সংবাদপত্র বিক্রেতা চম্পাকে বৈদ্যুতিক বাইক দিল আকিজ

প্রকাশ:| মঙ্গলবার, ৮ আগস্ট , ২০১৭ সময় ১২:২৩ পূর্বাহ্ণ


সংবাদপত্র বিক্রেতা চম্পাকে বৈদুতিক বাইক দিল আকিজ গ্রুপ। আজ সকালে ইউএনও চটমোহর সহ আকিজ গ্রুপের কর্মকর্তারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

উল্লেখ্য দেশসহ সারা বিশ্বের খবর পৌঁছে দেন তিনি মানুষের দ্বারে। তার নিজের জীবন সংগ্রামের খবর রাখে না কেউ, থাকে অগোচরে। জীবন সংগ্রামী এক নারী হকার নাম চম্পা। মানুষের প্রতিটি সফলতার পেছনে থাকে হারের গল্প। জীবনে ঘাত-প্রতিঘাত না আসলে মানুষের পরিপূর্ণতা বা সফল হওয়া যায় না। তবে এই ঘাত-প্রতিঘাতের মাঝে মানুষের ইচ্ছা শক্তি সহায়ক হিসেবে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তেমনটিই ঘটেছে পাবনার চাটমোহর উপজেলার পার্শ্বডাঙ্গা ইউনিয়নের মল্লিকবাইন গ্রামের জান্নাতুল সরকার চম্পার (৩১) জীবনে। উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেও তার কপালে জোটেনি একটি চাকরি। তিনি একজন নারী হকার।
যে বয়সে স্বামী সন্তানদের নিয়ে একটি সুন্দর জীবন কাটাবার কথা, ঠিক সে সময় জীবন জীবিকার তাগিদে নারী হয়েও সাইকেল চালিয়ে খবরের কাগজ (পত্রিকা) বিক্রি করছেন চাটমোহর পৌর সদরসহ গ্রামাঞ্চলের সর্বত্র।
কথা হয় পত্রিকা বিক্রেতা জান্নাতুল সরকার চম্পার সাথে। তিনি বলেন উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে খবরের কাগজ বিক্রি করছি। চাকরি তো হলো না। বয়স চলে গেছে। সংসার চালাতে হবে তো। অভাবের কাছে হার মানতে রাজি নই আমি। তাই এটা করছি (পত্রিকা বিক্রি)।
এভাবেই দৃঢ়চিত্তে কথাগুলো বলছিলেন চম্পা। দীর্ঘ ৪ বছর ধরে শহরের আনাচে কানাচে সাইকেল চালিয়ে বিক্রি করছেন খবরের কাগজ। শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ সবাই তাকে একনামে চেনে। প্রতিদিন প্রায় ২০-২৫ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে খবরের কাগজ বিক্রি করে পরিবারকে অন্নের জোগান দিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
চাটমোহর উপজেলা পার্শ্বডাঙ্গা ইউনিয়নের মল্লিকবাইন গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য মৃত ইসাহাক আলী সরকারের দ্বিতীয় সন্তান চম্পা। ২০০০ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। পাস করার পরই ছোটবেলা থেকে দৃঢ়চেতা ও প্রত্যয়ী চম্পা কিছু একটা করবেন এবং নিজে স্বাবলম্বী হবেন এই আশায় একটি চাকরির খোঁজ করতে থাকেন। পরে ২০০২ সালে ঈশ্বরদী আলহাজ টেক্সটাইল মিলে নিরাপত্তা বিভাগের হাবিলদার হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন।
পরে ২০০৫ সালে উপজেলার ডিবিগ্রাম ইউনিয়নের কাঁটাখালী গ্রামে এক ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেন তার পরিবার। বেশ ভালোই চলছিল সংসার। বিয়ের পর সেই চাকরি ছেড়ে সানফ্লাওয়ার নামে একটি বীমা কোম্পানিতে চাকরি নেন চম্পা। তবে বছর না পার হতেই স্বামীর সাথে বনিবনা না হওয়ায় বিচ্ছেদ হয় তাদের মধ্যে। চম্পা চলে আসেন বাবার বাড়িতে।
এদিকে তার পরিবারের আর্থিক অবস্থাও ভালো না। পরিবার থেকে আবারও তাকে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন সবাই। কিন্তু সংসার জীবনের উপর তার ভীষণ অনীহা জন্মে। আর ঘর বাঁধতে তিনি রাজি নন। তখন তার চারদিকে শুধুই অন্ধকার! বাবা মারা গেলে মা ও ছোট ভাইয়ের দায়িত্বটাও তার কাঁধে চাপে। বড় ভাই আলাদা হয়ে যান। কি করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না চম্পা। এসব কথাগুলো বলতে গিয়ে চম্পার দু’চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় পানি গড়াতে থাকে।
নিজেকে সামলে নিয়ে চম্পা বলেন, ‘আমি কোনো কাজকে ছোট করে দেখি না। প্রথম দিকে অনেকে আমাকে কটূক্তি করেছে। প্রথম প্রথম খারাপ লাগতো। কিন্তু এখন আর খারাপ লাগে না। কেননা, আমি না খেয়ে থাকলে আমাকে কেউ সাহায্যে করবে না। আর আমি তো কারো কাছে হাত পাতছি না। অন্যকিছুও করছি না। কাজ করে খাচ্ছি। সম্মান করি পেশাকে।
তিনি আরো বলেন, ‘সমস্যা একটাই, নারী হয়ে সাইকেল চালিয়ে কাজটা করছি। তবে নারীরা এখন কত কিছুইতো করছে। ট্রেন চালাচ্ছে, বিমান ওড়াচ্ছে, গাড়ি চালাচ্ছে। সর্বোপরি প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রী, স্পিকারসহ উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারাও নারী। এজন্য একজন নারী হয়ে আমি এতে কোনো সমস্যা দেখি না। এটা নিয়ে আমার কোনো হীনম্মন্যতাও নেই। আমার মনোবল আছে। না খেয়ে থাকলে, আমায় কেউ খেতে দেবে না। এটা আমার একটা অন্যরকম জীবন যুদ্ধ বলতে পারেন। আমি ঘাম ঝরিয়ে রোজগার করে খাচ্ছি। পরিবারকে খাওয়াচ্ছি।
ছোট ভাই সুজনকেও এই পেশায় নিয়ে এসেছেন চম্পা। দুই ভাই বোন মিলে গড়ে প্রতিদিন ৩৫০ কপি পত্রিকা বিক্রি করেন। প্রতিমাসে গড়ে দুই ভাইবোনের রোজগার প্রায় ১০-১১ হাজার টাকা হয়। তা দিয়েই চলে তাদের সংসার। কারো কাছে হাত পাততে হয় না।