রোহিঙ্গা বস্তিতে চলছে স্বজন হারাদের আর্তনাদ

প্রকাশ:| সোমবার, ৫ ডিসেম্বর , ২০১৬ সময় ০৯:৫২ অপরাহ্ণ

কায়সার হামিদ মানিক, উখিয়া (কক্সবাজার) প্রতিনিধি :

মিয়ানমারের সেনাবাহিনী,সেদেশের পুলিশ ও রাখাইন সম্প্রদায়ের বর্বর নির্যাতনের শিকার হয়ে মিয়ানমারের বিপুল পরিমান মুসলিম রোহিঙ্গা পালিয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছে উখিয়া উপজেলার কুতুপালং রোহিঙ্গা বস্তিতে। এ পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার রোহিঙ্গা কুতৃপালং রোহিঙ্গা বস্তিসহ বনবিভাগের জায়গায় দালালদের সহযোগিতায় আশ্রয় নিয়েছে বলে বিভিন্ন সুত্রে জানা গেছে। আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মধ্যে প্রতিটি পরিবারের কোন না কোন সদস্য খোয়া গেছে মিয়ানামর সেনা ও পুলিশ বাহিনীর নির্মমতায়। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বর্বর নির্যাতন ও ধর্ষনের শিকার অনেকেই এসেছেন রোহিঙ্গা বস্তিতে। প্রতিরাতে চলছে বস্তিতে স্বজনহারা রোহিঙ্গাদের আর্তনাদ। রাতজুড়ে চলছে আজাহারি। এমনটায় জানিয়েছেন বস্তিতে বসবাস করা লোকজন। বস্তি কমিটির সভাপতি আবু সিদ্দিক জানান, স্বজনহারা রোহিঙ্গাদের আজাহারি চলছে বস্তি জুড়ে। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আজাহারির কারনে বস্তিতে আগে থেকেই অবস্থান করা পুরাতন রোহিঙ্গাদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে।
কুতুপালং রোহিঙ্গা বস্তি পরিদর্শন করে দেখা গেছে,স্বজনহারা এরকম হাজারো রোহিঙ্গার আর্তনাদ। কেউ পিতা হারিয়ে, কেউ সন্তান হারিয়ে, কেউ মা হারিয়ে, কেউ স্বজন হারিয়ে, কেউ সঙ্গম হারিয়ে কাঁদছেন। সবকিছু হারিয়ে রোহিঙ্গা বস্তিতে স্বজনদের বাড়ীতে আশ্রয় নিয়ে তারা মানবেতন জীবন যাপন করছে। কিন্ত তারা দিনে যেনতেন ভাবে কাটালেও রাতে স্বজনদের কথা মনে করছে হু হু করে কাঁদছে। কুতুপালং রোহিঙ্গা বস্তিতে কথা হয় মিয়ানমারের নেছাপ্রো থেকে পাড়া পালিয়ে এসে বস্তিতে স্বজনদের বাড়ীতে আশ্রয় নেওয়া আনোয়ারা বেগম (৪০) এর সাথে। সে জানায়, তার স্বামী আবদুর রহমানকে তার চোখের সামনেই গুলি করে হত্যা করেছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। ২ টি শিশু সন্তান নিয়ে সে বর্তমানে বস্তিতে মানবেতর জীবনযাপন করছে। মিয়ানমার খেয়ারীপাড়া গ্রামের ফিরিজা (২৭) তার শিশু সন্তান শারমিন আরা(৯), ইয়াছির(৭), ফরমিন আরা (৪) ও ২ বছরের নাইম আরাকে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছে রোহিঙ্গা বস্তির এক স্বজনদের বাড়ীতে। মিয়ানমার সেনা সদস্যরা তার স্বমীকে গলা কেটে হত্যা করেছে তার চোখের সামনেই। এ কথা সে কিছুতেই ভুলতে পারছেনা। ৪ শিশু সন্তানকে নিয়ে সে চোখে বর্তমানে অন্ধকার দেখছে। সে আরো জানায়, দিনের বেলায় কোন রকম সময় কাটালেও রাতে সে ভয়াবহ দৃশ্য চোখে ভেসে উঠে। যে কারণে কান্না থামাতে পারি না।
মংডু পোয়াখালী ছালিপাড়া থেকে আসা ইলিয়াছ (৩৫) জানায়, সেখানকার সেনাবাহিনী ও পুলিশ তার পিতা আব্দুস শুক্কুর কে জবাই করে হত্যা করেছে। এসময় তার স্ত্রী রহিমা (২৫) কে লক্ষ্য করে গুলি করলে ভাগ্যক্রমে সে বেচেঁ যায়। গুলিবিদ্ধ স্ত্রীকে নিয়ে অনেক কষ্টে এপারে চলে এসেছি। সে আরো জানায়, তার পাশের বাড়ীতে থাকা বোন, তার স্বামী ও ছেলে মেয়েসহ ৫ জনকে সেনাবাহিনী ও পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। তারা বেঁেচ আছে কিনা জানি না।
শফিউল আলম (৩৫), স্ত্রী নুর বেগম(২৮) ও ৪ ছেলে মেয়েকে নিয়ে এসেছেন মংডুর পোয়াখালী গ্রাম থেকে। সে জানায়, সেনা সদস্যরা আসতে দেখে সে পার্শ্ববর্তী জঙ্গলে লুকিয়ে পড়ে। তারা চলে যাওয়ার পর বাড়ী এসে দেখি বড় ভাই নুর মোহাম্মদের লাশ মাটিতে পড়ে আছে। পাশের বাড়ীর আলী হোছন (৬০), আবুল বশর (২৮), লালু (৪০)সহ সেনাবাহিনী ধরে নিয়ে গেছে। পরে শুনেছি তাদেরকে নির্মম নির্যাতন করে জবাই করে হত্যা করা হয়েছে।
কুতুপালং বস্তি ম্যানেজম্যান্ট কমিটির সভাপতি আবু ছিদ্দিকসহ একাধিক বস্তিবাসী জানান, রাত নামলে বস্তিতে আশ্রয় নেয়া স্বজনহারা রোহিঙ্গাদের কান্নায় অন্যান্য বস্তিবাসীরা ঘুমাতে পারে না। তিনি বলেন, বস্তিতে যেসব রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে তারা কেউ না কেউ আত্মীয় পরিজনকে হারিয়েছে। সহায় সম্বলহীন এসব রোহিঙ্গারা একদিকে যেমন স্বজন হারানোর ব্যাথা ভুলতে পারছে না, অন্যদিকে আশ্রয়হীন অবস্থায় অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটাতে হচ্ছে। যে কারণে রাত নামলেই নারী শিশুর কান্নায় বস্তি এলাকায় এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।