রূপালী পর্দায় কবি নজরুল

প্রকাশ:| সোমবার, ২৫ মে , ২০১৫ সময় ০৮:৩৯ অপরাহ্ণ

অনুপম হায়াৎ:র বিজ্ঞানের অষ্টম আবিষ্কার এবং শিল্পকলার সপ্তম কলা হচ্ছে চলচ্চিত্র। আবার সপ্তকলাকে ধারণ করে চলচ্চিত্র হয়ে উঠেছে স্বয়ংসম্পূর্ণ এক মাধ্যম। এর আবিষ্কার পাশ্চাত্যে বৈজ্ঞানিকের ল্যাবরেটরিতে আর বিস্তার ঘটেছে ব্যবসায়ীদের হাতে। আর এটি শিল্প হয়ে উঠেছে সৃজন ও মননের স্পর্শে। এ ব্যাপারে অবদান রেখেছেন সৃজনশীল চিত্রপরিচালক, শিল্পী ও কবি-সাহিত্যিকরা।

বাংলা চলচ্চিত্র উন্মেষপর্বে সেই নির্বাক ও সবাক যুগে (১৯১৭-১৯৪৬) ক্রমেই শিল্পিত ও অভিজাত হয়ে ওঠে যুগস্রষ্টা কয়েকজন কবি-সাহিত্যিকের সৃষ্টিকর্ম ধারণ করে। যেমন সেই নির্বাক যুগে ১৯২২ সালে প্রথম চলচ্চিত্রায়িত হয় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘বিষবৃক্ষ’, শরত্চন্দ্রের উপন্যাস ‘আঁধারে আলো’ এবং ১৯২৩ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্প ‘মানভঞ্জন’। আর ১৯৩১ সাল থেকে বাংলা চলচ্চিত্র গানে গানে সরব হয়ে ওঠে কাজী নজরুল ইসলামের সংগীত ও সুরের স্পর্শে তাঁর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মাধ্যমে।

Kazi-Najrul-Islam-picকালজয়ী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম কাজী নজরুল ইসলাম১(১৮৯৯-১৯৭৬)। বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, সাংবাদিকতা, রাজনীতি, নাটক, বেতার, গ্রামোফোন ও চলচ্চিত্র তাঁর প্রতিভার স্পর্শে হয়েছে উজ্জ্বল। ১৯৪২ সালের জুলাই মাসে অসুস্থ হওয়ার আগে পর্যন্ত তিনি মেতেছিলেন ‘সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’। তাঁর সৃষ্টির ক্ষেত্র ছিল আধুনিক বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী জনপ্রিয় শিল্প গণমাধ্যম চলচ্চিত্রও। চলচ্চিত্রে তিনি অবদান রেখেছেন সুরভাণ্ডারি, পরিচালক, সংগীতকার, সুরকার, গীতিকার, অভিনেতা, গায়ক, চিত্রনাট্যকার, সংলাপকার ও সংগঠক হিসেবে। ১৯৩১ থেকে ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসে অসুস্থ হওয়ার আগে পর্যন্ত চিত্রলোকে নজরুল ছিলেন এক সক্রিয় ব্যক্তি। শুধু বাংলা চলচ্চিত্র নয়, নজরুলের দানে সমৃদ্ধ হয়েছে হিন্দি, উর্দু ও পাঞ্জাবি ভাষায় নির্মিত চলচ্চিত্রও।

নজরুলের জন্ম বায়োস্কোপ চালুর যুগে। তাঁর জন্মের দুই/তিন বছরের মধ্যেই মানিকগঞ্জের হীরালাল সেন কলকাতায় প্রথম বায়োস্কোপ বা চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। হীরালালই প্রথম বাঙালি চলচ্চিত্রকার। আর ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দে বিদ্রোহী প্রেমিক কবি নজরুল চলচ্চিত্রে জড়িত হয়ে বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে পথিকৃত্-এর মর্যাদা পান।

