সংগ্রামে দ্রোহে প্রেম আর প্রতিবাদে বোধন-প্রমা

প্রকাশ:| বৃহস্পতিবার, ২০ নভেম্বর , ২০১৪ সময় ০৭:৪১ অপরাহ্ণ

pচট্টগ্রাম: চট্টগ্রামে সাংগঠনকিভাবে আবৃত্তি চর্চা শুরু হয় আশির দশকে। বর্তমানে চট্টগ্রাম আবৃত্তিচর্চার পূণ্যভূমি। চট্টগ্রামের আবৃত্তিশিল্পীদের আবৃত্তির মন্ত্রণা ছড়িয়ে যাচ্ছে বিশ্বব্যাপী। চট্টগ্রামের আবৃত্তিশিল্প চর্চার দুই কাণ্ডারী সংগঠন হল বোধন আবৃত্তি পরিষদ ও প্রমা আবৃত্তি সংগঠন। দেশের ক্রান্তিলগ্নে, সংগ্রামে, দ্রোহে, প্রেম ও প্রতিবাদে সবসময় সরব আবৃত্তি অঙ্গনের অন্যতম প্রধান এই দুটি সংগঠন নিয়ে বাংলানিউজের বিশেষ আয়োজন।

বোধন
‘আধাঁর ভেঙে আলোর বুনন’। কন্ঠের শক্তিতে বলীয়ান বোধন দু’যুগরেও বেশি সময় ধরে দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনে অন্যতম একটি স্থান দখল করে আছে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন যখন তুঙ্গে, ১৯৮৭ সালের ৯ জানুয়ারি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে কয়েকজন তরুণের অদম্য প্রচেষ্টায় জন্ম নেয় বোধন। ২৮ বছরের পথচলায় লড়াকু কর্মীদের ত্যাগে, শ্রমে বোধন একটি পুরোধা সংগঠনে পরিণত হয়েছে।

বোধন আবৃত্তি পরিষদের গতিশীল পথচলার মন্ত্রণা জানতে বাংলানিউজের কথা হয় সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার রাসলেরে সঙ্গে। তিনি বলেন, সমাজে শুদ্ধতা তৈরি করতে কবিতা একটি উচ্চর্মাগীয় পথ। দেখা গেছে যখনই দেশে মৌলবাদ, জঙ্গীবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে তখনই সবার আগে আক্রান্ত হয়েছে কবিরা। বোধন বিশ্বাস করে তাদের আবৃত্তি চর্চা সর্বদা মৌলবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হয়ে উঠবে।

তিনি জানান, শুদ্ধ আবৃত্তি চর্চা ও শিক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা রাখতে ১৯৯৩ সালে বোধন বাংলাদেশের প্রথম আবৃত্তি স্কুল গড়ে তোলে। ছয় মাস অন্তর এখানে শুদ্ধ উচ্চারণ ও আবৃত্তি চর্চার ক্লাস হয়। ক্লাসের সিলেবাসে আবৃত্তি অনুসঙ্গ হিসেবে রয়েছে শুদ্ধ উচ্চারণ, কবিতার ভাব ও রস, ছন্দ, উপস্থাপনা, সংবাদ পাঠের মত বিভিন্ন বাচিক শিল্প সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহ। বর্তমানে তাদের ৪১তম আর্বতন চলছে। প্রতি ব্যাচে ‍শিশু ও বড়রা মিলিয়ে ১৫০ জনের মত শিক্ষার্থী প্রশিক্ষণ নেয়। এ পর্যন্ত প্রায় ৫ হাজার শিক্ষার্থী এ স্কুলে প্রশিক্ষণ নিয়েছে।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে বোধন বহু সাড়া জাগানো প্রযোজনা মঞ্চে এনেছে। বোধনের উল্লেখযোগ্য প্রযোজনাগুলোর মধ্যে রয়েছে কাজল রেখা, আমিনা রেখা, রাজসভায় মাধবী, কিষাণকাব্য, এখনো একাত্তর, মৃত্যুলোকে সশরীর, যাদুকেন্দ্রীক, আলেয়া, ইতিহাসের কথা, জয় সত্যের জয়, দেবতার গ্রাস, ডাকঘর, কাবুলীওয়ালা, মুজিব মানে মুক্তি, বিষ বিরিক্ষের বীজ, হিং টিং ছট ইত্যাদি। শিশুবিভাগ প্রযোজনার মধ্যে রয়েছে হিংসুটে, হাসির সুতোয় বোনা, গুরুশিষ্য, পান্তা বুড়ির গল্প, আজকে ছুটির দিন, ছড়ানো ছিটানো ছড়া, ভূতের জাদু, বাংলাদেশের কথা।

১৯৯৬ সালে প্রথম শিশু উৎসবের পর বোধন আয়োজন করে আবৃত্তি উৎসব, বর্ষপূর্তি রবীন্দ্র উৎসব, রজতজয়ন্তী। যেকোন উৎসবের উদ্বোধন বোধন নিজস্ব ঢঙে অর্থাৎ প্রদীপ প্রজ্জ্বলন, শত কন্ঠের আবৃত্তি ও ঢোলবাদনের মাধ্যমে করে থাকে।

বোধন আবৃত্তি পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জানান, শিশুদের আবৃত্তি চর্চা ও শুদ্ধ ও প্রমিত বাংলা উচ্চারণে উৎসাহী করতে আগামী বছর স্কুল ভিত্তিক আবৃত্তি উৎসব আয়োজন করা হবে।

