিপলস সোসাইটি (ভিপস), সোসাইটি অব দ্যা ডেফ এন্ড সাইন ল্যাংগুয়েজ ইউজারস (এসডিএসএল) এবং প্রতিবন্ধী ব্যাক্তিদের নিয়ে কর্মরত সংস্থা সেন্টার ফর দ্যা রিহেবিলিটেশন ফর দ্যা প্যারালাইজড (সিআরপি) কৌশলগত সহযোগী সংগঠন হিসেবে স¤পৃক্ত ছিলেন।
এই নিরীক্ষায় দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, স্বল্প দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী ব্যক্তি, ক্রাচ ব্যবহারকারী ব্যক্তি এবং শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অংশগ্রহন করেন। এই প্রবেশগম্যতা নিরীক্ষায় সরকারি গনস্থাপনা ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিভিন্ন ধরনের বাধা পরিলক্ষিত হয়। সংগতিপূর্ণ বন্দোবস্ত সহ (রিজেন্যাবল একমোডেশন), সার্বজনীন পরিকল্পনার (ইউনিভার্সাল ডিজাইন) ভিত্তিতে সরকারি সকল গনস্থাপনা প্রতিবন্ধী ব্যাক্তিদের জন্যে প্রবেশগমন উপযোগী করতে হবে।
এই নিরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের জন্যে বি-স্ক্যান ১৫ জুলাই ২০১৪ তারিখে একটি সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করে। সাবরিনা সুলতানা – সভাপতি, বি-স্ক্যান এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সাংবাদিক সম্মেলনে রাশেদুজ্জামান চৌধুরী, সভাপতি, আরসিডি, আসমা আক্তার – শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, নিমাই বণিক – সাধারণ স¤পাদক, চট্টগ্রাম বধির সংস্থা, সিফাত তানজিলা, – (সিআরপি), মোহাম্মদ ইফতেখার মাহমুদ – সদস্য ভিপস, শামীম আহমেদ, প্রোগ্রাম ম্যানেজার, ওয়াটারএইড, রফিকুল ইসলাম মজুমদার, প্রজেক্ট ম্যানেজার, পিএসটিসি, ডাঃ মাহফুজুর রহমান, চেয়ারম্যান, বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্র, রাশেদ রউফ- সহ-সভাপতি, প্রেস ক্লাব, মহসিন চৌধুরী- সাধারণ স¤পাদক, প্রেস ক্লাব, মোঃ জালালউদ্দিন, প্রধান প্রকৌশলী, শিক্ষা প্রকৌশল বিভাগ, সাইফুদ্দিন মাহমুদ, উপ-সচিব, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, আরিফুল ইসলাম, নির্বাহী প্রকৌশলী, ওয়াসা, এছাড়া সরকারি, বেসরকারি, প্রতিবন্ধী ব্যাক্তিবর্গ এবং সাংবাদিক বৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
সালমা মাহবুব -সাধারণ স¤পাদক, বি-স্ক্যান, মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।এই প্রবন্ধে উল্লেখিত বিভিন্ন সমস্যা সমূহ এবং সুপারিশ মালা নিুে প্রদান করা হল।
বাধাসমূহ
* ১০টি স্থাপনার মধ্যে ৯টিতেই প্রবেশমুখে সুব্যবস্থা নেই। শুধুমাত্র সিডিএ ভবনে চমৎকার একটি র‌্যাম্প রয়েছে যদিও দুঃখজনক- সব সময় সেটি মোটর সাইকেল দিয়ে ঘেরা থাকে।
* চট্টগ্রাম মেডিক্যাল, নিউমার্কেট ও রেলওয়ে স্টেশনে স্লোপের মত ঢালু পথ থাকলেও তাকে র‌্যাম্প বলা যায় না। অত্যন্ত খাড়া, পিচ্ছিল এবং কোন রেলিং নেই। ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় ১ ইঞ্চি অনুপাত ১২ ইঞ্চি লম্বা র‌্যাম্প নির্মাণের কথা বলা হলেও কোন কোন জায়গায় আমরা ১ ইঞ্চির অনুপাতে মাত্র ৩ ইঞ্চি লম্বা র‌্যাম্প পেয়েছি যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এই ঢালুপথগুলো মূলত মালামাল বা রুগী বহনের ট্রলী বা স্ট্রেচার নিয়ে উঠানামার জন্য তৈরি করা হয়েছে।
