রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন চুক্তি: আদৌ কার্যকর হবে কিনা জনমনে প্রশ্ন

নিউজচিটাগাং২৪/ এক্স প্রকাশ:| শুক্রবার, ৩১ আগস্ট , ২০১৮ সময় ১২:১০ অপরাহ্ণ

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট। বিভীষিকাময় পরিক্রমা পার হয়ে যারা বাংলাদেশে এসেছেন, তাদের ঠাঁই হয়েছে কক্সবাজার জেলার উখিয়া ও টেকনাফ অঞ্চলে। উখিয়ার কুতুপালং এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবির। সন্ত্রাসী সংগঠন আরসার হামলা-অভিযোগের ধুয়া তুলে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত রাখাইন রাজ্যে নিপীড়ন চালিয়েছিল মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। এ ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে জাতিগত নিষ্পেষণের এক নির্মম দৃষ্টান্ত।

২৫ আগস্টের পর মাত্র তিন সপ্তাহে নাফ নদী পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে সোয়া চার লাখ রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ। নির্যাতন থেমে থাকেনি। দিনের পর দিন নির্যাতন চলেছে। চলতি আগস্ট মাসেও রোহিঙ্গা এসেছে বাংলাদেশে। এক বছরে এই সংখ্যা সাত লাখ ছাড়িয়েছে।

মানবিক এই বিপর্যয়ে পাশে দাঁড়াতে বাংলাদেশ মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছে। প্রথমে মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তে কড়াকড়ি মনোভাব রাখা হলেও পরে তা শিথিল হয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসে বড় ধরনের মানবিক এই বিপর্যয় বুঝতে পেরে সরকার রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঢুকতে দিয়েছে। আশ্রয় দিয়েছে। খাবার দিয়েছে।

রোহিঙ্গাদের ঢুকতে দেওয়া বাংলাদেশের জন্য ছিল মাথা পেতে বড় ধরনের সামাজিক ও পরিবেশের বিপর্যয় মেনে নেওয়া। কারণ কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ ছিল দেশের পর্যটন শিল্পের স্বর্গভূমি। রোহিঙ্গাদের সেখানে আশ্রয় দেওয়ায় বিস্তর বনভূমির যেমন ক্ষতি হয়েছে, তেমনি ধ্বংস হয়েছে পাহাড়। এখন পর্যন্ত সরকারি হিসাবে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কারণে উখিয়া ও টেকনাফের প্রায় ২০ হাজার বর্গ-একর এলাকার পাহাড় ও বন উজাড় হয়েছে।

বাংলাদেশ সরকার শুরু থেকেই রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে কূটনৈতিক পর্যায়ে চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে মিয়ানমারের ওপর। গত বছরের নভেম্বরে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে মিয়ানমার। ১৬ জানুয়ারি দুই দেশের মধ্যে প্রত্যাবাসন চুক্তি হয়েছে। দুই বছরের মধ্যে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শেষ করার কথা থাকলেও এই চুক্তির কোনো অগ্রগতি নেই। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে গত জুন মাসে ইউএনডিপি এবং ইউএনএইচসিআরের সঙ্গে চুক্তি হলেও তাদের রাখাইন রাজ্যে ঢুকতে নানাভাবে নিরুৎসাহিত করছে মিয়ানমারের সেনারা। তাই প্রত্যাবাসনের এই চুক্তি আদৌ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

গত ২ জুলাই রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘুরে গেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এবং বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম । কথা বলেছেন নির্যাতনের ক্ষত শরীরে বয়ে বেড়ানোর মানুষের সঙ্গে। ভয়াবহ বর্ণনা শুনে আপ্লুত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শুধু রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়াই নয়, নির্যাতনকারী সেনাদের বিচারের দাবি উঠেছে। মিয়ানমার এসবে থোরাই কেয়ার করছে। দেশটির নেত্রী অং সান সু চি শুরু থেকেই শক্ত হয়ে আছেন। শান্তিতে নোবেল পাওয়া এই নেত্রীর ভূমিকা বিশ্বজুড়ে সমালোচিত হয়েছে, এখনো হচ্ছে। জাতিসংঘসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অব্যাহত চাপের মধ্যেও সু চি বরাবরই নিজেদের দোষ ঢাকার চেষ্টা করছেন।

গত ২১ আগস্ট সিঙ্গাপুরে এক বক্তৃতায় প্রত্যাবাসন বিষয়ে বাংলাদেশের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করেছেন সু চি। বলেছেন, ‘আমাদের পক্ষে একতরফাভাবে প্রত্যাবাসনের সময় বেঁধে দেওয়াটা খুব কঠিন। কারণ এখানে আমাদের বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে হচ্ছে।’

মিয়ানমার আসলে কী চায়? এখনো রাখাইনে নির্যাতন বন্ধ হয়নি। প্রতিদিনই কমবেশি মানুষ নাফ পাড়ি দিয়ে এদেশে আসছে। ওদিকে প্রত্যাবাসনের বিষয়েও আন্তরিক নয় সু চির দেশ। রোহিঙ্গারাও বলছে, তারা তখনই রাখাইনে ফিরে যাবেন, যখন তাদের সেখানকার নাগরিকের স্বীকৃতি দেওয়া হবে। ফিরিয়ে দেওয়া হবে ফেলে আসা বসতবাড়ি, সহায়-সম্পত্তি। নিরাপত্তা থাকবে। আর কখনো তাদের ওপর এমন বর্বরতা চলবে না, এমন নিশ্চয়তাও তারা চান।

মিয়ানমার কি আসলেই এসব দাবি মেনে নেবে? রোহিঙ্গারা কি নিজভূমে নিরাপদ আবাস ফিরে পাবে? এসব প্রশ্ন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। সেই সঙ্গে জনঘনত্ব বাড়ছে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে। রোহিঙ্গারা কি আসলেই ফিরবে, নাকি ফিরবে না। সবাই কি আদৌ ফিরতে পারবে? এখন পর্যন্ত যে প্রস্তুতির কথা বলা হচ্ছে, তাতে বিপুল এই জনগোষ্ঠীর প্রত্যাবাসন দীর্ঘ সময়ের ফাঁদে আটকে যাবে।