নজরুল মোট কটি চলচ্চিত্রের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তা এখনো পুরোপুরি বলা সম্ভব নয়। কেননা নজরুলের জীবন ও কর্ম মহাখনিতুল্য। গত ৪০-৫০ বছর ধরে গবেষণা করেও অনেকে নজরুল সম্পর্কে খুব সামান্যই জানতে পেরেছেন। এ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে দেখা যায়, নজরুল ২০-২১টি ছবির সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। এসব ছবির মধ্যে রয়েছে : জলসা (আবৃত্তি ও গান), ধূপছায়া, প্রহলাদ, বিষ্ণুমায়া, ধ্রুব, পাতালপুরী, গ্রহের ফের, বিদ্যাপতি (বাংলা), বিদ্যাপতি (হিন্দি), গোরা, সাপুড়ে (বাংলা), সাপেড়া (হিন্দী), নন্দিনী, চৌরঙ্গী (বাংলা), চৌরঙ্গী (হিন্দি), দিকশূল, অভিনয় নয়, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম (প্রামাণ্য চিত্র), বিদ্রোহী কবি (প্রামাণ্য চিত্র), কবি নজরুল (প্রামাণ্য চিত্র), কাজী নজরুল ইসলাম (প্রামাণ্য চিত্র) ও একটি উর্দু ছবি।

অবিভক্ত বাংলায় ব্যবসায়িক ভিত্তিতে চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করে পারসি চিত্র প্রতিষ্ঠান ম্যাডান থিয়েটারস। এই প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে কলকাতায় প্রথম নির্বাক বাংলা ছবি ‘বিল্বমঙ্গল’ নির্মিত হয় ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে। ম্যাডান থিয়েটারসই ১৯৩০-৩১ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম সবাক বাংলা ছবি নির্মাণেরও উদ্যোগ নেয় বাণিজ্যিক কারণে। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে নজরুলকে ম্যাডান থিয়েটারস ‘সুরভাণ্ডারি’ নিযুক্ত করে। নজরুলের সুরভাণ্ডারি নিযুক্ত হওয়ার সংবাদটি কলকাতার দৈনিক ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকায় ১৯৩১ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় ছাপা হয়।

সুরভাণ্ডারি হিসেবে নজরুলের দায়িত্ব ছিল সবাক চিত্রে অংশগ্রহণকারী নট-নটীদের কণ্ঠস্বর পরীক্ষা করা। উল্লেখ্য, সুরভাণ্ডারি পদটি সংগীত পরিচালকেরও ওপরে।

ম্যাডান থিয়েটারসে সুরভাণ্ডারি হিসেবে নজরুলের যোগদানের পরই পরীক্ষামূলকভাবে ৩০-৪০টি সবাক খণ্ডচিত্র নির্মিত হয়। এগুলো ‘জলসা’ নামে মুক্তি পায় ১৯৩১ সালের ১৩ মার্চ। সম্ভবত এই চিত্রে নজরুল তার ‘নারী’ কবিতাটি আবৃত্তি ও একটি গান পরিবেশন করেছিলেন; কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের, বাংলা সবাক চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অবিস্মরণীয় সেই ঘটনার প্রামাণ্য নিদর্শনটি এখন দুষ্প্রাপ্য।

নজরুল ম্যাডান থিয়েটারসে যোগদানের পর এই প্রতিষ্ঠানের প্রযোজনায় কয়েকটি সবাক ছবি মুক্তি পায় ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দে। এগুলোর মধ্যে ছিল প্রথম বাংলা সবাক ছবি—জামাই যষ্ঠী, জোর বরাত, ঋষির প্রেম, তৃতীয় পক্ষ, প্রহলাদ ও লায়লা। এসব ছবির সংগীত পরিচালক ভিন্ন হলেও ‘সুরভাণ্ডারি’ হিসেবে নজরুলের অবশ্যই অবদান থাকার কথা। এর মধ্যে ‘প্রহলাদ’ ছবিতে ধীরেন দাসের কণ্ঠে কয়েকখানি সুশ্রাব্য নজরুলগীতি (সুরসহ) ব্যবহূত হয়েছে বলে অশোক কুমার মিত্রের সূত্রে জানা যায়। তিনি ম্যাডান থিয়েটারসের ‘বিষ্ণুমায়া’ (১৯৩২) ছবিতেও ধীরেন দাসের কণ্ঠে নজরুলগীতি (সুরসহ) ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেছেন; কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, ‘প্রহলাদ’ এবং ‘বিষ্ণুমায়া’র প্রিন্ট এবং বুকলেটও দুষ্প্রাপ্য। ফলে এসব ছবিতে নজরুল সংশ্লিষ্টতার বিস্তারিত ও প্রামাণ্য তথ্য পাওয়া যায় না।

