মোবাইল ব্যাংকিং এ মোবাইল অপারেটররাই

প্রকাশ:| মঙ্গলবার, ১৭ জুন , ২০১৪ সময় ১১:০০ অপরাহ্ণ

মোবাইল ব্যাংকিং 1মোবাইল ব্যাংকিং সেবার পরিধি বাড়াতে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে খোদ মোবাইল ফোন অপারেটররাই। মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক ব্যবহারের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ায় অপারেটরদের কাছে এক প্রকার জিম্মি হয়ে পড়েছে সেবা প্রদানকারী ব্যাংকগুলো। মুনাফা ভাগাভাগি নিয়ে নীতিমালা না থাকায় অপারেটররা ইচ্ছামতো মাশুল আদায় করছে। ফলে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের অনুমোদন নিয়েও অনেক ব্যাংক এ সেবা চালু করছে না, আবার অনেক ব্যাংক এ সেবা চালু করলেও পরিধি বাড়াতে আগ্রহী হচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে সব অপারেটরের নেটওয়ার্ক ডাটা ব্যবহারের ওপর একই হারে চার্জ নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

একই হারে সেবার মাশুল (চার্জ) নির্ধারণে বাংলাদেশ ব্যাংক সব বাণিজ্যিক ব্যাংক, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি), ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় এবং সেলফোন অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটবের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটি আনস্ট্রাকচারড সাপ্লিমেন্টারি সার্ভিস ডাটা (ইউএসএসডি) ব্যয় নির্দিষ্ট করতে কাজ করবে। সেবার মাশুল নির্ধারিত হলে গ্রাহকপর্যায়ে এ সেবা নিতে খরচ কমপক্ষে ৫ টাকা কমে আসবে। বর্তমানে ব্যাংকগুলো প্রতি হাজার টাকা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেন করতে ১৮-২০ টাকা সেবা মাশুল আদায় করছে।

কমিটির একজন সদস্য বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কত টাকা লেনদেন হলো, এ হিসাবে অপারেটরদের চার্জ আদায়ের সুযোগ নেই। তবে নতুন সেবা হওয়ায় এখনো এ পদ্ধতিতেই চার্জ আদায় চলছে। আমরা পর্যালোচনা করে অপারেটরদের একটা চার্জ নির্ধারণ করে দেব। একই হারে চার্জ নির্ধারণ হলে গ্রাহকপর্যায়ে সেবা গ্রহণের চার্জ কমবে। গ্রাহক ভোগান্তিও কমে আসবে।’

জানা গেছে, বাংলাদেশে ২০১০ সালে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের কার্যক্রম শুরু হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক ২৮টি ব্যাংককে এ সেবা প্রদানের অনুমতি দেয়। এর মধ্যে ২০টি ব্যাংক এ সেবা চালু করলেও বাকিরা তা চালু করতে আগ্রহী হচ্ছে না। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের অনুমোদন দেয়ার সময় থেকেই ব্র্যাক ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান বিকাশ, ডাচ্-বাংলার মোবাইল ব্যাংকিং সেবা চালু করে। প্রথমে এ সেবা চালু করায় এ খাতের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে প্রতিষ্ঠান দুটি। সাম্প্রতিক সময়ে ইউসিবিএল, ইসলামী ও ব্যাংক এশিয়া এ সেবার পরিধি বাড়াতে উদ্যোগ নিয়েছে। তবে অন্য ব্যাংকগুলো এ সেবা চালু করলেও বাজার ধরতে এক রকম বিপাকেই আছে। আর আটটি ব্যাংক এ সেবার জন্য অনুমোদন পেলেও চালুর আগ্রহ দেখাচ্ছে না।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ব্যাংকগুলো এ সেবা দিলেও পুরোপুরি সেলফোন অপারেটরদের ওপর নির্ভর করেই চলতে হচ্ছে। কারণ অপারেটরদের নেটওয়ার্ক ব্যবহার ছাড়া এ সেবা দেয়ার কোনো উপায় নেই। যে কোনো ব্যাংককে এ সেবা চালুর আগে অপারেটরদের সঙ্গে চুক্তি করতে হয়। অপারেটরদের সঙ্গে চুক্তির ক্ষেত্রে মুনাফা ভাগাভাগি নিয়ে কোনো নীতিমালা না থাকায় বিপাকে পড়েছে ব্যাংকগুলো। এ সুযোগে অপারেটররা ব্যাংকভেদে পৃথক মাশুল আদায় করছে। ব্র্যাক ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিকাশের সঙ্গে প্রতি হাজার টাকা লেনদেনে গ্রামীণফোনের ৭ শতাংশ চুক্তি হলেও ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি করেছে ৮ শতাংশ।

