রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জন্ম নেয়া শিশুদের ভবিষ্যত অনিশ্চিত

নিউজচিটাগাং২৪/ এক্স প্রকাশ:| বৃহস্পতিবার, ২১ জুন , ২০১৮ সময় ১২:০০ পূর্বাহ্ণ

রক্ষণশীলতার কারণে প্রসবকালীন মৃত্যু ঝুঁকিতে থাকে রোহিঙ্গা নারীরা।
অযত্নে অবহেলায় জন্ম নিচ্ছে হাজারো শিশু।
কায়সার হামিদ মানিক,উখিয়া।
বাংলাদেশ আশ্রিত রোহিঙ্গা নারীরা অনেকে নতুন মা হয়েছে। আবার অনেকে মা হতে যাচ্ছে। কারো জানা নেই, তাদের আগত কিংবা অনাগত শিশুদের ভবিষ্যৎ কি হবে। এসব রোহিঙ্গা পিতা-মাতা তাদের শিশুদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের বিষয়ে একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কোন সহায় নেই বলে জানান। গর্ভবতী নারী এবং নবজাতক শিশুরা পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাচ্ছে না বলে জানিয়েছে রোহিঙ্গা গর্ভবতী নারীরা।
মিয়ানমারে বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়ে গত ২৫ আগষ্ট পরবর্তী দেশটির রাখাইন রাজ্য থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছে লাখ লাখ রোহিঙ্গা। চলমান নিবন্ধন প্রক্রিয়ার তথ্যমতে, আশ্রিত রোহিঙ্গার সংখ্যা গত ১৮ মে পর্যন্ত ১১ লাখ ১৭ হাজারে দাঁড়িয়েছে। পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের অধিকাংশই নারী-শিশু। এর মধ্যে ৭০ শতাংশই নারী।
বিশাল এ জনগোষ্টির মাঝে প্রায় অর্ধ লক্ষ মহিলা অন্ত:সত্ত্বা (হামিল)। তবে ২০১৮ সালে বাংলাদেশে ৪৮ হাজার রোহিঙ্গা শিশু জন্ম নেবে বলে জানিয়েছেন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিয়োজিত আর্ন্তজাতিক দাতব্য সংস্থা সেভ দ্যা চিলড্রেন। এছাড়াও প্রতিদিন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গড়ে ৬০জন রোহিঙ্গা শিশু জন্ম নিচ্ছে এমন তথ্য ইউনিসেফের।
ইউনিসেফের তথ্যমতে, গত নয় মাস আগে সঙ্কট শুরুর পর থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১৬ হাজারের বেশি শিশু জন্ম নিয়েছে। এদের মধ্যে মাত্র তিন হাজার শিশুর জন্মের সময় স্বাস্থ্যকর্মীদের সহযোগিতা পেয়েছে। অন্যান্যরা ক্যাম্পে ত্রিফলের ছাউনির ঝুপঁড়িতে ক্যাম্প গুলোতে অযতœ অবহেলায় জন্ম গ্রহণ করছে।
ক্যাম্পে জন্ম নেওয়া এসব নবজাতকদের একটি বড় অংশ বিভিন্ন রোগ ও পুষ্টিহীনতার ফলে মারা যেতে পারে এমনটি আশংকা দেখা দিয়েছে। বিপুল সংখ্যক শিশুর জন্ম প্রক্রিয়া, স্বাস্থ্য এবং পুষ্টি মোকাবেলা করা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
২০ জুন (বুধবার) কথা হয় ঘুমধুম ক্যাম্প-৭ এর জি ব্লকের হেড মাঝি মো: হাছন এর সাথে। তিনি জানান তার ব্লকে ৯শ পরিবারের মধ্যে ৩১জন গর্ভবর্তী মহিলা আছে।
মিয়ানমারের মংডু জামবনিয়া থেকে পালিয়ে আসা একরাম উল্লাহ’র স্ত্রী গর্ভবর্তী রাজিয়া বেগম (২০) জানান, এ পর্যন্ত চেকআপ করা হয়নি। মাতৃত্বকালীন কত বার চেকআপ করা দরকার তাও জানে না। এটা তার দ্বিতীয় সন্তান। বড় সন্তানের বয়স ২ বৎসর। তাদের ভবিষ্যত ও নিরাপদ মাতৃত্বের বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, আল্লাহ যা করে তা হবে। ভবিষ্যতের চিন্তা করি না। একই ধরণের কথা বলেন প্রথম বার গর্ভবতী হওয়া ফকিরা বাজার এলাকার মঞ্জুর আলমের স্ত্রী হলেকা বেগম(১৮)।
ত্রিপলের ঝুপঁড়িতে ভ্যাপসা গরমে স্যাতস্যাতে মাটির উপর পাটি বিছিয়ে শুয়ে রেখেছে ১২ দিনের শিশু কন্যা শওকত আরাকে। গায়ে নেই কোন কাপড়। শিশুটির পিতা ওবাইদুর রহমান (২২) লাকড়ি কুড়াতে গেলে মায়ের প্রসব বেদনা শুরু হয়। কোন ডাক্তার বা অভিজ্ঞ ধাত্রী’র সহযোগিতা ছাড়াই ঝুপঁড়িতে সন্তান জন্ম দেয়ার করুণ বর্ণনা দেন মা হাসিনা বেগম (২১)।
প্রতিটি ঝুপঁড়ির সামনে বয়ে গেছে মল-মূত্রের নালা। এসব নালার পাশে হামাগুড়ি দিচ্ছে ক্যাম্পের শিশুরা। তাদের একজন ইকবাল মিয়া শিশু কন্যা মোকারমা (৯ মাস)।
শিশু বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব শিশুদের সুষ্ঠু ভাবে বেড়ে উঠার জন্য পরিকল্পনা নিতে হবে সরকার ও সংশ্লিষ্ট দাতা সংস্থা গুলোকে।
রোহিঙ্গা শিশুর জন্মের আগে এবং পরে প্রসূতি মায়ের যত্ন, এরপর ডেলিভারি সংক্রান্ত বিষয়ে জানতে চাইলে সদ্য বদলীজনিত উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: মিজবাহ উদ্দিন বলেন, সার্ভিসটা দেশের অন্যান্য কমিউনিটি ক্লিনিক বা উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র গুলোতে চালু না থাকলেও উখিয়ার বালুখালী উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র, কুতুপালং কমিউনিটি ক্লিনিক, পালংখালী পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে রোহিঙ্গা আসার আগে থেকে চলমান ছিল।
তিনি আরো বলেন, রোহিঙ্গা মায়েরা হাসপাতালে ডেলিভারী করানোর চেয়ে বাড়িতে ডেলিভারী করাতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। বিশেষ করে রক্ষণশীলতার কারণে অনেকে প্রসবকালীন মৃত্যু ঝুঁকিতে থাকে বেশি। প্রসূতি মা ও শিশুর পুষ্টির ব্যাপারেও স্বাস্থ্য বিভাগ এবং বিভিন্ন সংস্থা তাদেরকে বুঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।