১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দে নজরুল ‘ধূপছায়া’ নামে একটি ছবি পরিচালনা ও সে-ছবির সংগীত পরিচালনা এবং তিনি বিষ্ণুর ভূমিকায় অভিনয় করেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। চলচ্চিত্রের ইতিহাস খুঁজে অবশ্য এ নামে কোনো ছবি পাওয়া যায় না। তবে হতে পারে ধূপছায়া একটি অসমাপ্ত বা অমুক্তিপ্রাপ্ত ছবি।

National-Poet-Kazi-Nazrul-Islam-4v১৯৩২-৩৩ খ্রিষ্টাব্দে ম্যাডানের প্রযোজনায় আরও কয়েকটি সবাক ছবি মুক্তি পায়। এ সবের মধ্যে ছিল কৃষ্ণকান্তের উইল, চিরকুমারী, কলংক ভঞ্জন, রাধাকৃষ্ণ। এসব ছবিতে সুরভাণ্ডারি নজরুলের কণ্ঠস্বর ব্রাশআপ করা অনেক নট-নটী, গায়ক-গায়িকা, নায়ক-নায়িকা, অভিনেতা-অভিনেত্রী ছিলেন। শুধু ম্যাডান থিয়েটারস নয়, ওই সময়ের বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান নিউ থিয়েটারস, ইস্ট ইন্ডিয়া ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিজ প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের ছবিতেও নজরুলের কাছে ট্রেনিংপ্রাপ্ত শিল্পীরা অংশ নিয়ে সবাক পর্বের চিত্রজগেক মাতিয়ে তোলেন।

ম্যাডান থিয়েটারসের অন্যতম পার্টনার মিসেস পিরোজ ম্যাডান ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দে পায়োনীয়ার ফিল্মস কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রতিষ্ঠান থেকে গিরিশ চন্দ্রের ‘ধ্রুব চরিত’ নিয়ে ছবি নির্মাণের ঘোষণা দেওয়া হয়। ‘ধ্রুব’র পরিচালক নিযুক্ত হন কাজী নজরুল ইসলাম ও সত্যেন্দ্রনাথ দে। নজরুল এ ছবির সংগীত পরিচালনা ও গান রচনা করেন। তিনি ছবির নারদ চরিত্রে রূপদান করেন এবং গানেও কণ্ঠ দেন। নজরুল ছবির ১৮টি গানের মধ্যে ১৭টি গান রচনা করেন এবং একটি গানে অংশ নেন।

‘ধ্রুব’ চিত্রে নজরুল রচিত ও সুরারোপিত গানগুলো হচ্ছে :

১. জাগো ব্যথার ঠাকুর ২. অবিরত বাদল বরষিছে ৩. চমকে চপলা মেঘে মগন গগন ৪. ধূলার ঠাকুর, ধূলার ঠাকুর ৫. হরিনামের সুধার ৬. আমি রাজার কুমার ৭. হে দুঃখ হরণ ভক্তের সারণ ৮. শিশু নটবর নেচে যায় ৯. মধুর ছন্দে নাচে আনন্দে ১০. গহন বনে শ্রীহরি নামের ১১. দাও দেখা দাও দেখা ১২. ফুটিল মানস মাধবী কুঞ্জে ১৩. হূদিপদ্মে চরণ রাখো ১৪. ফিরে আয় ওরে ফিরে আয় ১৫. নাচো বনমালী ১৬. জয় পীতাম্বর শ্যাম সুন্দর ১৭. কাঁদিসনে আর কাঁদিসনে।

ছবিতে গিরিশচন্দ্র ঘোষ রচিত গানটির প্রথম চরণ হচ্ছে—’আয়রে আয় হরি’। ছবিতে নজরুল নারদ চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। তিনি স্বকণ্ঠে একটি গানও গেয়েছিলেন (ফুটিল মানস মাধবী কুঞ্জে)।

ইতিহাসবিদ কালীশ মুখোপাধ্যায় ধ্রুব-কে চিহ্নিত করেছেন অত্যন্ত নিকৃষ্ট ধরনের চিত্র হিসেবে। আর অধ্যাপক অরুণ দত্ত গুপ্ত ধ্রুব-কে ভালো সংগীতবহুল ছবি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