* সবচেয়ে দুঃখজনক কোন ভবন বা গণস্থাপনাতেই প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বান্ধব টয়লেট ব্যবস্থা নেই, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দরজাগুলো চাপা, বা দরজার সামনে ২/৩ ইঞ্চি উচু চৌকাঠ, হুইলচেয়ার ঘুরানোর মত পর্যাপ্ত জায়গার অভাব যা হুইলচেয়ার নিয়ে প্রবেশগম্য নয় এবং হাই কমোডের ব্যবস্থাও নেই। বেশিরভাগ ভবনেই যেখানে নারীদের জন্য আলাদা টয়লেট পাওয়া যায় নি সেখানে আমাদের কাছে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ব্যবস্থা থাকা অভাবনীয়! এছাড়াও পরিস্কার পরিছন্নতার মারাতœক অভাব লক্ষ্য করা গেছে যা সকলের স্বাস্থ্যের জন্যেই অত্যন্ত ক্ষতিকর।
* লিফটে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য ব্রেইল বাটন, ফ্লোর ঘোষনার ব্যবস্থা নেই, হুইলচেয়ার নিয়ে লিফটের দরজা দিয়ে কোনমতে ঢুকলেও ভিতরে ঘুরার মত পর্যাপ্ত জায়গা নেই।
*বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সিড়ির বিকল্প হিসেবে লিফটের কোন ব্যবস্থা নেই সেখানে সিঁড়ির ধাপগুলো অত্যন্ত উঁচু। সিড়ির/র‌্যাম্পের শুরু এবং শেষে, করিডোর ইত্যাদিতে ট্যাকটাইল বা ব্রেইল ব্লক এর ব্যবহার নেই। সাইন পোস্ট বা দিক নির্দেশনা নেই।
* স্বল্প দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহ সকলের জন্য স্থাপনাগুলোতে রঙের সঠিক ব্যবহার করা হয় নি যাতে জিনিসপত্র আলাদাভাবে চেনা বা বোঝা যায়। যেমন দরজার হাতলের সাথে দরজা এবং আশেপাশের দেয়ালের রঙ।
* অফিস কক্ষ, সভা কক্ষে প্রবেশের মত পর্যাপ্ত জায়গা নেই।
* কোন কোন জন গুরুত্বপূর্ণ অফিস এমন ভবনে স্থাপিত যেখানে প্রতিবন্ধী মানুষের পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয়। যেমন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিভিন্ন সমস্যা বা চাহিদাগুলোর ফোকাল সংস্থা সমাজসেবা কার্যালয়। সেটা নিজস্ব ভবন বা ভাড়া উভয় ক্ষেত্রেই ঢাকা এবং চট্টগ্রাম সমাজসেবা কার্যালয়ে আমরা দেখেছি হুইলচেয়ার নিয়ে দোতলায় যাওয়া তো অনেক দূরের কথা একতলাতেই প্রবেশ সম্ভব নয়।
* ইনফরমেশন ডেস্কেগুলোর উচ্চতা হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীর তুলনায় অনেক উচুতে।
* প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য কোন ফোকাল পারসনের ব্যবস্থা এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বিষয়ক কোন ওরিয়েন্টেশেন নেই।
* যে কোন ভবনে জরুরী অবস্থায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সবচেয়ে ঝুকিপূর্ণ অবস্থায় থাকেন। অথচ গুরুত্বপূর্ণ ১০টি গণস্থাপনার কোন স্থাপনাতেই ইমার্জেন্সি এক্সিট একেবারেই নেই।
*রেলওয়েতে ছাড়া আর কোন জায়গায় পানি পানের জন্য নির্দিষ্ট কোন স্থান পাওয়া যায় নি। ইত্যাদি।
*সার্বজনীন গম্যতায় শ্রবণ বাক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চাহিদাগুলো একেবারেই উপেক্ষিত। কোন ইশারা ভাষার সহযোগিতা নেই। জরুরী নাম্বারে এসএমএস সার্ভিসের ব্যবস্থা কাজ করে না। তথ্য অনুসন্ধান নোটিস বোর্ড বা সিটিজেন চার্টার, লোকেশন ম্যাপ ইত্যাদি সব জায়গায় ছিল না।
