রেলের শহর চট্টগ্রাম

প্রকাশ:| রবিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি , ২০১৬ সময় ১১:৫৭ অপরাহ্ণ

সুজিত সাহা::
পনেরো শতকের শেষ দিকে উত্তমাশা অন্তরীপ হয়ে ভারতে আসার পথ আবিষ্কার করেন ভাস্কো দা গামা। তার অনুগামী পর্তুগিজরা কালিকট থেকে অগ্রসর হয়ে বাংলা পর্যন্ত এসেছিল। পর্তুগিজরা সেদিনের চট্টগ্রাম বন্দরকে বলেছিল ‘পোর্তো গ্রান্দে’ অথবা বড় বন্দর। কলকাতাও তখন বন্দর ছিল, তবে পর্তুগিজদের চোখে সেটা ছিল ‘পোর্তো পিকুইনো’ বা ছোট বন্দর।

রেল ৫

রেলচারশ বছর পরের কথা। বাংলা প্রেসিডেন্সির প্রধান দুই বন্দর কলকাতা ও চট্টগ্রামের চেহারায়, ভূষায় যোজন যোজন তফাত। কলকাতা ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী হওয়ায় অন্যান্য স্থানের সঙ্গে এর যোগাযোগ ব্যবস্থা বেশ উন্নত হয়ে ওঠে। কলকাতা বন্দরও হয়ে ওঠে ভারতের ও উপমহাদেশের প্রধান বন্দর, যা দেশের বহির্বাণিজ্যের প্রায় পুরোটা একাই সামলাত। কিন্তু পূর্ব ভারতের অন্যতম সমৃদ্ধ এলাকা চট্টগ্রাম তখনো রেল যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। এ কারণে বিকশিত হচ্ছিল না পূর্ব বাংলা ও চট্টগ্রামের সম্ভাবনা। পিছিয়ে পড়েছিল চট্টগ্রাম বন্দরও।

ব্রিটিশ সরকারের আমলা ছিলেন কবি নবীন চন্দ্র সেন। আজকের চট্টগ্রাম শহরে জামাল খান রোড ও শহীদ সাইফুদ্দীন খালেদ সড়কের সংযোগস্থলে যেখানে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের ‘এরিনা হাউজ’, সেটাই নবীন বাবুর বাড়ি ছিল। ১৮৮৪ সালে তিনি ফেনী মহকুমার এসডিও হন। সে সময়ের যাতায়াত ব্যবস্থার বর্ণনা করতে গিয়ে নবীন বাবু লিখেছেন, ‘গো-যান এ অঞ্চলে একমাত্র চলার বাহন ছিল। তাও খুব কষ্টকরভাবে চলা হত। তাই নিজের জন্য কবি কল্পনা খাটাইয়া একখানি চাটাইয়ের পালকি প্রস্তুত করিয়াছি। চারিদিকে চাটাইয়ের বেড়া, তাহাতে গবাক্ষ ও দ্বার এবং গবাক্ষে নীলবর্ণের পর্দা।’

নবীন বাবু ছিলেন সরকারের পদস্থ কর্মকর্তা। তারই অবস্থা যদি এমন হয়, তাহলে অন্যদের কেমন ছিল? সেকালে তো লেখাজোখার রেওয়াজ খুব বেশি ছিল না। তাই আম মানুষের ব্যক্তিগত দিনলিপি বা বিবরণী পাওয়া সম্ভব নয়। তবে স্থল ও জলপথে বারবার বাহনবদলের পাশাপাশি পাহাড়, জঙ্গল ডিঙাতে যে লোকজন জেরবার হতো, তা বোঝার জন্য খুব বেশি কল্পনাশক্তির প্রয়োজন নেই। অনন্যোপায় না হলে কেউ দূরে কোথাও যেত না। মরিয়া হয়ে যারা যাতায়াত করত, পথে তাদের চোখ আটকে যেত নবীন বাবুর বাহনে। লোকমুখে তার পালকি নিয়ে চর্চা প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, ‘আমার দুই বংশ নির্মিত কাব্যের দ্বারা আমি এ অঞ্চলে অমরতা লাভ করিয়াছিলাম।’ নবীন বাবু অমরতা লাভ করেছেন অন্যভাবেও। সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। আগে বলি সেদিনের কথা, যখন বিশ্ব ত্বরিত ছোট হয়ে আসছিল এবং প্রসার ঘটছিল বাণিজ্যের ও বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার।

