শ্রেষ্ঠতমদের কাতারে মেসিকে রেখেছেন ম্যারাডোনা

প্রকাশ:| মঙ্গলবার, ২৭ মে , ২০১৪ সময় ০৯:২৩ অপরাহ্ণ

1251দিয়েগো ম্যারাডোনা নামটা আর্জেন্টাইনদের কাছে ঈশ্বরতুল্য। যে নামকে আজও আর্জেন্টাইনরা কুর্নিশ করে। খেলোয়াড় হিসেবে বুট তুলে রাখার ২০ বছর পরও তিনি জনতার মহানায়ক। কথাবার্তায় সব সময়ই তিনি ঠোঁটকাটা। নিজের নন্দিত জীবনকে নিজের দোষেই করেছেন নিন্দিত। সেটা স্বীকার করতেও পিছপা হননি কখনও। অকপটেই বলেন, তিনিই সেরা! কিন্তু তার পরও বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় তারকা লিওনেল মেসিকে ম্যারাডোনা নিজেই এগিয়ে রাখেন। ভালোবাসায় আগলে রাখেন। ২৮ বছর ধরে বিশ্বকাপ যায় না আর্জেন্টিনার ঘরে।

মেসির কাছে তাই প্রত্যাশার সীমা নেই আর্জেন্টিনা-সমর্থকদের_ শিরোপা চাই! বিশ্বকাপ জিতলে অমরত্ব পাবেন মেসি। কিন্তু ম্যারাডোনা বলেছেন, সেরাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম হওয়ার জন্য মেসির বিশ্বকাপ জয়ের প্রয়োজন নেই। মেসিকে তাই তিনি স্থান দিয়ে দিয়েছেন শ্রেষ্ঠতমদের কাতারে। বর্তমানে ক্রীড়াদূত হিসেবে দুবাইয়ে অবস্থানরত ম্যারাডোনা আর্জেন্টাইন দৈনিক ‘লা নেসিওন’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কথা বলেছেন বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। সমকাল পাঠকদের জন্য তা ভাষান্তর করেছেন_ সৌমিত জয়দ্বীপ

২০০৫ সালে দেখা মেসি আর আজকের মেসির মধ্যে পার্থক্য কী?

উত্তর :বলের ওপর তার নিয়ন্ত্রণটা একদমই আলাদা ছিল। যে গতিতে সে ইউরোপিয়ানদের মোকাবেলা করতে শুরু করে, সেটা একদমই ভিন্ন ছিল। থামতই না। থামবেও না। সেজন্যই আমি বলি, সে অনেকটাই আমার মতো। আমি তো তাও থামতাম। গোল করার চেয়ে খেলা বানাতাম বেশি। আমি চাইতাম ৯ নম্বর স্কোরার হতে! আমার লক্ষ্যের অনেকটা জুড়েই থাকত মাঠ। তার অধিকাংশ লক্ষ্য গোলপোস্ট। আমার মনে হয়, আগামী কয়েক বছর পরেই আরও পরিণত লিওকে নিয়ে আলোচনা করতে পারব। হয়তো গোল দিয়ে নয়। অবশ্যই ম্যাচ দিয়ে। যদিও, এটাই মানদণ্ড; কিন্তু আপনি তো প্রত্যেক ম্যাচেই তিনটি করে গোল করতে পারবেন না। তার পরও, সে পরিণত খেলোয়াড় হয়ে উঠবে। বয়স গেলে গতি কমে যাবে হয়তো। তবে অভিজ্ঞতা ঝুঁকি নেওয়া থেকে বিরত রাখবে।

এখন আপনি এটা নিয়ে আরও বেশি করে চিন্তা করে দেখুন_ আপনার শটের সামনে তিনটি কাঠি (গোলবার ও পোস্ট)। শতকরা সত্তরভাগ শটই সেখানে নিতে হয়। ভবিষ্যতে যদি এর ত্রিশভাগও করতে পারে, তাহলেও সে আরও পরিণত হয়ে উঠবে। বল নিতে মধ্যমাঠে নেমে যাবে। ফ্রি-কিক নেবে। সামনে এগিয়ে যাবে। আমি যা দেখছি, ফ্রি-কিক নিতে লিও ভয় পায় না। আমি কিন্তু ভয় পেতাম।

– ‘৮৬ বিশ্বকাপ ও নেপোলি অধ্যায় বলে, আপনি ২৫ বছর বয়সেই পরিণত হয়ে গিয়েছিলেন। মেসির বয়স প্রায় ২৭ এবং এখনও তার অনেক কিছু দেওয়ার আছে।

ম্যারাডোনা : এটা করতে যথেষ্ট ব্যক্তিত্ব থাকতে হয়। সবকিছুকে সে আমার চেয়ে অনেক হালকাভাবে নিতে পারে। মানসিকভাবে সে সিদ্ধান্ত অনেক ধীরে নেয়।

– তার মানে কি আপনি বলতে চাইছেন, আপনি কীভাবে খেলেন বা জীবনধারণ করেন তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ?

