শেষ মুহুর্তে ঈদের কেনাকাটায় উপচে পড়া ভিড়

নিউজচিটাগাং২৪/ এক্স প্রকাশ:| শুক্রবার, ১৫ জুন , ২০১৮ সময় ০১:৪৬ অপরাহ্ণ

তসলিম খাঁ :  দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজধানী শহর বন্দর নগরী চট্টগ্রামে রাতেও জমে উঠেছে ঈদের কেনা কাটা। ক্রেতা বিক্রেতাদের ব্যস্থতা দেখা গেল গত রাতে ঐতিহ্যবাহী টেরিবাজার ও জহুর হকার মার্কেট।উপচে গড়া ভিড় তাই দোকানিদের এক মূহুর্ত ও দম ফেলার ফুসরত নেই। তেমনি ক্রেতারা ও সকাল থেকে গভীর রাত পর্যস্ত ব্যস্ত সময় পার করছেন ঈদের কেনা কাটায়। নগরীর এমন কোন বিপনী বিতান নেই যেখানে নারী, পুরুষ, তরুন, শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সের মানুষের পদচারনা নেই। তারা মনের আনন্দে নিজেদের পছন্দ মত ঈদের কেনা কাটা সেরে নিচ্ছেন। ঈদ বাজার উপলক্ষে নগরীর অভিজাত বিপনী গুলো রং বে রং এর বর্ণিল আলোক সজ্জায় সাজানো হয়েছে এবার অতি বর্ষার কারণে এসময়ে হাতে কম সময় থাকায় ক্রেতারা ঠিক সময়ে ঈদ বাজার করতে পারে নাই। তাই সকাল বিকাল ও গভীর রাত পর্যন্ত ঈদের কেনা করতে দেখা গেছে। বেশীরভাগ ক্রেতারা সন্ধ্যার পর মার্কেটে আসে এবং গভীর রাত পর্যন্ত কেনা কাটা সেরে চলে যান। অনেকের অভিমত যে ভাবে চট্টগ্রামের বিপনী গুলোতে ঈদের কেনাকাটায় লোক সমাগম হচ্ছে। তাতে আগামী কাল তা বেড়ে নগরীর মার্কেট গুলোতে তিল ধারনের ঠাই থাকবেনা।
ঈদের কেনা কাটা করতে শুধু নগরবাসীই নয়। চট্টগ্রামের পার্শ্ববর্তী উপজেলা, ফেনী, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ী, বান্দরবন, কক্সবাজার জেলা থেকে ও প্রচুর লোকজনের সমাগম ঘটে চট্টগ্রামের বিপনী বিতান গুলোতে। তাদের মতে এখানে পছন্দসই মান সম্মত ও অপেক্ষাকৃত কম দামে ঈদের কেনা কাটা করা যায়। এখানে ধনী, গরীব ও মধ্যবিত্ত তিন শ্রেণীর ক্রেতাদের জন্য বিকিকিনির সুযোগ রয়েছে। ধনীদের জন্য রয়েছে অভিজাত বিপনী, আর মধ্যবিত্তদের জন্য রয়েছে দেশের সেরা পাইকারী কাপড়ের বাজার টেরী বাজার, রিয়াজ উদ্দীন বাজার, লাকী প্লাজা, ব্যাংকক সিংগাপুর মার্কেট ও ইপিজেড মার্কেট। আর গরীবদের জন্য রয়েছে নগরীর জহুর হকার মার্কেট। এদিকে গতকাল সরজমিনে নগরীর আক্তারুজ্জমান সেন্টার, আমিন সেন্টার, সেন্ট্রাল প্লাজা, সানমার ওশানসিটি, মিমি সুপার, আফমী প্লাজা, ভিআইপি টাওয়ার, এ্যাপলো শপিং, মতি টাওয়ার, চকভিউ, কেয়ারী ও নিউমার্কেটে ঘুরে দেখা গেছে সব মার্কেটেই ক্রেতাদের উঁপচে পড়া ভীড়। কোথাও তিল ধারনের ঠাই নেই। তবে ব্যতিক্রম দেখা গেছে ষোলশহর চট্টগ্রাম শপিং সেন্টারে। এখানে তেমন বেচা বিক্রি হয়নি।