সুপারিশ সমূহ-
*মূল প্রবেশ পথে দুই সাইডে অপিচ্ছিল রেলিংযুক্ত র‌্যাম্প থাকা আবশ্যকীয়। র‌্যাম্পে করগেটেড টাইলস ব্যবহার করলে পিচ্ছিল হয় না এবং রঙের ব্যবহার সঠিকভাবে আনা যায়।
*ইনফরমেশন ডেস্কের উচ্চতা হুইলচেয়ারে বসে থাকা ব্যক্তির সমান্তরাল উচ্চতায় রাখতে অন্তত ২৯ থেকে ৩০ ইঞ্চি হওয়া দরকার। যা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই চল্লিশ ইঞ্চির উপরে পেয়েছি সকল গনস্থাপনায় প্রতিবন্ধী মানুষের প্রবেশগম্যতার নিশ্চয়তা চাইআমরা। এক্ষেত্রে পুরো ডেস্কের উচ্চতা পরিবর্তন না করে একটি অংশ তাদের উচ্চতায় রাখা যেতে পারে।
*স্থাপনার বিভিন্ন কক্ষে/সেবা নিতে যাওয়ার জন্য সাইন পোস্ট বা দিক নির্দেশনার ব্যবস্থা করা।
*দরজাগুলো নূন্যতম ৩৬ ইঞ্চি চওড়া এবং হাতল হুইলচেয়ারে বসা ব্যক্তির উচ্চতায় থাকা জরুরী। এবং রঙের ব্যবহারের দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
*প্রতি তলায় সার্বজনীন গম্যতার নকশা পুরোপুরি মেনে অন্তত একটি প্রবেশগম্য টয়লেট থাকা অত্যন্ত জরুরী।
*একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষের প্রবেশের ক্ষেত্রে সিড়ির/ র‌্যাম্পের শুরু এবং শেষে, করিডোর ইত্যাদিতে ট্যাকটাইল বা ব্রেইল ব্লকের ব্যবস্থা করা। ইনফরমেশনগুলো টেকটাইল লেখা জরুরী।
*লিফটে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য ব্রেইল বাটন, ফ্লোর ঘোষনার ব্যবস্থা নেয়া দরকার। কিছু ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা থাকলেও সেটি বন্ধ করে রাখা হয়। এই দিকটা লক্ষ্য রাখা জরুরী।
*সকল গণস্থাপনায় নির্দিষ্ট বাধামুক্ত, উন্মুক্তস্থানে পানি পানের সুবিধা থাকা প্রয়োজন এবং সেটা প্রবেশপথের আশেপাশে হওয়া জরুরী।
*শ্রবণ বাক প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য ইশারা ভাষার সহযোগিতা নিশ্চিত করা এবং জরুরী নাম্বারে এসএমএস সার্ভিসের ব্যবস্থা করা। তথ্য অনুসন্ধান নোটিস বোর্ড, সিটিজেন চার্টার, লোকেশন ম্যাপের ব্যবস্থা করা।
*সিড়ির বাধা অতিক্রম করা সক্ষমতা সবার থাকে না। তাই ভিতরে নতুন লিফট স্থাপন করা না গেলেও প্ল্যাটফর্ম লিফট অথবা বাইরে দিয়ে ম্যানুয়েল বা যন্ত্রচালিত লিফট লাগানো জরুরী।
চট্টগ্রামের স্থাপনা সমূহঃ চট্টগ্রাম ওয়াসা, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড, চট্টগ্রাম সমাজসেবা কার্যালয়, বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল, চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন, চট্টগ্রাম নিউ মার্কেট, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং ডাবল মুরিং থানা।
ঢাকার স্থাপনা সমূহঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রেজিষ্ট্যার বিল্ডিং, কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন, গাবতলী বাস স্ট্যান্ড, ওয়াসা ভবন, ঢাকা নিউ মার্কেট, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, জেলা সমাজসেবা কার্যালয়, তেজগাও থানা, ভিক্টিম সাপোর্ট সেন্টার – তেজগাও, দক্ষিণ নগর ভবন।