পরিবহন সংকটের কারণে মানুষ না হয় চলাফেরা না করল, কিন্তু বাণিজ্যনির্ভর বিশ্বে পণ্য কীভাবে স্থবির থাকে? সে সময় ভারতবর্ষের মোট চা উৎপাদনের ৬৫ শতাংশ হতো আসাম, সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে। এই চা রফতানি করতে হতো কলকাতা বন্দর হয়ে। বাংলার দক্ষিণ-পূর্বকোণে অবস্থিত হওয়ায় অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের অভাবে চট্টগ্রাম বন্দর অনেকাংশে অবহেলিত থেকে যায়। অথচ কলকাতা হয়ে পণ্য পরিবহনে ঝক্কি ছিল অনেক। সিলেট থেকে কলকাতায় পণ্য পরিবহনে ১৩ দিন সময় লাগত, চট্টগ্রাম থেকে আরো বেশি। আসামের কথা না-ইবা বললাম। অথচ ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ের কল্যাণে পূর্ব বাংলার কুষ্টিয়া, ঢাকাসহ উত্তরবঙ্গ তত দিনে রেলসংযোগের আওতায় এসেছিল। সিলেট যদি রেলপথে সংযুক্ত হতো, তাহলে ২৪ ঘণ্টায় সিলেট থেকে কলকাতা যাওয়া যেত। পাশাপাশি চট্টগ্রাম যদি রেল নেটওয়ার্কের অন্তর্ভুক্ত হতো, তাহলে তো কলকাতায় না গিয়ে এ পথেই পূর্ববঙ্গ ও আসামের যাবতীয় খনিজ ও কৃষিজ পণ্য রফতানি করা যেত।

ফেনী থেকে নবীন বাবু চট্টগ্রামে স্থানান্তরিত হন। নিজ জেলায় তিনি ডেপুটি কালেক্টর হয়ে আসেন। একই সময় চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনার হয়ে আসেন ডি আর লায়েল। দুজনে মিলে চট্টগ্রাম ও সংলগ্ন এলাকার মানুষের যাতায়াতের দুর্দশা লাঘবে সংকল্পবদ্ধ হন এবং এখানে রেলওয়ের প্রস্তাব করেন। লাভজনক হবে না ভেবে সরকার প্রথম দিকে এতে আগ্রহী হয়নি। চট্টগ্রামেরও কেউ কেউ এ রেলওয়ে অসম্ভব বলে হাসি-ঠাট্টা করে বলতে থাকেন, ‘লায়েল সাহেব ও নবীন বাবু রেলওয়ে এনে ফেলবেন।’ লায়েল ও নবীন বাবু একা ছিলেন না। ব্রিটিশ ব্যবসায়ীরাও চাইতেন চট্টগ্রাম বন্দর রেলপথে সংযুক্ত হোক, তাতে তাদের পণ্য পরিবহনের ব্যয় ও বিপত্তি দুটোই কমবে। এরই মধ্যে চট্টগ্রাম থেকে চাঁদপুর এবং দাউদকান্দি থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত রেললাইন স্থাপনের জন্য কয়েকটি নকশাও করা হয়েছিল। নবীন বাবু একটি নকশার রিপোর্ট লায়েলের অনুমোদনক্রমে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি সরকারের কাছে পাঠান। বাংলা সরকার তা সমর্থন করে গভর্নমেন্ট অব ইন্ডিয়ার কাছে পাঠিয়ে দেয়। ভারত সরকারের পূর্তসচিব এ নকশার ওপর মন্তব্য করেন, ‘যত দূর দেখেছি এই লাইনটি অন্যান্য নকশার চাইতে শ্রেষ্ঠতর হবে।’ বাংলা সরকার এ রেলপথ হলে কোনো বিঘ্ন হবে কিনা তা জরিপ করতে ‘রেলওয়ে কার্যে অশেষ পারদর্শী’ মেজর স্টোরিকে নিয়োগ দেয়। মেজর স্টোরি নবীন বাবুর নকশা বুঝে নিয়ে সরজমিন পরিদর্শন করেন। তিনি সরকারকে রিপোর্ট করেন, ‘চট্টগ্রাম হইতে লাকসাম পর্যন্ত লাইন পূর্ব লাইন হইতে অধিকতর সুবিধাজনক ও অল্পতর ব্যয়সাধ্য বলিয়া মনে হইতেছে।’ নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিঠি চালাচালির পর ১৮৮৪ সালে ভারত সরকার এ অঞ্চলে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে নামে রেললাইন প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দেয়। লন্ডনের একদল ব্যবসায়ী এ রেললাইনের দায়িত্ব নেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে সেক্রেটারি অব স্টেটের কাছে চিঠি দেন। আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি (এবিআর) নামে একটি কোম্পানি গঠন করে এ ব্যবসায়ীরাই ১৮৯২ সালে এ লাইনের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেন। ১৮৯২ সালের ১৮ মার্চ এবিআর কোম্পানি ইংল্যান্ডে নিবন্ধিত হয়।

