রাজধানী ঢাকার বেশ কিছু স্থানে প্রকাশ্যেই বসছে কচ্ছপ বিক্রির হাট

প্রকাশ:| মঙ্গলবার, ৪ নভেম্বর , ২০১৪ সময় ১১:৪৪ অপরাহ্ণ

রাজধানী ঢাকার বেশ কিছু স্থানে প্রকাশ্যেই বসছে পরিবেশের বন্ধু হিসেবে পরিচিত কচ্ছপ বিক্রির হাট। শিকারিরা দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে শিকার করে কচ্ছপ ও তার মাংস বিক্রি করেন এসব হাটে।
কচ্ছপ বিক্রির হাট
অথচ দেশের সব বণ্যপ্রাণী সংরক্ষণে রয়েছে একটি বিশেষ আইন। কিন্তু বিলুপ্তপ্রায় এই প্রাণীটি বিকিকিনিতে সে আইন বা নিয়ম মানা হচ্ছে না। প্রশাসনের চোখের সামনে এমনটা ঘটলেও দেখেও যেন দেখছে না কেউ।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে চোখে পড়েছ কচ্ছপ বিক্রির বেশ কিছু হাট। তার মধ্যে পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার হচ্ছে কচ্ছপ বিক্রির সবচেয়ে বড় বাজার। এখানে সপ্তাহের প্রতি শুক্রবার কচ্ছপ বিক্রির হাট বসে।

হাটটিতে গিয়ে দেখা গেছে, বিভিন্ন প্রজাতির বিপন্নপ্রায় কচ্ছপ বিকিকিনিতে ব্যস্ত ব্যবসায়ীরা। এখানে রয়েছে কচ্ছপ সংক্ষণের বড় বড় আড়ৎ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শিকারিরা চোরাইভাবে বন্য কচ্ছপ শিকার করে এখানকার আড়ৎদারদের কাছে বিক্রি করছেন।

তাঁতীবাজার ছাড়াও রাজধানীর আরো বহু স্থানে বসে কচ্ছপ বিক্রির হাট। পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার ও তাঁতীবাজার, টঙ্গী, ফার্মগেটে কচ্ছপ ও কচ্ছপের মাংস বিক্রি করা হয়ে থাকে। এসব হাট-বাজারে প্রতিদিন অসংখ্য কচ্ছপ বিক্রি হয়ে থাকে। সারাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসব বন্য কচ্ছপ আনা হয়। এখান থেকে দেশের বাইরেও কচ্ছপ পাচার করা হয়।

এসব বাজারে প্রতি কেজি সন্ধি কাছিমের মাংস ৩৫০ টাকা, কড়ি কাইট্টা ৪০০ টাকা, হলুদ কাইট্টা ৪০০ টাকা, জাত কাছিম ৪৫০ টাকা, গাঙ্গুয়া কাছিম ৬৫০ টাকা, বাটাগুড় বাস্কা ১৬০০ টাকা দরে বিক্রি হয়। কচ্ছপকে বিক্রেতারা কাছিমও বলে থাকেন।

তবে আইনে বন্য কচ্ছপ নিধন নিষিদ্ধ হলেও নিজস্ব খামারের মাধ্যমে উৎপন্ন কচ্ছপ বেচাবিক্রি বৈধ। তাই বিক্রেতারা কচ্ছপগুলোকে বন্য বলেই ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করছেন।

তাঁতীবাজারের কচ্ছপ বিক্রেতারা জানান, বছরের প্রায় সব সময়ই তারা কচ্ছপ বিক্রি করে থাকেন। বিশেষ করে হিন্দু ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের লোকজন এ প্রাণীর মাংস বেশি খান। তাছাড়া কেউ কেউ কচ্ছপের মাংসকে আয়ু বাড়ার ওষুধও মনে করেন। অনেকেই আবার বাত-ব্যথা জন্যও এর তেল ব্যবহার বা মাংস খেয়ে থাকেন।

পরিবেশবাদীরা বলছেন, ‘পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় কচ্ছপের গুরুত্ব অনেক বেশি। কিন্তু শিকারিদের এমন অবাধ শিকারের কারণে প্রতিবছর প্রকৃতি থেকে হাজার হাজার কচ্ছপ হারিয়ে যায়। এর মধ্যেই বিরল প্রজাতির কচ্ছপ বিলুপ্ত হতে চলেছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে হলে কচ্ছপের পাশাপাশি প্রতিটি প্রাণীই সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে।’
kasim বিপন্ন কচ্ছপের প্রকাশ্য বিকিকিনি
তাঁতীবাজার ও শাঁখারীবাজারের বেশ কয়েকজন কচ্ছপ শিকারির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বছরের কার্ত্তিক মাস থেকে চৈত্রমাস পর্যন্ত কচ্ছপ শিকারের মৌসুম। এ সময় খাল-বিল, নদী-নালা ও জলাশয়ে পানি কমে থাকে। স্বল্প পানিতেই কচ্ছপ ধরা পড়ে বেশি। শিকারিরা সামান্য পরিমাণ পানির মধ্যে কোচ জাতীয় বিশেষ ধরনের উপকরণ দিয়ে কচ্ছপ শিকার করেন। যদিও সরকারিভাবে কার্তিক থেকে চৈত্র মাস প্রজনন মৌসুম হওয়ায় কচ্ছপ ধরা ও মারা নিষিদ্ধ।