এভাবে গ্রামীণফোন, বাংলালিংক, রবি, এয়ারটেল ব্যাংকভেদে প্রতি হাজার টাকা লেনদেনে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফা ভাগাভাগির চুক্তি করেছে। বিকাশে প্রতি হাজার টাকা লেনদেনে ৭ শতাংশ অপারেটর, ৮০ শতাংশ এজেন্ট ও বাকিটা বিকাশ পাচ্ছে। আবার ইসলামী ব্যাংকের প্রতি হাজার টাকা লেনদেনে ৮ শতাংশ অপারেটর, ৬১ শতাংশ এজেন্ট ও বাকিটা ব্যাংক পাচ্ছে। এভাবে ব্যাংকভেদে অপারেটরদের মুনাফা ভাগাভাগির হার ৩০ শতাংশ পর্যন্ত। বর্তমানে অপারেটররা এ হার বাড়িয়ে দিতে দরকষাকষি করছে ব্যাংকগুলোর সঙ্গে। এসব কারণে নতুন করে কেউ এ সেবা চালু করার আগ্রহ পাচ্ছে না। আবার অনেকে চালু করলেও গ্রাহক ও সেবার পরিধি বাড়ানোর কোনো উদ্যোগ নেই।

এ অবস্থায় মোবাইল ব্যাংকিং চালু করা ২০টি ব্যাংক সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এ সেবার সমস্যার কথা জানায়। তাদের অভিযোগ, অপারেটরদের কাছে ব্যাংক জিম্মি হয়ে পড়ছে। অপারেটররা ইচ্ছেমতো চার্জ নিতে চায়। আবার তারা চুক্তি ভঙ্গেরও হুমকি দিচ্ছে। প্রথম দিকে চালু করা কয়েকটি ব্যাংক এক্ষেত্রে অপারেটরদের ইন্ধন দিচ্ছে। প্রতি হাজার টাকায় চার্জ দেয়ার পরিবর্তে ডাটা ব্যবহারের ওপর চার্জ দেয়ার প্রস্তাব দেয় তারা। তাদের হিসাবে এতে সেবা ফি কমে আসবে।

এ পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক দাশগুপ্ত অসীম কুমারের নেতৃত্বে গত রোববার একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটির বৈঠক হয়। এতে বলা হয়, অপারেটরের ডাটা ফি একই করতে হবে। সব ব্যাংকের সঙ্গে অপারেটরদের চার্জের হার একই হতে হবে। এতে পুরো সেবার চার্জ কমে আসবে এবং ব্যাংকবহির্ভূত জনগণ আরো বেশি এ সেবায় যুক্ত হতে পারবে। এ কমিটি আলোচনা করে ডাটা হার নির্ধারণ করবে, যা বিটিআরসি এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় অপারেটরদের মানতে নির্দেশনা নেবে।

এ পর্যন্ত ১ কোটি ৫৪ লাখ গ্রাহক মোবাইল ব্যাংকিং সেবায় যুক্ত হয়েছে। আর এজেন্টসংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ২৬ হাজার। ২০১২ ও ২০১৩ সালে যে হারে এ সেবার প্রবৃদ্ধি হয়েছিল, বর্তমানে তা ঋণাত্মক হয়ে গেছে। চলতি বছরের এপ্রিলে সচল অ্যাকউন্টের সংখ্যা এর আগের মাসের তুলনায় ২ দশমিক ৭৭ শতাংশ কমে ৫৭ লাখ ৬৬ হাজারে নেমেছে। একই সময়ে ইনওয়ার্ড রেমিট্যান্স ৫ দশমিক ৫২ শতাংশ কমে ৩ কোটি ৮ লাখ টাকা হয়েছে।