মূল হোতাদের ছেড়ে দিলো রেল পুলিশ

প্রকাশ:| শুক্রবার, ৯ অক্টোবর , ২০১৫ সময় ১১:১৩ অপরাহ্ণ

রেলে আগদেশজুড়ে জামায়াত-শিবিরের তান্ডবের সময় চট্টগ্রাম রেলস্টেশনে সুবর্ণ এক্সপ্রেস ট্রেনে আগুন দেয়ার তিন মূল পরিকল্পনাকারীকে বাদ দিয়ে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে রেলওয়ে পুলিশ।

সঠিক নাম-ঠিকানা না পাওয়ায় মূল পরিকল্পনাকারী তিন শিবির কর্মীর নাম আসামির তালিকায় অর্ন্তভুক্ত করা যায়নি বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। পরিকল্পনাকারীদের বাদ দিয়ে পুলিশ রেলস্টেশনের ভাসমান লোকজনকে অভিযোগপত্রে অর্ন্তভুক্ত করেছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

মূল পরিকল্পনাকারীর নাম বাদ দেয়ায় অভিযোগপত্র নিয়ে আদালতে আপত্তি দাখিল করেছেন চট্টগ্রামের জেলা পিপি অ্যাডভোকেট আবুল হাশেম। আদালত রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ আমলে নিয়ে মামলা অধিকতর তদন্তের জন্য রেলওয়ে থানাকে নির্দেশ দিয়েছেন।

তিন শিবির কর্মী হল, সরকারি হাজী মুহম্মদ মহসিন কলেজের ছাত্র হাসান, সরকারি কমার্স কলেজের ছাত্র নাফিস এবং মনির নামে তাদের আরেক সহযোগী।

জেলা পিপি অ্যাডভোকেট আবুল হাশেম বলেন, মামলার এজাহারে এবং গ্রেপ্তার হওয়া একজনের জবানবন্দিতে তিনজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মূল পরিকল্পনাকারী এবং সরাসরি আগুন দেয়ার সঙ্গে জড়িত বলে জবানবন্দিতে তথ্য এসেছে। এরপরও তাদের নাম বাদ দেয়া দূরভিসন্ধিমূলক। তদন্তকারী কর্মকর্তা শিবিরের সঙ্গে যোগসাজশ করে সুকৌশলে অপরাধীদের আড়াল করেছে বলে আমার মনে হচ্ছে।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও চট্টগ্রামের রেলওয়ে থানার সাবেক ওসি মো.ইয়াছিন ফারুক বলেন, তিনজনের নাম-ঠিকানা পাওয়ার এবং তাদের গ্রেপ্তারের জন্য যথেষ্ঠ চেষ্টা করেছি। সেটা সম্ভব না হওয়ায় তাদের নাম অভিযোগপত্রে বাদ দিতে হয়েছে। তবে পরবর্তীতে নাম-ঠিকানা পেলে কিংবা গ্রেপ্তার করা গেলে সম্পূরক অভিযোগপত্রের মাধ্যমে তাদের ওই মামলায় আদালতে সোপর্দ্দ করার কথা বলেছি।

২০১৩ সালের ৭ মে দেশের একমাত্র বিরতিহীন আন্ত:নগর ট্রেন সুবর্ণ এক্সপ্রেসের চারটি কোচে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় শিবিরের সন্ত্রাসীরা। এতে ৬৫২০ নম্বর কোচের একটি আসন, ৬৫১১ নম্বরের চারটি আসন, ৬২০২ নম্বরের নয়টি আসন পুড়ে যায় এবং আগুনের তাপে ক্ষতি হয় ৬২১১ নম্বর কোচটি।

এ ঘটনার পর রেল পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে আজগর আহম্মেদ(২৭) ও মো. মিঠু মিয়া(২৩) নামে দুই শিবির কর্মীকে গ্রেপ্তার করে। এছাড়া পুলিশ ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ১৫ (৩) ধারায় একটি মামলা দায়ের করেন। আজগর আদালতে এ বিষয়ে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়।

