রাউজানে গরুর বাজারে তৎপর শতাধিক মৌসুমী ব্যবসায়ী

প্রকাশ:| বৃহস্পতিবার, ১ সেপ্টেম্বর , ২০১৬ সময় ০৯:৩২ অপরাহ্ণ

মৌসুমী ব্যবসায়ী
শফিউল আলম, রাউজানঃ
মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ আসন্ন। চাঁদ উদয়ের পর হতে ঈদের আগের দিন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানের ন্যায় চট্টগ্রামের প্রবাসী অধ্যূষিত রাউজানের উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজার সহ প্রায় প্রতিটি গ্রামে চলবে কোরবানি পশুর জমজমাট কেনাবেচা। এই কোরবানি ঈদের পশুর বাজারকে সামনে রেখে ইতোমধ্যে উপজেলার প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নের প্রতিটি গ্রামে প্রায় শতাধিক মৌসুমী পশু ব্যবসায়ীরা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গরু ক্রয় করে এনে মজুদ করে লালন পালন করছেন। অত্র অঞ্চলের কোরবানি পশুর যোগান দিতে পিছিয়ে নেই ক্ষুদ্র খামারীরাও।
সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, উপজেলার পাহাড়তলী , ঊনসত্তরপাড়া, কদলপুরের ঈশান ভট্টের হাট, সোমবাইজ্যে হাট সংগ্লন্ন এলাকা, নাতোয়ান বাগিছা, মোহাম্মদ পুর, পূর্ব রাউজান, হিঙ্গলা, ডাবুয়া, হলদিয়া, সুলতানপুর, জালানি হাট, গহিরা, চিকদাইর, নোয়াজিশপুর, মগদাইর, আধারমানিক, কাগতিয়া, পথেরহাট,পূর্ব গুজরা, পশ্চিম গুজরা, পাঁচখাইন, ব্রাক্ষ্মণ হাট, লাম্বুর হাট, গচ্ছি, খেলারঘাট. উত্তর সর্তা, বইজ্যার হাট, রমজান আলী হাট, গৌরি শংকর হাট, সহ বিভিন্ন এলাকায় পেশাদার ব্যবসায়ীদের সাথে সাথে মৌসুমী ব্যবসায়ীরা কোরবানি হাটে কেনাবেচা করার লক্ষ্যে বেশ কয়েকদিন ধরে দেশের উত্তরাঞ্চল ও পার্বত্য এলাকা থেকে গরু ক্রয় করে খোলা মাঠে বা নানা খালি জায়গায় তাবু টেনে অস্থায়ী গোয়ালঘর তৈরি করে লালন-পালন করছে।
এদিকে গত বছর কুরবানীর ঈদে গরু ব্যবসায় ধস নামায় অনেক পেশদার ও মৌসুমী গরু ব্যবসায়ী আর্থিকভাবে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হয়। যার ফলে এবার অনেকে গরু ব্যবসায়ী ব্যবসা করার উদ্দেশ্য থাকলেও আর্থিক কারণে তা সম্ভব হচ্ছেনা বলে জানান।
কয়েকজন মৌসুমী গরু ব্যবসায়ীর সাথে কথা বলে জানা যায়, আসন্ন কোরবানি ঈদে প্রবাসী অধ্যূষিত রাউজানের প্রায় সিংহভাগ পরিবার পশু কোরবানী দেয়। এদের মধ্যে কোন কোন পরিবার একাধিক পশু কোরবানী দেয়।এ কারণে রাউজানে কোরবানী গরুর চাহিদা প্রচুর। এই গরুর চাহিদার যোগান দিতে স্বল্প সময়ে অধিক মুনাফার আশায় পেশাদার ব্যবসায়ীদের সাথে মৌসুমী ব্যবসায়ীরাও গরুর ব্যবসায় নেমে পড়ে। মৌসুমী ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনেকে শখের বশে, অনেকে স্বল্প দামে পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের কোরবানি পশুর চাহিদা মিটিয়ে কিছু লাভের আশায় গরু ব্যবসায় নেমে পড়েছে।তবে অনেক প্রবাস ফেরতরাও এই ব্যবসায়ে জড়িয়ে পড়ে। অধিকাংশ মৌসুমী ব্যবসায়ীদের ব্যবসায়ে অর্থের যোগান আসে প্রবাসী ভাই, বন্ধু, আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে। পশুর মধ্যে উট, গরু মহিষ, ভেড়া, ছাগল কোরবানী দেওয়া গেলেও এ অঞ্চলের মানুষের কাছে কোরবানি পশু হিসেবে প্রথম পছন্দ দেশী জাতের গরু ও ছাগল। তাই মৌসুমী ব্যবসায়ীরা দেশের পার্বত্য অঞ্চলের খাগড়াছড়ি, রামগড়, লংগদু, কাউখালি, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও উত্তরাঞ্চরের রাজশাহী, বগুড়া, ময়মনসিংহ, কুড়িগ্রাম, শরিয়তপুর, রংপুর সহ বিভিন্ন জেলা থেকে দেশী জাতের গরু ক্রয় করে একক বা যৌথভাবে ট্রাকে করে গরু নিয়ে আসে। প্রতিটি ট্রাকে ২০ থেকে ২৫টি গরু আনা যায়। রাউজানে গরু আনতে পার্বত্য এলাকা থেকে ট্রাক প্রতি করচ পড়ে ৬-৭ হাজার টাকা আর উত্তরাঞ্চল থেকে খরচ পড়ে ২৫-৩০ হাজার টাকা। এছাড়াও পথে বিভিন্ন স্থানে পুলিশসহ বিভিন্ন গডফাদারদের চাঁদাবাজির শিকার হতে হয় বলে জানা গরু ব্যবসায়ীরা।