এবিআর কোম্পানির সদর দফতর স্থাপিত হয় চট্টগ্রামে। ইঞ্জিনিয়ার ব্রাউনজারের তত্ত্বাবধানে এ কোম্পানি ১৮৯৩ সালের জানুয়ারিতে চট্টগ্রাম থেকে ফেনী পর্যন্ত রেললাইন স্থাপনের কাজ শুরু করে। প্রথম লাইনটি চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। আর এর মধ্যবর্তী স্টেশন লাকসাম থেকে দুটি লাইন বের হয়ে একটি চাঁদপুর, অন্যটি নোয়াখালী পর্যন্ত বিস্তৃত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ইঞ্জিনিয়ার ব্রাউনজার ফেনীতে নবীন বাবুর নির্মিত বাঁশের ঘরের আকৃতি অনুকরণ করে পাহাড়তলীতে রেলওয়ে কর্মীদের কোয়ার্টারের নকশা করেন। ১৮৯৫ সালের ১ জুলাই চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত ৯৩ দশমিক ১৪ মাইল দীর্ঘ লাইনটি উদ্বোধন করা হয়।

ঔপনিবেশিক ভূ-রাজনীতি, ভৌগোলিক রণনীতি ও রণকৌশলগত সুবিধাদিসহ বাণিজ্যিক স্বার্থকে মাথায় রেখে কালে কালে চট্টগ্রাম থেকে জেলার দক্ষিণেও রেললাইন বিস্তৃত হয়। চট্টগ্রামে আসাম বেঙ্গল কোম্পানির সদর দফতর প্রতিষ্ঠা, রেলপথ স্থাপন এবং সেই রেলপথের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের সংযোগের সুফল এখনো পাচ্ছে চট্টগ্রামবাসী তথা বাংলাদেশ। ব্রিটিশদের বাণিজ্য দূরদর্শিতার সুফলকে কাজে লাগিয়ে পাহাড়-নদী-সমুদ্রবেষ্টিত এ শহর এখনো বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ায় বাণিজ্যের অন্যতম তীর্থভূমি হিসেবে পরিচিত।

