শাঁখারি শিল্প

প্রকাশ:| বুধবার, ১১ ডিসেম্বর , ২০১৩ সময় ১১:০৯ অপরাহ্ণ

শাঁখারি 1সবুজ সরকার>>নাটোর জেলা সদর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে জামনগর শাঁখারিপাড়া। জেলার বাগাতিপাড়া উপজেলার জামনগর ইউনিয়নের এই নিভৃত গ্রামটিতে গড়ে উঠেছে শাঁখা শিল্প। এখানকার অর্ধশতাধিক পরিবার শাঁখা শিল্পের সঙ্গে জড়িত। শাঁখা তৈরির সঙ্গে জড়িত শিল্পীরা জানান, প্রায় চৌদ্দপুরুষ ধরে জামনগরের শাঁখারিপাড়া গ্রামের নাগ, সেন, ধরসহ বেশ কয়েকটি গোত্র শাঁখা তৈরির কাজ করছে। ফাল্গুন ও চৈত্র মাসে শাঁখা তৈরির ধুম পড়ে যায়। এ সময় প্রচুর পরিমাণে শাঁখা তৈরির কাঁচামাল শঙ্খ (সামুদ্রিক শামুক) খুলনা, বাগেরহাটসহ সমুদ্র এলাকা থেকে সংগ্রহ করা হয়। শাঁখা তৈরির কারিগররা শঙ্খ (শামুক) সংগ্রহ করে বাড়িতে এনে মেশিনের সাহায্যে কেটে, তাতে আঠা দিয়ে আটকিয়ে তৈরি করা হয় শাঁখা। প্রতি জোড়া শাঁখার কাঁচামাল ১২ থেকে ২০ টাকা পিস ক্রয় করে আনতে হয়। বাড়িতে শঙ্খগুলো পরিষ্কার করে মেশিনের সাহায্যে

বিভিন্নভাবে নকশা আঁকিয়ে তা বাজারে বিক্রি করা হয়। শঙ্খ টুকরাগুলো আঠা দিয়ে জোড়া লাগানোর পর তার ওপর বিভিন্ন নকশা আঁকা হয়।

এক জোড়া শাঁখা তৈরি করতে ৫০ থেকে ৮০ টাকা খরচ হয়। প্রতি জোড়া শাঁখা বাজারে ১৫০ টাকা থেকে ৮০০ টাকা বিক্রয় করা হয়। প্রকার ভেদে ১ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত একটি শাঁখা বিক্রয় করা হয়। তাছাড়া শাঁখা তৈরি করার সময় যে পাউডার বের হয় তা বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হয়। প্রতি কেজি পাউডার ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হয়। এ পাউডারগুলো বিভিন্ন কোম্পানির লোকজন শাঁখারিদের কাছ থেকে কিনে প্রক্রিয়াজাত করে উন্নতমানের ক্রিম তৈরি করে। তাছাড়া অনেক মানুষ শাঁখার পাউডার কিনে নিজেরাই মুখে ব্যবহার করছে। এ পাউডার মুখের ব্রন, মেসতা, কালো দাগসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হয়। বর্তমানে দেশে ঊর্ধ্বগতির বাজারে শাঁখা তৈরির কাঁচামাল শঙ্খর (শামুকের) দাম বেড়ে যাওয়াতে লাভ কম হচ্ছে বলে তারা জানান। একজন শাঁখা তৈরির কারিগর প্রতিদিন ৫ থেকে ৭ জোড়া শাঁখা তৈরি করতে পারে। এতে তার সব খরচ বাদে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা লাভ হয়ে থাকে। শাঁখা শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের অধিকাংশই ভূমিহীন। বসতভিটা ছাড়া তাদের অনেকেরই কিছুই নেই। তারা গ্রামীণ ব্যাংক, ব্র্যাক, আশাসহ বিভিন্ন এনজিও’র কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। জামনগর শাঁখারিপাড়ার যাদব সেনের স্ত্রী বিটুরানী সেন জানান, আমি প্রতিদিন ৪-৫ জোড়া শাঁখা তৈরি করতে পারি। এতে আমার ২০০ টাকা আয় হয়। আমার স্বামী এ কাজ করে, আমি তাকে সাহায্য করি। উভয় মিলে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা গড়ে আমাদের আয় হয়। শেখরচন্দ্র সেন জানান, শাঁখা তৈরি করে আমাদের সংসারে সচ্ছলতা ফিরে এসেছে। পরিবারের ছোট-বড় সবাই মিলে আমরা শাঁখা তৈরি করে থাকি। বর্তমানে শাঁখার কাঁচামাল শঙ্খ (শামুক), জিংক অক্সাইড ও এমাফোক্স আটার দাম বৃদ্ধি পাওয়াতে লাভ কম হচ্ছে। আগের চেয়ে এখন পুঁজিও বেশি লাগে। আমি এক লাখ টাকা মূলধন দিয়ে প্রথমে এ ব্যবসা শুরু করে ছিলাম। তখন শঙ্খর দাম কম ছিল। কিন্তু এখন এর দাম অনেক বেশি। প্রায় ১২ মাসই আমরা শাঁখা তৈরি করে থাকি। তবে ফাল্গুন ও চৈত্র মাসে শাঁখার ভরা মৌসুম বলা হয়। কারণ এ সময় প্রচুর পরিমাণে শঙ্খ পাওয়া যায়। আমাদের স্বল্প সুদে ঋণ দিলে এ শিল্পকে আমরা আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারতাম। শ্রীদেব সেন বলেন, আমাদের আদি পুরুষরা শাঁখা বানাতো, আমরাও সেই পেশাকে ধরে রেখেছি মাত্র। আমার দিন ভালো যায় না। আমার মূলধন নেই। ঋণ নিয়ে এ কাজ করে বেশি লাভবান হওয়া যায় না। তুলশী রানী জানান, পুঁজির অভাবে আমরা বেশি মাল কিনতে পারি না। আমাদের এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে আমাদের সহজ মুনাফার মাধ্যমে ঋণ দিতে হবে। হিন্দু সম্প্রদায়ের মেয়েদের বিয়ে হলে শাঁখা পরার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। শাঁখারিরা জানান, সরকারিভাবে স্বল্প সুদে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করলে এ শিল্পকে আরও বিস্তার ঘটানো সম্ভব হবে।

