যানজটে স্থবির চট্টগ্রাম, অচল চট্টগ্রাম

প্রকাশ:| রবিবার, ২৩ আগস্ট , ২০১৫ সময় ১১:৫৯ অপরাহ্ণ

নিউজচিটাগাং স্পেশাল:: যানজটে স্থবির চট্টগ্রাম, অচল চট্টগ্রাম। অসহনীয় তীব্র যানজটে বেহাল চট্টগ্রাম। প্রধান প্রধান সড়ক ছাড়িয়ে যানজট অলি-গলি পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত স্থবির থাকছে বন্দরনগরীর অনেক এলাকা। এতে করে নগরবাসীকে চরম দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। প্রতিদিনের যানজটে নষ্ট হচ্ছে হাজার হাজার শ্রমঘণ্টা।

চট্টগ্রামে যানজট
অসহনীয় তীব্র যানজটে বেহাল চট্টগ্রামে জনদুর্ভোগ প্রকট আকার ধারণ করার পাশাপাশি ভেঙে পড়েছে ট্রাফিক ব্যবস্থা। রিকশা, সিএনজি,  টেম্পু, হিউম্যান হলার, পুরনো বাস আর যত্রতত্র দাড়িয়ে যাত্রী উঠানামা করানো ও পার্কিংয়ের কারণে চট্টগ্রাম শহর যানবাহন চলাচলের অযোগ্য ও যানজটের নগরীতে পরিণত হয়েছে। এর উপর রয়েছে প্রধান সড়ক সমূহের পাশে অসখ্য স্কুল ও ক্লিনিক-রোগ নির্নয় কেন্দ্র যেসব প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পার্কিং ব্যবস্থা না থাকার চাপ।

এতে করে নগরবাসীকে চরম দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। যানজটে নাকাল হচ্ছে মানুষ। ঘরে ফেরাদের দুর্ভোগও চরমে। ট্রাফিক পুলিশের নির্দেশনাও কেউ মানছে না। আবার এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নে পুলিশেরও যেন কোন গরজ নেই। ফলে পরিস্থিতির কোন উন্নতি হয়নি। কার্যত ভেঙ্গে পড়েছে নগরীর ট্রাফিক ব্যবস্থা। পুলিশের নির্দেশনা ছিল ফুটপাত দখল করা যাবে না। যত্রতত্র গণপরিবহন দাঁড় করিয়ে যাত্রী উঠা-নামা করা যাবে না। বিকেল তিনটা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত সড়কে পণ্যবাহী ভারী যানবাহন চলবে না। এসব নির্দেশনার কোনটাই বাস্তবায়ন হয়নি। ব্যস্ততম সব মোড়ে ফুটপাত দখল হয়ে গেছে। রাস্তা দখল করে বসেছে বাজার। সেখানে খুশি সেখানে বাস দাঁড় করিয়ে যাত্রী উঠা-নামা চলছে। ট্রাফিক পুলিশকে খুশি করে নিষিদ্ধ সময়ে ভারী যানবাহনও চলছে। কয়েকদিন রাস্তায় পুলিশকে বেশ তৎপর দেখা গেলেও এখন সবকিছু চলছে আগের মত। তার উপর কয়েকটি সড়কে নির্মাণ কাজের জন্য যানজট আরও তীব্র হয়েছে। মহানগরীর ব্যস্ততম প্রধান সড়কের বহদ্দারহাট থেকে মুরাদপুর হয়ে ষোলশহর ২ নং গেইট, ২ নং গেইট-জিইসি-ইস্পাহানী পর্যন্ত ফ্লাইওভার নির্মাণ কাজের জন্য রাস্তা দখল করে নেয়ায় সেখানে যানজট স্থায়ী রূপ নিয়েছে। রাস্তার মাঝ বরাবর অংশ দখল করে দুই পাশের সরু অংশে চলছে যানবাহন। এই কারণে সেখানে তীব্র যানজট হচ্ছে। যানজট বহদ্দারহাট হয়ে চান্দগাঁও আবাসিক এলাকা, চাঁন্দগাও থানার মোড় হয়ে শাহ আমানত সংযোগ সেতু পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে। অন্যদিকে মুরাদপুর থেকে শুরু হয়ে তীব্র জট ষোলশহর হয়ে সিডিএ এভিনিউ পর্যন্ত ট্রাফিক ব্যবস্থাকে অচল করে দিচ্ছে। কদমতলী জংশনে চলছে আরও একটি ফ্লাইওভারের নির্মাণ কাজ। বছরে পর বছর সম্ভুক গতিতে চলছে এই ফ্লাইওভার নির্মাণ কাজ। এরফলে ব্যস্ততম এই মোড়কে ঘিরে যানজট চমর আকার ধারণ করেছে। ওই এলাকায় কদমতলী বাস টার্মিনাল ছাড়াও আছে বিআরটিসি বাস টার্মিনাল। বিআরটিসি টার্মিনালের পাশে স্টেশন রোডে রয়েছে ঢাকাসহ দূরপাল্লার প্রায় ত্রিশটি বাস সার্ভিসের কাউন্টার। এসব কাউন্টারের সামনে থেকে যাত্রী নিয়ে বাস ছেড়ে যাচ্ছে। যানজটের কারণে যাত্রীদের চরম দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এই ফ্লাইওভারের পাশে রয়েছে ফলের আড়ত। আড়তে আসা বিপুলসংখ্যক ট্রাক রাস্তার পাশে দাঁড় করিয়ে রাখায় যানজট আরও তীব্র হচ্ছে। রেয়াজুদ্দিন বাজার মুখি শাক-সবজি বোঝাই ট্রাকগুলোও কদমতলী হয়ে চৌতন্যগলিতে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। সব মিলিয়ে কদমতলী মোড়কে ঘিরে মহানগরীর বিশাল এলাকায় যানজট স্থায়ী হয়ে গেছে।