এক অর্থে এবিআর কোম্পানিই আজকের চট্টগ্রাম বন্দরের নির্মাতা। তারাই সমুদ্রতীরবর্তী এই প্রাচীন পোতাশ্রয়কে বন্দরে রূপান্তর করে। বন্দরের উন্নয়নের জন্য একে রেলের সঙ্গে সংযুক্ত করতে তারা ১৮৯০ সাল থেকে সরকারের কাছে আবেদন করতে থাকে। বন্দরের সঙ্গে রেলসংযোগের গুরুত্ব উপলব্ধি করে পোর্ট কমিশনার্সও সরকারের কাছে জেটি এবং অন্যান্য সুবিধা নির্মাণের জন্য অনুদান চেয়েছিল। কিন্তু সরকার এবিআর কোম্পানিকেই অনুমোদন দেয়। কলকাতা বন্দর ও জয়েন্ট স্টিমার কোম্পানির তীব্র বিরোধিতার মুখে ১৮৯৯ সালে রেল কোম্পানির উদ্যোগে চট্টগ্রাম পোতাশ্রয়ে প্রথম জেটি নির্মাণকাজ শেষ হয়। ১৯০০-১৯১০ সালের মধ্যে এবিআর চট্টগ্রাম বন্দরে আরো তিনটি জেটি নির্মাণ করে। ১৮৯৯ সালের জুনে নির্মিত প্রথম জেটিতে এসএস স্যার রবার্ট ঢেরনিক নামের জাহাজ ভিড়ে মালপত্র খালাস করে। ওই জাহাজে ১ হাজার ৬৪৮ বেল পাট বোঝাই করে রফতানি করা হয়েছিল। ১৯৬০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দর রেলওয়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল। রেলওয়ে চট্টগ্রাম বন্দরকে গুরুত্বপূর্ণ বন্দরে পরিণত করে ব্যবসা-বাণিজ্যকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সম্প্রসারণ করতে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

১৮৮৮ সালের পূর্ব পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরকে পোতাশ্রয় হিসেবে গণ্য করা হলেও রেলপথ স্থাপনের মাধ্যমে এটি বিশ্বের অন্যতম বন্দরে পরিণত হয়। চট্টগ্রাম এখন বিশ্বের শীর্ষ ১০০ বন্দরের একটি হিসেবে পরীক্ষিত।

ইতিহাসের প্রাচীন এ নগরী চট্টগ্রাম বা চাটগাঁয় কৃষিকে ছাপিয়ে শিল্প-কলকারখানা স্থাপন ও বিকাশের পেছনেও রেলসংযোগের ভূমিকা কম নয়। চট্টগ্রাম শহরের একটি বড় অংশ এখনো রেলের মালিকানায় রয়েছে। এমনো বলা যায়, এ কারণেই অপরিকল্পিত নগরায়ণের এই কালে এখনো এ শহরে পাহাড় রয়েছে, সবুজ মহীরুহ এখনো পথ চলতি মানুষের মাথায় ছায়া দেয়। রেলওয়ের এসব ভূমি এখনো চট্টগ্রাম শহরের সৌন্দর্যের প্রাণ। নগরীর প্রায় সিংহভাগ পাহাড়, বন-বাদার, বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ সড়ক রেলের মালিকানাধীন। আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের সদর দফতর সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং (সিআরবি) দেশের ঐতিহ্যবাহী ভবন হিসেবে পরিচিত।

চট্টগ্রাম শহরের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের ৮ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের রেলযোগাযোগ প্রতিষ্ঠার আগে এবিআর কোম্পানি বন্দরের সন্নিকটে চট্টগ্রাম বন্দর ইয়ার্ড (সিজেপিওয়াই ইয়ার্ড নামে পরিচিত) স্থাপন করে। সেখান থেকে একাধারে কয়েকটি মালবাহী ট্রেন চলাচলের ট্র্যাক রয়েছে। কালের বিবর্তনে এসব ট্র্যাকের অধিকাংশ ক্ষয়িষ্ণু হলেও চট্টগ্রাম বন্দরের পণ্য খালাস হয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানো এবং দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে রফতানিমুখী পণ্য চট্টগ্রাম বন্দরে নিয়ে আসার এক ব্যাপক কর্মযজ্ঞ চট্টগ্রামকে সারা দেশ থেকে বিশেষভাবে আলাদা করেছে।