যেভাবে শাঁখা তৈরি হয় : শাঁখা তৈরির মূল উপকরণ শঙ্খ। শঙ্খ কেটে একাধিক রূপান্তর করে নান্দনিক সাজে তৈরি হয় পূর্ণাঙ্গ শাঁখা। কিন্তু সেই শঙ্খ আহরণ বাংলাদেশ কিংবা ভারতেও সম্ভব নয়। আমদানি করতে হয় সুদূর শ্রীলঙ্কার সিংহল থেকে। দেশের টাঙ্গাইল, খুলনা ও ঢাকার কিছু আমদানিকারক শঙ্খ আমদানি করার পর ওই শঙ্খ মেশিনে কেটে খুচরা বিক্রেতার মাধ্যমে পৌঁছে দেয় দেশের বিভিন্ন স্থানে। প্রতি বস্তা শঙ্খের দাম ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত। এছাড়া টুকরো টুকরো শঙ্খের সমষ্টিতে শাঁখা শিল্পী যখন পূর্ণাঙ্গ এক জোড়া শাঁখা তৈরি করে, তা গুণগত মানের ওপর প্রতি জোড়া ৬০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। ফেরি করে, পাইকারি দরে এবং খুচরা বিক্রির মাধ্যমে শাঁখা ব্যবসায়ীরা বছরের পর বছর ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন।

রূপচর্চায় শাঁখা : শাঁখা তৈরির সময় শাঁখা শিল্পীরা শঙ্খের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করেন। শঙ্খের প্রতিটি টুকরোই এদের শঙ্খ তৈরির ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। যেমনটি মেশিনে শাঁখা তৈরির সময় যে পাউডারের সৃষ্টি হয় তা শঙ্খচূর্ণ হিসেবে বিভিন্ন প্রসাধনী কোম্পানি হরেক নামে রূপচর্চার জন্য ফের প্রক্রিয়াজাত করে বাজারজাত করে থাকে।

শাঁখার যত নাম তত দাম : শাঁখার মূল ক্রেতা সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। হিন্দুদের বিয়েতে এবং এয়োত্রী নারীদের মাঙ্গলিক অলঙ্কার হিসেবে আবশ্যক হওয়ায় এর চাহিদা রয়েছে ব্যাপক। শাঁখারও রয়েছে বিভিন্ন নাম। যেমন গুরুদক্ষিণা, জাজি, কড়ি, পাটি, কাচ্চা, পিনা, চুত্তা ও চিকন বাওটি। এছাড়া সোনায় বাঁধানো শাঁখারও চাহিদা রয়েছে। নামের সঙ্গে শাঁখার দামেরও হেরফের রয়েছে। আধুনিকতা আর নান্দনিক আল্পনায় তৈরি করা ওই শাঁখা হিন্দু ধর্মের নারীরা পছন্দ অনুযায়ী নানা দামে কিনে পরিধান করেন।