রুপাইখাল দখলের মহোৎসব

নিউজচিটাগাং২৪/ এক্স প্রকাশ:| শুক্রবার, ৪ মে , ২০১৮ সময় ১০:২২ অপরাহ্ণ

পেকুয়া প্রতিনিধি
পেকুয়ার রুপাইখাল মগনামা ইউনিয়নের মৎস্য প্রজনন ও জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষনের অন্যতম উৎস। সরকারী ১নং খাস খতিয়ানের বদ্ধ জলমহাল। হাজার হাজার মানুষ এ খালের উপর নির্ভরশীল হয়ে জীবিকা নির্বাহ করে। বর্তমানে এ খালটি চলে যাচ্ছে ভূমি চক্রের দখলে। দিনদিন দখল অব্যাহত রাখায় খালটি মৃত হওয়ার উপক্রম হচ্ছে। আর দখলের এ উৎসবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ওই ইউনিয়নের ধারিয়াখালী এলাকার মৃত ফেরদৌসের ছেলে ইউনিয়ন যুবদল নেতা ইখতিয়ার উদ্দিন। একটি সিন্ডিকেট তৈরি করে তিনি দখল চক্র অব্যাহত রেখেছেন বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন। স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন কয়েকবার অভিযান চালিয়ে দখল চেষ্টা বন্ধ করার প্রয়াস চালঅলেও কিছুদিন বন্ধ থাকার পর আবারো দখল চক্রে মতে ওঠেন যুবদল নেতা। এ নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের জোরালো ভূমিকার দাবী জানিয়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পশ্চিমে কুতুবদিয়া চ্যানেল, পূর্বদিকে কাটাফাঁড়ি নদী এ সঙ্গমস্থলে রুপাইখালের উৎপত্তি। মগনামা ইউনিয়নের মৎস্য প্রজনন ও জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষনের অন্যতম উৎস। এ খালে মৎস্য আহরন করে জীবিকা নির্বাহ করছে শত শত জেলে। তারা প্রানপন চেষ্টা করছে খাল অবমুক্ত রাখতে। কিন্তু বিগত ১মাস আগ থেকে যুবদল নেতা ইখতিয়ার উদ্দিন খাল দখলে নিতে বাঁধ তৈরী করে। স্ক্যাভেটর দিয়ে মাটি ভরাট করে খালের প্রবাহমান অংশ দখলে নেয়।রুপাইখালের জেগে উঠা চর ভরাট করে সেখানে তৈরী করছে লবণ চাষের জমিসহ বসতবাড়ি। এ কারণে পানি চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আবাদি জমি অনাবাদিতে পরিণত হচ্ছে। এ বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা জবরদখল ঠেকাতে ও বন্দোবস্তীসহ লিজ কার্যক্রম স্থগিত রাখতে বিগত কয়েকমাস আগে মহামান্য হাইকোর্টে রিট আবেদন দায়ের করে। বিচারপতি জাফর আহমদ ও নাঈমা হায়দারের হাইকোর্ট বেঞ্চে মামলাটি শুনানীধীন আছে। তারপরও যুবদল নেতা প্রশাসনকে বৃদ্ধাগুলি দেখিয়ে দখল উৎসবে মেতে আছে।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, প্রায় ১শ ৭০ একরেরও অধিক রুপাইখালের আয়তন। এক সময় প্রচন্ড গভীর ছিল খালটি। বর্তমানে খালের বিপুল অংশ পলি জমে ভরাট হয়ে যায়। দরদরিঘোনার অংশে খাল নেই। চাষীরা লবণ উৎপাদন করছে এ খালে। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ জিয়া ও এরশাদ সরকারের সময় বন্দোবস্তী মুলে দখলে দেয় স্থানীয়দের। ৯০ দশকের পর বিএনপি সরকার দলীয় বিবেচনায় নেতা-কর্মীদের অনুকুলে এ খাল লীজ দেয়। রুপাইখাল মগনামা ইউনিয়নের অর্থনীতির অন্যতম প্রানের স্পন্দন। সেটি সরকারের বদ্ধ জলমহল শ্রেনীভূক্ত সম্পত্তি। এ খালের দু’পাড়ে মানুষের বসতি রয়েছে। সরকারের খাস জমিতে মানুষ বসবাস করছিল যুগ যুগ ধরে। তারা অত্যন্ত দরিদ্র। খাল থেকে মৎস্য আহরন করে সংসার চালায়। এ ছাড়া রুপাইখাল পানি নিষ্কাশনের অন্যতম মাধ্যম এ ইউনিয়নে। মধ্যম পূর্ব দক্ষিন পশ্চিম অংশের লোকালয়ের পানি এ খালের উপর দিয়ে গিয়ে নদীতে চলাচল করে।যুবদল নেতার নেতৃত্বেকাটাফাঁড়ি সোনালী বাজার সড়কের লায়ন মুজিবের বাড়ি সংলগ্ন রুপাইখাল অংশ দখল চলছে। তার বাড়ির দক্ষিন পাশের্^ রুপাইখাল হওয়ায় দখল অব্যাহত রাখলেও প্রতিবাদ করার সাহস পায়না স্থানীয়রা। একে একে সরকারের ১নং খাস খতিয়ানের খাল শ্রেনীর ওই সম্পত্তির প্রায় ৫ একর তার কব্জায় নিয়ে যায়। যার কারণে দরদরিঘোনা, ব্যাঙকুয়াল ঘোনা, বাইন্নাঘোনা, রুকের চর, দারিয়াখালী ও কুমপাড়া হয়ে প্রায় ৫ কিলোমিটার বিস্তৃত কাটাফাঁড়ি সোনালী বাজার সড়কের আমজাবর বাড়ির নিকট বেড়িবাঁধে এর গতি থামিয়ে দেয়।

