রাইফার মৃত্যু: ভুল চিকিৎসায় হয়েছে বললেন ডা. আঞ্জুমান আরা

নিউজচিটাগাং২৪/ এক্স প্রকাশ:| বৃহস্পতিবার, ২৬ জুলাই , ২০১৮ সময় ০৮:৫৫ অপরাহ্ণ

শরীফুল রুকন : চট্টগ্রামের ম্যাক্স হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় সাংবাদিককন্যা রাইফা খানের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের কার্যনির্বাহী কমিটির জেনারেল সেক্রেটারি ডা. আঞ্জুমান-আরা-ইসলাম। রাইফার মৃত্যুতে চিকিৎসক-নার্সের দোষও দেখছেন তিনি।

বৃহস্পতিবার দুপুরে মা ও শিশু হাসপাতাল নার্সিং ইনস্টিটিউটে ডিপ্লোমা ইন নার্সিং কোর্সের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক ডা. আঞ্জুমান-আরা-ইসলাম।

তিনি বলেন, এখানে আমার সাংবাদিক ভাইয়েরা আছেন, সাংবাদিক-ডাক্তার মুখোমুখি অবস্থানে এখন। এটার অবসান হোক। আজকে এই সভা থেকে আমি দোয়া করি। আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করি। অবশ্যই আমাদের দোষ আছে, আমরা স্বীকার করি। আমরা ভালো হয়ে যাবো। আমরা সেবা দেবো, শ্রম দেবো, বাড়তি দেবো। তাহলে কিন্তু কোনো সমস্যা হবে না।’

চিকিৎসক ও নার্সদেরকে পরামর্শ দিয়ে ডা. আঞ্জুমান-আরা-ইসলাম বলেন, ‘আমি ডাক্তার হয়েছি বলে মহাপুরুষ হয়ে যাইনি। তুমি নার্স হয়েছো বলে ধমক দিয়ে কথা বলবে? না, কখনোই না। এই অ্যাসাইনমেন্ট তোমাকে দেওয়া হয়নি। আল্লাহতায়ালা ডাক্তার হিসেবে আমাকে বানিয়েছেন, পাশে দাঁড়িয়ে প্রেসক্রিপশন লিখে, নার্সকে বুঝিয়ে দিতে। বাকি কাজ সুন্দরভাবে নার্স করবে। কাজটা অসুন্দর হয়েছে বলেই, আজকে এই সমস্যা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘ইনজেকশনটা (রাইফাকে পুশ করা সেডিল) স্লোলি দেওয়ার কথা, কম দেওয়ার কথা। পুরো ইনজেকশন দেওয়ার কথা ছিল না। পুরো ইনজেকশন পুশ হয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে বাচ্চাটা মারা গেছে। বাচ্চাটা একজন সাংবাদিকের। এটা আমার বাচ্চা হতে পারতো।’

‘আজকে আমরা পরম করুণাময়ের কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। হে আল্লাহ দোষ-ক্রুটি যা হয়েছে অজান্তে হয়েছে, জেনে শুনে করিনি। আমরা করতে চাইও না। আমাদেরকে ক্ষমা করুন। সবসময় ক্ষমা করুন।’

হবু নার্সদের প্রতি ডা. আঞ্জুমান-আরা-ইসলাম বলেন, আমরা যারা ডাক্তার, নার্স আছি আমরা সৌভাগ্যবান। মানুষকে সেবা করে বেহেস্তে যাওয়ার সুযোগ আমাদের অনেক বেশী। আমি আমার মেয়েদেরকে বলি, মা বেহেস্তের চাবি তোমাদের হাতে আছে, যেহেতু তোমরা সেবিকা হয়েছো। আমাদেরকে একটু নিয়ে যেও।

‘আজকে আমরা যারা মঞ্চে বসে আছি, তোমাদের কাছে এই ফরিয়াদ আবার রাখছি। তোমরা অবশ্যই বেহেস্তে যাবে। যাওয়ার সময় পেছনে আমাদের দিকে একটু তাকাবে। আমাদেরকে তোমাদের সাথে নিয়ে যেও, কেমন?’