দেখা যায়, আমদানীকৃত গরুর মধ্যে ছোট গরুর সংখ্যাই সবচাইতে বেশী। তবে অনেকে দুই চারটি বড় গরুও আমদানী করেছেন । তবে এ গরুগুলো ৭০-৮০ হাজার টাকার বেশী নয়। উপজেলার পাহাড়তলী শেখপাড়া গ্রামের মৌসুমী গরু ব্যবসায়ী গাজী নুরুল ইসলাম ও আবু ছালেক চৌধূরী জানান, তারা অনেকটা শখের বশবর্তী হয়ে এই ব্যবসায় নেমে পড়েছেন। তারা প্রাথমিক পর্যায়ে কুড়িগ্রাম থেকে ছোট বড় মিলে ৩০ টি গরু এনেছে । দু’একদিনের মধ্যে আরো ৩০টি মত গরু আনবেন। বর্তমানে তাদের কাছে থাকা গরু গুলোর মূল্য গরু ভেদে ৩৫-৭৫ হাজার টাকা। অপেশাদারীত্বের কারণে কোন সমস্য সম্মুখীন হতে হয় কিনা জানতে চাইলে তারা জানান, গরু গুলো লালন-পালনের জন্য ব্যয় একটু বেশী হচ্ছে। তারা নিজেরা ছাড়াও ২জন কাজের লোক সর্বদা নিয়োজিত রয়েছেন। গরুর খাবার খুড়া, ভুষির দাম একটু বেশী । ৪০ কেজি খুড়ার দাম ৪’শ থেকে ৪’শ বিশ টাকা ভুষির বস্তা ৯’শ থেকে ১২’শ টাকা । এছাড়া রোগ ব্যাধির সমস্যাও রয়েছে। এসব বাদ দিলে এই ব্যবসাটা আমরা বেশ উপভোগ করছি।
অনেকে আগেভাগে এসব অস্থায়ী গরুর বাজার থেকে নিজের পছন্দের গরুটি ক্রয় করে নিচ্ছেন। ক্রেতাদের দৃষ্টি ভারতীয় ও দেশের বাইরের বিভিন্ন ইনজেকশন এবং মানবদেহে ক্ষতিকর ঔষধ খাওয়ানো গরু’র বিপরীতে দেশীয় জাতের গরু’র দিকেই বেশী। কদলপুরে গরু ক্রয় করতে আসা এহেছানুল হক চৌধূরী নামের এমনি একজন ক্রেতা জানান, এসেছি গরু দেখতে, সুবিধামত দামে গরু মিললে নিয়ে নেয়ার চিন্তা করেছি। হাট থেকে গরু ক্রয় করে আনার ঝামেলা থেকে রেহায় পেতে আগেভাগে এখানে গরু দেখতে এসেছি। কিন্তু অন্যান্য বারের চেয়ে প্রচুর গরু আসলেও বেপারীরা দাম হাঁকছেন বেশী। দামের ব্যাপারে বক্কর নামের এক ব্যবসায়ী জানান, পশুর ক্রয়, পরিবহন খরচ, খাবারের দামসহ লালন-পালনের নানা খরচ অন্যান্য বছরের তুলনায় বেশী। সেকারণে গরু দাম একটু বেশী।
দেখাযায়, উপজেলার বিভিন্ন হাটে ও স্পটে গরু রাখার সুবিধার্থে নতুন করে স্থাপন করা হচ্ছে অসংখ্য বাঁশ। কোনো কোনো স্থানে বৃষ্টির কথা মাথায় রেখে টাঙ্গানো হয়েছে শামিয়ানা। ইতোমধ্যে গরু বাজারের ইজারাদাররা ক্রেতাদের নজর কাড়তে নিচ্ছে নানান উদ্যোগ। এদিকে কোরবানি গরুর বাজারকে সামনে রেখে বেড়েই চলেছে গরু চুরির ঘটনা । এই শংকায় খামারি, মৌসুমী ব্যবসায়ী সকলেই কাটাচ্ছে নির্ঘুম রাত। বিগত এক দশকে রাউজানের গরুর বাজারে চাঁদাবাজি, ছিনতাইয়ের মত তেমন কোন ঘটনা ঘটেনি। তবুও কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী রয়েছে তৎপর। এবিষয়ে রাউজান থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কেপায়েত উল্লাহ জানান, গরু ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা যাতে নির্বিঘেœ কোরবানি পশু কেনাকেটা করতে পারে সে লক্ষ্যে প্রতিটি স্পটে পুলিশের টহল থাকরে। তবে তিনি টাকা লেনদেনের ক্ষেত্রে জাল নোটের ব্যাপারে সকলকে সজাগ থাকার আহ্বান জানান।