এবিআর কোম্পানির উদ্যোগে পূর্ব বাংলায় রেললাইন স্থাপনের মাধ্যমে এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রসার শুরু হয়। এর মধ্যে রয়েছে কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বৃদ্ধি, নতুন ব্যবসা কেন্দ্র-শহর-বাজার সৃষ্টি, লিংক রোড বা জোগান সড়ক তৈরি, কলকারখানা তৈরি, নতুন কর্মসংস্থান, আধুনিক মুদ্রা ব্যবস্থার প্রচলন এবং নতুন নতুন পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি। এতে এখানকার মানুষের মধ্যে একটি ব্যবসায়ী চিন্তা ও কর্মের উন্মেষ ঘটে। পরবর্তী সময়ে ভোগ্যপণ্য, ভারী শিল্প, ইস্পাত, জাহাজ নির্মাণ শিল্পসহ নানামুখী শিল্প-কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে এখানকার মানুষ ব্যবসায়ী হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়। স্বাধীনতার পর চট্টগ্রামের বনেদি ব্যবসায়ীরাই দেশের প্রধান শিল্পোদ্যোক্তা হিসেবে আবির্ভূত হন।

শুরুতে এ অঞ্চলে রেলসেবা পণ্য পরিবহনের জন্য শুরু হলেও যাত্রীসেবাও সমান্তরালে চলতে থাকে। তবে চট্টগ্রাম ও সিলেট ছাড়াও ব্রিটিশ ভারতের বিভিন্ন এলাকা থেকে শিল্পের কাঁচামাল, পাট, চা, চিনি সরবরাহের জন্য এখানে একটি আধুনিক বন্দর ব্যবস্থাপনা সৃষ্টির প্রয়াস নিয়েছিলেন ব্রিটিশ শাসকরা। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে বছরে প্রায় ৪ কোটি টন পণ্য আমদানি হয়। যার ১০ শতাংশ বা ৪০ লাখ টন রেলপথে সারা দেশে পাঠানো হয়। দৈনিক প্রায় ১০০ টিইউএসের বেশি কনটেইনার পরিবহন করে এসব পণ্য। জ্বালানি তেলের সিংহভাগই রেল পরিবহন করে। একসময় রেলের আয়ের সিংহভাগই আসত পণ্য পরিবহন খাত থেকে। রেলের ইনফরমেশন বুক-২০১৩-এর তথ্যানুসারে দেখা গেছে, ১৯৮৫ সাল থেকে রেলের আন্তঃনগর ট্রেন সার্ভিস চালুর পর যাত্রী পরিবহন খাতে এর রাজস্ব আয় বাড়তে থাকে। শুরুতে রেলের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের পণ্য পরিবহন হলেও ১৯৮৬-৮৭ অর্থবছর থেকে রেলওয়ে কনটেইনার সার্ভিস শুরু করে। যা চট্টগ্রাম বন্দর ও ঢাকা আইসিডিতে কনটেইনার পরিবহনে ন্যস্ত থাকে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকা আইসিডি পর্যন্ত কনটেইনারে পণ্য পরিবহনে ২০১২-১৩ সালে রেলওয়ে ৬১ কোটি ৪৪ লাখ ৮৯ হাজার টাকা আয় করে। রেলের জ্বালানি ব্যবহারের চিত্র থেকে চট্টগ্রামে রেলের কর্মযজ্ঞের বিশেষ ধারণা পাওয়া যায়। রেলের তথ্যমতে, ২০১২-১৩ অর্থবছরে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল ১৮৪ টন কয়লা খরচ করে। এর বিপরীতে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের খরচ হয় মাত্র ৫২ টন কয়লা। অন্যদিকে এ সময়ে রেলওয়ে ৩৫ হাজার ৩৭ টন ডিজেল ব্যবহার করলেও এর মধ্যে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ে ব্যবহার করে ২১ হাজার ১০১ টন। বন্দর দিয়ে আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে রেলের ভূমিকা কী, তা প্রতি টন পণ্য পরিবহনে রেলপথে গড় খরচের চিত্র দেখলেই বোঝা যায়। ইনফরমেশন বুক-২০১৩ অনুসারে, ২০১২-১৩ অর্থবছরে রেলওয়ে প্রতি কিলোমিটার পণ্য পরিবহনে আয় করেছে মাত্র ২ দশমিক ৩ টাকা। এক্ষেত্রে টনপ্রতি পণ্য পরিবহন থেকে আয় করেছে ৫৪৩ দশমিক ৮৪ টাকা। খুব কম খরচে পণ্য পরিবহন সুবিধার কারণে বন্দরকে ব্যবহার করে রেলওয়ে চট্টগ্রামসহ সারা দেশের অর্থনীতিতে অবদান রেখে চলেছে।