মার্কেট এলাকায়ও তীব্র যানজট ও জনজট হচ্ছে। ফুটপাত দখলে চলে যাওয়ায় মার্কেট এলাকায় হাঁটার অবস্থায়ও নেই। বেশিরভাগ মার্কেটেই নেই নিজস্ব গাড়ি পার্কিং। এই কারণে যানজট আরও বাড়ছে। নগরীর নিউমার্কেট ও রেয়াজুদ্দিন বাজারকে ঘিরে তীব্র যানজট কোতোয়ালী, লালদীঘি হয়ে আমতলা, জুবিলি রোড এবং স্টেশন পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে। আক্তারুজ্জামান সেন্টার, ব্যাংকক-সিঙ্গাপুর মার্কেট, লাকীপ্লাজা ও সাউথল্যান্ড সেন্টারকে ঘিরে পুরো আগ্রাবাদে তীব্র যানজট। একই অবস্থা সিডিএ এভিনিউর স্যানমার ওশান সিটি, চকবারের গোলজার কমপ্লেক্স, মতি টাওয়ার ও কেয়ারীকে ঘিরে। মিমি সুপার, কল্লোল সুপার ও আফমি প্লাজাকে ঘিরে প্রবর্তক মোড় হয়ে যানজট নাছিরাবাদ হাউজিং সেসাইটি পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে। যানজটে দেশের অন্যতম ব্যস্ততম বাণিজিক এলাকা চাক্তাই, খাতুনগঞ্জ ও আসাদগঞ্জে স্থবিরতা নেমে এসেছে। তীব্র জটের কারণে সেখানে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে।

একদিকে যানজট অন্যদিকে গণপরিবহনের সংকটে নগরবাসীকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। রাস্তায় নেমে মিলছে না গণপরিবহন। সিটি বাসের বিশাল একটি অংশ গার্মেন্টস ও ইপিজেড শ্রমিকদের পরিবহনে রিজার্ভ ভাড়ায় চলে যাচ্ছে। এর ফলে গণপরিবহন সংকট দেখা দিয়েছে। এ সংকটকে পুঁজি করে ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে ট্যাক্সি ও রিকশা চালকেরা। প্রতিদিন যারা কর্মস্থলে আসা-যাওয়া করেন তারা পড়েছেন বিপাকে। গণপরিবহন সংকটের কারণে যাতায়াত খাতে তাদের কয়েকগুণ বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। নগরীতে সিএনজি চালিত অটোরিকশা চালকদের বেপরোয়া ভাড়া নৈরাজ্য চলছে।