ঈদকে সামনে রেখে দেশ-বিদেশের সেরা কালেকশন। আলো ঝলমলে একেকটি শোরুম। বিপণিকেন্দ্রের অলিগলিতেও আলোর বন্যা, নতুন কাপড়ের জমজমাট বিকিকিনি। নারী-পরুষের বিশেষ করে তরাুণ-তরুণীদের উপচেপড়া ভিড়। বিক্রয়কর্মীদের কথা বলার ফুরসত নেই। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম পাইকারি বিপণিকেন্দ্র টেরিবাজারের চিত্র এটি। একসময় থান কাপড়ের জন্য বিশেষভাবে খ্যাতি পেলেও কালের পরিক্রমায় এখন অনেক শোরুম হয়েছে। যেখানে শীততাপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে একই ছাদের নিচে থান কাপড়ের পাশাপাশি শাড়ি, লুঙ্গি, লেহেঙ্গা, থ্রিপিস, পাঞ্জাবি, শার্ট, জুতা, গহনা সবই মিলছে।
মেগামার্ট এর একজন বিক্রয়কর্মী জানান, এ ঈদে শিশুদের পোশাকে সুতোর কাপড়ের চাহিদা বেশি। ২২০ টাকা থেকে আড়াই হাজার টাকার পোশাক রয়েছে শিশুদের। প্যান্টের থান কাপড় সর্বনিম্ন ২০০ টাকা থেকে ১ হাজার ২৫০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। তৈরি ত্রিপিস ও গাউন ২ হাজার ২০০ থেকে ৮ হাজার ৫০০ টাকায়, পাঞ্জাবি ৩০০ টাকা থেকে ২ হাজার ৬৫০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।
আজমীর স্টোরে কথা হয় রাউজান থেকে আসা এক প্রবাসী সঙ্গে। তিনি বলেন পরিবারের সবার জন্য সুলভে কেনাকাটা করা যায় বলেই এখানে আসা। বাজেট অনুযায়ী শাড়ি, লুঙ্গি, থ্রিপিস সব পাচ্ছি টেরিবাজারে।
ব্লাউজের কাপড় বেক্সি কাপড়ের গজ খুচরায় বিক্রি হচ্ছে ১৩০ টাকা। কমদামি আছে গজ ৭০ টাকা। ২০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৮০০ টাকা দামের লুঙ্গি বিক্রি হচ্ছে লুঙ্গির দোকানে।
টেরিবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক বলেন, শতাধিক বিপণিকেন্দ্র (মার্কেট) নিয়ে টেরিবাজার। ছোট-বড় মিলে দোকান হবে প্রায় ২ হাজার। টেরিবাজারে একসময় শুধু থান কাপড় ও রেডিমেড পোশাক পাইকারি বিক্রি হতো। কিন্তু যখন এখান থেকে কাপড় নিয়ে শপিং সেন্টারগুলোতে মাত্রাতিরিক্ত বেশি দামে বিক্রি হতে শুরু করে তখন টেরিবাজারের ব্যবসায়ীরাই সুলভে খুচরা বিক্রি শুরু করেন।
ঠিক এ চিত্র দেখা গেছে নগরের অভিজাত বিপণিকেন্দ্র স্যানমার ওশান সিটিতে এ বিপণিকেন্দ্রের তৃৃতীয় তলায় মেয়েদের পোশাকের দোকানগুলোতে সবচেয়ে বেশি ভিড়। লেহেঙ্গা, গাউন, বারারা, ডয়মন্ড সিল্ক, ফ্লোর টাচ, বয়েল প্রিন্ট, বারবীসহ নানা রকমের নিত্য নতুন পোশাক কিনতে তরুণীরা ভিড় করেছেন সেখানে। এখানে ওপেলিয়া, দুল আর অ্যারাবিয়ানের মতো দোকানগুলোতে শুধুই নারী ক্রেতাদের আনাগোনা। এখানে বিভিন্ন অলংকারের দাম ৫০০ থেকে ১০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
চোখে পড়ার মতো ঈদের ভিড় আফমি প্লাজায়। ঈদ যেহেতু গরমের সময় তাই পোশাক হিসেবে এবার আরামদায়ক কাপড় আর ঢিলেঢালা কাটই বেশি পছন্দের। এমনটাই বলছেন আফমি প্লাাজার দোকানিরা।
