মেইড ইন বাংলাদেশ

প্রকাশ:| শনিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর , ২০১৩ সময় ১১:২০ অপরাহ্ণ

প্লাস্টিক সামগ্রীঘরে-বাইরে যেকোনো প্লাস্টিকসামগ্রীর গায়ে এখন লেখা থাকে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’। বিস্ময়কর হলেও সত্য, একসময়কার আমদানিনির্ভর এসব পণ্যের প্রায় সবই এখন দেশে তৈরি হচ্ছে। সময়ের ব্যবধানে প্লাস্টিকপণ্যে স্বনির্ভরতার দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
মানসম্মত এসব পণ্য দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। বর্তমানে প্রতিবছর গড়ে ২৫ কোটি ডলার প্রচ্ছন্ন ও আট কোটি ডলার সরাসরি রপ্তানি হচ্ছে। তবে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা বা জিএসপি স্থগিত করায় বিপাকে পড়েছেন সম্ভাবনাময় শিল্পটির উদ্যোক্তারা।
শিল্পের একাধিক উদ্যোক্তা বলেন, বর্তমানে মোট রপ্তানি মাত্র ১০ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রে গেলেও দেশটির প্লাস্টিকপণ্যের বিশাল বাজার ধরার সুযোগ ছিল। এ জন্য প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু এখন সেটি হাতছাড়া হতে পারে। জিএসপি স্থগিতের পর শুল্কছাড়ের সুবিধা পাওয়া যাবে না। ফলে পণ্যের দাম বেড়ে অন্যদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে যাবেন তাঁরা।
উদ্যোক্তারা মনে করেন, জিএসপি স্থগিতের সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি কমার পাশাপাশি অন্যান্য দেশেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা আছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও (ইইউ) যদি একই রকম সিদ্ধান্ত নেয়, তবে এ খাতের রপ্তানিই বন্ধ হয়ে যেতে পারে। কারণ, প্লাস্টিকপণ্যের মোট রপ্তানি ৭০ শতাংশই যায় ইইউতে।
এদিকে রপ্তানিবাজার নিয়ে শঙ্কার কালো ছায়া থাকলেও দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে শক্ত ভিত গড়ে নিয়েছেন উদ্যোক্তারা। বাংলাদেশ প্লাস্টিক দ্রব্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিপিজিএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্লাস্টিকপণ্যের বাজার বর্তমানে সাড়ে সাত থেকে আট হাজার কোটি টাকার।
এই বিশাল চাহিদার প্রায় পুরোটাই জোগান দিচ্ছে সারা দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রায় তিন হাজার প্রতিষ্ঠান। এগুলোর মধ্যে স্থানীয় চাহিদা মেটায় দুই হাজার ৫০০, প্রচ্ছন্ন রপ্তানি করে ৪৭৩, সরাসরি রপ্তানি ১৭ এবং উভয় রপ্তানি করে মোট ১০টি প্রতিষ্ঠান।
সম্ভাবনাময় শিল্পের আদ্যোপান্ত: খাতটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দেশে প্লাস্টিকসামগ্রী তৈরির ইতিহাস একেবারে নতুন নয়। ষাটের দশকে অল্পবিস্তর গৃহস্থালি ব্যবহার্য দ্রব্যসামগ্রী তৈরি হতো। তখন ভারত ও চীন থেকে প্রয়োজনীয় প্লাস্টিকপণ্য আমদানি করা হতো। আশির দশকে এসে দেশের এসব পণ্য উৎপাদন ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।
নব্বইয়ের দশকে পোশাক খাতের জন্য হ্যাঙ্গার, পলিব্যাগ, বোতামসহ বিভিন্ন উপকরণ তৈরির মধ্যে দিয়ে প্লাস্টিকশিল্পে বিপ্লব শুরু হয়। প্রচ্ছন্ন এই (সরাসরি নয়) রপ্তানির পর পরই মূলত চাহিদা অনুযায়ী অন্য পণ্যসামগ্রীও উৎপাদন করতে থাকেন উদ্যোক্তারা। একই সঙ্গে প্রচ্ছন্ন রপ্তানির পাশাপাশি সরাসরি রপ্তানি হতে থাকে। ২০০০ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে প্রয়োজনীয় প্রায় সব ধরনের প্লাস্টিকপণ্য উৎপাদনে সক্ষমতা দেখাতে থাকেন উদ্যোক্তারা।
