রাজনীতি পাচ্ছে নতুন মেরূকরণ

mirza imtiaz প্রকাশ:| বৃহস্পতিবার, ১৮ অক্টোবর , ২০১৮ সময় ০১:৪১ পূর্বাহ্ণ

সদ্য আত্মপ্রকাশ করা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে কেন্দ্র করে নানা আলোচনা দেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে। রাজনীতি পাচ্ছে নতুন মেরূকরণও। সবচেয়ে বেশি সরব হয়ে উঠেছে জোট রাজনীতি। একদিকে যেমন বিভিন্ন জোটের মধ্যে ভাঙন শুরু হয়েছে; তেমনি জোট সম্প্রসারণের খবরও শোনা যাচ্ছে। আসছে নতুন জোট গঠনের তথ্য। বিদ্যমান বিভিন্ন জোটের শরিক দলগুলোর মধ্যে জন্ম নিচ্ছে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের। এমনকি বিকল্পধারাকে ছাড়াই ভাঙনের মুখে যাত্রা শুরু করা ঐক্যফ্রন্ট ঠিক কত দূর এগোবে—এ নিয়ে জোটের ভেতর-বাইরে চলছে আলোচনা-গুঞ্জন। বিকল্পধারার যুগ্ম মহাসচিব মাহী বি. চৌধুরী ও ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম নেতা মাহমুদুর রহমান মান্নার মধ্যকার টেলিফোন আলাপ ফাঁস হয়ে যাওয়ায় বেশ বিতর্কের মুখে এখন ঐক্যফ্রন্ট। এমনকি শক্ত ভীত গড়তে এখনই জোট সম্প্রসারণের কথা ভাবছে ঐক্যফ্রন্ট নেতারা।

জামায়াতে ইসলামীকে না ছেড়েই ঐক্যফ্রন্টে যুক্ত হওয়ায় সমালোচনার মুখে বিএনপি। এ নিয়ে বিপাকে ঐক্যফ্রন্টও। এরই মধ্যে ঐক্যফ্রন্টকে কেন্দ্র করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের মধ্যে ভাঙন শুরু হয়েছে। নির্বাচনী দর-কষাকষির প্রশ্নে বিএনপিকে নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত দুই জোটের অন্য শরিকরাও। এমন অবস্থায় পরিস্থিতি সামাল দিতে বিএনপিকেও নতুন করে নির্বাচনী ও আন্দোলনের কৌশল নির্ধারণ করতে হচ্ছে।

বিশেষ করে ঐক্যফ্রন্টকে কিছুতেই আস্থায় নিতে পারছে না সরকার ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। বিএনপিকে সঙ্গে নিয়ে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন এই জোটের মধ্য দিয়ে ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের গন্ধ পাচ্ছেন ক্ষমতাসীনরা। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা গত রোববার এক জনসভায় ‘নীতিবানরাই খুনি-দুর্নীতিবাজদের সঙ্গে ঐক্য করেছে’ বলে মন্তব্য করেছেন। জোটকে মোকাবিলা করতে নতুন করে কৌশল নির্ধারণ করছে আওয়ামী লীগ। শোনা যাচ্ছে ১৪ দলীয় জোট সম্প্রাসরণের কথাও।

গত শনিবার আত্মপ্রকাশের পর থেকে গতকাল পর্যন্ত দেশের রাজনীতি পর্যবেক্ষণ করে এবং খোঁজখবর নিয়ে ঐক্যফ্রন্টকে ঘিরে রাজনীতির এমন চিত্র পাওয়া গেছে। গত শনিবার আত্মপ্রকাশের পর মাত্র তিন দিনের মাথায় গতকাল বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট থেকে চলে যায় দুই শরিক দল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) ও ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এনডিপি)। ওয়ান ইলেভেনের কুশীলবদের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক গড়ার অভিযোগ তুলে জোট ছাড়ে দল দুইটি। জোট ছাড়ার ঘোষণা দিয়ে দল দুইটির নেতারা এমন প্রশ্নও তোলেন যে ক্ষমতায় যেতে আরেকটি অগণতান্ত্রিক অশুভ শক্তিকে ক্ষমতায় আনার ষড়যন্ত্রের অংশীজন হতে যাচ্ছে কিনা বিএনপি। এ দুইটি দল ২০১২ সাল থেকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে ছিল। বিএনপি জোটের প্রতি আনুগত্য দেখিয়ে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বয়কট করে তারা। ন্যাপ-এনডিপির অভিযোগ, জোটের জন্য বড় ত্যাগ স্বীকার করলেও তাদের সেভাবে মূল্যায়ন হয়নি।