সমালোচক খগেন্দ্রনাথ রায় লেখেন : ধ্রুব হয়েছে একখানি যাত্রান্তরিত নাটক। ধ্রুব ছবির অভিনয়ে নজরুল নতুনত্ব এনেছিলেন ‘নারদ’ চরিত্রের মেকআপে। তিনি অশীতিপর নারদকে আটাশে নামিয়ে আনেন, পোশাকও বদলে ফেলেন। নজরুলের এই ‘বিদ্রোহ’ ও নবনারদী রূপ নিয়ে পত্র-পত্রিকা ও বিভিন্ন মহলে তুমুল সমালোচনা হয়; কিন্তু নজরুল তাঁর যুক্তি দিয়ে বলেছেন, ‘আমি চিরতরুণ ও চিরসুন্দর প্রিয় নারদের রূপই দেবার চেষ্টা করেছি।’

ধ্রুব মুক্তি পেয়েছিল ১৯৩৪ সালের ১ জানুয়ারি; কিন্তু এই ছবি মুক্তির সঙ্গে সঙ্গেই ম্যাডান থিয়েটারসের সঙ্গেও নজরুলের সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়। কারণ ম্যাডান থিয়েটারস কবির সঙ্গে প্রতারণা করেছিল।

১৯৩৫ সালের ২৩ মার্চ কলকাতার রূপবাণী প্রেক্ষাগৃহে যখন কালী ফিল্মস প্রযোজিত প্রিয়নাথ গাঙ্গুলী পরিচালিত ‘পাতালপুরী’ মুক্তি পায়, তখন দর্শকরা দুই সাহিত্যিক বন্ধুর সম্মিলিত মেধার সঙ্গে পরিচিত হয়। এঁদের একজন কাহিনিকার, চিত্রনাট্যকার শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, আরেকজন এ ছবির সংগীত পরিচালক গীতিকার, অভিনেতা কাজী নজরুল ইসলাম।

ছবিতে নজরুল রচিত ও সুরারোপিত গানগুলো হচ্ছে : ১. এলো খোঁপায় পরিয়ে দে ২. আঁধার ঘরের আলো ৩. শিকারী মারিস না তুই ৪. ধীরে চল চরণ ৫. ফুল ফুটেছে কয়লা ফেলা ৬. তালপুকুরে তুলছিল সে শালুক ৭. দুঃখের সাথী গেলি কই ৮. বল কত দূরে যাই।

এ ছবির কাহিনি গড়ে উঠেছে কয়লা খনির শ্রমিক নারী-পুরুষদের নিয়ে। নজরুল ছবির কাহিনির মূল ‘থিম’ অনুযায়ী সংগীত সৃষ্টির জন্য বর্ধমানের কয়লা খনি অঞ্চলেও গিয়েছিলেন প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য। এ ছবিতে তিনি ‘ঝুমুর’ নামে নতুন সুর সৃষ্টি করেছিলেন। সমালোচকরা ছবির নিন্দা করলেও সংগীতের প্রশংসা করেছিলেন।

পৌরাণিক ‘ধ্রুব’ এবং কয়লা খনির শ্রমিক-জীবননির্ভর ‘পাতালপুরী’র পর নজরুল হত্যা-রহস্য-রোমাঞ্চ-প্রেমনির্ভর ‘গ্রহের ফের’ ছবির সংগীত পরিচালনা করে বিচিত্র ও সৃজনশীল প্রতিভার পরিচয় দেন। দেবদত্ত ফিল্মস প্রযোজিত চারু রায় পরিচালিত ‘গ্রহের ফের’ মুক্তি পায় ১৯৩৭ সালের ৪ ডিসেম্বর। ছবিতে অজয় ভট্টাচার্যের লেখা গানের সুর দিয়েছিলেন নজরুল।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিকট আত্মীয় ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় (ডি.জি) পরিচালিত ‘হালবাংলা’ চিত্রের একটি ছোট্ট চরিত্রে নজরুল অভিনয় করেন বলে জানা যায়। দৃশ্যটি ছিল কৌতুককর। হালবাংলা মুক্তি পেয়েছিল ১৯৩৮ সালের ১২ মার্চ।