মগনামা ইউনিয়নের বাইন্নাঘোনা ও ধারিয়াখালীর লোকজন জানায়, রুপাইখাল ভূমিগ্রাসীদের নজরে এসেছে। এর আগেও অনেকে দখলের চেষ্টা করে। আমরা মৎস্য শিকারী ও লবণ চাষীরা আন্দোলন সংগ্রাম করে এদের হটিয়েছি। ইখতিয়ার একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। এক সময় ছাত্রদলের দুর্ধর্ষ ক্যাডার ছিল। জোট সরকারের সময় ২০০৫ সালে সে ছিল দুরন্ত ও দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী। ওই বছর তার নেতৃত্বে ছাত্রদল ও যুবদল ক্যাডাররা সোনালী বাজারে বঙ্গবন্ধুর শোক দিবসের কাঙ্গালী ভোজে হানা দেয়। অস্ত্র স্বস্ত্র নিয়ে তারা রান্না করা মাংসের ডেকসি ছুড়ে মারে। শোক দিবসে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ চলছিল। ইখতিয়ার মাইক্রোফোন ভাংচুরসহ তান্ডব চালায়। বিরোধীদলীয় নেতা-কর্মীদের হামলা ও মারধর করা হয়। বর্তমানে যুবদলের রাজনীতির স্থানীয় শীর্ষ ক্যাডার। সেই ব্যক্তি স্থানীয় বলয় সৃষ্টি করে খাল দখল করে যাচ্ছে। স্থানীয় থানায় লিখিত এজাহার দায়ের করা হলেও মামলা হয়না তার বিরুদ্ধে।
সর্বশেষ উপজেলা আইন শৃংখলা কমিটির সভায় খাল দখলের বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। বৈঠকে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ইউএনও ও ওসিকে তাগিদ দেয়। জেলা প্রশাসক কক্সবাজারকে অবহিত করা হয়। প্রশাসন অভিযান পরিচালনা করে। জবর দখলকারী ইখতিয়ার উদ্দিনের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নিতে সিদ্ধান্ত হয়। তার বিরুদ্ধে মামলা রেকর্ডের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। পেকুয়া থানা পুলিশকে নির্দেশনা দেওয়া হয় মামলা রেকর্ড করে তাকে গ্রেফতার করতে। স্থানীয় ৬ নং ওয়ার্ডের সদস্য নুরুল আজিম বাদী হয়ে অভিযোগ দেয়। সেটি নিয়মিত মামলা রুজু করতে জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওসিকে নির্দেশনা দেয়। এর প্রেক্ষিতে ইউপি সদস্য নুরুল আজিম অভিযোগ দেয়। তবে সে সময় থেকে ওই অভিযোগ ঝুলন্ত আছে। অদৃশ্য কোন কারনে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়নি এমনকি বাঁধ এখনও অপসারিত না হওয়ায় জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তার খুটির জোর কোথায় এখন এ প্রশ্ন মগনামায়। ইউএনও একাধিকবার ওই স্থান পরিদর্শন করেছেন। কানুনগো ও ভূমি অফিস বাঁধ অপসারন করছিলেন। ইউপি সদস্য নুরুল আজিম জানায়, ভূমি অফিস আমাকে দায়িত্ব দিয়েছিল বাঁধ অপসারন করতে। তারা ২/১ দিন এসেছিল। আমার অভিযোগ এখনো মামলা হিসেবে রেকর্ড হয়নি। এ ভাবে চললে এ খাল ইখতিয়ারসহ ভূমিদস্যুরা গ্রাস করে ফেলবে।
এ বিষয়ে জানতে ওসি পেকুয়ার সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পেকুয়ার কানুনগো শান্তি জীবন চাকমা জানায়, রুপাইখাল ১ নং খাস খতিয়ানভূক্ত সম্পত্তি। ইখতিয়ারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অবশ্যই নিতে হবে। আমরা বাঁধ অপসারন করেছি। স্ক্যাভেটর জব্দ করতে গিয়েছিলাম। তবে তারা স্ক্যাভেটরটি সরিয়ে ফেলে। প্রয়োজনে আবার যাব। এ বিষয়ে জানতে ইউএনও মাহাবুব উল করিম এর মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়, তিনি ফোন রিসিভ না করায় বক্তব্য পাওয়া যায়নি।