এদিকে বিকল্পধারা ছাড়াই জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর থেকে দ্বিধাবিভক্ত যুক্তফ্রন্ট। এই জোটের চেয়ারম্যান বিকল্পধারার সভাপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। জোটের গুরুত্বপূর্ণ বাকি দুইটি দল যুক্ত হয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে। ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর বিকল্পধারা, জেএসডি ও নাগরিক ঐক্যের সমন্বয়ে গঠিত যুক্তফ্রন্ট অনেকটা কার্যকারিতা হারিয়েছে। জেএসডি ও নাগরিক ঐক্য এখন ব্যস্ত ঐক্যফ্রন্ট নিয়ে। এছাড়া যুক্তফ্রন্টে সম্প্রতি যোগ দেওয়া সোনার বাংলা পার্টি ও জনদল থাকছে ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুক্তফ্রন্টের এক শীর্ষ নেতা জানান, ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর যুক্তফ্রন্টের আর কোনো প্রাসঙ্গিকতা থাকছে না। এমনকি বিকল্পধারা বি. চৌধুরীর নেতৃত্বে নতুন বড় জোট গঠনের পরিকল্পনা করছে বলেও শোনা যাচ্ছে।

তবে বিকল্পধারার যুগ্ম মহাসচিব মাহী বি. চৌধুরী বলেন, যুক্তফ্রন্ট ভাঙেনি। ঐক্যফ্রন্ট গঠন নিয়ে মতবিরোধ হয়েছে, তাতে পুরনো জোট ভাঙার কিছু নেই। শিগগিরই যুক্তফ্রন্টের বৈঠক ডাকা হতে পারে।

আবার বিকল্পধারা ভেঙে যাচ্ছে এমন গুঞ্জনও রয়েছে রাজনীতিতে। গত শনিবার জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের দিনেই বিকল্পধারার দুই নেতাকে বহিষ্কার করা হয়। তারা হলেন বিকল্পধারার সহ-সভাপতি শাহ আহাম্মেদ বাদল ও কৃষিবিষয়ক সম্পাদক জানে আলম হাওলাদার। এ নিয়ে দলের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। এরপর থেকে এ গুঞ্জন শুরু হয় যে বিকল্পধারা ভাঙতে পারে। বহিষ্কৃতদের নেতৃত্বে একটি অংশ বিকল্পধারার নতুন কমিটি গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে। এ অংশ শিগগির তলবি সভা করবেন। তবে বহিষ্কৃত দুইজন ছাড়া বাকি সব নেতা দলের সঙ্গে আছেন বলে জানিয়েছেন মাহী বি. চৌধুরী। তিনি জানান, বহিষ্কৃতরা বিভিন্ন বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন।

এদিকে বিকল্পধারাকে ঐক্যফ্রন্টে আনার পাশাপাশি ঐক্যফ্রন্টকে সম্প্রসারণের চেষ্টা হচ্ছে বলে জানা গেছে। বিকল্পধারা সূত্র মতে, গত সোমবার রাতে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী রাজধানীর বারিধারায় বিকল্পধারা সভাপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বাসায় তার সঙ্গে বৈঠক করেন। এ সময় বি. চৌধুরীকে ঐক্যফ্রন্টে আসার আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গে কোনো ধরনের ঐক্যে যেতে অস্বীকৃতি জানান বি. চৌধুরী।

একইভাবে ঐক্যফ্রন্টকে সম্প্রসারণের লক্ষ্যে প্রাথমিকভাবে ২০ দলীয় জোটের চারটি দল এলডিপি, বিজেপি, কল্যাণ পার্টি ও জাতীয় পার্টির সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছেন ঐক্যফ্রন্ট নেতারা। জোট সূত্র মতে, সরকারবিরোধী অন্যান্য রাজনৈতিক দলকেও এই ফ্রন্টে আনার চিন্তাভাবনা চলছে। ধীরে ধীরে ২০ দলীয় জোটের অন্য দলগুলো এই ঐক্যফ্রন্টে আনার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত রয়েছে। যে চারটি দলের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা চালানো হচ্ছে সে দলগুলোর শীর্ষ নেতৃত্ব এই প্রস্তাব কিভাবে গ্রহণ করবেন তার ওপর নির্ভর করছে জোট সম্প্রসারণের পুরো বিষয়টি।

এদিকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে সন্দেহের চোখে দেখছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাসহ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী এবং দলের নেতারা এ জোটকে নির্বাচন বানচাল ও সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র এবং চক্রান্ত বলে অভিযোগ করে আসছে। গতকালও সেতুমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ‘শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরানোই ড. কামালের মূল উদ্দেশ্য’ বলে মন্তব্য করেন। তাই জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সরকারবিরোধী এই জোটের নেতাদের তৎপরতায় সতর্ক নজর রাখছে ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারকরা।

দলীয় সূত্রগুলো জানায়, নির্বাচনী কাজ এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের তৎপরতা গভীর নজরদারিতে রাখবে দল। রাজপথে ঐক্যফ্রন্টকে কঠোরভাবে মোকাবিলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে নেতাকর্মীদের। সরকারবিরোধী যেকোনো তৎপরতা রোধে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকেও কাজে লাগানো হবে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন বানচালে এই জোট যাতে কোনো তৎপরতা না চালাতে পারে সেজন্য সতর্ক থাকবে আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্র ১৪ দলের শরিকরা।

এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ১৪ দলের মুখপাত্র ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, এই ঐক্যের (জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট) মধ্যে যারা আছেন তারা সহজভাবে রাজনীতি করেন না। তারা বিভিন্ন সময় চক্রান্ত ষড়যন্ত্রের রাজনীতি করে এসেছেন। ’৭৫-এর পরে গত ওয়ান ইলেভেনের সময়ও দেখেছি তাদের বিতর্কিত ভূমিকা। এখন চিন্তা করি, ঠিক জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে একসঙ্গে তারা আবার কোনো চক্রান্ত করে কিনা।

তবে এসব বিতর্ক ও শঙ্কাকে আমলে না নিয়ে নতুন কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। গতকাল ঐক্যফ্রন্টের শরিক দল জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রবের বাসায় অনুষ্ঠিত বৈঠক থেকে আগামী ২৩ অক্টোবর মঙ্গলবার সিলেট বিভাগ সফরের মধ্য দিয়ে ঐক্যফ্রন্টের কর্মসূচি শুরু করার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে ঐক্যফ্রন্ট নেতারা জানিয়েছেন। এরপর চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা বিভাগে পরবর্তী কর্মসূচি দেওয়া হবে বলেও জানান বৈঠকে অংশ নেওয়া নেতারা। তবে কী ধরনের কর্মসূচি দেওয়া হবে তা স্পষ্ট করা হয়নি। এসব কর্মসূচি সুষ্ঠুভাবে পালন করতে সরকারের সহযোগিতা চান ঐক্যজোটের নেতারা। এমনকি ঐক্যফ্রন্টের লিয়াজোঁ কমিটি গঠন করা হয়েছে বলেও জানান নেতারা।

এ ব্যাপারে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক ও ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ঐক্যফ্রন্টের ঘোষিত লক্ষ্য বাস্তবায়নের শপথ নিতে সব নেতা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে যাবেন। পরিবর্তনের বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে ঐক্যফ্রন্টের কর্মসূচি শুরু হবে। কর্মসূচি চূড়ান্ত।

অবশ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে বাদ দিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গড়ায় এবং সেখানে ন্যূনতম শর্তে যুক্ত হতে পারায় খুশি বিএনপি। তবে এই ফ্রন্ট টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে বেশকিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে বলে মনে করছে দলটি। কারণ আসন বণ্টন ও ক্ষমতার ভারসাম্য, এমনকি জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্কের প্রশ্নে এখনো বেশকিছু বিষয়ে ঐকমত্য হয়নি ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে। নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নার সঙ্গে বেশকিছু ইস্যুতে এর আগে ঝামেলা হয়েছিল ড. কামালের, যা পরে নিষ্পত্তি হয়েছে।

এ ব্যাপারে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ঘোষণায় বিএনপি অবশ্যই খুশি। তবে আমরা আরো খুশি হব যদি সরকারের বাইরে থাকা দলগুলো এই ফ্রন্টের সঙ্গে যুক্ত হয়। আমরা চেষ্টা করব সব ইস্যুতে যেন ঐকমত্য হয়। আমরা একসঙ্গে চলতে পারি।


আরোও সংবাদ