ম্যারাডোনা :আমি ব্যক্তিত্ব নিয়ে কথা বলছি। দেখুন, আমি এটা বলছি কারণ, তাকে আমি প্রথম দেখেছি কিশোর হিসেবে এবং জেনেছি খেলোয়াড় হিসেবে। আমার মনে হয়, সে মাঠে খুবই দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়, যতটা না বাইরে। বাইরে সে হয়তো গানও গায়। তবে, ওর জীবনযাপন আমার চেয়ে অনেক শান্তময়।

– যখন কারও গুণ নয়, বরং দোষ নিয়ে তুলনা করা হয়, তখন ম্যারাডোনা ও মেসি একদমই বিপরীত। ম্যারাডোনা-যুগ থেকে শুরু করে মেসি-যুগ পর্যন্ত_ ব্রাজিল-ইংল্যান্ডকে নতজানু করা দিয়েগোর সঙ্গে আর্জেন্টিনার জাতীয় সঙ্গীত না-জানা ও গাইতে না-পারা পেশাদার রেকর্ড ভাঙা লিওর তুলনা মানুষ কীভাবে করে?

ম্যারাডোনা : সৌভাগ্যক্রমে, মুক্তমনা হলে উচ্চ ও যুক্তিসঙ্গত পথ দেখা যায়। কোচ হিসেবে ইতালির আরিগো সাচ্চির সৌভাগ্য-দুর্ভাগ্য উভয়ই ছিল। তিনি উভয় দিককেই শিক্ষা হিসেবে বর্ণনা করতেন। একজন ম্যারাডোনা যখন মিলানের মুখোমুখি হতো এবং একজন মেসিকে যখন রিয়াল মাদ্রিদের কোচের মুখোমুখি হতে হয়, উভয় ক্ষেত্রেই তারা তখন লেখে ও বলে যে, ‘প্রতিপক্ষের চোখেমুখেও এ উচ্ছ্বাস খেলা করে যেত যে, ম্যারাডোনা ছিল আজ থেকে ২০ বা ৩০ বছর আগের একমাত্র ফুটবল খেলোয়াড়।’

আমার প্রস্তুতি আমাকে নিজেকেই নিতে হতো। লিও অসাধারণ এক বার্সেলোনাকে পেয়েছে। তবে সেটা তার ভুল নয়। সে দলটাতে যোগ দেওয়ার পরই একটা ভিন্নতা তৈরি করে দিয়েছে। একদম শূন্য থেকেই, আমি যে কোনো কিছু আবিষ্কার করতে পারতাম। সে যে কোনো দলে খেলতে পারত এবং সেটাকেও বিশেষ বানিয়ে ফেলতে পারত। লিও আমাদের সময়ের সন্তান, যে কি-না ফুটবলটা পেশাদারিত্ব ও উচ্ছ্বাসের সঙ্গে খেলে। তার অমিত প্রতিভাটা ঠিক স্বাভাবিক প্রবৃত্তি নয় এবং এটা ফুটবল স্কুলে বছরের পর বছর উৎপাদন করেও পাওয়া যাবে না। সে নিজেই নিজের শিক্ষক। এভাবেই তার অর্কেস্ট্রা অসাধারণ সুর তুলেছে। লিও স্বয়ংসম্পূর্ণ একটা দলের যথার্থ সুবিধাটা নিয়েছে। ম্যারাডোনা ছিল অনেক বেশি স্বাধীনচেতা ও স্বনির্ভর। লিওনেলের, দিয়েগোর মতো কোনো বিতর্ক নেই। তবে, ব্যক্তিত্বটা এখনও সম্ভবত তৈরি হয়নি। লিও নিয়মের প্রতি অনেক বেশি শ্রদ্ধাশীল, অনেক বেশি পেশাদার এবং খুবই কম প্রদর্শনবাদী। তবে, উভয়েই নিজেদের মতো করে একই রকম পথের পথিক_ ফুটবল ভালোবেসেছে, একটা সময়কে ধারণ করেছে এবং ফুটবল ইতিহাসের কিংবদন্তি হওয়ার জন্য অক্ষয় পদচিহ্ন এঁকেছে।

– আপনি নেপোলির জন্য যা করেছেন, লিও তেমনটা করতে পারবেন?

