শীর্ষ সন্ত্রাসীরা দাপিয়ে বেড়ালেও পুলিশের চোখে পলাতক

প্রকাশ:| রবিবার, ১৯ জুলাই , ২০১৫ সময় ০৪:১০ অপরাহ্ণ

নিউজচিটাগাং স্পেশাল::
তালিকাভূক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীর সংখ্যা চট্টগ্রাম জেলায় ৭৭৫ এবং মহানগরীতে ৩৫০ জন। তারা নাশকতা, খুন, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, ডাকাতি ও অপহরণসহ নানা অপকর্মে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। অথচ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখে তারা পলাতক।
গেল বছরে চট্টগ্রাম জেলার ১৪ উপজেলায় ১০০ জনেরও বেশি খুন হয়েছে। থানায় মামলা হয়েছে ৩ হাজারের বেশি। পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছে প্রায় ৩০ জন পুলিশ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রাম মহানগর ও বিভিন্ন উপজেলায় সন্ত্রাসীরা রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় প্রকাশ্যে অপকর্ম করে বেড়াচ্ছে। কারাগারে এবং বিদেশে পালিয়ে থাকা সন্ত্রাসীদের কেউ কেউ তাদের কর্মী বাহিনীকে দিয়ে এলাকায় চাঁদা আদায় ও নাশকতার ঘটনা ঘটাচ্ছে। মাসে প্রতি থানায় গড়ে ১৫ থেকে ২০ জন নিরীহ মানুষ সন্ত্রাসীদের স্বার্থের বলি হচ্ছে। এরই মধ্যে রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রত্যাহার করা হচ্ছে জেলা ও মহানগরীর শীর্ষ সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া অনেক মামলা।
জেলা ও মহানগরীর সন্ত্রাসীর মধ্যে বর্তমানে বিএনপি-জামায়াতদলীয়রা গা-ঢাকা দিয়ে চলছে। প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে সরকারদলীয় সন্ত্রাসীরা। ফটিকছড়ি উপজেলায় ১৪ মামলার আসামি তৈয়ব বাহিনীর প্রধান আবু তৈয়ব, ১১ মামলার আসামি মহিউদ্দিন, বোয়ালখালীর পারভেজ, মিরসরাইয়ের সন্ত্রাসী পিচ্ছি কামালসহ ১৪ উপজেলার তালিকাভুক্ত কয়েকশ সন্ত্রাসী এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও পুলিশের চোখে তারা পলাতক। তালিকাভুক্ত আওয়ামী লীগের সমর্থক শীর্ষ সন্ত্রাসী সুনীল কান্তি দে ভারত থেকে প্রায়ই চট্টগ্রামে আসা-যাওয়া করেন। তার দীর্ঘকালের সহযোগী মশিউর রহমান দিদার এখনো নগরীর খুলশিসহ আশপাশ এলাকায় ব্যাপক সক্রিয়। পুরনো তালিকার আরেক সদস্য আওয়ামী লীগ সমর্থক সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর মামুনুর রশিদ মামুন এখন সকল কর্মকান্ড থেকে নিজেকে গুটিয়ে চট্টগ্রামেই অবস্থান করেন। গত এক যুগে তার বিরুদ্ধে কোন মামলা হয়নি। সাবেক ছাত্রলীগ নেতা রাজিব দত্ত রিংকুও নগরীতে সক্রিয়। বিএনপি সমর্থিত সন্ত্রাসী বাকলিয়ার মোর্শেদ খান ও মোমিন রোডের এতিম আলম দীর্ঘদিন পুলিশের খাতায় পলাতক থাকলেও চট্টগ্রাম শহর ও দক্ষিণ চট্টগ্রামে তাদের বিচরণ রয়েছে। জামায়াত-শিবিরের দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ খান একাধিক হত্যা মামলায় জামিন নিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর গ্রেফতার হন। তার সহযোগী মহিনসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী নগরীর ওয়াজেদিয়া, বাকলিয়ার চাইল্যাতলীসহ বিভিন্ন এলাকায় নীরব চাঁদাবাজি করছেন। ভারত, দুবাই, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরসহ বিদেশ কানেকশনের বেশ কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী রয়েছেন চট্টগ্রামের। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে যুবলীগের হেলাল আকবর বাবর, বায়েজিদ এলাকার কুদ্দুস, শফি, মেহেদি, ছেড়া আকবর, ঢাকাইয়া আকবর, গোসাইলডাঙ্গার পিল্টু, আগ্রাবাদ মোগলটুলির মাছ কাদের, সাখাওয়াত হোসেন বাবুল, সিআরবির শামীম, লিমন, অজিত, যুবলীগের সোহেল, ইস্রাফিল ও বিএনপি সমর্থক লিটন।
চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী রাউজানের মেজর ইকবাল এখন দুবাইতে। রাউজানের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যে ফজল হক সৌদি আরবে, আজিজুল হক ওমানে, মোক্কামেল হায়াত খান মুকি কানাডায়, আনোয়ার দুবাই ও নাসির কাতারে আত্মগোপনে রয়েছে। অনেকে আত্মগোপনে রয়েছে চট্টগ্রাম ও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যে রমজান আলী, ফরিদ, আবু তাহের, তৈয়ব, কামরুল হাসান টিটু, জাহেদ, আফজল, বাবুল, লেদা বাইল্যা, বজল, জমির উদ্দিন জম্মু, রোমান, কল্যাণ বড়–য়া, আবছারসহ অনেকেই প্রায় সময় আত্মগোপন থেকে বরিয়ে এসে সন্ত্রাস ও ডাকাতি করছে। চট্টগ্রাম জেলার আত্মগোপনে থাকা সন্ত্রাসী ও ডাকাতদের অনেকেই চট্টগ্রাম শহরের কাপ্তাই রাস্তার মাথা, বায়োজিদ, অক্সিজেন, বাকলিয়া, চকবাজার এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস করছে বলে জানা গেছে। তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। বিভিন্ন নেতার বাসায় তাদের আনাগোনা রয়েছে। টেলিফোনে যোগাযোগ রেখে মিশন বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিদেশে আত্মগোপন করা সন্ত্রাসীরা নেতাদের আনুগত্য প্রকাশ করছেন।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) উপ-কমিশনার পরিতোষ ঘোষ বলেন, ‘চট্টগ্রামে সন্ত্রাসীর হালনাগাদ তালিকা নেই। যা রয়েছে তা ২০০৯ সালের। সিএমপির সর্বশেষ তালিকায় শীর্ষ ২৮ সন্ত্রাসীসহ প্রায় সাড়ে তিনশ সন্ত্রাসীর নাম রয়েছে। গত কয়েক বছরে অপরাধে জড়িতদের তালিকা তৈরি হয়নি। চিহ্নিত অপরাধী এবং সন্ত্রাসীদের হালনাগাদ তালিকা ও ডাটাবেইস তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে সিএমপি। নতুন ডাটাবেইসে শীর্ষ তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ছাড়াও নাশকতা, চুরি, ছিনতাইকারী, চাঁদাবাজ, মাদক ব্যবসায়ী ও পাচারকারীসহ বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের অন্তর্ভূক্ত করা হবে। নতুন এই ডাটাবেইস তৈরি হলে অপরাধীদের শনাক্ত করে তাদের আইনের আওতায় আনা সহজ হবে।’
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার হাফিজ আকতার বলেন, ‘সন্ত্রাসীদের অবস্থান জানার সাথে সাথে গ্রেফতারের অভিযান চালানো হচ্ছে। তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের অনেকে কারাগারে আটক রয়েছে। আর কেউ দেশের বাইরে পালিয়ে রয়েছে। যারা এলাকায় লুকিয়ে রয়েছে তাদের গ্রেফতারে পুলিশ সতর্ক রয়েছে।’