রোহিঙ্গাদের জন্য ভাড়া ঘর

প্রকাশ:| সোমবার, ২৫ সেপ্টেম্বর , ২০১৭ সময় ০৪:৫৯ অপরাহ্ণ

টেকনাফের লেদা বাজার থেকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের দিকে যেতে রাস্তার দক্ষিণ পাশজুড়ে সবুজ ধানক্ষেতের পাশেই গড়ে উঠেছে হঠাৎ করেই গড়ে উঠেছে ঘরগুলো। সারি সারি ঘর। বাঁশের বেড়া দিয়ে তৈরি এসব ঘরে বসবাস করতে শুরু করেছে প্রায় ১৪০টি রোহিঙ্গা পরিবার। এ জন্য তাদের মাসে মাসে গুনতে হবে ‘ভাড়া’। বারোশ’ থেকে পনেরোশ’ টাকার ঘর আছে। আবার রয়েছে ৫০০ টাকার ঝুপড়িঘরও। রোহিঙ্গাদের ভাষায়, জমি বা ঘরের মালিককে বলা হয় ‘জমিদার’। তারা জমিদারকে ভাড়া দেবেন। জমিদারের খোঁজ জানতে চাইলে দুই রোহিঙ্গা পুরুষ নিয়ে যান ঘরগুলোর মালিক আবদুস শুক্কুরের কাছে। সমকালের সঙ্গে তার কথা হয়। শুক্কুর জানান, এই জমি ও ঘরের মালিক তিনি। পৈতৃক সূত্রে জমি পেয়েছেন। ঘর তুলে তিনিই রোহিঙ্গাদের থাকতে দিয়েছেন বলে স্বীকার করলেও ভাড়া নেওয়ার কথা অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘ওরা দেবে ভাড়াঙ্ঘ কী যে বলেনঙ্ঘঙ্ঘ
ওদের কাছে কি আর টাকা আছে? দয়া করে থাকতে দিয়েছি।’
শুক্কুরের সঙ্গে কথা বলার সময় ঘরগুলোর বাসিন্দাদের অনেকেই আসেন। তাদের একজনের কাছে জানতে চাইলাম, ‘কত টাকায় ঘর ভাড়া নিয়েছেন?’ তিনি চটপট উত্তর দেন, ‘এক হাজার টাকায়।’ এ সময় শুক্কুর বেশ বিব্রত হন। তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে সেখান থেকে চলে যেতে উদ্যত হন।
রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে এবং স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের লেদা টাওয়ার এলাকার মীর কাশেমের ছেলে আবদুস শুক্কুর (৩৭)। চলতি মাসের শুরুতে রোহিঙ্গারা নাফ নদ পাড়ি দিয়ে টেকনাফে ঢুকতে শুরু করলে শুক্কুর ও মীর কাশেম লেদা টাওয়ারের পাশে বন বিভাগের সংরক্ষিত এই বনভূমি দখল করে রাতারাতি ঘর তুলে ভাড়ার ব্যবসা শুরু করেছেন। গতকাল দুপুরে ঘুরে দেখা গেল, মোট ১২০টি ঘরে ১৪০টি রোহিঙ্গা পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। কোনো কোনো ঘরে একাধিক পরিবারও রয়েছে। সমকালের প্রশ্নের জবাবে এখানে বসবাস করা প্রতিটি রোহিঙ্গা পরিবারের সদস্যরা বলেছেন, তারা টাকার বিনিময়ে এখানে ঘর ভাড়া নিয়েছেন। স্থানীয় দোকানি শাহ আলম বলেন, শুক্কুর আর তার বাবা ঘর তুলে ভাড়া দিয়েছেন। চলতি মাসেই তারা ঘরগুলো সেখানে তুলেছেন। এই জায়গার মালিক সরকার। একই কথা জানান স্থানীয় বেশ কয়েকজন অধিবাসী।
আবদুস শুক্কুর বলেন, ১২০টি ঘরের সব তার নয়। তার নিজের মাত্র ১২টি। বাকিগুলোর মধ্যে ছোট ভাই জাহাঙ্গীরের রয়েছে ১০টি আর বাবা মীর কাশেমের ঘর বাকিগুলো। তিনি কথা বলার সময় সেখানে আসেন তার বাবা মীর কাশেম। তিনি সমকালকে জানান, ঘরগুলো সব শুক্কুর দেখাশোনা করে। কে কত টাকা দেয়, তা তিনি জানেন না। বন বিভাগের জমিতে ঘর তুললেও পিতা-পুত্র তা অস্বীকার করেন। তারা দাবি করেন, এই জমি তাদের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া।
বন বিভাগের স্থানীয় বিট কর্মকর্তা জানান, ওই জমি বন বিভাগের কি-না, তা তিনি কাগজপত্র না দেখে এখনই বলতে পারছেন না। তবে বনের জমি দখল করে উখিয়া ও টেকনাফের বহু স্থানে অস্থায়ী ঝুপড়িঘর তোলা হয়েছে। এগুলো তারা শিগগিরই পুলিশের সহায়তায় অপসারণ করার উদ্যোগ নেবেন। বন বিভাগের টেকনাফ রেঞ্জ কর্মকর্তা তাপস কুমার দেব অবশ্য এ বিষয়ে কিছু বলতে চাননি।
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, কেবল আবদুস শুক্কুর বা মীর কাশেম নন, টেকনাফ উখিয়ার বহু মানুষ বিভিম্ন স্থানে রাতারাতি অস্থায়ী ঘর তুলে রোহিঙ্গাদের কাছে ভাড়া দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, আবাসিক এলাকার বাসাবাড়িতেও ভাড়া নিয়ে বসবাস করছেন অপেক্ষাকৃত সচ্ছল রোহিঙ্গারা।
বিষয়টি নিয়ে বিস্ট্ময় প্রকাশ করে টেকনাফ থানার ওসি মো. মাঈন উদ্দিন খান বলেন, পুলিশের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও স্থানীয়রা কীভাবে রোহিঙ্গাদের কাছে ঘর ভাড়া দিচ্ছেন, তা বোধগম্য হচ্ছে না। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের বাসা ভাড়া না দিতে একাধিকবার টেকনাফে পুলিশের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হয়েছে। এরপরও কেউ কথা না শুনলে তাকে আইনের হাতে সোপর্দ করা হবে।
শরণার্থী হিসেবে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের বাড়িভাড়া না দিতে গত ১৬ আগস্ট নির্দেশ দেয় পুলিশ সদর দপ্তর। একই সঙ্গে কক্সবাজারে থাকা রোহিঙ্গাদের পরিবহন না করতে গাড়ি মালিক ও শ্রমিকদেরও বারণ করা হয়। দমন-পীড়নের মুখে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ছড়িয়ে পড়ার খবর আসার প্রেক্ষাপটে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে এ নির্দেশনা পাঠানো হয়।
বাংলাদেশে দশকের পর দশক ধরে চার লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী হয়ে আছে। তাদের বিরুদ্ধে জঙ্গি তৎপরতাসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাে জড়িয়ে পড়ার তথ্যও সরকারের কাছে রয়েছে। গত মাসের শেষে রাখাইনে নতুন করে সহিংসতা শুরুর পর এরই মধ্যে আরও চার লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে। এ সংখ্যা আরও বাড়ছে। নতুন শরণার্থীদের জন্য কক্সবাজারের উখিয়ার বালুখালীতে আশ্রয়শিবির করেছে সরকার। সেখানে তাদের নিবন্ধনও করা হচ্ছে।