কাজী নজরুল ইসলামের কাহিনি, গান ও সুর অবলম্বনে ১৯৩৮ সালে বাংলা ও হিন্দি ভাষায় নির্মিত হয় ‘বিদ্যাপতি’। বিদ্যাপতি এর আগে পত্রিকায় প্রকাশিত হয়, মঞ্চে অভিনীত হয় এবং গ্রামোফোন রেকর্ডে নাট্যাকারে প্রকাশিত হয়। এই ছবির মাধ্যমে নজরুলের সুনাম লাহোর, করাচি, মুম্বাই, কলকাতা, ঢাকা, সিলেট, বরিশাল হয়ে সুদূর রেঙ্গুন পর্যন্ত পৌঁছায়। ১৯৩৮ সালের এপ্রিল মাসে বাংলা বিদ্যাপতি একযোগে ১৩টি হলে মুক্তি পায়। এর মধ্যে ৭টি হল ছিল বর্তমান বাংলাদেশ অঞ্চলে।

ছবির পরিচালক দেবকী কুমার বসু আর সংগীত পরিচালক রাইবাঁদ বড়াল। প্রযোজনায় নিউ থিয়েটারস।

বিদ্যাপতি চিত্রে নজরুলের গানগুলো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এ ছবির সংলাপ ও চিত্রনাট্য নজরুলেরই লেখা বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। যেহেতু ‘বিদ্যাপতি’ নাটকের রচয়িতা নজরুল, কাজেই ছায়াছবিতে এর সংলাপ এবং চিত্রনাট্যও তাঁরই রচনা হতে পারে।

বাংলা চলচ্চিত্রে রবীন্দ্র ও নজরুল-প্রতিভার সমন্বয় ঘটে ‘গোরা’ চলচ্চিত্রে ১৯৩৮ সালে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস অবলম্বনে নরেশ মিত্র পরিচালিত এই চিত্রের সংগীত পরিচালনা করেন কাজী নজরুল ইসলাম। ছবিতে তিনটি রবীন্দ্রসংগীত ও একটি নজরুলগীতি ব্যবহূত হয়েছিল। রবীন্দ্রসংগীত ছিল :

১. প্রতিদিন হয় ২. ওহে সুন্দর মম ৩. রোদন ভরা এ বসন্ত। এ ছবির মুক্তিপর্বে বিশ্বভারতী বোর্ড আপত্তি তোলে নজরুলের পরিচালনায় রবীন্দ্রসংগীতের যথার্থতা নিয়ে। নজরুল তখন রবীন্দ্রনাথের কাছে সশরীরে উপস্থিত হয়ে কবির সম্মতি আদায় করেন। বিশ্বভারতীর আচরণের জবাবস্বরূপ নজরুল ‘ঊষা এলো চুপি চুপি’ নামে একটি গান রচনা করে এই ছবিতে যুক্ত করেন।

অরূপ দত্ত গুপ্ত লিখেছেন, ‘গোরা ছবিতে নজরুলের সংগীত পরিচালনা তাঁর সংযম ও পরিমিতি বোধের জন্য সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। এই ছবিতে রবীন্দ্রসংগীত যেভাবে ব্যবহূত হয়েছে, তাতে রবীন্দ্রসংগীতেরই বৈশিষ্ট্য রক্ষিত হয়েও একটা অভিনব মেজাজ তৈরি হয়েছে এবং এর পুরো কৃতিত্বটি নজরুলের।’

নজরুল রচিত আরও একটি কাহিনির চলচ্চিত্ররূপ দেন দেবকী কুমার বসু। এটি হচ্ছে—’সাপুড়ে’। বাংলা ও হিন্দি ভাষায় নির্মিত এই চিত্রটি ১৯৩৯ সালে মুক্তি পেয়ে সুপারহিট হয়। বেদে-জীবননির্ভর এই চিত্রের সাতটি গান নজরুলেরই লেখা এবং সুরও তাঁরই সৃষ্টি। ছবির সংগীত পরিচালনা করেন রাইচাঁদ বড়াল। ছবিতে নজরুলের গানগুলো হচ্ছে : ১. হলুদ গাঁদার ফুল ২. আকাশে হেলান দিয়ে ৩. কথা কইবে না বউ ৪. কলার মান্দাস বানিয়ে দাও ৫. পিছল পথে কুড়িয়ে পেলাম ৬. ফুটফুটে চাঁদ হাসেরে ৭. দেখিলো তোর হাত দেখি।