রেলওয়ে চট্টগ্রামের হিসাবমতে, চট্টগ্রাম বিভাগে রেলের মোট জমির পরিমাণ ৭ হাজার ৭০১ একর। এর মধ্যে সংস্থার নিজস্ব প্রয়োজনে ব্যবহার হচ্ছে প্রায় ৩ হাজার একর। আর অব্যবহূত জমির পরিমাণ ১ হাজার ৭৩ দশমিক ৯৭ একর। বাকি জমি হয় বেদখল, না হয় ইজারা বা প্রতীকী মূল্যে বরাদ্দ দেয়া। অর্থাৎ ১৮৫ বর্গকিলোমিটারের এ শহরে বিপুল পরিমাণ রেলওয়ের জমি থাকায় চট্টগ্রামকে রেলের শহর বলেই মনে করেন রেলওয়ে-সংশ্লিষ্টরা।

চট্টগ্রামে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের অধীনে ৭১টি আন্তঃনগর ট্রেন, মেইল এক্সপ্রেস ৬৮টি, লোকাল ৫৭টি, কমিউটার ৩০টি, কনটেইনার ৬টি, পণ্যবাহী ট্রেন ৩টি এবং বেলাস্ট ট্রেন ২টি। প্রতিমানে রেলওয়ে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ৫-৬ হাজার টিইউএস পণ্য পরিবহন করে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে মোট ৬০ হাজার টিইউএস পণ্য পরিবহন করে। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (২৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত) ৪০ হাজার ৪৫২ টিইউএস কনটেইনার পরিবহন করেছে। বিগত অর্থবছরের একই সময়ে কনটেইনার পরিবহন করেছিল ৩৮ হাজার ২৭৭ টিইউএস। অন্যদিকে চলতি অর্থবছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১৯ হাজার ৫৭৫টি ওয়াগনে তেল, সার, খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্য পরিবহন করেছে। বন্দরকেন্দ্রিক রেলপথে সারা দেশে পণ্য পরিবহন, চট্টগ্রামের সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ ও যাত্রী পরিবহন এখানকার প্রাত্যহিক কর্মকাণ্ডের প্রধানতম অনুষঙ্গ বলেই ধরে নেয়া যায়।

এ অঞ্চলে চালু হওয়ার পর থেকে রেলওয়ে দেড় শতাধিক বছর পার করেছে। ব্রিটিশ শাসন, পাকিস্তানি শাসন ও স্বাধীন বাংলাদেশে অনেক পটপরিবর্তনের সাক্ষী হয়ে রেল তার আপন মহিমায় পরিবহন কাজ চালিয়ে যাচ্ছে অবিরত। পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তনকে সামনে নিয়ে এখনো দেশের অর্থনীতিতে অবদান রেখে চলেছে রেল। এখনো রেলপথই চট্টগ্রাম তথা সারা দেশের পণ্য আমদানি ও রফতানির প্রধানতম মাধ্যম। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে রেলওয়েকে কিছুটা বাণিজ্যিকীকরণের প্রচেষ্টা শুরু হলেও রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় এটি গণমানুষের পরিবহন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। কম খরচ ও নিরাপদে পণ্য ও যাত্রী পরিবহনে রেলওয়ে অবিচল ভূমিকা রাখছে। ১৯৯৮ সালে বন্যায় সারা দেশের সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা বিনষ্ট হলেও রেলওয়ের মাধ্যমেই যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু ছিল। দেশীয় রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়েও রেলপথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন চালু থাকে।