নার্সিংয়ে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের প্রতি ডা. আঞ্জুমান-আরা-ইসলাম বলেন, ‘কোন রোগী পাওয়ার পর পাঁচ মিনিট ডাক্তারের কাছ থেকে সব বুঝে নেবে। যেহেতু ডাক্তার লিখে দিয়ে চলে যাবে, তুমি সারাদিন রোগীর পাশে থাকবে। ডাক্তারকে বলবে, কী কাজ, কীভাবে সুন্দর করে করতে হবে? রোগীকে ভালোবেসে, মায়া করে আল্লাহর কাছে জায়গা করে নিও, এই অনুরোধ তোমাদের কাছে।’

প্রসঙ্গত দৈনিক সমকালের চট্টগ্রাম ব্যুরোর সাংবাদিক রুবেল খানের আড়াই বছর বয়সী মেয়ে রাইফা গলায় ব্যথা নিয়ে গত ২৮ জুন বিকালে ম্যাক্স হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর ২৯ জুন রাতে তার মৃত্যু হয়। ভুল চিকিৎসায় তার মৃত্যু হয়েছে অভিযোগ করে আন্দোলন করছেন সাংবাদিকরা।

এ ঘটনায় সিভিল সার্জনের নেতৃত্বাধীন কমিটি ইতিমধ্যে প্রতিবেদন দেয়, যাতে কর্তব্যরত চিকিৎসক, নার্স ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে অবহেলা এবং গাফিলতির প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়ে তিন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। তবে ওই প্রতিবেদনে ভুল চিকিৎসা হয়নি বলে দাবি করা হয়।

এ ঘটনায় গত ২০ জুলাই অভিযুক্ত তিন চিকিৎসক ডা. বিধান রায় চৌধুরী, ডা. দেবাশীষ সেন গুপ্ত এবং ডা. শুভ্র দেব এবং ম্যাক্স হাসপাতালের এমডি ডা. লিয়াকত আলীর বিরুদ্ধে চকবাজার থানায় মামলা করেছেন রাইফার বাবা রুবেল খান।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে নারী নেত্রী ও সাবেক কাউন্সিলর রেহানা বেগম রানু বলেন, পৃথিবীতে ক্ষণিকের অতিথি আমরা। এই নশ্বর পৃথিবীতে আমরা কেবল মৃত্যুঞ্জয়ী হতে পারি, সেবা দিয়েই। সেবিকারা মৃত্যুঞ্জয়ী হবে, তাদের সেবার মাধ্যমে। আমার দৃষ্টিতে নার্সরাই হচ্ছেন শ্রেষ্ঠ বিত্তবান মানুষ। তারা মানুষকে অবহেলা করেন না, মানুষকে ভালোবাসেন, মানুষকে ধ্যান-জ্ঞান করেন।’

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পিএইচপি পরিবারের চেয়ারম্যান সুফী মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, মানুষের মুখে হাসি ফোটানো সবচেয়ে বড় কাজ, সবচেয়ে বড় ইবাদত। কারও দুঃখ দেখলে সেটা কমাতে হবে, তার মুখে হাসি আনার চেষ্টা করতে হবে- এটা একটা ইবাদাত। নার্সিং পেশায় দায়িত্বপালনের মাধ্যমে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা সম্ভব।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সংরক্ষিত কাউন্সিলর আবিদা আজাদ, সাবেক সংরক্ষিত কাউন্সিলর রেখা আলম চৌধুরী, মা ও শিশু হাসপাতালের সহ-সভাপতি এস এম মোরশেদ হোসাইন প্রমুখ।

এর আগে মা ও শিশু হাসপাতাল নার্সিং ইনষ্টিটিউট ও শামসুন নাহার খান নার্সিং কলেজে ২০১৭-২০১৮ সেশনে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের শপথবাক্য পাঠ করানো হয়। অনুষ্ঠানের শেষে মা ও শিশু হাসপাতালের তহবিলের জন্য এক কোটি টাকার চেক তুলে দেন পিএইচপি পরিবারের চেয়ারম্যান সুফী মোহাম্মদ মিজানুর রহমান।


আরোও সংবাদ