ম্যারাডোনা : ব্যক্তিগতভাবে আমি সেটা বিশ্বাস করি। তবে, আমি নিশ্চিত, যত বেশি ফুটবল খেলবে তত বেশি আনন্দ পাবে। আমার ক্ষেত্রেও সেটা হয়েছিল। আমরা অবশ্য বিদ্রোহের ক্ষেত্রে বেশ বিপরীত। আমি মাঠ ও মাঠের বাইরে দ্রোহী ছিলাম। আমি সর্বদাই সত্য কথা বলেছি এবং যেটা অব্যাহত রাখতে গিয়ে অন্য কেউ নয়, আমি নিজেই নিজের ক্ষতিটা বেশি করেছি। তবে, আমি সর্বদা সেটাই করেছি যেটা মনে করেছি। মাঠে মেসি যুদ্ধংদেহী নয়। তবে, সে ক্ষমতাবান। যেমন ধরুন, অধিনায়কত্বটা তার পাশে বেশ মানানসই এবং আমার এটা মনে আছে, তাকে অধিনায়কের দায়িত্বটা প্রথম সাবেলা বা বিলার্দো নন, আমিই দিয়েছিলাম। আমি দায়িত্বটা দিয়েছিলাম, কারণ, দেখলাম, অনুশীলন না দেওয়ায় সে খুবই রাগান্বিত হয়েছিল। সে এটার অভাব অনুভব করছিল। সবাইকে দেখতে দিন, অসামান্যদের মাঝে কীসের তাগাদা অনুভূত হয়।

– এভাবেই কি তারা তাহলে তাদের নেতৃত্বেরও চর্চা করেন?

ম্যারাডোনা :নিশ্চয়ই। আমি তাকে দেখি খেলাটার নেতৃত্বদাতা হিসেবে। সত্যিই বলছি, ত্রিশটার মধ্যে ১৬টা থেকে ১৪টা ম্যাচ জেতা অবশ্যই শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয়। মাঠে মেসি খুবই খেলোয়াড়সুলভ এবং সে জানে, তাকে সাফল্য পেতে হবে। আমি তাকে এটা করতে দেখেছি। উদাহরণ হিসেবে বললে, সে কখনোই গ্রন্দোনার সঙ্গে তর্ক করবে না। এগিয়ে যাবে। তবে সে সব জানে। মানে আমি বোঝাতে চাইছি যে, আমি নিজেকে তেমন নেতা মনে করি না যার গ্রন্দোনার জন্য কোনো অনুভূতি আছে। আমি যেমনটা করেছি, সেটা তার প্রকৃতিতেই নেই। তবে আমি তাকে মাঠে রাগান্বিত হতে দেখেছি।

– তবে, এই খুনে মানসিকতা আপনি দেখেননি বলেই সম্প্রতি জেরার্ডো মার্টিনোকে বলেছেন। কোনো উদাহরণ দিতে পারবেন?

ম্যারাডোনা : না, আমি দেখিনি। তবে, আমার দক্ষিণ আফ্রিকার স্মৃতি মনে আছে। সেটা এমনই ছিল যে, আমি নিজ কানে শুনেছি এবং আমি কোনোদিন সেটা ভুলব না। জার্মানির বিপক্ষে হেরে বিদায় নেওয়ার পর লিওর কান্না। আমি সেখানে গেলাম এবং তাকে বললাম, আমাকে দুনিয়ার অনেক কিছুরই প্রতিশোধ নিতে হবে। আমি হৃদয় দিয়ে বলেছিলাম। সবাই পেছনের চিন্তা করছিল। খালি জায়গায় সে একা। মাথা নোয়ানো। কাঁদছিল। এটা খুবই কঠিন মুহূর্ত, যেটা আর্জেন্টাইনদের জানতে হবে। কারণ, কেউ যদি মনে করে, সে জার্সিটাকে অনুভব করতে পারে না, জাতীয় সঙ্গীত গাইতে পারে না, তবে তারা অবশ্যই অবিবেচক।

অনেকেই মনে করেন, ওই বিশ্বকাপে তারা তাকে ও আমার দলকে ট্রফি হাতে উঁচিয়ে ধরতে দেখার বিশাল সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। লিও আমার সঙ্গে দুর্দান্ত একটা বিশ্বকাপ কাটিয়েছে। একদমই আলাদা। এবং কেউ কিন্তু বলেনি, কেন কোনো গোল হলো না? সে সব প্রতিপক্ষকে তীর ছুঁড়েছে…

– কিন্তু জার্মানির বিপক্ষে ম্যাচে…

ম্যারাডোনা : আমি আবারও বলছি, আমরা জার্মানির বিপক্ষে কোনো ভুল করিনি।

– করেননি? আপনি নিশ্চিত?