তিন তদন্তকারী কর্মকর্তার হাত ঘুরে ২০১৪ ‍সালের ১২ সেপ্টেম্বর আদালতে এ মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করেন রেলওয়ে থানার তৎকালীন ওসি মো.ইয়াছিন ফারুক। অভিযোগপত্রে ১৩ জনকে আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, জবানবন্দিতে আজগর জানিয়েছে, ঘটনার দিন ভোর ৪টার দিকে নগরীর ছোটপুল মোড় থেকে একটি সিএনজি টেক্সিতে করে তারা ছয়জন পুরাতন রেলস্টেশনে আসেন। ছয়জনের মধ্যে ছিল হাসান, নাফিস, মবিন, মনির, ফরহাদ এবং আজগর নিজে।

পুরাতন রেলস্টেশনে যাবার পর আজগরকে নতুন রেলস্টেশনে যাবার নির্দেশ দেয় হাসান। আজগর নতুন রেলস্টেশনে গিয়ে ১০-১৫ মিনিট হাঁটাহাঁটি করে। এসময় সে দেখতে পায়, সাদা বগিওয়ালা একটি ট্রেন স্টেশনের দিকে ঢুকছে এবং এর চার-পাঁচটি বগিতে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। তখন আজগর বুঝতে পারে, হাসান, নাফিস, মনির, মবিন ও ফরহাদ এ ঘটনাটি ঘটিয়েছে।

জবানবন্দিতে হাসান, নাফিস, মনির, মবিন ও ফরহাদকে ট্রেনে আগুন দেয়ার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে আজগর উল্লেখ করে।

জবানবন্দিতে হাসানকে শিবিরের সাথী এবং বাকিদের সক্রিয় সদস্য ও নিজেকে সমর্থক বলে উল্লেখ করে আজগর।

জবানবন্দিতে এই তথ্য এলেও অভিযোগপত্রে হাসান, নাফিস ও মনিরের নাম নেই। অভিযোগপত্রে যাদের আসামি করা হয়েছে তারা হল,একেএম ওয়াহেদুজ্জামান (৩১), মাসুম বিল্লাহ (৩০), আজগর আহমেদ এহছান (২৯), শাহীনূর ইসলাম (১৯), মো.ইলিয়াছ হোসেন (২৭), মো.জিয়াউল ইসলাম প্রকাশ জুয়েল (২৭), মো.মিঠু মিয়া (২৫), মো.ফারুক আজম (২৫),আব্দুল হালিম (২১), তরিকুল ইসলাম প্রকাশ ফরহাদ (২০), নাসিরউদ্দিন খান (২১) সিফাতুল গণি প্রকাশ সিফাত (১৯), মেসবাহউদ্দিন মবিন (১৮),। এবং

জেলা পিপি অ্যাডভোকেট আবুল হাশেম বলেন, মামলায় যাদের আসামি করা হয়েছে এদের অধিকাংশই নিরীহ রেলস্টেশনের ভাসমান লোকজন বলে আমার কাছে তথ্য আছে। গোঁজামিলের চার্জশিট দেয়ার জন্যই তদন্তকারী কর্মকর্তা পিপি’র কাছ থেকে সাক্ষ্যস্মারকে কোন মতামত নেননি। তারা পিপি’র কাছ থেকে বিষয়টি গোপন করে সরাসরি আদালতে অভিযোগপত্রটি দাখিল করেছেন। এতে অনৈতিক লেনদেনের বিষয়ে সন্দেহ হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রেলওয়ে থানার সাবেক পরিদর্শক মো.ইয়াছিন ফারুক বাংলানিউজকে বলেন, আমরা পিপি’র মৌখিক মতামত নিয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন, যাদের নাম-ঠিকানা পাওয়া যাচ্ছেনা তাদের বাদ দিয়েই চার্জশিট আদালতে দাখিল করতে। আমি সেটাই করেছিলাম।

এদিকে অভিযোগপত্রটি নিম্ন আদালত থেকে বিচারিক আদালতে যাবার পর ৭ অক্টোবর জেলা পিপি অ্যাডভোকেট আবুল হাশেম এ ব্যাপারে আপত্তি দাখিল করেন। জেলা ও দায়রা জজ অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দিয়ে নথি পাঠিয়ে দিয়েছেন নিম্ন আদালতে।

জেলা পিপি অ্যাডভোকেট আবুল হাশেম বলেন, নিম্ন আদালত থেকে নথি যাবে রেলওয়ে থানায়। তারপর নতুন তদন্তকারী কর্মকতা নিয়োগ করে অধিকতর তদন্ত শুরু হবে।

নিউজচিটাগাং২৪/এসএ