প্রমা
স্বপ্নবুনণের এক অনন্য ক্ষেত্র প্রমা। যেখানে ব্যক্তি শুধু শিল্পী নয়,এক একজন যোদ্ধা। শিল্পের প্রতি, সমাজের প্রতি, দেশের প্রতি একনিষ্ঠ এই সংগঠন দু’যুগ ধরে আবৃত্তিচর্চাকে পরিণত করেছে দায়বদ্ধ এক শিল্পমাধ্যমে। ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে মানবিক সমাজ গঠনের প্রত্যয় নিয়ে ১৯৯০ সালের ২৯ নভেম্বর চট্টগ্রামের মাটিতে গড়ে উঠে প্রমা আবৃত্তি সংগঠন।

বর্তমানে প্রমা’র সদস্য সংখ্যা ৪০০ ছাড়িয়ে গেছে। তবে সংখ্যার বিচারে নয়, প্রমাকে বিচার করতে হবে কাজের মানে, এমনটাই বললেন সংগঠনের সভাপতি রাশেদ হাসান।

প্রমা’র এই কাণ্ডারী বাংলানিউজকে বলেন, আবৃত্তি করে হাততালি পাওয়ার জন্য প্রমা নয়। আমাদের কাছে আবৃত্তি বিনোদনের মাধ্যম নয়, একটি পরিপূর্ণ শিল্প। যা শিল্পের পাশাপাশি সমাজ ও দেশের প্রতি দায়বদ্ধ থাকে।

তিনি আরও বলেন, প্রতিযোগিতায় বিশ্বাসী নয় প্রমা। দেশের সংকটময় মুহুর্তে কণ্ঠে দৃপ্ত কবিতা নিয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যেমন রাজপথে নেমেছি তেমন পরিশীলিত আবৃত্তি চর্চার মাধ্যমে মানুষকে বাংলাভাষার প্রতি সচেতনতা সৃষ্টি করেছি। এখানেই প্রমা অন্যদের চেয়ে আলাদা।

সভাপতি রাশেদ হাসান স্বপ্ন দেখেন প্রমা’র প্রতিটি শিল্পী জ্ঞানচর্চায় নিয়োজিত থেকে নিজেদের সংগঠিত রাখবে দেশের যেকোন সংকটমুহুর্তে।

সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক বিশ্বজিৎ পাল বাংলানিউজকে জানান, আবৃত্তি চর্চার প্রচার ও শুদ্ধ বাংলা উচ্চারণ শেখাতে প্রতিবছর ৪ মাসব্যাপী কর্মশালা আয়োজন করে প্রমা। বর্তমানে কর্মশালার ৩৮তম ব্যাচ চলছে। প্রতি ব্যাচে ৬০-৭০ জনের মত শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে।

প্রতিবছর শহীদ জননী জাহানারা ইমামের মৃত্যুবার্ষিকী স্মরণে শ্রদ্ধানুষ্ঠান, দেশের প্রথাবিরোধী ও বহুমাত্রিক লেখক হুমায়ূন আজাদ স্মরণে ‘সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাব’’ র্শীষক আবৃত্তি অনুষ্ঠান, দেশের প্রধান কবি শামসুর রহমান স্মরণে ‘তুমি নিশ্বাস, তুমিই হৃদস্পন্দন’, প্রতিশ্রুতিশীল আবৃত্তিশিল্পীদের নিয়ে আবৃত্তি অনুষ্ঠান ‘কালের পথে কাব্যরথ’, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস স্মরণে ‘মৃত্যুঞ্জয়ী রাতের শপথ’ র্শীষক আবৃত্তি অনুষ্ঠান, শ্রাবণে কবিতার আড্ডা, ঢোলবাদন , আদিবাসী নৃত্য, সঙ্গীত পরিবেশনায় বসন্ত উৎসব, স্বাধীনতা উৎসব, নবীন শিল্পীদের নিয়ে নিয়মিত একক আবৃত্তি অনুষ্ঠান ‘হৃদয়ে শুনি কবিতার ধ্বনি’ এবং শিশুশিল্পীদের অনুষ্ঠান ‘স্বপ্নে হারাই অচিনপুর’ আয়োজন করে প্রমা। মে দিবসে প্রমাসহ পাঁচটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের মিলিত আয়োজনে মে দিবস পালন করা হয়। এ পর্যন্ত তিনটি আবৃত্তি উৎসবের আয়োজন করেছে প্রমা ।

প্রমা’র দর্শকনন্দিত প্রযোজনাগুলোর মধ্যে রয়েছে সোজন বাদিয়ার ঘাট, সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাব, জননী বাংলা, আবার এসেছে পহেলা মে, চে তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে তোলে, চিরকালের প্রমিথিউস, স্মৃতি ৭১, জয় নিপীড়িত মানুষের জয়, পরানের গহীন ভিতর, কথা মানবীর ভাষ্য, মানুষ জাগবে ফের, রাজপথে জনপদ, জাহানারা ইমামরে ‘একাত্তরের চিঠি অবলম্বনে ‘আমার মা’, আনিসুল হকের উপন্যাস ‘মা’ অবলম্বনে ‘মা’ , ফুলের গন্ধে ঘুম আসেনা, রঙিন ফানুস, ঘুমপাড়ানি গান, ভবি যাহা মনে, রাম রাবণরে ছড়া, অন্তর মম বিকশিত কর, একুশের ইতিকথা ইত্যাদি।