এর উপর যোগ হয়েছে ক্ষতবিক্ষত সড়ক-জনপদ। চট্টগ্রামের রাস্তাগুলোর কী বেহাল দশা হয়েছে তা ঘর থেকে বেরুলেই বুঝা যায়। মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ না পাওয়া, কিংবা যে বরাদ্দ দেয়া হয় তার সঠিক ও সদ্ব্যবহার না হওয়া, সর্বোপরি লাগাতার বৃষ্টির কারণে সড়ক মহাসড়কের অবস্থা একেবারেই করুণ হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। চট্টগ্রাম মহানগরী ও জেলার দেড় হাজার কিলোমিটার সড়কের মধ্যে এক হাজার কিলোমিটার সড়কেরই এখন করুণ অবস্থা।সরেজমিন জেলা ও নগরীর বিভিন্ন রাস্তা ঘুরে ভয়াবহ চিত্র পাওয়া গেছে। চট্টগ্রাম-রাঙ্গামাটি সড়ক, চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি সড়ক, চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়ক, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সিটি গেট থেকে অলংকার পর্যন্ত এলাকায় কয়েক গজ পর পর সড়কে সৃষ্টি হয়েছে খানাখন্দ ও বড় বড় গর্ত। এসব সড়কে যানচলাচল দুরূহ হয়ে পড়েছে।

টানা বর্ষণের সঙ্গে দীর্ঘদিন যাবৎ সংস্কার না হওয়ায় বন্দরনগরী চট্টগ্রামের রাস্তাগুলো যানবাহন চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। প্রধান সড়কগুলোতে যেমন বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হওয়ায় যানবাহন চলাচল কঠিন হয়ে পড়েছে।
একই অবস্থা গলি এবং উপ-গলির সড়কগুলোরও। এর ফলে জনদুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। এ অবস্থায় দ্রুত এসব সড়ক মেরামতের জন্য সরকারের কাছে একশ কোটি বরাদ্দ চাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সিটি কর্পোরেশন।
সিটি কর্পোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, নগরীতে সাড়ে ৮শ কিলোমিটার কাঁচাপাকা সড়ক রয়েছে। এর মধ্যে পাকা সড়কের পরিমাণ সাড়ে ৬শ কিলোমিটার। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এসব সড়ক সংস্কার করা হয়নি।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে টানা বর্ষণ এবং জলাবদ্ধতা। ফলে নগরীর কোনো সড়কই এখন আর যানবাহন চলাচলের উপযোগী নয়। বিশেষ করে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত থেকে ইপিজেড মোড় হয়ে আগ্রাবাদ, ইস্পাহানীর মোড় থেকে জিইসি হয়ে বহদ্দারহাট পর্যন্ত প্রধান সড়কটি বড় বড় খানা-খন্দকে ভরে গেছে। এতে নগরবাসীকে পড়তে হচ্ছে চরম দুর্ভোগে।
ভাঙা-চোরা এসব রাস্তায় প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। যানজটের অন্যতম কারণও চলাচলের অনুপযোগী এসব রাস্তা।
এদিকে, সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কাজী মোহাম্মদ শফিউল আলমের দাবি, টানা বর্ষণে নগরীর তিনশ থেকে সাড়ে ৩শ কিলোমিটার রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতার সৃষ্ট হওয়ায় রাস্তাগুলোর স্থায়িত্ব থাকছে না। এক্ষেত্রে পানি সরে যাওয়ার সাথে সাথে মেরামতের ব্যবস্থা করা হলে খরচ অনেকটা কমবে। এ সব রাস্তার কারণে ভয়াবহ যানজট পরিস্থিতিও তৈরী হচ্ছে।

পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ ভয়াবহ যানজট পরিস্থিতির কথা স্বীকার করে এর নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক পুলিশের সংখ্যা বাড়েনি বলে উল্লেখ করেন। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, ফিটনেসবিহীন ট্রাক, বাস, টেম্পো চলাচল বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ, অবৈধ রিকশা চলাচল নিয়ন্ত্রণ, ট্রাফিক আইনভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে তাত্ক্ষণিক জরিমানা, বাস-ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণ, যত্রতত্র বাস-টেম্পো থামানো বন্ধ করা গেলে যানজট সমস্যার সমাধান হবে। যানজট নিরসনে জাতিসংঘ উন্নয়ন সংস্থার সুপারিশে সড়কের ওপর থেকে ভাসমান হকার ও স্থাপনা নিষিদ্ধ, গুরুত্বপূর্ণ সড়কের মোড়গুলো সম্প্রসারণ, বহুতল মার্কেট ও ভবনের পার্কিং প্লেস বাধ্যতামূলক করার কথা থাকলেও সেগুলো মানছে না কেউ। সিডিএ, সিটি কর্পোরেশন ও মেট্রোপলিটন পুলিশ এ ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা না নেয়ায় সমস্যা আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে বলে বিশেষজ্ঞরা অভিমত দেন।