চট্টগ্রাম বস্তুতই রেলের শহর। এ শহরের ইতিহাসে মিশে আছে রেলওয়ে। মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে স্বাধীনতাকামীরা ঔপনিবেশিক সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াইয়ের যে পরিকল্পনা করেছিলেন, তার বড় অংশজুড়ে ছিল রেলওয়ে। নগরীর পাহাড়তলীতে রেলওয়ে এলাকায় ছিল ইউরোপীয় ক্লাব। সেখানেই সফল অপারেশন শেষে আত্মাহুতি দিয়েছিলেন প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। রেলের মাধ্যমে সমৃদ্ধির পরিক্রমাকে ধরে রাখতে ২০০৩ সালের ১৫ নভেম্বর চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ওয়ার্ডে রেলওয়ে ক্যারেজ অ্যান্ড ওয়াগন কারখানার বিপরীতে প্রায় ১২ একর জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ রেলওয়ে জাদুঘর। উঁচু টিলার ওপর অবস্থিত কাঠের বাংলোটি তার মধ্যে ধারণ করে আছে রেলের ১৫০ বছরের ইতিহাস। বাংলোটির আয়তন প্রায় ৪ হাজার ২০০ বর্গফুট এবং কাঠের তৈরি দোতলা। সামনে প্রবেশের জন্য নিচ থেকে উঠে এসেছে একটি পাকা সিঁড়ি, যার ওপর একপাশে খুব দুর্বল হাতের কাজের একটি বাঘের ভাস্কর্য। এ টিলার পাশে শাহজাহান মাঠের এক কোনায় অবস্থিত ইউরোপীয় ক্লাব। শুক্রবারসহ সপ্তাহের প্রতিদিন বেলা ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত জাদুঘরটি খোলা থাকে। জাদুঘরের সামনের কক্ষে রয়েছে একটি মডেল রেললাইন, যার মাধ্যমে একটি স্টেশন থেকে অন্য একটি স্টেশনে কীভাবে একটি ট্রেন যায়, তা বিস্তারিত দেখানো হয়েছে।

জাদুঘরটিতে প্রধানত টেলিযোগাযোগ ও সংকেত বিভাগ, ট্রাফিক বিভাগ (ব্যবসা ও যোগাযোগ), পথ ও পূর্ত বিভাগ এবং যন্ত্রকৌশল বিভাগ— চারটি বিভাগই প্রাধান্য পেয়েছে। এখানে চিত্রের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে অবিভক্ত বাংলায় প্রথম রেললাইন স্থাপনের দৃশ্য। এখানে সংরক্ষিত আছে ১৯৪২ সালের ইস্টার্ন বেঙ্গল স্টেট রেলওয়ে ও বেঙ্গল আসাম রেলওয়ের মনোগ্রাম। আছে ১৯৭২ সালের স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রেলওয়ে মনোগ্রাম। বিভিন্ন যন্ত্রপাতি এবং সরঞ্জামাদির মধ্যে রয়েছে সিগনাল ফ্ল্যাগ, প্লাটফর্ম ল্যাম্প, ট্রেইল ল্যাম্প, এডলার ল্যাম্প, রেললাইনের বিভিন্ন বিম এবং স্লিপার (ব্রডগেজ ও মিটারগেজ), সংকেত বিভাগের অতীতে ব্যবহূত বিভিন্ন সরঞ্জাম। রয়েছে ১৯৬০-৭০ পর্যন্ত ব্যবহার্য বিভিন্ন অ্যানালগ ফোন এবং টেলিযোগাযোগ বিভাগের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি। আরো রয়েছে ১৯৪৮ সালে ব্যবহার করা গার্ড কন্ট্রোল সুইচ, ফেলি লাইট, ইলেকট্রো হাইড্রলিক, ১৯৮০-এর পূর্বে ব্যবহার্য ঝাড়বাতি, রোলিং স্টকে ব্যবহূত বিভিন্ন কালার কোড। একটি জাতির ঐতিহ্য, কৃষ্টি, সংস্কৃতি, স্বকীয়তা এবং মূলকে ধারণ করে সে দেশের জাদুঘরগুলো। চট্টগ্রামে অবস্থিত রেলওয়ে মিউজিয়াম সে রকমই একটি আত্মপরিচয়ের স্থান। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সূতিকাগার চট্টগ্রামে ব্রিটিশ নির্মিত রেলের আত্মপরিচয় এখান থেকেই জানা যায়। চট্টগ্রাম তথা বাংলার সমৃদ্ধির সেসব স্মৃতিস্মারক নিয়ে জাদুঘরটি পাহাড়বেষ্টিত পাহাড়তলীর নির্জন পাহাড়ে ইতিহাস সন্ধানে ডাক দেয়।