সরেজমিন দেখা গেছে, মেয়েদের পোশাকের ক্ষেত্রে লাল, নীল, সবুজ, ও বেগুনি রঙের সঙ্গে বিভিন্ন শেড ব্যবহার করা পোশাক বেশি। রয়েছে কাপড়ের মধ্যে অ্যান্ডি কটন ও সুতি এবং তাঁত। শাড়ির ক্ষেত্রে নকশিকাঁথার সেলাই, চুমকি, এমব্রয়ডারি ও কারচুপি করা বিভিন্ন নকশা দেখা গেছে। দেশী দশে রয়েছে শিফন, জর্জেট, সিল্ক, মসলিন, টাঙ্গাইল, কাতান, তাঁত, সুতি, জামদানি, কোটা, ডিজাইনার শাড়ি, হ্যান্ড পেইন্টেড শাড়ি ও বাটিক থ্রিপিস। এখানে, ছেলেদের শার্ট ৪৫০-৬৫০ টাকা, মেয়েদের জর্জেট কাপড় ১২০০-২০০০, বাটিক থ্রি পিস ৪৫০-৬৫০, সিল্ক শাড়ি ২২৫০-৪৫০০ টাকা, জামদানি শাড়ি (সুতি) ২২৫০-৩০০০, মসলিন শাড়ি ১০৫০০-১৫৫০০, কাতান-টাঙ্গাইল ১৬০০-৪০০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
মুরাদপুর থেকে কেনাকাটা করতে আসা গৃহিনী খালেদা খানম বলেন, এখন বর্ষা সময় হলেও ঢিলেঢালা কাপড় কিনে নিয়ে যাচ্ছি। আমার ছোট্ট ছেলের জন্য পাঞ্জাবি নিলাম আর দুই মেয়ের জন্য ঢিলেঢালা কাট কাপড় নিলাম।
নগরের প্রবর্তক মোড়ের মিমি সুপার মার্কেটে গিয়ে দেখা গেছে নিচতলায় শাড়ির দোকানে ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে লাখ টাকা পর্যন্ত দাম হাঁকচ্ছেন বিক্রেতারা। কাতান শাড়ি, কাঞ্চিবরণ, ইতালিয়ান ক্রেপ, জামদানি, লেহেঙ্গা শাড়ি সহ দেশি-বিদেশি শাড়ি বিক্রি করছেন।
মিমি সুপার মার্কেটে একটি শাড়ীর দোকানে সাউথ ইন্ডিয়ান ক্লথ ৩ থেকে ১৫ হাজার টাকা, কানজিবরণ দেড় হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা, কটন শাড়ি ৬০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা, ক্রেপ শাড়ি ২ থেকে ১২ হাজার টাকা, শিপন শাড়ি ৬ থেকে ১৫ হাজার টাকা ও জর্জেট শাড়ি ২ থেকে ১০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
নগরের ব্যস্ততম বিপণিকেন্দ্র সেন্ট্রল প্লাজোয় গিয়ে দেখা গেছে জমজমাট বিকিকিনিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন এখানো বিক্রেতারা। ঈদে পছন্দের পোশাক কিনতে নিচতলার বিভিন্ন থান কাপড় এবং থ্রিপিসের দোকানে ভিড় করেছেন তারুণীরা। কেউ কেউ থান কাপড় কিনে পছন্দসই ডিজাইনে পোশাক বানাতে ভিড় জমাচ্ছেন তৃতীয় তলার টেইলার্সে। দোতলার শিশুদের পোশাক এবং জুয়েলারির দোকান গুলোতে ভিড় কম থাকলেও জুতা-স্যান্ডেলের দোকানে উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে।