বিদ্যাপতির মতো সাপুড়ে ছবির গানও লোকের মুখে মুখে ফিরতে থাকে। ছবিতে কানন দেবীর গাওয়া গান ‘আকাশে হেলান দিয়ে’ বা ‘কথা কইবে না বউ’ জনপ্রিয় হয়।

নজরুলের একান্ত সুহূদ সাহিত্যিক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় নিজের কাহিনি অবলম্বনে ১৯৪১ সালে ‘নন্দিনী’ নামে একটি ছবি পরিচালনা করেন। এই চিত্রে নজরুলের লেখা ও সুরে ‘চোখ গেল চোখ গেল পাখিরে’ গানটি ব্যবহূত হয়। ছবিতে গানে কণ্ঠ দেন শচীন দেব বর্মণ।

১৯৪১ সালে নজরুলের উদ্যোগ ও নেতৃত্বে গঠিত হয় চলচ্চিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘বেঙ্গল টাইগার পিকচার্স’। এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত হন আব্বাসউদ্দীন আহমদ, ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরু, হুমায়ূন কবীর, এস ওয়াজেদ আলী, মোহাম্মদ মোদাব্বের, আজিজুল ইসলাম, সারওয়ার হোসেন, আজিজুল হক প্রমুখ। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ছিলেন এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান পৃষ্ঠপোষক।

বি. টি পিকচার্স থেকে নজরুল নিজের লেখা কাহিনি, চিত্রনাট্য, সংলাপ, গান ও সুর অবলম্বনে ‘মদিনা’ নামে একটি চলচ্চিত্র পরিচালনার কথা ঘোষণা করেন। মদিনা-র জন্য নজরুল গান ও সুর রচনা করেন এবং চিত্রনাট্যের প্রাথমিক খসড়াও তৈরি করেন। কিন্তু আর্থিক অবস্থা ও হঠাত্ অসুস্থতার কারণে মদিনা আর চলচ্চিত্রায়িত হয়নি।

nazrul_01‘চৌরঙ্গী’ নামে কলকাতায় একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু হয় ১৯৪০ দশকের প্রথম দিকে। তবে ছবিটি মুক্তি পায় নজরুলের অসুস্থতা শুরু হওয়ার সময়, ১৯৪২ সালে। বাংলা ও হিন্দি ভাষায় নির্মিত এই চলচ্চিত্রে নজরুল গীতিকার সুরকার ও সংগীত পরিচালক এবং নেপথ্য সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বাংলা চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেন নবেন্দু সুন্দর।

বাংলা চৌরঙ্গী চিত্রে নজরুলের ৮টি গান রয়েছে। গানগুলো হলো : ১. রুম ঝুম ঝুম ঝুম ২. জহরত পান্না হীরার বৃষ্টি ৩. সারাদিন ছাদ পিটি ৪. চৌরঙ্গী চৌরঙ্গী ৫. প্রেম আর ফুলের ৬. ঘুমপাড়ানি মাসিপিসি ৭. ঘরছাড়া ছেলে ৮. ওগো বৈশাখী ঝড়। হিন্দি চৌরঙ্গী পরিচালনা করেন এস. ফজলী। ছবিতে গানের সংখ্যা ১৩টি। এর মধ্যে ৭টি গানের সুরকার ও গীতিকার নজরুল। গানগুলো হচ্ছে : ১. চৌরঙ্গী হ্যায় ইয়ে চৌরঙ্গী ২. সারাদিন ছাদ পিটি ৩. আ-জারি নিদিয়া ৪. উহ করকে আয় ৫. মো উমপে গুজরাতি ৬. ক্যায়সে মিলান ৭. হাম ইসকে মারোকা। বাংলা ও হিন্দি চৌরঙ্গী-র গান ও সুর হয়েছিল জনপ্রিয়।

