রস আহরন ও খেজুর গাছের কদর বেড়েছে

প্রকাশ:| বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারি , ২০১৫ সময় ১১:৪৪ অপরাহ্ণ

গ্রামীণ জীবনে শীতের মওসুমে পিঠা উৎসবের মূল আয়োজনে থাকে খাঁটি গুড়পাটালি। বছরের একটি সময়ে গ্রামগঞ্জের মেঠো পথ বেয়ে, বাগানে, এখানেসেখানেই বেড়ে উঠা খেজুর গাছের কদর যেন বেড়ে যায়। গ্রামের মধুবৃক্ষ হিসেবেই পরিচিত খেজুরের গাছ। সুস্বাদু খেজুর যেমন। তেমনি এর রস। আবার রস থেকেই উৎপাদন করা হয় খাঁটি মানের গুড়পাটালি।
খেজুর গাছের রস১
পাবনা জেলায় চলতি বছরে ৫৩ হাজার গাছ থেকে প্রায় ৯ কোটি টাকার খেজুর গুড়পাটালি পাওয়া যাবে এমনটি আশা করছেন জেলা কৃষি বিভাগ।

শীত এসেছে। জামাই-মেয়ে বাড়িতে আসার আগমন বার্তায় গৃহস্থের দরজায় কড়া নড়াচ্ছেন গাছিরা। গ্রামের সেই মেঠো পথে বেড়ে উঠা অযত্ন আর অবহেলার খেজুরের গাছের কদরও বেড়ে যায় গাছি ও গাছওয়ার মাঝে। খেজুর রস সংগ্রহ01

বাড়ির অতিথি, নিমন্ত্রণে আসা জামাই মেয়েকে শীতের পিঠা খেতে দেয়ার জন্যেই উৎপাদন করতে হয় খেজুর রসের গুড়পাটালি। এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন গ্রামের সেই সব গাছিরা। তারা রাত আর দিন মিলেই চালিয়ে যাচ্ছেন রস সংগ্রহের কাজ। সন্ধ্যার আগমনী বলে দেয় খেজুর গাছের রসতারা দড়ি বেয়ে গাছে উঠেছেন, গাছ ঝুঁড়ছেন। গলায় রশি দিয়ে হাড়ি ঝুলিয়ে গাছ থেকে নামিয়ে আসছেন। আবার শিশির ভেজা ভোর আর শীতের প্রকোপ মারিয়ে গাছ থেকে সংগ্রহ করছেন রাতের জমে থাকা মধুরস।

এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠরা বলেন, পাবনা অঞ্চলে শীত মওসুমে চলে খেজুর গুড়ের বিভিন্ন প্রকারে খেজুর রসপিঠা-পুলি আর পায়েশ খাওয়ার আয়োজন। শহর থেকে গ্রামের নিজ নিজ বাড়িতে আসে শীত মৌসুমে বেড়াতে। গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে জামাতা-মেয়ে, নাতি-নাতনীদের নিয়ে শীত উৎসব ঘিরে তৈরি হয় নানার প্রকার পিঠার আয়োজন। গ্রামের বাড়িতে মেয়ে জামাই ও নাতী-নাতনীদের ছাড়া শীত মৌসুমে পিঠা উৎসব যেন জমে উঠে না। পিঠা তৈরিকে কেন্দ্র করে গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে আনন্দ উৎসবে মুখরিত হয়ে উঠে পুরো অঞ্চল। আর পুরো শীত মৌসুম চলে বিভিন্ন প্রকারের পিঠা খাওয়ার ধুম। নাতি-নাতনীসহ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বাড়ির উঠানে শীতের সকালে শীতল পাটিতে বসেই খেজুরের রস আর মুড়ি খাওয়ার বসে আসর। এ সব নিয়ে নানা গান ও রচিত হয়েছে।
খেজুর রস১ভৌগলিক দিক থেকে পাবনা খুবই প্রাচীন একটি জেলা। এক সময়ে বৃহত্তর পাবনার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল সিরাজগঞ্জ। আজ পৃথক জেলা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। সড়ক পথ, রেললাইনের ধার, জমির আইল, বাড়ির আঙিনায়সহ জেলার ৯টি উপজেলায় ৩২৭ একর খেজুর গাছের বাগান রয়েছে।

পাবনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এসব বাগানে গাছের সংখ্যা ৫২ হাজার ৪শ। প্রতি খেজুর গাছ থেকে প্রতি শীত মওসুমে গাছের রস থেকে গড়ে প্রায় ১৫ থেকে ২০ কেজি গুড়পাটালি পাওয়া যায়। প্রতি কেজি ঝুলা গুড় কমপক্ষে ৬০ থেকে ৭০ টাকা বিক্রি হয়। আর পাটারি গুড় ১০০ থেকে ১২০ টাকা করে বিক্রি হয়ে থাকে। গড়ে প্রতি কেজি ৭০ থেকে ৮০ টাকা করে হলে এ হিসাবে এ বছরে প্রায় ৫৩ হাজার গাছ থেকে প্রায় ৮ থেকে ৯ কোটি টাকার খেজুর গুড় উৎপাদন হবে বলে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের দাবি করছেন। গত বছরের তুলনায় এ বছর আবহাওয়া অনুকূল থাকায় তুলনামূলতভাবে এবারে গুড় বেশি পাওয়া যাবে।

জেলার সবচেয়ে বেশি খেজুর গাছ ঈশ্বরদী উপজেলায়। এখানে গাছের সংখ্যা ১৬ হাজার ৪শ। এ পরের অবস্থান সাঁথিয়ায় রয়েছে ৭ হাজার ২শ। পাবনা সদর ও বেড়া উপজেলায় রয়েছে ৬ হাজার ৪শ করে। সুজানগর, ভাগুড়া ও আটঘরিয়ায় ৪ হাজার করে। সব চেয়ে কম গাছ রয়েছে চাটমোহর ও ফরিদপুর উপজেলায় ২ হাজার করে।

পাবনা অঞ্চলে ঝুলা গুড় খুবই কম উৎপাদন হয়ে থাকে। পাটালি গুড়ের চাহিদা ও কদর বেশি। পাবনার মাটি খেজুর গাছের জন্য খুবই সহায়ক বলে কৃষিবিদরা জানান। এছাড়া রস খুবই সুমিষ্ট হবার কারণে এখানের খেজুর গুড়ের চাহিদাও বেশি। শীত মৌসুমভিত্তিক জেলায় প্রায় ৫শ পরিবার খেজুর গাছের উপর নির্ভরশীল। একজন ব্যক্তি প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৫০টি খেজুর গাছের রস সংগ্রহ করতে পারে। একজন গাছি শীত মৌসুমে ১২০ দিনে, একটি গাছ থেকে প্রায় ১৫ থেকে ২০ কেজি গুড় পেয়ে থাকে।

খেজুর গাছ ফসলের কোনো প্রকারের ক্ষতি করেনা। এ গাছের জন্য বাড়তি কোনো খরচ করতে হয়না। ঝোপ-জঙ্গলে কোনো প্রকার যত্ন ছাড়াই বড় হয়ে উঠে। শুধুমাত্র শীত মৌসুম আসলেই নিয়মিত গাছ পরিষ্কার করে রস সংগ্রহ করা হয়। রস, গুড় ছাড়াও খেজুর গাছের পাতা দিয়ে মাদুর তৈরি ও জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হয়।

ঈশ্বরদীর বিভিন্ন হাট বাজারে প্রচুর খেজুর গুড় পাওয়া যায়। ইতোমধ্যে এখানের গুড় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি হয়ে থাকে। পাইকারি ব্যবসায়ীরা আগাম টাকা দিয়ে গাছিদের কাছ থেকে গুড় কিনে থাকে।

ঈশ্বরদী উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের গাছি শাজাহান আলী, হারুনুর রশিদ, রফিকুল ইসলাম, হাসানুর রহমান, মরজেন প্রামানিক জানান, গাছ কাটার কাজ কষ্টের হলেও রস সংগ্রহে মজা রয়েছে। তৈরি খেজুর গুড় গাছের মালিককে দেয়ার পর এবং নিজের পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনদের চাহিদা মিটিয়ে গুড় বিক্রি করে যে অর্থ আসে তা দিয়ে সংসার বেশ ভালোই চলে। তবে শীতের তীব্রতা বাড়লে খেজুর রস আরও বেশি মিষ্টি হয় সেই সঙ্গে গুড়ও ভালো হয় বলে তারা জানালেন।


আরোও সংবাদ