তবে প্লাস্টিকপণ্য উৎপাদনের কাঁচামালের পুরোটাই সৌদি আরব, মালয়েশিয়া ও ভারত থেকে আমদানি করতে হয়।
বাড়ছে রপ্তানি, তবে আছে শঙ্কা: গত চার বছরে প্লাস্টিক খাতের সরাসরি রপ্তানি আয় বেড়েছে ৬৯ শতাংশ, অর্থের পরিমাণে যা সাড়ে তিন কোটি ডলার।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯-১০ অর্থবছরে প্লাস্টিক খাতের রপ্তানি আয় হয় পাঁচ কোটি ডলার। পরের বছর তা বেড়ে দাঁড়ায় ছয় কোটি ৮৭ লাখ ডলার। পরবর্তী দুই বছর, অর্থাৎ ২০১১-১২ ও ২০১২-১৩ অর্থবছরে রপ্তানি আয় হয় যথাক্রমে আট কোটি ৮৬ লাখ ও আট কোটি ৪৫ লাখ ডলার। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাস, অর্থাৎ জুলাই-আগস্টে এক কোটি ২৬ লাখ ডলার আয় হয়।
বর্তমানে বিশ্বের ২৩টি দেশে প্লাস্টিকপণ্য রপ্তানি হচ্ছে। এর মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ, যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, কানাডা ও মালয়েশিয়ায় সবচেয়ে বেশি প্লাস্টিকপণ্য রপ্তানি হয়। এ ছাড়া সার্কভুক্ত দেশ ভারত, শ্রীলঙ্কা ও নেপালে বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিকপণ্য রপ্তানি হয়।
তবে এ ইতিবাচক দিকগুলো যুক্তরাষ্ট্রে জিএসপি স্থগিতের সিদ্ধান্তে হোঁচট খেয়েছে বলে মনে করেন বিপিজিএমইএর সাবেক সভাপতি শাহেদুল ইসলাম। তিনি সম্প্রতি প্রথম আলোকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের খেলনার বাজার বিশাল। বাজারটি ধরতে বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা কাজ শুরু করেছিলেন। সাফল্যও পাচ্ছিলেন। কিন্তু এখন এটি বন্ধ হয়ে যাবে।
সমিতির বর্তমান সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘রপ্তানিবাজার সম্প্রসারণে আমরা ডেভেলপমেন্ট স্টেজে আছি। এ সময়েই আমরা ধাক্কাটা খেলাম। এখন যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি অন্তত ৫০ শতাংশ কমে যেতে পারে। কারণ, জিএসপি স্থগিতের কারণে ৩ থেকে ১৬ শতাংশ শুল্ক দিয়ে রপ্তানি করতে হবে। তাতে পণ্যের দাম যাবে বেড়ে।’ বর্তমানের এই পরিস্থিতিতে অন্যদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে প্লাস্টিকপণ্যের রপ্তানিতে সরকারকে নগদ সহায়তা দেওয়ার দাবি করেন তিনি।
জিএসপি ফিরে পেতে সরকারের উদ্যোগ সন্তোষজনক কি না, এমন প্রশ্ন করলে জসিম উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘জিএসপি স্থগিতাদেশের কারণে প্লাস্টিকসহ বেশ কয়েকটি শিল্প ক্ষতির মুখে পড়েছে। তবে সরকারপক্ষ থেকে প্লাস্টিকশিল্পের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে কী করণীয়, তা নিয়ে একবার আলোচনাও করা হয়নি।’ প্লাস্টিক শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ, আলাদা শিল্পপার্ক নির্মাণ, প্লাস্টিক রিসাইক্লিং করার ব্যবস্থা ও ব্যাংকঋণের সুদের হার কমানোর দাবি করেন তিনি।
একনজরে প্লাস্টিকশিল্প
 দেশজুড়ে ৩ হাজার শিল্পপ্রতিষ্ঠান
 প্রচ্ছন্ন ও সরাসরি রপ্তানি করে ৫০০ প্রতিষ্ঠান
 সাড়ে ৭ থেকে ৮ হাজার কোটি টাকার দেশীয় বাজার
 ২০০০ সালের পর থেকে পণ্য উৎপাদনে সক্ষমতা দেখাচ্ছেন উদ্যোক্তারা
২৩টি দেশে প্লাস্টিক পণ্য যাচ্ছে
৩৩ কোটি ডলার প্রচ্ছন্ন ও সরাসরি রপ্তানি (বার্ষিক)
৬৯% সরাসরি রপ্তানি বেড়েছে চার বছরে
শঙ্কা
জিএসপি স্থগিতের কারণে আমেরিকায় এখন রপ্তানিতে ৩-১৬ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে। কমতে পারে ৫০ শতাংশ রপ্তানি

বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে প্লাস্টিকপণ্যের রপ্তানিতে সরকারকে নগদ সহায়তা দিতে হবে।
মো. জসিম উদ্দিন
সভাপতি, বিপিজিএমইএ


আরোও সংবাদ