নজরুল অসুস্থ হন ১৯৪২ সালের ৯ জুলাই। তাঁর অসুস্থতার পর আরও কয়েকটি চিত্রে তাঁর রচিত গান ও সুর ব্যবহূত হয়েছে। প্রেমাংকুর আতর্থী পরিচালিত ‘দিকশূল’ (১৯৪৩) চিত্রে দুটি গান-’ঝুমকো লতার জোনাকি’ ও ‘ফুরাবে না মালা গাঁথা’ এবং শৈলজানন্দ পরিচালিত ‘অভিনয়’ (১৯৪৫) চিত্রে একটি গান ‘ও শাপলা ফুল নেব না’ রয়েছে।

অসুস্থ হওয়ার পর মৃত্যুর আগে পর্যন্ত কয়েকটি প্রামাণ্য চলচ্চিত্রেও নজরুলকে দেখা যায় প্রত্যক্ষভাবে। তবে এসব ছবিতে অন্যেরা তাঁকে ব্যবহার করেছেন। উত্সাহীদের কাছে এসব ছবি খুবই গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে, এতে জীবন্ত নজরুলকে দেখা যায়—দেখা যায় ঘুমন্ত বিদ্রোহী সিংহকে।

নজরুল-সংশ্লিষ্ট তেমনি কয়েকটি প্রামাণ্যচিত্র হচ্ছে : পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রযোজিত ‘বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম’ (১৯৫৬-৫৭), পাকিস্তান চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর প্রযোজিত ‘বিদ্রোহী কবি’ (১৯৭০), ভারত সরকার প্রযোজিত ‘কাজী নজরুল ইসলাম’ (১৯৭২) এবং বাংলাদেশ আমলে চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর প্রযোজিত ‘কবি নজরুল’ (১৯৮০-৮১) ও বিবিসি টিভি চ্যানেল ফোর (লন্ডন) প্রযোজিত ‘কাজী নজরুল ইসলাম’।

ব্রিটিশ আমলে, পাকিস্তান আমলে, বাংলাদেশ আমলে উপমহাদেশের বিভিন্ন ছবিতে প্রযোজক-পরিচালকরা নজরুলের গান, সুর, সংগীত, কাহিনিকে নানাভাবে ব্যবহার করেছেন, কখনো স্বীকৃতি দিয়ে, কখনো বিনা স্বীকৃতিতে। এসব ছবির মধ্যে উল্লেখ করা যায়—চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন, মৃত্যুক্ষুধা (অসমাপ্ত), তিন কন্যা, নবাব সিরাজদ্দৌলা, হাসুলী বাঁকের উপকথা, দাদা ঠাকুর, বিষ্ণুপ্রিয়া, শ্রী শ্রী তারকেশ্বর, সুবর্ণ গোলক, দেবদাস, বারবধূ, নীলকণ্ঠ, আগমন, জীবন থেকে নেয়া, কোথায় যেন দেখেছি, বধূ বিদায়, লায়লী মজনু, রঙিন নবাব সিরাজদ্দৌলা, শান্তির প্রহরী ইত্যাদি।

নজরুল শুধু চলচ্চিত্র মাধ্যমের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন না—তাঁর প্রেরণারও উত্স ছিল চলচ্চিত্র। নিতাই ঘটকের স্মৃতি থেকে জানা যায়, ১৯৩০-এর দশকে নজরুল সেকালের বিখ্যাত ইংরেজি ছবি ‘পেগ্যান লাভ সঙ’-এ নায়ক র্যামন নোভারোর কণ্ঠে ‘কাম টু মি হোয়ার দি মুনস বীমস’ গান শুনে এতই মুগ্ধ হন যে, বাড়ি ফেরার পথেই মুখে মুখে তিনি রচনা করেন, ‘দূর দ্বীপবাসিনী চিনি তোমারে চিনি’ গানের প্রথম পর্ব। অনেকেই নজরুলের সেই বিখ্যাত কবিতা ‘ট্রেড শো’র কথাও জানেন। সেই কবিতায় নজরুল সেকালের নতুন প্রেক্ষাগৃহ রূপবাণী-গান্ধী-রবীন্দ্রনাথ-সুভাষ-জহরলালের সঙ্গে তুলনা করে অনুরাধা-নিউ থিয়েটারস-ভাগ্যচক্র-পাহাড়ী-দুর্গাদাস-সায়গল-পংকজ-অমর-দেবকী কুমার-অশোক কুমার-অচ্ছুত কন্যার প্রসঙ্গ টেনে লিখেছেন :

‘হায়রে বিংশ শতাব্দী, হায় বাংলার যৌবন

নিকট, কপট ছায়াপট প্রেমে পড়িয়াছে জনগণ।

বাণীচিত্রে যা ফুটে ওঠে তা কি এই জীবনের ছায়া?