রেল কর্মযজ্ঞে সৌন্দর্যমণ্ডিত চট্টগ্রাম

সিআরবি এলাকার অপার সৌন্দর্য ছাড়াও পাহাড়তলী এলাকার বিভিন্ন ভূমি সবই চট্টগ্রামের রেলকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডের নিদর্শন বহন করে। রেলের কোচ তৈরি ও ইঞ্জিন মেরামত কারখানা ছাড়াও বাংলাদেশে রেলওয়ের সব প্রিন্টিং কার্যক্রম চলে এ এলাকায়। শহরের অধিকাংশ এলাকায় রয়েছে রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কলোনি ও বাংলো। পাহাড়ে পাহাড়ে রেল কর্মকর্তাদের বাংলো এখানকার আদি ইতিহাসকে মনে করিয়ে দেয় নিশ্চয়। এদিকে রেল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পানির সমস্যা সমাধানে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের তত্ত্বাবধানে ১৯২৪ সালে খনন করা হয় বর্তমানে ফয়’স লেক নামে পরিচিত কৃত্রিম লেক। শুরুতে পাহাড়তলী লেক নামে পরিচিত থাকলেও ইংরেজ রেল প্রকৌশলী ‘ফয়’-এর নামানুসারে এর নামকরণ হয়। পাহাড়ের এক শীর্ষ থেকে আরেক শীর্ষে আড়াআড়িভাবে বাঁধ নির্মাণ করে ৩৩৬ একর জমির ওপর স্থাপিত এ লেক কৃত্রিমতাকে ছাপিয়ে চট্টগ্রামের অকুণ্ঠ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ট্রেড মার্ক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। ১৯২০ সালে পাহাড়তলী এলাকায় আরো একটি কৃত্রিম লেক স্থাপন করা হয়। এছাড়া শহরের মধ্যেই এখনো রেলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বিশালাকৃতির বেশ কয়েকটি জলাধার। চট্টগ্রামের প্রধান বাণিজ্যিক এলাকা আগ্রাবাদের বিশালাকৃতির জলাধার ছাড়াও সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন স্থাপনা রেলের জমিতে নির্মিত। রেলের মালিকানাধীন সড়কে বাণিজ্যিক যানবাহন চলাচলে রেলওয়ে কিছুটা রক্ষণশীল হলেও এসব সড়ক চট্টগ্রামের যানজট থেকে পরিত্রাণ পেতে টনিকের কাজ করে চট্টগ্রামবাসীর। অন্যদিকে রেল কর্মযজ্ঞে প্রকৃতির কোলে মানবসৃষ্ট নিদর্শনগুলো চট্টগ্রামে পর্যটক আকর্ষণে ভূমিকা রাখে। সিআরবির শতবর্ষী রেইনট্রি কিংবা পাহাড়তলী এলাকার বনাঞ্চল শহরের বুকে এখনো প্রকৃতিকে লালন করে আছে পরম মমতায়। রেল ও চট্টগ্রাম এভাবেই এক সুতোয় একটি প্রাচীন শহরের নতুন অধ্যায় তৈরি করেছে। আগলে রেখেছে শহরের সৌন্দর্য, যা তার ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করে। অন্যদিকে রেলের এ ভূমিকা কয়েকশ বছরের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পালাবদলের এ শহরকে এগিয়ে যাওয়ার পথে আরো বেশি প্রাণিত করে। চট্টগ্রাম যেমন সম্ভাবনা ও সমৃদ্ধির শহর, তেমনি রেলেরও বটে। সুজিত সাহার লিখাটি বণিক বার্তা থেকে নেয়া।