দেখা গেছে থান কাপড় এবং থ্রিপিসের দোকানগুলোতে বুটিকস কাপড় ৪ হাজার থেকে শুরু করে ৯ হাজার টাকায়, সেরাত গাউন কাপড় ৬ হাজার থেকে শুরু করে ১০ হাজার টাকায়, বোম্বাই ফ্যাশেনেবল কটন ৪ হাজার থেকে শুরু করে সাড়ে ৪ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ব্র্যান্ডের কাপড় ৯ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকায়, গোল আহমেদ কাপড় সাড়ে ৬ হাজার থেকে ৯ হাজার টাকায়, মারিয়াবি কাপড় সাড়ে ৬ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকায় এবং ওয়েজডেন কাপড় ৪ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেশি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বুটিকসের থ্রিপিস দেড় হাজার থেকে শুরু করে আড়াই হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে গঙ্গা ও বর্ষা কাপড়ে তরুণীদের আগ্রহ বেশি দেখা গেছে। ঈদে গরম এবং বৃষ্টির মৌসুম থাকার কারণেই সুতোয় বোনা এ কাপড় দুইটিতে ক্রেতাদের বেশি আগ্রহ বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পোশাকের দাম রাখা হচ্ছে ১ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত। হরেক রকম ডিজাইনের স্যান্ডেল মিলছে দেড়শ’ থেকে দেড় হাজার টাকায়।
একাধিক কোম্পানির প্রসাধন সামগ্রী মিলছে ১০০ থেকে ২ হাজার টাকার মধ্যে। এ ছাড়াও নিত্য নতুন ডিজাইনের হাতব্যাগ, জুয়েলারি সামগ্রী, পার্সসহ মেয়েদের বিভিন্ন ব্যবহার্য জিনিসও মিলছে সেন্ট্রাল প্লাজায়। তবে গত বছরের চেয়ে এবছর বিকিকিনি কম বলে জানিয়েছেন সেন্ট্রাল প্লাজার বিক্রেতারা।
ঈদের কেনা কাটার পাশাপাশি প্যান্ট, শার্ট ও পায়জামা পাঞ্জাবী সেলাইয়ের ধুম পড়েছে নগরীর টেইলার্স গুলোতে। সব বয়সী পুরুষের প্রথম লক্ষ্য থাকে চোখ ধাঁধানো নকশার পাঞ্জাবি। দেখা গেছে নগরীর খাজা টেইলার্স, আল আমিন, ইব্রহীম, এলিগেন্স, কাজিক টেইলার্স অরবিন্দ, রেমন্ড, জেমস এবং গিজা হাউসের এ বাহারি পাঞ্জাবি কালেকশনে আছে লিলেন, আদ্দি, প্রিমিয়ামসহ সূতি কাপড়ে তৈরি বিভিন্ন ধরনের পাঞ্জাবি।
এর মধ্যে ক্রেতাদের বেশি আকর্ষণ করছে জামদানি নামের এক্সক্লুসিভ পাঞ্জাবি। খাজা টেইলার্সে সূতি কাপড়ের তৈরি বিভিন্ন পাঞ্জাবি আড়াই হাজার থেকে ১০ হাজার টাকায়, লিলেন কাপড়ের পাঞ্জাবি সাড়ে ৫ হাজার থেকে ৭ হাজার ৩০০ টাকায়, আদ্দি কাপড়ের পাঞ্জাবি ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকায় এবং প্রিমিয়াম কাপড়ের পাঞ্জাবি আড়াই হাজার থেকে ১০ হাজার টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। পাঞ্জাবি ছাড়াও অরবিন্দ কাপড়ের শার্ট দেড় থেকে আড়াই হাজার টাকায়, রেমন্ড কাপড়ের শার্ট ২ থেকে ৩ হাজার টাকায়, জেমস কাপড়ের শার্ট ২ থেকে ৪ হাজার টাকায় এবং গিজা হাউস কাপড়ের শার্ট ২ থেকে আড়াই হাজারে মিলছে এখানে।
ঈদের কেনাকাটা করতে আসা ক্রেতাদের বাড়তি নিরাপত্তা দিতে মাকেটে অতিরিক্ত পুরিশ মোতায়েন করা হয়েছে। চুরি, চিনতাই, চাদাঁবজি রোধে একাদিক টিম মাঠে কাজ করছে।