এই বিকৃতি কাগজের ফুল এই মরীচিকা মায়া?’

সম্ভবত নজরুল এই কবিতাটি লিখেছিলেন প্রমথেশ বড়ুয়া পরিচালিত ‘বাংলা ১৯৮৩’ ছবির প্রথম প্রদর্শনী উপলক্ষে। প্রদর্শনী হয়েছিল ১৯৩২ সালের ২৬ ডিসেম্বর কলকাতার রূপবাণী প্রেক্ষাগৃহে। এর আগের সপ্তাহে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই প্রেক্ষাগৃহের উদ্বোধন করেছিলেন।

নজরুল সম্পাদিত পত্র-পত্রিকায়ও চলচ্চিত্র অন্যতম বিষয় হিসেবে ঠাঁই পেত। ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দে নজরুলের প্রধান সম্পাদকত্বে ‘দৈনিক নবযুগ’ পত্রিকার অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে সাপ্তাহিক একটি বিভাগের নাম ছিল ‘রূপ ও ছন্দ’। এটি পরিচালনা করতেন রূপকার।

জাতীয় কবি, প্রথম বাঙালি মুসলমান চিত্রপরিচালক, সুরভান্ডারি, সংগীত পরিচালক, গীতিকার, সুরকার, গায়ক, অভিনেতা, কাহিনিকার, সংগঠক কাজী নজরুল ইসলাম প্রত্যক্ষভাবে, শারীরিকভাবে এবং প্রামাণ্যভাবে যেসব চলচ্চিত্রে জড়িত ছিলেন, সেসব সংক্রান্ত যাবতীয় নিদর্শন (প্রিন্ট, ক্যাসেট, সার্টিফিকেট, চিত্রনাট্য, শুটিং স্ক্রিপ্ট, স্থিরচিত্র, বিজ্ঞাপন, আলোচনা, সমালোচনা, রেকর্ড, পোস্টার, ব্যানার) অনতিবিলম্বে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা হোক। দেশে তথ্য মন্ত্রণালয়, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, নজরুল ইন্সটিটিউট, ফিল্ম আর্কাইভ, জাতীয় জাদুঘর, শিল্পকলা একাডেমী, ডিএফপি, টেলিভিশন, এফডিসি, গণমাধ্যম ইন্সটিটিউট রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান নজরুল-চলচ্চিত্র-নিদর্শন সংগ্রহ ও সংরক্ষণের মাধ্যমে এই প্রজন্মকে উদ্দীপ্ত করবে।

দেশে ফিল্ম আর্কাইভ হয়েছে ১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দে। দীর্ঘ এই সময়ের মধ্যে নজরুল পরিচালিত ধ্রুব ছবির ১৮টি রিলের মধ্যে মাত্র একটি রিল সংগ্রহ করা হয়েছে। নজরুল ইন্সটিটিউট অদ্যাবধি তাঁর ছবির কোনো নিদর্শন সংগ্রহের উদ্যোগই নেয়নি। অন্যান্য প্রতিষ্ঠান বিবিধ কাজ-কর্ম নিয়ে অতি ব্যস্ত থাকলেও জাতীয় কবির প্রতি দেখাচ্ছে চরম অবহেলা। আমরা চাই, বর্তমান বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী গণমাধ্যম চলচ্চিত্রের ফিতেয় বন্দি নজরুলের জীবন ও কর্মের নিদর্শন প্রেক্ষাগৃহে, টিভিতে, অডিটরিয়ামে, মেলায়, অনুষ্ঠানে হোক বারংবার প্রদর্শিত। চলচ্চিত্রের শতবর্ষের পথপরিক্রমায় আমাদের চেতনার পর্দায় প্রতিফলিত হোক নজরুল চিত্র, সাউন্ডট্যাকে উচ্চারিত হোক তাঁর গান ও সুর। [লেখাটি সংগৃহীত]