বর্তমানে কচ্ছপের প্রায় ৩০০ প্রজাতি পৃথিবীতে থাকলেও এর মধ্যে মাত্র ২০ প্রজাতির কচ্ছপ বর্তমানে বাংলাদেশে পাওয়া যায়। কচ্ছপের জাতগুলোর মধ্যে সন্ধি কাছিম, কড়ি কাইট্টা, হলুদ কাইট্টা, ধুর কাছিম, জাত কাছিম ও গাঙ্গুয়া কাছিম অন্যতম। বাকি জাতগুলো দিনদিন হারিয়ে গেছে।

যদিও কচ্ছপ বিলুপ্তির কথা চিন্তা করে ১৯৯৮ সালে সরকার কচ্ছপের ব্যবসা নিষিদ্ধ করেছে সরকার। কিন্তু এ প্রাণীটি সংরক্ষণে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের কোনো উদ্যোগই নেই। বন বিভাগের নীরবতায় কচ্ছপসহ দেশের বহুল প্রজাতির প্রাণী হারিয়ে যাচ্ছে বলে দাবি করেছেন পরিবেশবাদীরা।

তবে বন্যপ্রাণী রক্ষায় বিভিন্ন সময়ে অভিযান পরিচালনা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। গত ২৩ অক্টোবর সকালে রাজধানীর তাঁতীবাজারে অভিযান চারিয়ে ৪ কচ্ছপ বিক্রেতাকে আটক করেছে তারা। তবে মাঝে মধ্যে পরিচালিত এসব অভিযান লোক দেখানো মাত্র বলে দাবি করছেন পরিবেশবাদীরা।

পরিবেশবাদি সংগঠন ডাব্লিউবিবি ট্রাস্টের মিডিয়া এডভোকেসি অফিসার সৈয়দ সাইফুল আলম শোভন বাংলামেইলকে অভিযোগ করে বলেন, ‘বন্যপ্রাণী দেশের সম্পদ, জীবন, জীবিকা ও পরিবেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এর জন্য কারো কোনো মাথা ব্যথা নেই।’

তিনি জানান, দেশের বন্যপ্রাণী রক্ষায় বন্যপ্রাণী অপরাধ সংক্রান্ত যে কোন তথ্য জানাতে বন অধিদপ্তর ও বিশ্বব্যাংক যৌথভাবে একটি হটলাইন সার্ভিস চালু করা হয়েছে। যার নম্বর ০১৭৫৫৬৬০০৩৩। কিন্তু এ নম্বরটি তথ্য দানকারীকে বিভ্রান্ত করা ছাড়া কোন উপকার দিচ্ছে না।
kasim বিপন্ন কচ্ছপের প্রকাশ্য বিকিকিনি
বিশিষ্ট পরিবেশবিদ ও প্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. এন আই খান বাংলামেইলকে বলেন, ‘দেশে বণ্যপ্রাণী সংরক্ষণে অনেক আইন আছে। কিন্তু তার প্রয়োগ নেই। এজন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীসহ সবাইকে সচেতন হতে হবে। আইনের প্রয়োগ ও জন-সচেতনা বৃদ্ধি করতে পারলেই কাচ্ছপসহ বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীগুলো রক্ষা করা যাবে।’

এজন্য বণ্যপ্রাণী বিষয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্য বইয়ে একটি অধ্যায় সংযুক্ত কারার জন্যও সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান।

এ ব্যাপারে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অপরাধ দমন বিভাগের বন্যপ্রাণী পরিদর্শক অসিম মল্লিক বাংলামেইলকে বলেন, ‘বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে। আমরা এখন আর পুলিশের সহযোগিতা নিচ্ছি না। কারণ তাদের সহযোগিতা নিলে অপরাধীরা প্রকৃত সাজা পায় না। এখন থেকে সরাসরি ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অপরাধীকে সাজা দেয়ার ব্যবস্থা করছি। আশা করছি এর মধ্যেমে সচেতনা বৃদ্ধির পাশাপাশি বণ্যপ্রাণী সংরক্ষণ করা যাবে।’