ম্যারাডোনা :না। এ ব্যাপারে আমি আর কিছু বলতে চাইছি না।

– মনে হচ্ছিল, ২০১০-এর দক্ষিণ আফ্রিকা হবে আপনার ‘৮৬-র মেক্সিকোর মতো।

ম্যারাডোনা : আমার মতে, সে দুর্দমনীয় একটা বিশ্বকাপ খেলেছে। যে বয়সে সে এ অভিজ্ঞতা অর্জন করল সেটাকে কৃতজ্ঞতা জানাই। আমার মনে হয়, বিশ্বকাপ জেতা ওর জন্য সময়ের ব্যাপার যদি না ইনজুরি ওকে গ্রাস করে ফেলে। যদি না হয়, তবে আবারও একটু থামবে। কারণ, সে সর্বক্ষণই খেলতে চায়, সর্বক্ষণই। সে জন্যই আমি বলি, ক্রিশ্চিয়ানো ও লিও বাকিদের পেছনে ফেলে গোল্ডেন বল পেলে আমি আনন্দিত হই। সর্বোৎকৃষ্ট কর্তৃত্বকারীরাই তো জিতবে।

– মারাকানায় কাপ দেখছেন…

ম্যারাডোনা : হয়তোবা। এটা হতে পারে। আমরা হয়তো একটা সহজ গ্রুপে পড়েছি, তবে বিশ্বকাপ বড় জায়গা। স্তরটাও উঁচু। স্পেন আছে। জার্মানি আছে। ব্রাজিলের অসাধারণ রক্ষণভাগ আছে। আপনি যদি ব্রাজিলের রক্ষণের কথা চিন্তা করেন, তাহলে ছয়-সাতটা নাম মুখে চলে আসবে। তাদের ও নেইমারের বিপক্ষে দাঁড়ানোর কথা চিন্তা করুন। হৃদয়ের ভেতরে যা কিছু কাঁদছে সেসব মোচন করতে লিওকে চরিত্রের পরীক্ষা দিতে হবে। ২০১৪ হতে পারে তার উচ্চাসনে যাওয়ার সবচেয়ে বড় মঞ্চ।

– আপনি কি সেরা কারও বিশ্বকাপ জেতার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন?

ম্যারাডোনা :কী? না! বিশ্বের শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় হওয়ার জন্য লিওর বিশ্বকাপ জয়ের প্রয়োজন নেই। তার আর কিছুই করার নেই। আর্জেন্টিনার জন্য বিশ্বকাপ জেতাটা অসাধারণ ব্যাপার হবে। সমর্থকদের জন্যও হবে। লিওর জন্যও হবে। তবে একটা বিশ্বকাপ জিতলে বা না জিতলে সে আজ যেসব কৃতিত্ব দেখিয়ে এ স্থানে এসেছে সেগুলো খাটো হয়ে যাবে না।

– তার স্থানটা তাহলে কোথায়?

ম্যারাডোনা :সেরাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম যারা তাদের পাশে।

– তারা কারা?

ম্যারাডোনা : যাদের কথা সবাই বলে তারাই। ডি স্টেফানো, পেলে, ত্রুক্রইফ, আমি… আমি। এবং আমার পরে মেসির নামটা বসিয়ে দিন। হা-আ, তিনজন আর্জেন্টাইন!

মেসি বন্দনার এখানেই শেষ নয়। সম্প্রতি এক টিভিতে ম্যারাডোনা বলেছেন, ‘মেসি, আমি শুধু বলতে চাই, আমি তোমাকে ভালোবাসি, তুমি রেকর্ড ভেঙে ফেলছ, তুমি সবাইকে কথা বলাচ্ছ। তুমি জানিয়ে দিয়েছ, তুমি পুরো ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ হতে চলেছ। যখন তুমি এই দৌড়টা শেষ করবে, তখন আমরা আমাদের অনুভব করব। আজ, তুমি যা করছ, আমি সেটাই করে যেতাম। তুমি তোমার পরিবার নিয়ে সুখে থাকো। তোমাকে ভালোবাসি, সত্যিই…’
taj ///